৩টি বড় আবিষ্কার যা বদলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ ! - প্রিয়লেখা

৩টি বড় আবিষ্কার যা বদলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ !

Naseeb Ur Rahman
Published: September 24, 2019

প্রযুক্তি বিশ্ব বিগত ৪০ বছরে যে তিনটি মৌলিক আবিষ্কারের মাধ্যমে জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে সেগুলো হলো পার্সোনাল কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন। ঠিক এমনই প্রযুক্তি বান্ধব আবিষ্কার যার যুগান্তকারী অবদান বদলে দিবে পরবর্তী দশকে তার সাক্ষী হতে চান; তবে আপনাকে নিতে হবে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। 

চলুন তবে জানি সে সকল পদক্ষেপ সম্পর্কে।  

প্রথমেই সেই সকল প্রযুক্তি উন্নয়ন ভাবনা থেকে দূরে সরে আসুন যা ইতিমধ্যে উন্নয়নের শীর্ষে রয়েছে। উদাঃস্বরুপ- বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি সংযুক্ত সৌর ও বায়ু শক্তি, কৃত্রিম ফসল উন্নীতকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি।

যেসব প্রযুক্তি পণ্য বা এপ্লিকেশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা নিয়ে বেশিদূর না ভাবাই যৌক্তিক। এমন প্রযুক্তির মাঝে রয়েছে গ্রাফিন, বৈদ্যুতিক বায়ু যান, জিরো কার্বন বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল, ছোট মডুলার বিশিষ্ট পারমাণবিক চুল্লী, ক্যান্সার রোগের প্রতিষেধক ইত্যাদি।

কিন্তু এখানেই থেমে থাকা নয়। গবেষণা এখন অসম্ভবকেও সম্ভব করে চলেছে।

“ ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদন করা মাংস প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা  চাপ বহুল অংশে কমাবে। আর প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া গ্রীণহাউস গ্যাস নিঃস্মৃত দূষণের মাত্রা কমাবে। একইসাথে  সুপেয় পানির জলাধারের উপরও চাপ কমবে। “ 

আজ আমরা আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো ভবিষ্যত প্রযুক্তির।

কালচারড মিট (Cultured meat):  ল্যাবরেটরিতে উৎপাদন করা সাংস্কৃতিক মাংস

Cultured meat বা সাংস্কৃতিক মাংস, শুনতে খানিকটা ভিন্ন শুনালেও ঠিক এমনটাই নাম দিয়েছেন গবেষকরা। গবেষকরা বলছেন বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাসন সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর আবাসন  নির্মাণকারীরা ফসলি জমি ও পশু চারণ ক্ষেত্রে আবাসন নির্মাণ করছেন। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ফসলি জমি ও তিন চতুর্থাংশ চারণভূমি আজ তাই বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বহির্বিশ্বের নানা দেশ তাই আজ খাদ্য উৎপাদনে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যায় যেখানে নিজ বা অন্য দেশের চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক খাবারের বিশেষ চাহিদা রয়েছে।

সাংস্কৃতিক মাংস বা Cultured meat খেতে সত্যিকারের মাংসের মতই যা বাড়ির অভ্যন্তরে বা ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদন করা হয়। এখনো পর্যন্ত এই মাংসের উৎপাদন খরচ যথেষ্ট ব্যয়বহুল। এই মাংস দিয়ে উপাদেয় বায়োকেমিক্যাল স্যুপ প্রস্তুত ও পরিবেশন করা সম্ভব। ২০১৩ সালে যখন মাষ্ট্রিচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের প্রথম সংস্কৃত-মাংসের হ্যামবার্গার (Cultured meat ham burger) পরিবেশন করেন, তখন তারা এর দাম নির্ধারণ করেছিলেন $ ৩,২৫,০০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪,৫৮,০০০ অস্ট্রেলীয় ডলার)। কিন্তু বিগত ছয় বছরে ৬০ গুণ কমে প্রতি কিলোগ্রাম Cultured meat এর দাম এসে দাড়িয়েছে  $ ৫,০০০ মার্কিন ডলার এর নীচে (প্রায় ৭,০৫০ অস্ট্রেলীয় ডলার)। 

Cultured meat দেখতে মাংসের কিমার মত ও খেতে মিষ্টি। গবেষকরা স্বীকার করেছেন চর্বি ও পেশী সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ মাংস পেতে এখনো দেরি, তাই চাইলেই আপনি এখন Cultured meat এর সুস্বাদু স্টেক খেতে পারছেন না। তাছাড়া কৃত্রিম ভাবে উৎপাদিত মাংস খেতে এখনো অনেকে অনীহা প্রকাশ করলেও এটি খেতে সুস্বাদু ও সহজপাচ্য।

গবেষকরা অনুরোধ জানিয়েছেন কৃত্রিম ভাবে উৎপাদিত মাংসের বাজারের সাথে তাজা মাংসের প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করুন। এতে পশুসম্পদের উপর বাড়তি চাপ যেমন কমবে ঠিক তেমনি মাংসের বাড়তি মূল্যও  কমবে।

কৌশলগত সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনছে আন্তর্জাতিক ভাবে বিখ্যাত মাংস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ যেমন Memphis Meats, Just, Finless Foods, Mosa Meats, Tyson Foods।  তারা চেষ্টা করছে সাশ্রয়ী খরচে শক্তিবর্ধক Cultured meat উৎপাদন করার। বিল গেটস ও বড় মাপের কৃষি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘কার্গিল’ আজ বাজি ধরেছে কৃত্রিম ভাবে উৎপাদিত সাংস্ক্তিক মাংস বা Cultured meat এর উপর ( বিল গেটস ও কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত মাংসের খামারে বড় আকারে বিনিয়োগ করেছেন)।

উৎপাদন ও বিক্রয় খরচের মাত্রা সাশ্রয়ী এবং সহনীয় হলে পরবর্তী  দুই দশকে খাদ্য উৎপাদনকারী খামার ও খামারির সংখ্যা যতটা বৃদ্ধি পাবে ঠিক ততটাই গবাদি পশু ও মৎস্য শিকারীর সংখ্যা কমবে।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিঃ ফ্লেক্সিবল অবজেক্ট ম্যানিপুলেটিং রোবট

বাছাই করুন, দেখুন, তুলুন, নাড়াচাড়া করুন কিংবা সরিয়ে রাখুন। এধরণের কাজ তো আমরা প্রায়শই করে থাকি। এ ধরনের কাজের সাথে আমরা এতটাই মিশে গেছি যেন এই ধরনের কাজ করা কোন ব্যাপার না। একই ধরণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে রোবটদের ক্ষেত্রেও। রোবটরা এখন ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন কাজে সহায়তা থেকে শুরু করে সড়ক নির্মাণে ইট বিছানো থেকে ধোঁয়া-মোছা-লন্ড্রির কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

যেসব কাজে সতর্কতা অবলম্বন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব কাজেই আজ রোবট  সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যেমন পরিবহন নির্মাণ শিল্প । পরবর্তী উন্নয়নের পথে ধাবিত হতেই এবং অধিক সামর্থ্য অর্জনে মেশিন কে মুখোমুখি হতে হবে বাস্তব জীবনের জটিল ও কঠিন কার্যধারার। Artificial Intelligence বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, Sensor, Actuators রোবটকে সেই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

LIDAR- Light Detection and Ranging; একটি রিমোট সেন্সিং মেথড যা পৃথিবীর উপরিভাগের ভূতল বা পৃষ্ঠের পরিক্ষণ করা হয়। সেই দর্শন প্রক্রিয়াটি আজ পরিবহণ শিল্পের উন্নয়নে গাড়ি নির্মাণ কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে যার উপকারিতা আগামীতে বিশ্ববাসী উপভোগ করবে। আজকের দিনে রোবটরা তাদের অবস্থান ও কাজের রূপকল্প ও মানচিত্র নির্মাণ করে সেই অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করা শিখেছে। রোবটরা এই কাজে ব্যবহার করছে মেশিন ভিশন টেকনোলজি যা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ও ভিডিও গেইমস এর ইমেজ ক্যাটালগ ও ইমেজ প্রসেসিং এর কাজ করছে।

OpenAI’S Dactyl System এমন  একটি রোবট যা একটি ব্লককে ৫০ টি ভিন্ন উপায়ে উপস্থাপন করতে পারে। Softwear Automation Sewbot পোশাককর্মীর চেয়ে দ্রুতগতিতে জিন্স ও টি-শার্ট উৎপাদন করতে পারে।

এই সিস্টেমগুলোর বিশেষ দিক হলো এরা ক্রমান্বয়ে নিজেরা শিখতে থাকে। বর্তমান সময়ের কিছু রোবটকে তো “Reinforcement Learning”, পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। যেখানে স্বতন্ত্র নেট সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্যিমুলেশন প্রক্রিয়ায় রোবটকে বাস্তব জীবনের আদলে বিভিন্ন অবজেক্ট এর ম্যানিপুলেশন শেখানো হয়। পরবর্তীতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত  রোবট কে বাস্তব পরিবেশে কাজে লাগানো হয়। আর যে কাজটি রোবটের স্মৃতিতে একবার ধারণ হয়ে যায় সে কাজটি রোবট কখনো ভুলে না।

পরবর্তী প্রজন্ম দেখতে পাবে রোবটদের ২৪/৭ নানা কাজে নিয়োজিত থাকার চিত্র যে সকল কাজ পূর্বে মানুষ করতো। কর্মক্ষেত্রে এর যেমন প্রভাব পরবে, একই ভাবে প্রভাব পরবে দৈনন্দিন জীবনের উপরেও। শতাব্দীর বেশীসময় ধরে যে সকল পণ্যদ্রব্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি তার মূল্য পূর্বাপেক্ষা কমবে।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিঃ ফিউশন পাওয়ার

শক্তিকে না সৃষ্টি করা যায় না ধ্বংস করা যায়, কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তর করা যায়। কেমন হয় যদি শক্তির এমন উৎস আবিষ্কার করা সম্ভব হয় যেখানে শক্তি হবে অফুরন্ত এবং তা সাপোর্ট দিবে দিনরাত ২৪ ঘন্টা। চিন্তা করুন খানিক সেই সময়ের কথা যখন আপনার বাসায় কখনোই বিদ্যুৎ যাবে না! পরিবেশের উপর পড়বে না তেজস্ক্রিয়তা বা গ্রীণহাউস প্রতিক্রিয়ার প্রভাব।

ফিউশন প্রক্রিয়ার প্রিন্সিপল অনেকটা কয়লা থেকে তাপশক্তি সংগ্রহের মতই। ফিউশন প্রক্রিয়ায় একটি চৌম্বকীয় বোতলে প্রচন্ড তাপমাত্রায় পারমাণবিক ফিউজের নিউক্লিয়াস হতে আরও ভারী নিউক্লিয়াস উৎপন্ন করা হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে ইলেকট্রন ও পর্যায়ক্রমে ইলেক্ট্রিসিটি উৎপন্ন করা সম্ভব।

বিজ্ঞানীরা  প্রমাণ করেছেন যে ফিউশনের বাস্তবায়ন করা সম্ভব; এ দিয়ে শুধুমাত্র হাইড্রোজেন বোমা নির্মাণই নয় বরং সূর্যের মত শক্তির উৎস উৎপন্ন করা সম্ভব। কিন্তু ফিউশন নির্মাণে প্রয়োজন পড়ে বিপুল পরিমান গ্যাস, উচ্চ চাপ এবং মিলিয়ন ডিগ্রীর অধিক তাপমাত্রা। উপযুক্ত পরিবেশে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা ও চাপে গ্যাস প্লাজমায় রূপান্তরিত হয়। শুধুমাত্র প্রয়োজন চৌম্বকীয় তরঙ্গটির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যা নিতান্তই কঠিন।

ফিউশন প্রজেক্ট সফল করার প্রথম কৌশল হচ্ছে শক্তির সেই বিক্রিয়াকৃত কেন্দ্রবিন্দুটি আবিষ্কার করা যেখানে সবচেয়ে অধিক শক্তি উৎপন্ন হয়। পরবর্তীতে তাপমাত্রা ও উত্তাপ কে নিয়ন্ত্রণ করে নিউট্রন প্রবাহ কমিয়ে ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপাদিত শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। এবং সর্বশেষ অপারেটিং রিঅ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লীর সাহায্যে এই প্রক্রিয়া চালু রইবে।

ইন্ডাস্ট্রিতে ফিউশন রিঅ্যাক্টর নিয়ে প্রচলিত রয়েছে যে এই আবিস্কারটি পরিপূর্ণভাবে আসতে কম বেশি আরও ৩০ বছর সময় লেগে যাবে।     

একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রায় $২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ($৩৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার) ব্যয় করে ফ্রান্সে বিশ্বের বৃহত্তম পরীক্ষামূলক পারমাণবিক চুল্লী International Thermonuclear Experimental Reactor (ITER) নির্মাণ করছে। ২০২৫-এই নির্মাণ কাজের সমাপ্তি হবার কথা। আশা করা যায় যে এর পরবর্তী সংস্করণ ২০৩৫ সাল হতে বাণিজ্যিক শক্তি উৎপাদন করবে। তবে উন্নীতকরণের কাজ ২০৬৫ সাল পর্যন্ত চালু থাকতে পারে।