সিনিসিজমঃ সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মকানুন থেকে মুক্তি বনাম নৈরাশ্যবাদ - প্রিয়লেখা

সিনিসিজমঃ সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মকানুন থেকে মুক্তি বনাম নৈরাশ্যবাদ

ahnafratul
Published: April 10, 2018

সিনিসিজম হচ্ছে এমন একটি মতামত যেখানে একজন মানুষ আশায় বসতি স্থাপন করতে পারেনা। এককথায় বলতে গেলে, এরা হচ্ছে নৈরাশ্যবাদী। মানুষের মাঝে কোনো ধরনের আশা ভরসার আলো দেখতে পায় না এবং যারা ভালো কিছুর প্রত্যাশা করে, তাদের প্রতিও এরা কোনো ধরনের সুবিচার করতে পারেনা। প্রাচীন গ্রীক মতাদর্শে সিনিসিজম নিয়ে প্রথম আলোচনা করা এবং এটি নিয়ে যারা কথা বলতেন, তাদেরকে বলা হতো সিনিক (Cynic). মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই স্বার্থপর, চলে আবেগের বশবর্তী হয়ে- এমন ধারনা নিয়ে নৈরাশ্যবাদের উত্থান। প্রথমদিকে অর্থ, সম্পদ, বিত্ত, যৌনতা ইত্যাদি জাগতিক সকল ধরনের সুখ ছেড়ে দিয়ে কেবলমাত্র প্রকৃতির কাছেই নিজেকে সমর্পণ করতে সিনিকরা। তারা ভাবত, জগতের সকলকিছুই অসাড়, কোনো মূল্য নেই। তাই প্রকৃতির কাছেই নিজেকে সমর্পণ করে দেয়া উচিত।
সিনিকদের প্রথম রুপরেখাটি তৈরি করে দিয়ে যান অ্যানটিস্থিন। ৫ম শতাব্দীতে (যীশুর জন্মের আগে) তিনি সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে অনুসরণ করেন ডায়োজিনিস। অ্যাথেন্সের রাস্তায় রাস্তায় দিন গুজরান করতেন তিনি। সিনিসিজমকে তিনি একটি ব্যাখামূলক অবস্থানে নিয়ে যান এবং তার কার্যকারিতা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করতে শুরু করেন। অনেকে এজন্য তাকে খ্যাপা, বদ্ধ উন্মাদ ইত্যাদি বিশেষণে আখ্যায়িত করতে শুরু করে। বেশ কিছুসংখ্যক মানুষ তাকে, তার জীবনাদর্শকে অনুসরণ করতে শুরু করে। নিজেদের ভাগ্যকে, বিত্তকে বিকিয়ে দিয়ে এথেন্সে যেন ডায়োজিনিস নিজের জীবন ভালোভাবে কাটাতে পারে, সে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তারা। ১ম শতকে রোমান সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে সিনিসিজমেরও বিস্তার ঘটে। রোমের রাস্তার এখানে ওখানে দেখা গেল সিনিকরা ভিক্ষা করছে এবং মানুষকে তাদের জীবনানুসারে চলবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে।

ডায়োজিনিসের দর্শন

৫ম শতকের শেষদিকে এসে সিনিসিজম ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে শুরু করে, তবে কিছু কিছু ধ্যানধারণা ও মতবাদ ক্রিশ্চিয়ানিটির প্রথম যুগে চলছিল। উনিশ শতকে এসে দেখা গেল সিনিসিজমের প্রধান যে ভাবধারা ছিল, তা আমূল পরিবর্তন হয়ে নতুন একটি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিনিক দর্শনের যে বিচার তা প্রথমদিকে সাধারণ একটি জীবনযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেখানে কোনো বাহুল্য কিংবা কোনো ধরনের জৌলুস থাকবে না। পরবর্তীতে সিনিসিজমে এসে দেখা গেল যে মানুষের মাঝে অবিশ্বাস এবং ভালো কাজের প্রতি একধরনের অনিশ্চয়তাকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে সিনিসিজমের মাধ্যমে।
প্রথম দিকে সিনিকদের বলা হতো কুকুর প্রজাতির বা কুকুরের মতো আচরণ করে এমন। অবশ্য এর প্রতি নানাধরনের কারণও ছিল। জীবনব্যবস্থা, বাস করবার পদ্ধতি ইত্যাদি দেখে মানুষ ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে রাখত। তাদের প্রতি এথেন্সবাসীর ছিল একধরনের অবজ্ঞা ও বিতৃষ্ণা। সিনিকদের কেন কুকুরদের সাথে তুলনা করা হতো, সেটি নিয়েও নানাধরনের কথাবার্তা, আলাপন রয়েছে। এদের মধ্যে একটি হচ্ছে-
সিনিকদের কুকুর বলার কারণ রয়েছে প্রধানত চারটি। প্রথমত, এই দুই জীবের মাঝে জীবন ধারণের তেমন কোনো তফাত নেই। কুকুর যেমন একা কিংবা দলে চলে, তারাও ঠিক তেমন। মানুষের সামনেই খাবার খায়, যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয়, খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি করে এবং রাস্তার পাশে একটি চৌবাচ্চায় শুয়ে থাকে।
দ্বিতীয় কারণ, কুকুর একটি লজ্জাহীন প্রাণী। সভ্যভব্য হয়ে থাকবার কোনো ধরনের গুণাবলী কুকুরের মাঝে নেই। সিনিকরাও ঠিক তাই। যখন যা পারে, তাই করে। সমাজের যে একটি নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে, তা মেনে চলার কোনো ধরনের ইচ্ছা বা সংকল্প সিনিকদের মাঝে দেখা যায়না।
তৃতীয় কারণ, সেবক হিসেবে কুকুররা খুবই চমৎকার এবং তারা নিজেদের নিয়মকানুন খুব সক্ষমভাবে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সিনিকদের মাঝেও ঠিক এমন একটি প্রভাব রয়েছে।


চতুর্থ কারণ, কুকুর খুবই বৈষম্যসৃষ্টিকারী প্রাণী এবং শত্রু ও বন্ধুর মাঝে প্রভেদ কী কী, সেগুলো একটি কুকুর খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে। তাদের মতবাদ যারা গ্রহণ করে, তাদেরকেই কেবল বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে এবং যারা তা অস্বীকার করে, দূর দূর করে তাদের তাড়িয়ে দেয়। মূলত এই চারটি কারণের জন্য সিনিকদের তৎকালীন সমাজে কুকুরদের সাথে তুলনা করা হতো।
প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সিনিকরা সদগুণাবলীকেই কেবলমাত্র সুখের একমাত্র উপাদান বলে মনে করত। তারা এটিও ভাবত যে সুখ খুঁজতে বেশিকিছু করবার দরকার নেই। নিজের মাঝে একধরনের সদগুণের সন্নিবেশ ঘটালেই জীবনে সুখ আনয়ন করা সম্ভব। এই জাগতিক সুখের মাঝে যে কোনো সত্য নেই, এটিও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল সিনিকরা। সমাজের সবকিছুকে অস্বীকার করে তাই তারা গড়ে তুলতে চেয়েছিল একটি নয়া সমাজ। সিনিক শব্দটি তাই গ্রীক শব্দ “কুনোস” থেকে উদ্ভূত করা হয়েছে যার অর্থ দাঁড়ায় কুকুর। সমাজ, স্বাস্থ্য, পরিবার, বিত্ত সবকিছুকে তারা পায়ে ঠেলে দিয়ে নিজেদের মতো একধরনের সমাজব্যবস্থাকে মেনে নিচ্ছে। কেবলমাত্র প্রকৃতির নিয়ামানুযায়ী একধরনের আত্মসংযুক্তি প্রকাশ করাই ছিল সিনিকদের প্রধান কাজ।
প্রাচীন সিনিকরা সামাজিক সকল ধরনের প্রথাকে অস্বীকার করে সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মগুলোকে কঠোর ও তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছে যে কেবলমাত্র প্রকৃতির সাথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যোগদান করার মাধ্যমেই সকল ধরনের জাগতিক সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা যায়। তবে ১৮ ও ১৯ শতকে এসে দেখা যাচ্ছে যে পুরো অর্থটিই বদলে যাচ্ছে। এখানে একধরনের নৈরাশ্যবাদীতা ও হতাশার কথা বলা হয়েছে।
তবে সবকিছু বিবেচনা করলে দেখা যায় সিনিকরা প্রথমে তাদের পথে ঠিকই ছিলেন। জাগতিক সব সুখশান্তি থেকে নিজেদের আলাদা করতে হলে সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মকানুনের প্রতি দরকার একধরনের জোরালো প্রতিবাদ ও আঘাত। সেটির কোনো কমতি ছিল না ডায়োজিনিস কিংবা পদাঙ্ক অনুসারীদের।

Loading...