প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার- এক অদম্য জীবনের কাহিনী - প্রিয়লেখা

প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার- এক অদম্য জীবনের কাহিনী

Ranju Prasad Mandal
Published: October 15, 2017

চরাচর বিস্তৃত অন্ধকার ঠেলে চলেছেন একজন মানুষ, একজন নারী। প্রচন্ড হাওয়ায় হাতের টিমটিম করে জ্বলা প্রদীপ প্রায় নিভে যায় যায়। হাওয়া আগলে দাঁড়ালেন আর একজন মানুষ, একজন পুরুষ। প্রদীপ জ্বলে উঠল অনির্বাণ শিখায়। উজ্জ্বল হয়ে উঠল একটি বাঙালি মেয়ের মুখ। মেয়েটির নাম কাদম্বিনী গাঙ্গুলী- প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার। কাদম্বিনী শুধু ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষিত প্রথম বাঙালি তথা দক্ষিণ এশীয় মহিলাই নন, চন্দ্রমুখী বসুর সাথে তিনিই সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্নাতক। তাকে তাই অশিক্ষা, কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে থাকা বাঙালি মেয়েদের জীবনে ‘Lady with the lamp’ বললে বোধহয় অত্যুক্তি হয়না। তবে কাদম্বিনীর এমন উত্তরণ বোধহয় সম্ভব হত না সেই ‘পুরুষ’টির সক্রিয় সহায়তা ছাড়া। তিনি কাদম্বিনীর স্বামী তথা বাঙলায় নারী জাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। যিনি রয়ে গেছেন প্রায় অন্তরালেই।

মহাপ্রাণ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী

তাহলে একদম গোড়া থেকেই শুরু করা যাক। বাঙালির জীবনে ১৮৬১ সাল এক আশ্চর্য বছর। এই বছরেই জন্ম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ডা. নীলরতন সরকারের। আর এই বছরেই জন্ম কাদম্বিনী দেবীরও, ১৮৬১ সালের ১৬ই জুলাই বিহারের ভাগলপুরে(মতান্তরে বরিশালের চাঁদসীতে)। উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বাঙালির বৌদ্ধিক জগতে এক নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটে। এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ব্রাক্ষ্ম সমাজ। ব্রাক্ষ্ম সমাজের অনুপ্রেরণাতেই কাদম্বনীর বাবা ব্রজকিশোর বসু মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে উদ্যোগী হন। কাদম্বিনীর শিক্ষা শুরু হয় ঢাকার ইডেন মহিলা বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন বালিগঞ্জের বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে এবং ১৮৭৮ সালে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এবং চন্দ্রমুখী বসু ১৮৮১ সালে এফএ এবং ১৮৮৩ সালে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসাবে বিএ পাস করেন। এফএ পাশ করেই তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার আবেদন জানান। কিন্তু পুরুষ অধ্যুষিত জগতে এক মেয়ের অনুপ্রবেশ কি এতো সহজে হবে? আসতে থাকে বাধার পর বাধা। ইতিমধ্যেই ১৮৮৩ সালে তার বিয়ে হয় বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও নারী প্রগতির এক স্তম্ভ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর সাথে। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসেই ১৮৮৪ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে মাসিক ২০ টাকা বৃত্তি নিয়ে ভর্ত্তি হন কাদম্বিনী। কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় সমাজের এক স্থবির অংশের সাথে কাদম্বিনীর লড়াই। আর এই লড়াইয়ের ফল স্বরূপই বোধহয় ১৮৮৮ সালের ফাইনাল পরীক্ষায় তাকে ফেল করিয়ে দিলেন এক বাঙালি অধ্যাপক, তাও মাত্র ১ নম্বরের জন্য! অবশেষে বহু ঝামেলার পর ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের পর তাকে দেওয়া হল কোনরকমে একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রী- জি.এম.সি.বি এবং কাদম্বিনী খুললেন তার চেম্বার। যার বিজ্ঞাপনে লেখা হল-
MRS. KADAMBINI GANGULY B.A. G.M.C.B
MEDICAL PRACTITIONER
Can be consulted at her residence, 45-5 Beniatola Lane, College Square, Calcutta, Terms Moderate.

ডা. কাদম্বিনী গাঙ্গুলী

এই বাঙালী মেয়ের লড়াইয়ের খবর দেশের সীমা ছাড়িয়েছে এই সময়েই। ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের বিশেষ সুপারিশে ১৮৮৮ সালে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনে তিনি যোগ দেন লেডি ডাফরিন হাসপাতালে। একজন মেয়ে সবার মুখে ঝামা ঘষে এত সহজে ডাক্তার হয়ে যাবেন?! এত সহজ! তাই এবার বিরোধিতা শুরু হল আরো বড় ভাবে। তাকে নিয়ে শুরু হল ঠাট্টা। ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকার দাপুটে সম্পাদক মহেশচন্দ্র পাল সমস্ত শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে ডা. কাদম্বিনীকে তুলনা করলেন ‘স্বৈরিণী’ এমনকি ‘বারবণিতা’র সঙ্গেও। কাদম্বিনী এবং দ্বারকানাথ শুরু করলেন আইনি লড়াই। অতঃপর সম্পাদকের ৬ মাস জেল এবং ১০০ টাকা জরিমানা ধার্য্য হল। ১৯৯২ সালে সমুদ্র পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রা করলেন কাদম্বিনী। ফিরলেন এল.আর.সি.পি (এডিনবরা), এল.আর.সি.এস (গ্লাসগো) এবং জি.এফ.পি.এস (ডাবলিন) উপাধি নিয়ে। এরপর ডাক্তার হিসাবে তার খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নেপালের রাজমাতার চিকিতসার জন্য তিনি নেপালেও যান এবং তাকে সুস্থ করে তোলেন।

কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর সই ও হস্তাক্ষর
(সূত্র- Marxist Indiana)

ডা. কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর কর্মকান্ড যে শুধুই চিকিৎসাশাস্ত্রে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। সমাজসংস্কার ও রাজনীতিতেও তার ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৮৯ সালে বম্বেতে কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে যোগদান করা ৬ জন মহিলার একজন তিনি। ১৮৯০ সালের অধিবেশনে তিনি বক্তব্যও রাখেন। শুধু তাই নয় চা বাগান ও কয়লা খনির শ্রমিকদের দুর্দশার বিষয়ে তিনি যথেষ্ট উদবিগ্ন ছিলেন এবং কয়লা খাদানের শ্রমিকদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে বিহার-ওড়িশাতেও যান। কিন্তু এই সব কিছুর বাইরেও তিনি ছিলেন ঘরের কাজে অসম্ভব পটু একজন মা। দীর্ঘাঙ্গী, সুন্দরী, আধুনিকা একজন মহিলা। যিনি রুগী দেখে বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে লেস বুনে চলেন। তার নাতনী পুন্যলতা চক্রবর্তীর লেখায় পাওয়া যায় এমনই এক ঘরোয়া কাদম্বিনীকে- “একদিকে খুব সাহসী আর তেজস্বিনী অন্যদিকে ভারী আমুদে মানুষ…মাতৃভাষার মত অনর্গল ইংরেজি বলতে পারতেন। তখনকার সবচেয়ে আধুনিক ফ্যাশনের শাড়ি, জামা, জুতো পড়ে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা ও কাজকর্ম করতেন… একটুও সময় তিনি নষ্ট করতেন না।…যখন যেখানে বসতেন হাসি গল্পে একেবারে মাতিয়ে তুলতেন।”

১৮৯৮ সালের ২৭শে জুন মৃত্যু হয় দ্বারকানাথের। কাদম্বিনী তার বিপুল কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রাখেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চিকিৎসা করেছেন, অস্ত্রোপচার করেছেন। ১৯২৩ সালের ৩রা অক্টোবর। কাদম্বিনীর যাত্রা শুরু হয় অনন্তের পথে। কিছু কিছু মানুষের সমগ্র জীবন আসলে অনুপ্রেরণার আরেক নাম। তেমনই একজন ডা. কাদম্বিনী গাঙ্গুলী- এক মহাজীবনের নাম।
কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাই যথার্থই লিখেছেন-
“হরিণ-নয়না শুন কাদম্বিনী বালা
শুনো ওগো চন্দ্রমুখী কৌমুদীর মালা
যে ধিক্কারে লিখিয়াছি “বাঙালীর মেয়ে”
তারি মত সুখ আজি তোমা দোঁহে পেয়ে
ভাসিল আনন্দ ভেলা কালের জুয়ারে।।
ধন্য বঙ্গনারী ধন্য সাবাসি তুহারে।”

তথ্যসূত্রঃ ১। Kadambini Ganguly, Woman of Substance, The Times of India, Jul 18, 2011.
২। কাদম্বিনী, সুনীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শারদীয়া আমার সময়, ১৪১৭।
৩। KadambinI Ganguly – An Illustrious Lady, B. K. Sen, Science and Culture, September-October, 2014, Vol. 18, Pages 271-274.