গেম অব থ্রোনসঃ পর্দার অন্তরালের কিছু সত্য গপ্পো - প্রিয়লেখা

গেম অব থ্রোনসঃ পর্দার অন্তরালের কিছু সত্য গপ্পো

ahnafratul
Published: September 5, 2017

গেম অব থ্রোনস।

কিছুদিনের জন্য সমগ্র পৃথিবী যেন স্থবির হয়ে গিয়েছিল। লিকড এপিসোড, নানা ধরণের যুক্তি কুযুক্তি আর তর্ক, চরিত্র বিশ্লেষণ, প্লট বিশ্লেষণ সবকিছু নিয়েই মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিল সিরিয়াল প্রেমিকরা। এতোটা হাইপ আর ভালোবাসা এই একটি টিভি সিরিজের জন্য। শেষ সিজনের জন্য অপেক্ষার মুহুর্তটা আরো বেড়ে যাচ্ছে, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হোয়াইট ওয়াকার ড্রাগনের পিঠে চড়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে, আমাদের প্রতীক্ষাও যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে।
তবে আজ এই সিরিজের পেছনের কিছু কথা নিয়ে আজকের আলোচনা। তো, শুরু করা যাক?

১) টার্কিশ সেনাবাহিনীতে ব্যানড এই সিরিজঃ


২০১৪ সালে নভেম্বর মাসের এক রিপোর্টে বলা হল, গেম অব থ্রোনসসহ বেশ কিছু টিভি সিরিজ টার্কিশ মিলিটারির অধীনের যেসব স্কুল রয়েছে, সেখানে ব্যান করা হয়েছে। কারণ হিসেবে অনেক কিছু বলা হল- যৌনতা, নারীদেহের অবাধ প্রদর্শন, পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে দৈহিক মিলনের দৃশ্য, গালিগালাজ, নেতিবাচক চরিত্রের মুখরতা ইত্যাদি নানা ধরণের যুক্তি (ভাগ্যিস, তারা ড্রাগন নিয়ে কিছু বলে নি!) টার্কিশ দৈনিক কামহুরিয়েতের মতে, এটাই প্রথম নয়। ২০১২ সালে ইস্তাম্বুলের মিলিটারি একাডেমী থেকে বেশ কিছু সামরিক অফিসারকে বের করে দেয়া হয়েছিল এই সিরিজ দেখার অপরাধে।

২) জর্জ আর আর মার্টিনের জগত দেখতে চান ম্যাপে?

টিজনিকের তৈরি ম্যাপ

ওয়েস্টেরোস, এসোস, দ্য নর্থ, কাস্টারলি রক- এই জায়গাগুলো কোথায় রয়েছে, কেমন অবস্থানে রয়েছে, তা যদি আপনার নখদর্পণে থাকে, তবে কেমন হবে বলুন তো? গ্রাফিক ডিজাইনার মিখাইল টিজনিক ঠিক এমনই একটি ম্যাপ তৈরি করেছেন। ল্যানিসপোর্ট থেকে হাই গার্ডেনে যাবার সমুদ্রপথ, কাস্টারলি রকে যাবার গোল্ড লাইন- সবকিছু টিজনিকের এই ম্যাপের মাঝে রয়েছে। যেমন একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ম্যাপের একজায়গায় ঈগল-চোখের সাহায্যে দেখলে দর্শকরা জানতে পারবেন যে, আর কিছুদূর সামনে এগুলেই পাওয়া যাবে হ্যারেনটাউন স্টেশনের ধূলিমাখা জায়গা। হ্যারেনহেল জায়গাটি থেকে হ্যারেনটাউন নামটি এসেছে। বহু বছর আগে নাকি ড্রাগনের মুখ থেকে নিঃসৃত আগুন থেকে হ্যারেনহেল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

এছাড়াও ডথরাক, হাই গার্ডেন ইত্যাদি জায়গার অবস্থান ও ইতিহাস জানা যাবে টিজনিকের তৈরি এই ম্যাপ থেকে।

৩) কেমন করে এল ভ্যালেরিয়ান স্টিলঃ

ডেমাস্কাস স্টিলের তৈরি কুঠার দেখতে যেমন হত

হালকা একধরণের মৌল থেকে কেমন করে তীক্ষ্মধার সমরাস্ত্র তৈরি করা যায়, তা আমরা দেখতে পেয়েছি ভ্যালেরিয়ান স্টিলের মাধ্যমে। লেখক জর্জ আর আর মার্টিন এই ভ্যালেরিয়ান স্টিলের ধারণা পেয়েছিলেন সত্যিকারের এক ধরণের অ্যালয়ের মাঝে। এর নাম ছিল “ডেমাস্কাস স্টিল”। ভারতীয় উপমহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলে এই ডেমাস্কাস স্টিলের তৈরি অস্ত্র পাওয়া যেত। তীক্ষ্মধার, হালকা ওজন আর মসৃণ তলের কারণে ডেমাস্কাস স্টিল ছিল খুবই জনপ্রিয়। ১৮ শতকের দিকে এই অস্ত্র তৈরি করার প্রয়োজনীয় ফর্মূলা হারিয়ে যায়। পর্যাপ্ত তাপমাত্রা ও কৌশল জানা না থাকার কারণে ধীরে ধীরে কালের গর্ভে হারিয়ে যায় এই ডেমাস্কাস স্টিল। নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছে এই ডেমাস্কাস স্টিলের অনুকরণে অস্ত্র তৈরি করতে, কিন্তু রহস্যজনক কোন একটা কারণে তা আর হয় নি।

৪) আয়রন থ্রোনের যবনিকাপাতঃ
“আমরা গেম অব থ্রোনসের আয়রন থ্রোন রেপ্লিকা আর বিক্রি করছি না, দুঃখিত! আমরা এই কাজটা করে একবার দারুণ মজা পেয়েছিলাম কিন্তু এখন আর তা করছি না। আমরা আপনাদের জন্য বিকল্প কিছু নিয়ে এসেছি।”

২০১৩ সালে এইচবিও ও ফায়ারবক্স একত্রিত হয়েছিল আয়রন থ্রোনের প্রমাণ সাইজের রেপ্লিকা বিক্রি করবার জন্য। ২০০০০ পাউন্ডে তারা বিক্রি করে এই সিংহাসন। ফাইবারগ্লাস ও রেসিনের দ্বারা তৈরি এই সিংহাসন দৈর্ঘ্যে ৭ফিট ২ ইঞ্চি লম্বা, প্রস্থে ৫ফিট ৫ ইঞ্চি। তবে কিছুদিন পরেই এই রেপ্লিকা বিক্রির সিদ্ধান্ত বাদ দেয় এইচবিও আর ফায়ারবক্স। কারণ, বিপুল পরিমাণে চাহিদা এবং তাদের অপারগতা। ফলে ফায়ারবক্স তাদের ওয়েবসাইটে ওপরের খবরটি প্রকাশ করে।

৫) মার্টিনের স্বপ্নের সিংহাসন যেমন ছিলঃ
“এই আয়রন থ্রোন হবে বিশাল! কদাকার, অসমতল। হাজারো কামারের ঠুকঠুকানিতে গড়ে উঠবে আয়রন থ্রোন; যেখানে থাকবে অর্ধগলিত, আধভাঙ্গা তলোয়ার, মৃত মানুষের কেটে নেয়া হাতের খানিক অংশ আর পরাজিতের শরীরের রক্তমাখা টুকরো! অন্তত এক হাজার তলোয়ার থাকবে এখানে। মাত্র এই কয়েকটি নয়!”

মার্টিনের ভাবনায় আয়রন থ্রোন ছিল খানিকটা এমনই

এই ছিল জর্জ মার্টিনের স্বপ্নের আয়রন থ্রোনের বর্ণনা। শুনেই বোঝা যাচ্ছে, আয়রন থ্রোন নিয়ে অনেক বেশি স্বপ্নাতুর হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।। তবে তার মনের মাঝে আঁকা আয়রন থ্রোন আর বাস্তব সিরিজের আয়রন থ্রোন যে এক হয় নি, তা তার একটি কথা শুনলেই বোঝা যায়-
“আমি গুণে দেখেছি। এখানে দুইশ তলোয়ারও হবে না!”

৬) দুর্লভ প্রজাতির শূকর যখন বাঁচেঃ
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা কাউন্টি আরমাঘে কিছুটা কষ্টকরই হয়ে গিয়েছিল। তবে কেনি গ্রেসির জন্য নয় এটি একটি চমৎকার সংবাদ নিয়ে আসে যখন তিনি জানতে পারেন, মধ্যযুগীয় কায়দায় একটি সেট নির্মাণ করার জন্য তার শূকরগুলো দরকার হবে গেম অব থ্রোনসের পরিচালকদের। উত্তর আয়ারল্যান্ডের একটি স্থানে শ্যুটিং কাজ চালানোর জন্য দরকার একটি ব্রিডিং ফার্মের এবং এমন কিছু শূকর, যা মধ্যযূগীয় সে কায়দার সাথে সাদৃশ্য বহন করবে।

বেলফাস্ট টেলিগ্রাফকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন,
“কৃষিকাজ করে এখন আর আগের মত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলনও আগের মত হচ্ছে না। যদি এই সিরিয়ালের কাজ করা শুরু না হত এখানে, আমি জানি না আমি কি করতাম।”

৭) রোগের নাম “ফিব্রোডিসপ্লাসিয়া অসিফিকানস প্রোগ্রেসিভ”
জর্জ আর আর মার্টিন যখন গ্রে স্কেল রোগটির কথা মাথায় এনেছিলেন, তখন এই রোগের সাথে সামঞ্জস্যতাপূর্ণ আরো কিছু রোগের কথা তার মাথায় ছিল। যেমন, লেপ্রসি। মধ্যযুগে এই রোগটি ভুক্তভোগীকে দিত অবর্ণনীয় কষ্ট। ভয়, আতঙ্ক ও প্রচন্ড ব্যথা- সবকিছু একসাথে জেঁকে ধরত তাকে। সাথে রয়েছে সমাজ থেকে একঘরে করে দেয়ার ভয়।
তবে লেপ্রসির মত আরো একটি রোগ রয়েছে যার নাম ফিব্রোডিসপ্লাসিয়া অসিফিকানস প্রোগ্রেসিভ। এই রোগের ফলে শরীরের টিস্যুগুলো আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে যেতে থাকে এবং সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, চামড়াগুলো আস্তে আস্তে হাড়ের মত শক্ত হতে থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে শরীর একদম হাড়ের তৈরি বর্মে পরিণত হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই ভুক্তভোগী এখানে “টার্নড টু স্টোন”-এ পরিণত হয়ে যান।

হ্যারি ইস্টল্যাকের কঙ্কাল

এর সবচেয়ে অন্যতম একটি উদাহরণ দেয়া যায় হ্যারি ইস্টল্যাককে। এই ব্যক্তি ফিব্রোডিসপ্লাসিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৩ সালে ৩৯ বছরে মৃত্যুবরণ করেন। রোগের কারণে তার শরীর এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে তিনি শুধু তার ঠোঁট দুটো নড়াতে পারতেন। ফিলাডেলফিয়ার মাটার জাদুঘরে বিজ্ঞানের উন্নতি ও গবেষণার জন্য ইস্টলাকের কঙ্কাল দান করে দেয়া হয়েছিল।

গেম অব থ্রোনস আসলে একটা জগতের পানপাত্র, যেখানে থাকে মোহনীয়তার এক অশেষ অমৃত। যতই পান করতে থাকুন, ফুরোবে না। তবে সিরিজের জগতে খুব দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে আসছে গেম অব থ্রোনসের আয়ুকাল। ভক্তকূলের হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকুক শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই সিরিজ।
কিংবা কে জানে, শতাব্দীর সেরা!

(তথ্যসূত্রঃ টেলিগ্রাফ.কো.ইউকে)