আজকের ব্যাক্তিত্ত্ব - উইলিয়াম শেকসপিয়ার - প্রিয়লেখা
উইলিয়াম শেকসপিয়র

আজকের ব্যাক্তিত্ত্ব – উইলিয়াম শেকসপিয়ার

চৌধুরী সাহেব
Published: August 10, 2016

উইলিয়াম শেকসপিয়ার ( William Shakespeare ) (২৬ এপ্রিল, ১৫৬৪; মৃত্যু ২৩ এপ্রিল, ১৬১৬) ছিলেন একজন ইংরেজ কবি ও নাট্যকার। তাঁকে ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক এবং বিশ্বের একজন অগ্রণী নাট্যকার মনে করা হয়। তাঁকে ইংল্যান্ডের “জাতীয় কবি” এবং “বার্ড অফ অ্যাভন” (অ্যাভনের চারণকবি) নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। তাঁর যে রচনাগুলি পাওয়া গিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ৩৮টি নাটক,১৫৪টি সনেট, দুটি দীর্ঘ আখ্যানকবিতা এবং আরও কয়েকটি কবিতা। কয়েকটি লেখা শেকসপিয়র অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে যৌথভাবেও লিখেছিলেন। তাঁর প্রতিটি নাটক পৃথিবীর বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং অপর যে কোনো নাট্যকারের রচনার তুলনায় অধিকবার মঞ্চস্থ হয়েছে।

শেকসপিয়রের জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্ট্র্যাটফোর্ডে অন-অ্যাভনে। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি অ্যানি হ্যাথাওয়েকে বিবাহ করেন। অ্যানির গর্ভে শেকসপিয়রের তিনটি সন্তান হয়েছিল। এঁরা হলেন সুজান এবং হ্যামনেট ও জুডিথ নামে দুই যমজ। ১৫৮৫ থেকে ১৫৯২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অভিনেতা ও নাট্যকার হিসেবে লন্ডনে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লর্ড চেম্বারলেইন’স ম্যান নামে একটি নাট্য কোম্পানির তিনি ছিলেন সহ-সত্ত্বাধিকারী। এই কোম্পানিটিই পরবর্তীকালে কিং’স মেন নামে পরিচিত হয়। ১৬১৩ সালে তিনি নাট্যজগত থেকে সরে আসেন এবং স্ট্র্যাটফোর্ডে ফিরে যান। তিন বছর বাদে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। শেকসপিয়ারের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে নথিভুক্ত তথ্য বিশেষ পাওয়া যায় না। তাঁর চেহারা, যৌনপ্রবৃত্তি, ধর্মবিশ্বাস, এমনকি তাঁর নামে প্রচলিত নাটকগুলি তাঁরই লেখা নাকি অন্যের রচনা তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে।

william-shakespeare_5029159247682

শেকসপিয়ারের পরিচিত রচনাগুলির অধিকাংশই মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৫৮৯ থেকে ১৬১৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। তাঁর প্রথম দিকের রচনাগুলি ছিল মূলত মিলনান্তক ও ঐতিহাসিক নাটক। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে তাঁর দক্ষতায় এই দুটি ধারা শিল্প সৌকর্য ও আভিজাত্যের মধ্যগগনে উঠেছিল। এরপর ১৬০৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানত কয়েকটি বিয়োগান্ত নাটক রচনা করেন। এই ধারায় রচিত তাঁর হ্যামলেট, কিং লিয়ার ও ম্যাকবেথ ইংরেজি ভাষার কয়েকটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি। জীবনের শেষ পর্বে তিনি ট্র্যাজিকমেডি রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এই রচনাগুলি রোম্যান্স নামেও পরিচিত। এই সময় অন্যান্য নাট্যকারদের সঙ্গে যৌথভাবেও কয়েকটি নাটকে কাজ করেন তিনি।

তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত নাটকগুলির প্রকাশনার মান ও প্রামাণ্যতা সর্বত্র সমান ছিল না। ১৬২৩ সালে তাঁর দুই প্রাক্তন নাট্যসহকর্মী দুটি নাটক বাদে শেকসপিয়রের সমগ্র নাট্যসাহিত্যের পোর্টফলিও প্রকাশ করেন।

তাঁর সমকালে উইলিয়াম শেকসপিয়র ছিলেন একজন সম্মানিত কবি ও নাট্যকার। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর খ্যাতি হ্রাস পেয়েছিল। অবশেষে ঊনবিংশ শতাব্দীতে খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন। রোম্যান্টিকেরা তাঁর রচনার গুণগ্রাহী ছিলেন। ভিক্টোরিয়ানরা রীতিমতো তাঁকে পূজা করতেন; জর্জ বার্নার্ড শ’র ভাষায় যা ছিল চারণপূজা। বিংশ শতাব্দীতেও গবেষণা ও নাট্য উপস্থাপনার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর রচনাকে পুনরাবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়। আজও তাঁর নাটক অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুচর্চিত। সারা বিশ্বের নানা স্থানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা আঙ্গিকে এই নাটকগুলি মঞ্চস্থ হয়ে থাকে।

জন্ম ও শৈশব

উইলিয়াম শেকসপিয়র এর পিতা জন শেকসপিয়র ছিলেন একজন সফল গ্লোভার ও অল্ড্যারম্যান। তাঁর আদি নিবাস ছিল স্নিটারফিল্ডে।তাঁর মা মেরি আরডেন ছিলেন এক ধনী ভূম্যধিকারী কৃষক পরিবারের সন্তান। উইলিয়াম শেকসপিয়ার জন্মগ্রহণ করেছিলেন স্ট্র্যাটফোর্ড-আপঅন-অ্যাভনে। ১৫৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল তাঁর ব্যাপ্টিজম সম্পন্ন হয়। তাঁর জন্মের সঠিক তারিখটি জানা যায় না। তবে ২৩ এপ্রিল অর্থাৎ, সেন্ট জর্জ’স ডে -এর দিনে তাঁর জন্মদিন পালন করার প্রথা রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এক গবেষক ভুল করে এই তারিখটিকে শেকসপিয়রের জন্মদিন বলে উল্লেখ করেছিলেন। পরে তারিখটি জীবনীকারেদের কাছে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে। কারণ, উইলিয়াম শেকসপিয়র মারা গিয়েছিলেন ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল।  তিনি তাঁর পিতামাতার আট সন্তানের মধ্যে তৃতীয় এবং জীবিত সন্তানদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ।

সেযুগের কোনো লিখিত প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, অধিকাংশ জীবনীকার মোটামুটি একমত যে শেকসপিয়র সম্ভবত স্ট্র্যাটফোর্ডের কিং’স নিউ স্কুলে পড়াশোনা করেন। স্ট্র্যাটফোর্ড-আপঅন-অ্যাভনে জন শেকসপিয়রের বাড়ি, এটিকে শেক্সপিয়ারের জন্মস্থল মনে করা হয়।

১৮ বছর বয়সে উইলিয়াম শেকসপিয়ার ২৬ বছর বয়সী অ্যানি হ্যাথাওয়েকে বিবাহ করেন। ১৫৮২ সালের ২৭ নভেম্বর ওরসেস্টরের অ্যাংলিক্যান ডায়োসিসের কনসিস্টরি কোর্ট একটি বিবাহ লাইসেন্স জারি করেছিল। বিয়ের ছয় মাস পরে অ্যানি সুজানা  নামে একটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন। ১৫৮৩ সালের ২৬ মে তার ব্যাপ্টিজম হয়। এর প্রায় দুই বছর বাদে শেকসপিয়র দম্পতির হ্যামনেট নামে এক পুত্র ও জুডিথ নামে এক কন্যা জন্মায়। এরা ছিল যমজ। ১৫৮৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এদের ব্যাপ্টিজম হয়। হ্যামনেটের মৃত্যু হয়েছিল মাত্র এগারো বছর বয়সে। তার মৃত্যুর কারণ জানা যায় না। ১৫৯৬ সালের ১১ আগস্ট তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

যমজ সন্তানের জন্মের পর শেকসপিয়রের পরবর্তী ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫৯২ সালে লন্ডনের একটি মঞ্চ দৃশ্যের বর্ণনায়। ১৫৮৫ থেকে ১৫৯২ পর্যন্ত বছরগুলিকে বিশেষজ্ঞেরা তাই শেকসপিয়ারের জীবনের “হারানো বছর” বলে উল্লেখ করে থাকেন। জীবনীকারেরা নানা অপ্রামাণিক গল্পের ভিত্তিতে এই পর্বের এক একটি বিবরণ প্রস্তুত করেছেন। শেকসপিয়রের প্রথম জীবনীকার তথা নাট্যকার নিকোলাস রো স্ট্র্যাটফোর্ডের একটি কিংবদন্তির উল্লেখ করে বলেছেন, হরিণ রান্না করার অপরাধে বিচারের হাত থেকে বাঁচতে শহর ছেড়ে লন্ডনে পালিয়ে গিয়েছিলেন শেকসপিয়র। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রচলিত আর একটি গল্প হল, শেকসপিয়র লন্ডনের থিয়েটার পৃষ্ঠপোষকদের ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নাট্যশালায় কাজ করতে শুরু করেন। জন অব্রে লিখেছেন শেকসপিয়র গ্রামের স্কুলশিক্ষকের চাকরি করতেন।

মঞ্চের শুরু

১৫৯২ সালের মধ্যে উইলিয়াম শেকসপিয়ার একজন অভিনেতা ও নাট্যকার হিসেবে জীবিকা উপার্জন করা শুরু করেন। ১৫৯০ সালে, কিছু দলিল দস্তাবেজ থেকে জানা যায় তিনি লর্ড চ্যাম্বারলাইন’স নামক একটি নাটক কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার ছিলেন। কিং জেমস ১ রাজা হওয়ার পর কোম্পানিটির নাম হয় কিং’স মেন। সে সময় নাট্য অভিনয় অভিজাত সমাজের নিকট  খুব একটা প্রশংসনীয় ছিল না। যদিও জ্ঞানী-বুদ্ধিজীবীরা শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

নিজেকে প্রতিষ্ঠা

১৫৯৭ সালের মধ্যে তার ১৫-৩৭ টি নাটক প্রকাশিত হয়। কিছু দলিলে পাওয়া যায় এ সময় তিনি স্ট্র্যাটফোর্ডে নিউ হাউস নামে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাড়ি কেনেন।    স্ট্র্যাটফোর্ড থেকে লন্ডন চার দিনের ঘোড়-সফর তাই ধারনা করা হয় তিনি তার বেশির ভাগ সময় শহরেই লেখালেখি ও অভিনয় করে কাটাতেন। তবে বছরে একবার যখন লেন্টেন পিরিয়ডে ৪০ দিনের জন্য থিয়েটার বন্ধ থাকত তখন তিনি স্ট্র্যাটফোর্ডে আসতেন।

১৫৯৯ সালে তিনি ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার থেমস নদীর দক্ষিণ তীরে গ্লোব নামে নিজেদের একটি থিয়েটার নিরমান করেন। ১৬০৫ সালে উইলিয়াম শেকসপিয়ার স্ট্র্যাটফোর্ডের নিকটে তিনি ৪৪০ পাউন্ডের বিনিময়য়ে একটি রিয়েল এস্টেটের লিজ ক্রয় করেন। এক বছরের মধ্যেই এটির মূল্য দিগুণ হয়ে যায় সাথে সাথে এ থেকে তিনি বছরে ৬০ পাউন্ড আয় করতেন। এর ফলে তিনি একজন শিল্পীর পাশাপাশি উদ্যোক্তাও হয়ে উঠেন এবং পরবর্তীতে এটি সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করতে সহায়ক হয়।

 

লেখার ধরন

শেকসপিয়রের প্রথম দিকের লেখা সমসাময়িক লেখার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। নিজের সুবিধের জন্য ঐতিহ্যগত শৈলী অভিযোজন এবং শব্দের স্বাধীন প্রবাহ তৈরিতে তিনি খুবই উদ্ভাবনী শক্তি সম্পন্ন ছিলেন। প্রাথমিকভাবে নাটক রচনা করতে তিনি খুব সামান্য মাত্রায় পরিবর্তন করে  অমৃতাক্ষর পাঁচমাথার কাব্যের গঠনে ছন্দ ব্যবহার করতেন। কখনো তিনি তার নাটকে এই নমুনা থেকে সরে আসতেন এবং সহজ কবিতা, গদ্যের গঠন ব্যবহার করতেন।

ইতিহাস ও রম্য রচনা

রোমিও জুলিয়েট ছাড়া তার প্রথম দিকের নাটক ছিল ইতিহাস নির্ভর। রিচারড ২, হেনরি ৬, হেনরি ৫ ইত্যাদি দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকের ধংসাত্বক পরিণাম তুলে ধরে। এসময় তিনি কিছু রম্য নাটক রচনা করেন যেমন দ্য উইটি রোমান্স আ মিড সামার নাইট’স ড্রিম, দ্য রোম্যান্টিক মার্চেন্ট অফ ভেনিস, দ্য উইট এন্ড ওয়ার্ডপ্লে অফ মাচ এডো এবাউট নাথিং, দ্য চার্মিং এস ইয়ু লাইক ইট এবং টুয়েলফথ নাইট।

ট্রাজেডি ও ট্র্যাজিককমেডিস

উইলিয়াম শেকসপিয়ার ১৬০০ সালের দিকে বিয়োগাত্বক হ্যামলেট, কিং লিয়ার, ওথেলো, ম্যাকবেথ রচনা করেন।শেকসপিয়রের চরিত্রগুলো মনুষ্য মানসিকতার বিভিন্ন অভিব্যাক্তি প্রকাশ করে যা ছিল সময় নিরপেক্ষ ও সার্বজনীন।এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত হ্যামলেট যেখানে দেখা যায় সম্পর্কের বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিশোধ, অজাচার, নৈতিক পরাজয়। এই নৈতিক পরাজয় বিভিন্ন চমকে মোড় নিত ও ষড়যন্ত্রের রুপ নিত যা নায়ক ও তার প্রিয়জনদের ধংসের দিকে ধাবিত করত।তার জীবনের শেষ দিকে তিনি কয়েকটি ট্র্যাজিক-কমেডি রচনা করেন যেগুলো হল সিম্বেলিন, দ্যা উইনটারস টেল, দ্যা টেম্পেস্ট।

মৃত্যু

একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে উইলিয়াম শেকসপিয়ার তার জন্মদিন ২৩ এপ্রিল, ১৬১৬ সালে মৃত্যু বরন করেন।তবে অনেক পণ্ডিত এটাকে অনুমান বলে উড়িয়ে দেন। চার্চ রেকর্ড থেকে জানা যায় তিনি ২৫  এপ্রিল, ১৬১৬ সালে ট্রিনিটি চার্চে প্রোথিত হন। তার উইলে তিনি তার বড় মেয়ে সুজানাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার করে যান যদিও এক তৃতীয়াংশ তার স্ত্রীকেও প্রদান করেন। স্ত্রীকে সামান্য অংশ দেয়ার কারণ হিসেবে ধারনা করা হয় যে শেষ দিকে তাদের সম্পর্ক ততটা সুখকর ছিল না। তবে তাদের দাম্পত্য জীবন যে কোন রকম অশান্তি ছিল এ ব্যপারে খুব সামান্যই প্রমাণ পাওয়া যায়।