বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত পাঁচ প্রাণীর গল্প - প্রিয়লেখা

বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত পাঁচ প্রাণীর গল্প

farzana tasnim
Published: December 2, 2017

বিষাক্ত প্রাণীর নাম শুনলেই যাদের সাপ বা কাঁকড়াবিছের কথা মনে পড়ে গায়ে জ্বর এসে যায়, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। জ্বী, আপনার অপ্রিয় এই প্রাণীগুলোর চেয়ে ঢের বেশি বিষধর এবং ভয়ংকর প্রাণীর অস্তিত্ব এই ধরণীতেই রয়েছে! চলুন তবে জেনে আসা যাক বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত পাঁচটি প্রাণীর কথা।

ডেথ স্টকার স্করপিওন

বেশিরভাগ বিচ্ছু মানব জাতির জন্য ক্ষতিকারক নয়, যদিও এদের কামড়ের ফলে স্থানীয়ভাবে সামান্য ব্যথা, অনুভূতিহীনতা অথবা ফুলে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। কিন্তু ডেথ স্টকার নামের বিচ্ছু মারাত্মক ক্ষতিকারক একটি প্রজাতি,  যার বিষ সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। এর হুলের বিষ এতটাই শক্তশালী যে, অসহ্য যন্ত্রণা, জ্বর, অচেতনতা, মাংশপেশির প্রবল সংকোচন, অবশ এবং সবশেষে মৃত্যু ঘটায়। উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে এই বিচ্ছু পাওয়া যায়।

পাফার ফিশ

পৃথিবীর বিষাক্ত প্রাণীদের মধ্যে দ্বিতীয় বিষাক্ত মেরুদন্ডী প্রাণী হচ্ছে এই মাছ (প্রথম dart Fish)। জাপানে এটি ফুগু নামে এবং কোরিয়ায় as bok-uh নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এটি পটকা মাছ নামে পরিচিত। এই মাছ উপাদেয় খাবার হিসেবেও বিশেষ পরিচিত।  কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর চামড়া এবং ভেতরের কিছু অংশ খুবই বিষাক্ত। এই প্রাণীটি তার অনিষ্টকারীর উপস্থিতি বা বিপদ আঁচ করতে পারলে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গ্লোব বা ফুটবল আকার ধারণ করে এবং টেট্রোডক্সিনা যা কিনা সায়ানাইডের চেয়ে ১০০০ গুন  শক্তিশালী এমন বিষাক্ত পদার্থ আক্রমনকারীর উপর নিক্ষেপ করে।

এই মাছের বিষক্রিয়ায় খুব দ্রুত এবং ভয়ংকরভাবে মৃত্যু হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি জিহ্বা ও ঠোটের অসারতা, মাথা ঘোরানো, বমি, মাংশপেশির অবশ হওয়া, শ্বাসকষ্ট  ইত্যাদি উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে এবং যার কোন জানা প্রতিষেধক নেই। অনভিজ্ঞ লোকদের দ্বারা ধৃত এবং প্রস্তুতকৃত fugu বেশির ভাগ মৃত্যুর কারণ।

স্টোন ফিশ

হয়তো বা পাথুরে মাছ কোন সুন্দরী প্রতিযোগিতায় জিততে পারবে না, কিন্তু “পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত মাছ”-এর খেতাব নিশ্চিত জয় করতে পারবে। এর বিষের বিষক্রিয়া এতটাই তীব্র যে, আক্রান্ত ব্যক্তি যন্ত্রণায় দেহের অঙ্গ কেটে ফেলতে চায়। সমুদ্রের তলদেশে থাকা নানা রকম পাথরের ভাঁজে নিজেকে নিপুনভাবে আড়ালে করে রাখার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা এবং পাথরের ছদ্মবেশ ধারণ করে সবার চোখকে ফাঁকি দেয়ার প্রবনতার কারণে এই প্রানীটিকে ছদ্মবেশীদের গুরু বলে অনেকেই আখ্যায়িত করে থাকেন। এই প্রাণীর শরীরে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে বিষাক্ত কাঁটা এবং এই বিষাক্ত কাঁটা হাঙ্গর ও অন্যান্য লুন্ঠনকারী,অনিষ্টকারী প্রাণীর হাত থেকে তাকে রক্ষা করে।

এই কাঁটার আঘাতে ভিকটিমের হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা লোপ পায় এবং শরীর দ্রুত নিস্তেজ হয়ে আসে। আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হলে তাকে আর বাঁচানো যায় না। পাথুরে মাছ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিনাংশে বাস করে, কদাচিৎ ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর থেকে কুইন্সল্যান্ড পর্যন্ত বিশাল শৈল প্রতিবন্ধকের শান্ত অগভীর পানিতে দেখা যায়।

বক্স জেলিফিশ

পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত প্রাণীর মুকুটটি পরে বসে আছে এই অদ্ভুত সুন্দর প্রানীটি। দেখতে অপরুপ হলেও এটি সাক্ষাত মৃত্যুদুত। এর বিষ পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী। সাধারনত এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাগরে এদের দেখা মেলে। সাধারনত গভীর সমুদ্রে থাকলেও মাঝে মাঝে খাবারের সন্ধানে বীচের কাছাকাছি এসে পড়ে। তখন মানুষ এদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। এরা বেশিরভাগ সময়ে মানুষের পায়ে আক্রমন করে এদের বিষাক্ত হুল দ্বারা।

এর বিষ মানুষের হার্ট, নার্ভ সিস্টেম এবং স্কিন সেলগুলোকে আক্রমন করে এবং নস্ট করে ফেলে। বক্স জেলিফিসের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রবলভাবে কাঁপতে থাকে এবং আস্তে আস্তে ডুবে যায় অথবা তীরে পৌঁছানোর পূর্বেই মারা যায়। আর যারা জীবিত থাকে তারা ব্যথা ও দূর্বলতা নিয়ে বেঁচে থাকে। যদি অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নেওয়া হয় তাহলে বেঁচে থাকার কোনো আশাই থাকে না।

এর বিষের সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক হচ্ছে ভিনেগার। বিষক্রিয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে (কমপক্ষে) ভিনেগার দিতে হবে। ভিনেগারে আছে acetic acid যা জেলি ফিসের বিষকে রক্তে মিশে যেতে বাধা প্রদান করে এবং সেই সাথে ব্যথাও উপশম করে।

কিং কোবরা

শঙ্খচূড় বা কিং কোবরা, পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা বিষাক্ত সাপ, যার দৈর্ঘ্য হতে পারে ৫.৬ মিটার পর্যন্ত মানে প্রায় ১৯ ফিটের কাছাকাছি! এটি মূলত সম্পূর্ণ দক্ষিণ এশিয়ার বণাঞ্চল জুড়ে দেখা যায়। ইংরেজি নামে কোবরা শব্দটি থাকলেও এটি কোবরা বা গোখরা নয়। এটি সম্পূর্ণ আলাদা গণের একটি সাপ। এই সাপের আকার পর্যবেক্ষণ এবং ফণার পেছনের অংশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গোখরার সাথে এটির পার্থক্য খুব সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। গোখরার তুলনায় শঙ্খচূড় আকৃতিতে যথেষ্ট পরিমাণ বড়।

শঙ্খচূড়ের গণের নাম হচ্ছে Ophiophagus, যার আক্ষরিক অর্থ “সাপ খাদক” এবং প্রাথমিকভাবে এটি অন্যান্য সাপ ভক্ষণ করেই তার খাদ্য চাহিদা মেটায়। যেসকল সাপ এটি ভক্ষণ করে তার মধ্যে আছে ছোট আকৃতির অজগর। এছাড়াও অন্যান্য বিষধর সাপও এটি ভক্ষণ করে, যেমন: ক্রেইট, গোখরা এবং নিজ প্রজাতিভুক্ত অন্যান্য ছোট সাপ।

এই সাপের বিষ মূলত নিউরোটক্সিক, অর্থাৎ এটির বিষ আক্রান্ত প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। শঙ্খচূড়ের একটি সাধারণ দংশন-ই যেকোনো মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। এর কামড়ের ফলে মৃত্যুর হার প্রায় ৭৫%। বাংলাদেশের সুন্দরবনের গভীরে এই সাপ দেখতে পাওয়া যায়।

Loading...