এক আনসাং হিরোর নাম মাইকেল বেভান - প্রিয়লেখা

এক আনসাং হিরোর নাম মাইকেল বেভান

প্রিয়লেখা.কম
Published: May 16, 2018

১৯৯৪ সালের ১৪ ই এপ্রিল । শারজায় চলছে অস্ট্রেলেশিয়া কাপ । প্রতিপক্ষ শ্রীলংকার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেট দলে অভিষেক হল ২৪ বছর বয়সী এক আত্মপ্রত্যয়ী খেলোয়াড়ের । জার্সি নম্বর ১২ ,মাথায় ক্যাপ এর নম্বর ১১৬ । এর অল্প কয়েকদিন পরেই একই বছর ২৮ শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হল তার । এবার মাথায় ক্যাপ এর নম্বর ৩৬০ । ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার এই খেলোয়াড় টি কে নির্বাচকরা ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে চাইছিলেন আসন্ন ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্য । তারা যে ধীরে ধীরে কাকে গড়ে তুলেছিলেন তা বোঝা গেছে দলের কঠিন সময়ে । মাত্র দশ বছরের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ার এর পরিসংখ্যান তাকে বুঝবার জন্য কোন ভাবেই যথেষ্ট নয়। তার নাম মাইকেল বেভান ।

মাইকেল বেভান এর পুরো নাম মাইকেল গুইল বেভান । ডাকনাম বেভো । মাইকেল বেভান ছিলেন মূলত একজন ব্যাটসম্যান , সাথে পার্ট টাইম স্লো লেফট আরমার তথা স্পিনার। সোজা কথায় একজন ব্যাটিং অল রাউন্ডার । না , তিনি হালের ক্রেজ ক্রিস গেইল কিংবা ব্রেন্ডন ম্যাককালাম এর মত ব্যাট হাতে চার ছয়ের ফুলঝুরি ছোটাতেন না । বিরাট কোহলি কিংবা এবি ডি ভিলিয়ারস এর মত ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষের বোলারদের সামনে সাক্ষাৎ যমদূত হয়েও আবির্ভূত হতেন না । না ছিলেন তিনি ব্রায়ান লারার মত ন্যাচারাল স্ট্রোক প্লেয়ার কিংবা রাহুল দ্রাবিড় এর মত সলিড ডিফেন্সিভ প্লেয়ার ।  এমনকি তিনি  born batsman ছিলেন না শচিন টেন্ডলকার এর মত । তিনি ছিলেন born leader , যিনি দল কে নেতৃত্ব দিতেন ক্যাপ্টেন না হয়েই । নেতৃত্ব দিতেন তখন যখন দল ঘোর বিপদে । জেতাতেন হারা খেলা । আর তার এহেন গুণ এর কারণে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে  The Greatest Finisher of All Time হিসেবে ।

 

১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপ মঞ্চের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া শ্রীলংকার কাছে পরাজিত হয় । সেই রানার আপ দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন মাইকেল বেভান । মিডল অর্ডার এর নিচের দিকে ব্যাট হাতে নামতেন তিনি । দল যখন ঘোর অমানিশার অন্ধকারে , তখনই মাইকেল বেভান ব্যাট হাতে কাণ্ডারির ভূমিকায় । আর তাই তো মাইকেল বেভান যতক্ষণ ব্যাট হাতে থাকতেন , ততক্ষণ কেউই টি. ভি. সেট এর সামনে থেকে উঠতেন না । যখন উঠতেন , তখন বেভান ব্যাট হাতে দলের জয় নিশ্চিত করে  ফেলেছেন।

সেই সময়কার অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইন আপ ছিল অনেক শক্তিশালী ।মার্ক ওয়াহ, স্টীভ ওয়াহ , ড্যারেন লেম্যান , ডেমিয়েন মার্টিন, অ্যাডাম গিল্ক্রিস্ট এদের কেউ না কেউ প্রায় প্রতি ম্যাচেই ভাল খেলতেন । যেদিন সবাই হঠাৎ করে নিজের ছন্দটা হারিয়ে ফেলতেন , সেদিনই যেন নিজেকে চেনাতেন মাইকেল বেভান । ব্যাট হাতে বেভান নিজের জাত টা সারা পৃথিবী কে জানান দেন ১৯৯৬ সালের প্রথম দিনটিতে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে । সিডনী ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সেই খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের করা ১৭৩ রান চেজ করতে গিয়ে একসময় অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৩৮ / ৬ । সেখান থেকে হাল ধরেন বেভান । ব্যাট হাতে সহযোদ্ধারা যেদিন অসহায়, সেদিনই নিজের দলের বোলারদের সাথে নিয়ে খেললেন ৭৮ রানের এক অতিমানবীয় ইনিংস । অতিমানবীয় , কারণ ৭৮ টি রান তিনি বোলারদের সাথে ছোট ছোট জুটি গড়ে করেছিলেন এবং সময় নিয়েছিলেন ১৫০ মিনিট । বোলারদের আগলে রাখার পাশাপাশি রানের চাকাটাও তাকেই সচল রাখতে হয়েছিল । শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে ইনিংস এর শেষ বলে চার মেরে যখন দলের জয় নিশ্চিত করেন , তখন তার নামের পাশে রান ৭৮ টি , কিন্তু ততক্ষণে আরেকবার প্রমাণিত হয়ে গেছে যে ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা।

১৯৯৭ সালের ১০ এপ্রিল সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাদের মাটিতেই প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে দলকে জেতান বেভান । মাত্র তিন ওয়ানডে পরেই নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করেন ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে । কিন্তু এবার দলকে জেতাতে পারলেন না । বেভান এর ওয়ানডে সেঞ্চুরি করা ছয় টি ম্যাচের মধ্যে একমাত্র এটিতেই অস্ট্রেলিয়া হারে । সেবছর নিজভূমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে এক ইনিংসে ৬ এবং দুই ইনিংস মিলে ১০ উইকেট শিকার করে বোলার হিসেবেও নিজেকে প্রমাণিত করেন ।

১৯৯৮ সালের ২২ এপ্রিল শারজায় ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নিজের ৩য় সেঞ্চুরি করে দলকে জেতান বেভান । পরের বছর ইংল্যান্ড এ হতে যাওয়া বিশ্বকাপ এর জন্য নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত করে তোলেন এই ব্যাটিং অল রাউন্ডার । বিশ্বকাপ এর প্রাথমিক পর্বে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যাণ্ড এবং পাকিস্তানের কাছে হেরে যায় । কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের আদর্শতম  ক্যাপ্টেন স্টীভ ওয়াহ এর অতিমানবীয় নেতৃত্বগুণে তারা ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায় এবং সেমিফাইনালে উঠে যায় । ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ এর দ্বিতীয় সেমিফাইনাল হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া এবং সাউথ আফ্রিকার মধ্যে । অধিকাংশ ক্রিকেটবোদ্ধা এই ম্যাচটি কে বিশ্বকাপ এর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্নায়ুবিনাশী ম্যাচ বলে অভিহিত করেছেন । এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ৬৮ রানে অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেট হারায় । দলের হাল ধরেন বেভান এবং ক্যাপ্টেন স্টীভ ওয়াহ। ওয়াহ দলীয় ১৫৮ রানে আউট হলেও এক প্রান্তে বেভান ঠিকই মাটি কামড়ে ছিলেন । বোলারদের সাথে ছোট ছোট জুটি গড়ে দলীয় সংগ্রহ ঠিকই তিনি ২১৩ তে নিয়ে যান এবং ইনিংসের শেষ ওভারে আউট হন । ২১৩ সেই সময়ের সাউথ আফ্রিকার জন্য বড় স্কোর ছিল না । তাই ,পরে বোলিংয়ে নেমে প্রথম থেকেই অস্ট্রেলিয়ানরা সাউথ আফ্রিকাকে চেপে ধরে। ৬১ রানে সাউথ আফ্রিকার প্রথম ৪ ব্যাটসম্যান আউট হলেও দুই আফ্রিকান  মিডলঅর্ডার ক্যালিস এবং জনটি রোডস ঠিকই দল কে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন । কিন্তু ১৪৫ রানের মাথায় বেভান অসাধারণ ক্যাচে জনটি রোডসকে ফেরালে ম্যাচ এর মোড় ঘুরে যায় । ( দয়া করে কোন হার্ট এর রোগী এই ম্যাচটির হাইলাইটস দেখবেন না ! ) অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে ওঠে এবং পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ঘরে তোলে।

 

মাইকেল বেভান  ব্যাট হাতে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন যেই ম্যাচে সেটি ছিল বিশ্ব একাদশের হয়ে এশিয়া একাদশের বিপক্ষে । ২০০০ সালের ৮ এপ্রিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচে এশিয়া একাদশের রান ছিল ৩২০ । জবাব দিতে নেমে বিশ্ব একাদশের স্কোর একসময় ছিল ১৯৬ / ৭ এই অবস্থায় । তাতে কি , একপ্রান্তে বেভান ঠিকই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন । এই ১৯৬ / ৭ অবস্থা থেকে অ্যান্ডু ক্যাডিক কে সাথে নিয়ে গড়েন ১১৯ রানের এক অবিশ্বাস্য জুটি । শেষ ওভারে প্রয়োজন ছিল ২০ রান । বেভান সেই অসাধ্যও প্রায় সাধন করেই ফেলেছিলেন । ক্যাডিক শেষ ওভারে রান আউট হলে দলের সংগ্রহ থেমে যায় ৩১৯ রানে । বেভান অপরাজিত থেকেছিলেন ১৮৫ রানে । প্রায় অসম্ভব একটা অবস্থা থেকে টেনে এনে মাত্র ২ রানের জন্য দলকে জেতাতে পারেননি বেভান কিন্তু স্টেডিয়ামের উপস্থিত সহস্র দর্শক কে উপহার দিয়েছিলেন সারাজীবন মনে রাখার মত একটি সত্যিকারের ‘’ ক্রিকেটের বিজয় “ ।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের ইতিহাসে ২০০১ সাল উল্লেখযোগ্য ভারতের মাটিতে ভারত কে ওয়ানডে সিরিজে হারানোর জন্য । সিরিজ ২-২সমতায় ছিল । শেষ ম্যাচে তথা সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে ভারত এর ২৬৫ রানের জবাবে ২ ওভার হাতে রেখেই অস্ট্রেলিয়া ২৬৯ করে । প্রচণ্ড মানসিক চাপের এই ম্যাচে বেভান ৮৭ রানে অপরাজিত থাকেন এবং দলের জয় নিশ্চিত করেই সাজঘরে ফেরেন ।

২৯ শে জানুয়ারি ,২০০২ । মেলবোর্নে সফরকারী নিউজিল্যাণ্ড এর মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া । নিউজিল্যাণ্ড এর দেয়া ২৪৫ এর জবাবে অস্ট্রেলিয়ার ৫৩ রানেই ৪ উইকেট শেষ । উইকেটে আসলেন বেভান । আসলেন , দেখলেন এবং জয় করলেন । ২ উইকেট হাতে রেখেই অস্ট্রেলিয়া জিতে । বেভান খেলেন ৯৫ বলে ১০২ রানের অপরাজিত ইনিংস । ওয়ানডেতে এটিই তার শেষ সেঞ্চুরি ।শেষ সেঞ্চুরিটিও তিনি দলের বিপদের দিনেই করেছিলেন।

২০০৩ সালের বিশ্বকাপ এর আগে অস্ট্রেলিয়ার লাইন আপ এ ব্যাপক পরিবর্তন আসে । মার্ক ওয়াহ এর জায়গায় আসেন হেইডেন , শেন ওয়ারনের জায়গায় হগ , ফ্লেমিং এর জায়গায় ব্রেট লি। টম মুডী , পল রিফেল দের জায়গা নেন অ্যানডু সাইমন্ডস এবং অ্যানডি বিকেল । নেতৃত্বের ব্যাটন চলে যায় রিকি পন্টিং এর হাতে।এই বিশ্বকাপেও বেভান  নিজের জাত চিনিয়েছেন দলের বিপদে । ইংল্যান্ডের  বিপক্ষে প্রাথমিক পর্বের শেষ খেলায়  অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য ছিল ২০৫। ১৩৫ তুলতেই অস্ট্রেলিয়ার ৮ জন আউট । নবম  উইকেট জুটিতে অ্যানডি  বিকেল এর সাথে বেভানের ৭৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি অস্ট্রেলিয়াকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়। বেভানের রান ছিল ৭৪ , ১২৬ বলে  । অ্যানডি  বিকেল এর ৩৪ , ৩৬ বলে।

সেমিফাইনালেও বিকেল এর সাথে দলকে বাঁচান বেভান ।  যখন অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ৮৪ / ৭, তখন বেভান বিকেলকে নিয়ে হাল ধরেন । দুজনের হাফ সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ২০৮ । অষ্টম  উইকেট জুটিতে দুজন যোগ করেন ৯৭ রান । জবাবে নিউজিল্যাণ্ড ১১২ রানেই অল আউট। সেদিন বেভান বিকেলকে নিয়ে হাল না ধরলে হয়ত অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে যেত ।

 

২০০৩ বিশ্বকাপ এর পরপরই বেভান এর সময়টা খারাপ হতে শুরু করে । সারাজীবন দলের জন্য লড়াই করা এই ক্রিকেটার নিজের জন্য লড়াই করতে পারেননি। শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে ২০০৪ এর  ২৯ শে ফেব্রূয়ারী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান বেভান । ২৩২ ওয়ানডেতে ৫৩.৫৮ গড়ে ৬,৯১২ রান করেন তিনি । ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি ৬ টি , হাফ সেঞ্চুরি ৪৬ টি , উইকেট নিয়েছেন ৩৬ টি । ১০ বছরের ক্যারিয়ারে মাত্র ১৮ টি টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি । তিনি ওয়ানডেতে ৩০ কিংবা তার বেশি ম্যাচ খেলা ৮ ব্যাটসম্যানের একজন যার গড় ৫০ এর উপরে । আরও একটি অনবদ্য কীর্তি আছে তার । ওয়ানডেতে ৩০ কিংবা তার বেশি ম্যাচ খেলা মাত্র দুই জন ব্যাটসম্যান আছেন , যাদের ব্যাটিং গড় কখনই ৪০ এর নিচে নামেনি । দুইজনের একজন তিনি, আর একজন তারই সতীর্থ মাইক হাসি । লেখার শুরুতেই বলেছিলাম , ক্যারিয়ার এর পরিসংখ্যান দিয়ে বেভান কে বোঝা যাবে না । বেভান কে বুঝতে হলে যেতে হবে তাসমানিয়া কিংবা নিউ সাউথ ওয়েলস এর  ক্রিকেট একাডেমী গুলোতে যেখানে আজও ক্ষুদে ক্রিকেটাররা একটা অসম্ভব অবস্থান থেকে হারা ম্যাচ জিতে গেলে উল্লাসে বলে – “ ইয়েস, উই হ্যাভ ডান এ বেভান। ডন ব্র্যাডম্যান এর দেশের একজন ক্রিকেটারের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কীইবা হতে পারে ।

আজ এই পর্যন্তই। খুব দ্রুতই আবার ফিরবো আপনাদের সামনে নতুন কোন লেখা নিয়ে ততদিন আমাদের সাথেই থাকুন।

Loading...