হারানো বিশ্বকাপ খুঁজে দিয়েছিল যেই কুকুর! – প্রিয়লেখা

হারানো বিশ্বকাপ খুঁজে দিয়েছিল যেই কুকুর!

Sanjoy Basak Partha
Published: May 24, 2018

শুনতে কিছুটা অবাক লাগছে? বিশ্বকাপ হারালোই বা কবে, আবার কোনো কুকুর সেটা খুঁজে বের করলোই বা কবে! রোমাঞ্চকর সেই কাহিনী নিয়েই আজকের বিশ্বকাপ স্পেশাল আয়োজন।

চুরি যাওয়া জুলে রিমে ট্রফি:

১৯৬৬ সালে ঘরের মাটিতে ববি মুরের বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার ছবি এখনো অমর হয়ে আছে ইংলিশ ফুটবল ইতিহাসে। এখনো পর্যন্ত ওই একবারই যে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছে ফুটবলের জনকরা। তবে এই জুলে রিমে ট্রফি নিয়ে নাটক কম হয়নি।

বিশ্বকাপের আগে সেন্ট্রাল লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারের সেন্ট্রাল হলে জুলে রিমে ট্রফির প্রদর্শনী চলছিল। কিন্তু ২০ মার্চ শনিবার প্রদর্শনীর মাত্র দ্বিতীয় দিনেই শো কেস থেকে গায়েব হয়ে যায় বিশ্বকাপের ট্রফি।

একযোগে বিরতিতে যাওয়া সকল নিরাপত্তা কর্মীরা ফেরত এসে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেন, শো কেস থেকে চুরি হয়ে গেছে ট্রফি! ঘটনার সময় উপস্থিত না থাকায় চুরি কীভাবে ঘটলো, কে ঘটালো, এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ ধোঁয়াশার মধ্যে ছিলেন আয়োজকেরা। এই প্রদর্শনীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল ছিল সেটা বোঝাতে গিয়ে ‘দ্য থেফট অফ দ্য জুলে রিমে ট্রফি’ নামক বইয়ের লেখক ড: মার্টিন অ্যাথারটন লিখেছিলেন, ‘পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাই ছিল অপেশাদারিত্বে ভরা। এফএ চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছিল এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠান নিয়ে। নিরাপত্তাকর্মীদের একজনের বয়স ছিল ৭৪ বছর! এ থেকেই বোঝা যায় তারা কিরকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল।’

প্রায় ৩ হাজার পাউন্ড সমমূল্যের জুলে রিমে ট্রফি ডিসপ্লে কেইস থেকে উধাও

কোন প্রত্যক্ষদর্শীই না থাকায় কেউই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে পারছিলেন না। তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে ধারণা করা হয়, দুইজন ব্যক্তি জরুরী নির্গমনের (ইমার্জেন্সি এক্সিট) পথ দিয়ে ঢুকে ট্রফি নিয়ে পালিয়ে যায়।

মুক্তিপণ চেয়ে চিঠি:

জি হ্যাঁ, চুরি যাওয়া ট্রফির জন্য মুক্তিপণ চেয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছিল আয়োজকদের কাছে! চুরি যাওয়া বিশ্বকাপ নিয়ে তখন পুরো ইংল্যান্ডে শোরগোল শুরু হয়ে গেছে। দারুণ সংবেদনশীল এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত ও জুলে রিমে ট্রফি খুঁজে বের করার ভার দেয়া হলো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের উপর। কিন্তু অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও তদন্তের কোন কূল কিনারা করতে পারছিল না স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড।

মূল অপরাধী হিসেবে যেই দুজনকে সন্দেহ করছিল তারা, তাদের দুজনের সম্পূর্ণ বিপরীত বৈশিষ্ট্য সন্দেহ করছিল পুলিশ। একজন লম্বা, আরেকজন খাটো।

এদিকে বিশ্বকাপ খুঁজে না পেয়ে রৌপ্যশিল্পী জর্জ বার্ডকে দিয়ে তাড়াহুড়া করে আসল ট্রফির একটি রেপ্লিকা তৈরি করিয়ে ফেললো এফএ। তবে এফএ’র জন্য চমক বাকি ছিল তখনো। আসল বিশ্বকাপ ফিরে পেতে চাইলে ১৫ হাজার পাউন্ড মুক্তিপণ দিতে হবে, এমন দাবি সম্বলিত একটি নোট এলো এফএ’ চেয়ারম্যান জো মিয়ার্সের কাছে। নোটে জ্যাকসন নামে একজনের স্বাক্ষর ছিল।

পুলিশের পরামর্শে এফএ ও একাধারে চেলসি চেয়ারম্যান মিয়ার্স মুক্তিপণের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার নাটক করলেন।

নির্ধারিত সময়ে একজন আন্ডারকভার পুলিশ এক স্যুটকেস ভর্তি খবরের কাগজ ও সবার উপরে পাঁচ পাউন্ডের নোট দিয়ে স্তর বানিয়ে বাটারসি পার্কে  দেখা করতে গেলেন সেই জ্যাকসনের সাথে। শেষ পর্যন্ত যার সাথে দেখা হলো, তিনি জ্যাকসন নামের কেউ নন, বরং এডওয়ার্ড বেচলি নামের একজন সাবেক সৈন্য! ট্রফি না পেলেও তাই উপায়ন্তর না দেখে বেচলিকেই গ্রেফতার করে আনা হলো।

আসল ট্রফি উদ্ধার:

এদিকে আসল ট্রফি তখন হন্যে হয়ে খুঁজছে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। কিছুতেই রহস্যের কূল কিনারা করতে পারছিল না তারা। শেষ পর্যন্ত ট্রফি উদ্ধারের নাটকের চূড়ান্ত অঙ্ক মঞ্চস্থ হলো ২৭ মার্চ রোববার সন্ধ্যায়।

দক্ষিণ লন্ডনের নরউডের বাসিন্দা ডেভ করবেট একটি ফোন কল করার জন্য ও পোষা কুকুর পিকলসকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার জন্য ঘরে তালা দিয়ে বাইরে বের হলেন। তখনো কী আর তিনি জানতেন, তিনি এবং তার কুকুর বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে যাচ্ছেন!

‘পিকলস আমার প্রতিবেশীর গাড়ির কাছে ঘুরঘুর করতে লাগলো। হঠাৎ সেখানে পত্রিকা দিয়ে মোড়ানো, কিন্তু দড়ি দিয়ে খুবই শক্তভাবে বাঁধা একটি প্যাকেট দেখতে পেলাম।

আমি প্যাকেটটার নিচের দিকের বেশ খানিকটা অংশ টেনে ছিঁড়ে ফেললাম। তারপর কালো রংয়ের একটি আবরণ দেখতে পেলাম। আর এরপরই প্রিন্ট করা ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি ও উরুগুয়ে শব্দগুলো দেখতে পেলাম।’

‘এরপর সামনের প্রান্ত দিয়েও কাগজটি ছিঁড়লাম। দেখতে পেলাম মাথার উপরে একটি অগভীর থালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি নারীমূর্তি। আমি পত্রিকা ও টেলিভিশনে এর আগে জুলে রিমে ট্রফি দেখেছিলাম। আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো।’

ডেভ করবেট ও তার কুকুর পিকলস

‘বিশ্বকাপের মতো দেখতে লাগছে না’:

এরপর তড়িঘড়ি করে খুঁজে পাওয়া বিশ্বকাপ নিয়ে লোকাল থানায় গেলেন করবেট। কিন্তু থানার লোকজন শুরুতে করবেটের কথায় পাত্তাই দিলেন না!

‘আমি প্রথমেই সার্জেন্টের টেবিলে বিশ্বকাপটা আছাড় মেরে রাখলাম। এরপর বললাম, আমি বোধহয় বিশ্বকাপ ট্রফি খুঁজে পেয়ে গেছি।’

‘আমার স্পষ্ট মনে আছে, অফিসার আমাকে বলছিলেন, এটাকে দেখতে তো মোটেও বিশ্বকাপ ট্রফির মতো লাগছে না!’

এরপর অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের একজন গোয়েন্দা এসে করবেটকে নিজেদের জিম্মিতে নিলেন। বাকিটা শুনুন করবেটের মুখেই, ‘তারা উল্টো আমাকেই প্রধান আসামী বলে সন্দেহ করতে লাগলো। ঘণ্টাখানেক পরে তারা আমাকে আমার বাড়ি নিয়ে গেলো। নরউডে পৌঁছে দেখলাম, দুনিয়ার প্রেস আর ক্যামেরা আমার বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছে!’

যেই মুহূর্তে পুলিশ করবেটকে নির্দোষ ঘোষণা দিলো, সেই মুহূর্ত থেকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেন করবেট ও তার কুকুর পিকলস।

উদ্ধারের পর লন্ডনে প্রেসের কাছে জুলে রিমে ট্রফি প্রদর্শন করে পুলিশ

পিকলসের সিনেমায় অভিনয় ও দুনিয়াজোড়া খ্যাতি:

পিকলস তখন দুনিয়াজোড়া খ্যাতি পেয়ে গেছে। একের পর এক পুরষ্কারে ভূষিত করা হতে লাগলো কুকুরটিকে। ন্যাশনাল ক্যানিন ডিফেন্স লীগের পক্ষ থেকে মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হলো পিকলসকে। এছাড়া ‘ডগ অফ দ্য ইয়ার’, ‘ইতালিয়ান ডগ অফ দ্য ইয়ার’ সহ আরও অনেক পুরষ্কার পায় পিকলস।

এখানেই শেষ নয়, টেলিভিশনের পর্দায়ও নিজের উপস্থিতি জানান দেয় কুকুরটি। ‘দ্য স্পাই উইথ অ্যা কোল্ড নোজ’ নামক একটি চলচ্চিত্রে কাস্ট করা হয় পিকলসকে।

আর পিকলসের মালিক করবেটকে প্রায় ৫ হাজার পাউন্ড সমমূল্যের পুরষ্কার দেয়া হয়। এছাড়া ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ গোলে হারিয়ে স্বাগতিক ইংল্যান্ড শিরোপা জিতলে উদযাপনমূলক নৈশভোজেও আমন্ত্রণ জানানো হয় করবেট ও তার কুকুর পিকলসকে।

‘উদযাপনের এক পর্যায়ে গোটা ইংল্যান্ড দল ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। রাস্তা ভর্তি তখন মানুষ আর মানুষ। আমরাও ইংল্যান্ড দলের সাথে সাথে ব্যালকনিতে যাই। ববি মুর তখন পিকলসকে কোলে তুলে নেয় এবং দর্শকদের সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দেয়। সবাই ওকে নিয়ে খুব উল্লসিত ছিল।’

সিনেমায় সহকর্মীদের সাথে পিকলস

দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি:

পুরষ্কারের অর্থ দিয়ে সারেতে একটা বাড়ি কেনেন করবেট। তবে এরপরে বেশিদিন বাঁচেনি তার বিখ্যাত কুকুর পিকলস, ১৯৬৭ সালেই মারা যায় এটি। করবেটের বাড়ির বাগানেই সমাধিস্ত করা হয় পিকলসকে, আর তার সমাধিতে লেখা আছে, ‘পিকলস, ফাউন্ডার অফ দ্য ১৯৬৬ ওয়ার্ল্ড কাপ’!

পিকলসের সমাধি

চুরি যাওয়াই যখন জুলে রিমে ট্রফির ভাগ্য:

১৯৭০ সালে ৩য় বারের মতো বিশ্বকাপ জিতলে জুলে রিমে ট্রফিটিকে চিরতরে ব্রাজিলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এবার ব্রাজিলের কাছ থেকেও চুরি যায় এই ট্রফি! ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন ভবনে এক প্রদর্শনী চলাকালীন সময়ে গায়েব হয়ে যায় ট্রফিটি। কিন্তু এবার আর কোন পিকলস ট্রফিটি খুঁজে দিতে পারেনি। ধারণা করা হয়, ট্রফিটিকে গলিয়ে সোনায় পরিণত করা হয়েছিল।

আসল ট্রফির নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ এতটাই শঙ্কিত ছিল যে, বিশ্বকাপ জয়ের পর রেপ্লিকা ট্রফি দিয়েই উদযাপন করানো হয় ইংল্যান্ড দলকে!

আর প্রথমবার চুরি যাওয়ার পর জুলে রিমের যেই রেপ্লিকাটি বানানো হয়েছিল, সেটি তার নির্মাণশিল্পী জর্জ বার্ডকেই দিয়ে দেয়া হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রেপ্লিকাটিকে নিজের বিছানার নিচে একটি বাক্সে বন্দী করে রেখেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে এক নিলাম অনুষ্ঠানে রেপ্লিকাটি কিনে নেয় ফিফা। বর্তমানে এটি ম্যানচেস্টারের জাতীয় ফুটবল জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।