স্যানিবা এনসিডেন্স- প্রাগৈতিহাসিক যুগের চারচোখা জলজ গিরগিটি - প্রিয়লেখা

স্যানিবা এনসিডেন্স- প্রাগৈতিহাসিক যুগের চারচোখা জলজ গিরগিটি

ahnafratul
Published: April 4, 2018

ধরুন আমি যদি আপনাকে প্রশ্ন করি, এমন একটি প্রাণীর নাম বলুন যেটির চোখ দুইয়ের অধিক? ভাবতে হবে খুব, তাইনা? অতি উৎসাহী কেউ কেউ তো বলেই ফেলবেন, ‘কেন? এটা তো খুবই সহজ! মাছি।’ তবে এটি ছাড়া যদি আর কোনো প্রাণীর কথা বলতে হয়, তাহলে বেশ গলদঘর্ম হতে হবে বৈকি! বিজ্ঞানীরা গবেষণায় অদ্ভুত একটি বিষয় বের করে এনেছেন। আজ থেকে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর বুকে বাস করত লঙ টেইলড মনিটর লিজার্ড (পানিতে বাস করত বলে এদের মনিটর বলা হয়, এক ধরনের কুমির)। তাদের চোখ একজোড়া নয়, দু’জোড়া ছিল!

স্যানিবার খুলির ব্যবচ্ছেদ চিত্র

চার-চোখা এই গিরগিটির বৈজ্ঞানিক নাম স্যানিবা এনসিডেন্স (Saniwa ensidens). বিজ্ঞানীদের জানামতে এটিই একমাত্র পানিতে বাস করা মেরুদণ্ডী প্রাণী, যার চোখের সংখ্যা ছিল চার। তবে বর্তমান পৃথিবীতে এমন একটিই মেরুদণ্ডী প্রাণী আছে, যেটির নাম ল্যাম্প্রে। স্যানিবার তৃতীয় ও চতুর্থ চোখটি একদম মস্তকের ওপর স্থাপিত ছিল, যেখানে তার পিনিয়াল ও  প্যারাপিনিয়াল অস্থিগুলো সজ্জিত। এছাড়াও চোখগুলো ঘুরাতে পারত ৩৬০ ডিগ্রী। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন এই আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীতে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের বিবর্তন কীভাবে হলো, তা আরও ভালো করে বুঝতে সুবিধা হবে।
ফটোসেনসিটিভ অঙ্গ খুব কম মেরুদণ্ডী প্রাণীর মাঝেই পাওয়া যায়। মাছ এবং ব্যাঙ প্রজাতির কিছু সংখ্যকদের মাঝে এটি থাকে। বিজ্ঞানীরা এই ফটোসেনসিটিভ (আলোক-সংবেদী) অঙ্গকে বলছেন ‘তৃতীয় নয়ন’। গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ক্রিস্টার স্মিথ বলেন,
“একদিক থেকে লক্ষ্য করলে এটি আমরা বলতে পারি যে এই তৃতীয় নয়ন হয়ত মানুষ কিংবা পক্ষীকূলের মাঝেও ছিল। কালের বিবর্তনে সেটি আস্তে আস্তে হারিয়ে গিয়েছে। তবে আদিম মানুষের সত্যিই এটি ছিল কিনা, তা নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক হতে পারে।” ক্রিস্টার জার্মানীতে সেনকেনবার্গ রিসার্চ ইন্সটিটিউটে গবেষণারত আছেন। তিনি আরও বলেন,
“তৃতীয় চক্ষুর এই ধারণাটি হয়ত প্যারাপিনিয়াল নামক অপর একটি অঙ্গ থেকে প্রসূত হতে পারে। তবে এত কোটি বছর আগের এই গিরগিটি এবং বর্তমানের ল্যাম্প্রের মাঝে এই সাদৃশ্যটি ঠিক খাপ খায় না।”

ল্যাম্প্রে

নতুন পাওয়া এই গবেষণার ফলে এতদিনের একটি রহস্য উন্মোচিত হলো। পিনিয়াল অর্গান থেকে উদ্ভুত এই চোখ অন্যান্য চোয়ালবদ্ধ প্রাণীদের মাঝে কীভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেল, সেটিই গবেষণা করে বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। ক্রিস্টার ও তার সহযোগিরা ইয়াওমিঙ্গে রাখা একটি নমুনা দেখে সেটির পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন নানাভাবে। ১.৩ মিটার লম্বা এই গিরগিটির কম্পিউটেড টমোগ্রাফির মাধ্যমে এবং হাজারো এক্স-রে এর মাধ্যমে যখন ত্রিমাত্রিক ছবির সাহায্যে নতুনভাবে সামনে আনা হলো, তখন তারা বুঝলেন যে অকল্পনীয় একটি সত্যের কাছে পৌছে গিয়েছেন।
এই তৃতীয় চক্ষুর খোঁজেই তারা পেয়ে গেলেন আরও একটি বোনাস, অর্থাৎ চতুর্থ চোখের খোঁজ। প্রায় চার কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই গিরগিটির খুলিতে আরও একটি জায়গা পাওয়া গিয়েছে, যেখানে চতুর্থ চোখের অবস্থান। বিজ্ঞানীরা এমন একটি জিনিস মোটেও আশা করেননি, সেটা বলাই বাহুল্য।
বর্তমানের মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মতো এই দুটি চোখের অবস্থান যথাযথ নয়। গবেষণায় উঠে এসেছে এটি তারা ইচ্ছেমতো অবস্থান পরিবর্তন করতে পারত এবং কালের পরিক্রমায় কুমির, ঘড়িয়াল ও অন্যান্য পানিতে বাস করা সরীসৃপদের থেকে এটি হারিয়ে গিয়েছে।

স্মিথ বলছেন ভিন্ন কথা। পূর্বে প্রাণীদের অবস্থা আজকের মতো এত সুবিধের ছিল না। তাদের অবস্থান ছিল অনেক বিপদে পরিপূর্ণ এবং প্রতি পদে পদে বিশালাকার প্রাণীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হতো। ফলে যে জায়গায়ই অবস্থান করুক না কেন, নিজেদের আত্মরক্ষা করবার জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা প্রকৃতিই করে দিয়েছে। তবে তিনটি চোখের জায়গায় চারটি চোখের প্রাপ্তি, এটি বিজ্ঞানীদের জন্য সত্যিই খুব অভাবনীয় কিছু ছিল।
গবেষণাটি গত এপ্রিলের ২ তারিখ কারেন্ট বায়োলজি নামক একটি জার্নালে ছাপা হয়েছিল।
(সূত্রঃ লাইভ সাইন্স)

Loading...