বইপড়া - সেকাল একাল - প্রিয়লেখা

বইপড়া – সেকাল একাল

Milky Reza (Editor)
Published: August 23, 2019

জীবন যদি মিষ্টি করে সুযোগ খোঁজে ছুঁতো দেবার,

সুযোগ খোঁজে আমার নিজের আমিটাকে ভুলিয়ে দেবার,

ঠিক তখনি আশ্রয়হীন শত লোকের মাঝেও একা-

এই আমিটা খুঁজি ফিরি

পেতে যখন নিজের দেখা,

ঠিক তখনি ঘরের মাঝে

একটি কোণে চুপিসারে

হাতছানি দেয় বইয়ের গোছা।

বলে-

ভয় কিরে তোর?

আমি আছি,

আলো আমার বিছিয়ে দিতে।

 

নে যত হোক তোর চাহিদা,

আলোর কাঙ্গাল মন পাখিটা,

দিতে আমি সদাই রাজি,

তোর মাঝে যে আমিও বাঁচি।

 

তোরই মতো  অতৃপ্ত সব প্রানের বসত আমার কাছে।

যারা এই সমাজে সাপেক্ষিক উদ্ভ্রান্ত সব,

যারা নিজের মতো নিজের করে-

আমায় নিয়ে ঘরের মাঝে একটি কোণেই জগৎ রচে।

 

হ্যাঁ। বই আমাদের এমনই বন্ধু। যখনি মনে হয়ে নিজের থেকে ছিটকে যাচ্ছি, মতের অমিল বা সমাজের অসঙ্গতি খুব বিরক্তি সৃষ্টি করছে নিজের মধ্যে, তখনি আশ্রয় মেলে বইয়ের কাছে। শান্ত হয় মন।

 

আবার যখন একা লাগে তখন বন্ধু হয় বই। ভুলিয়ে দেয় সব একাকিত্বতা। নিবিড় আপন করে জড়িয়ে রাখে নিজের সাথে।

 

তেমনি আবার যখন জ্ঞানের পিপাসা বা প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, বই আমাদের সমাধান দেয়। বইয়ের সাথে কাটানো একটি মুহূর্তও আমাদের প্ররোচনা করেনা। প্রতিটা মুহূর্ত জীবনে কখনো না কখনো সাহায্য করে।

 

বই। কথায় আছে বই সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। একথার অন্যথা কেউ এখনো বলতে পারেনি।

 

বই মানেই সহস্র কাগজের পাতার বন্ধন। কালো হরফে কালির লেখা আর মলাটে বাঁধা। নতুন বই কিনে এনে দেখা তার প্রচ্ছদটা কেমন, রঙটা কেমন, ভিতরে পাতাগুলোর মান কেমন, কেমন হরফে ছাপানো। সবকিছুর মধ্যেই একটা আনন্দ।

এরপর নতুন বই খুলে চোখ বন্ধ করে ঘ্রান নেওয়া। আহ্!

 

বইপ্রেমী সবারই নতুন বইয়ের ঘ্রান নিতে খুব ভালো লাগে। ঘ্রানটা মূলত কার্বন আর কাগজের ঘ্রানের মিশেল। তেমন মধুময় কিছুই হওয়ার কথা নয়। তবুও আমাদের ভালোলাগে। কারণ আমরা বই কে ভালোবাসি। নতুন একটা বই খুললেই মন আনন্দে নেচে ওঠে। পড়ব, জানবো, ডুবে থাকবো, কতোইনা আনন্দে। সেই আনন্দে আন্তরিকতায় নতুন বইয়ের ঘ্রান এত মধূর। সবটাই আসলে মনস্তাত্ত্বিক।

 

বই প্রেমিকরা একটি বই খুললে শেষ হওয়া অবধি কোন কিছুতে শান্তি খুঁজে পাননা। সামনে কি আছে, তার সামনে কি আছে এসব জানার আকাঙ্খায় একবারেই বইটি পড়ে শেষ করে ফেলেন।

 

উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বই পড়ার ধারনা সার্বিকভাবে এমনই ছিল। তবে বিংশ শতাব্দীতে তা খানিকটা পরিবর্তিত। খানিকটা অপরিচিত ধরণ, তবে প্রচলিত এখন।

 

সে হলো ভার্চুয়াল বই পড়া। এখন মানুষ বই লেখেনও ভার্চুয়ালি। একটি বই মানে একটি পিডিএফ ফাইল বা একটি ডকুমেন্ট ফাইল। অথবা গুগলেই আপলোড করা পাতার পর পাতা। সুনির্দিষ্ট নিয়মে সাবস্ক্রাইব করে নির্দিষ্ট সাইট থেকে নির্দিষ্ট বইয়ের সফট কপি ডাউনলোড করে পড়তে হয়। এই বই পড়ায় উত্তেজনা কতোটুকু কাজ করে জানিনা।

এই বই পড়া হয় সুনির্দিষ্ট কারণ বশত। দরকার অনুযায়ী তথ্যগুলো জেনে নেয়া মাত্র।

 

এই বই কখনো বন্ধু হয়না। কারণ আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যখন গুছিয়ে তথ্য পেয়ে যাবেন তখন আর আপনি বাড়তি পড়বেন না। এভাবেই জ্ঞানের ভান্ডারও হয়ে যাচ্ছে সুনির্দিষ্ট।

 

এই ভার্চুয়াল বই কতোটা বন্ধু হতে পারে সে বিষয়ে সন্দিহান।  কতোটা টেনে রাখতে পারে নিজের কাছে জানিনা। জ্ঞান এখানে সীমাবদ্ধ।

এই হলো একালের বই পড়া।

 

আগে বইয়ের লাইব্রেরিগুলোতে আমরা খোঁজ রাখতাম। কি কি বই এসেছে, কবে কি বই আসবে। বই প্রেমিকদের কাছে গিয়ে বই ধার করে নিয়ে এসে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পড়ে ফেরত দিতাম। লাইব্রেরিতে নতুন বই কবে আসবে তা নিয়ে ব্যস্ততার শেষ নেই। এ যেন এক আনুষ্ঠানিকতা। বইকে ঘিরে কতোইনা জীবনের পরিক্রমা।

সেখানে হতাশা নেই, আছে কেবলি উৎসাহ আর উত্তেজনা। ছোট ছোট আনন্দকে উদযাপন করার সংস্কৃতি।

 

কিন্তু বই পড়ার একালটা কেমন জানি কঠোর। ভার্চুয়ালি সবকিছুই হাতের মুঠোয়। তবুও একালে মানুষগুলো হতাশাগ্রস্ত।  ছোট ছোট সেই উদযাপন আর উৎসাহগুলো মানুষ ভুলে গেছে। ভার্চুয়াল জগতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা আর একটা কাগজের বই নিয়ে পড়ে থাকার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা মনস্তাত্ত্বিক।

এখন কেউ আর সেই শান্তিটা পায়না। সবাই হতাশ। মনখারাপের জগৎ যেন এক।

 

তাই সেকালে যেন বই পড়াকে ঘিরেই বিনোদন ছিল, ছিল মুখে হাসি। আর একালে বইয়ের ধরনে যেমন এসেছে পরিবর্তন, উবে গেছে সেই উৎসাহ আর হাসি। মানুষ এখন মননিবেশ করতে পারেনা।

তাই সেই মলাটে বাঁধা কাগজের বই পড়ার রেওয়াজ শুরু হোক আবার সেই প্রত্যাশায়……

 

 

ছবিঃ সংগৃহীত