কিশোর শ্রমিক তুহিনের গল্প - প্রিয়লেখা

কিশোর শ্রমিক তুহিনের গল্প

Milky Reza (Editor)
Published: August 22, 2019

যে মনের আছে এতো মাধুরী,

সে কেন চলেছে বয়ে ব্যথাভার?

 

হ্যা, এমনি এক কিশোর শ্রমিক তুহিনের গল্প বলবো আজ, যার মনে রয়েছে গভীরতা এবং সৎ ইচ্ছা। সংকল্প এবং যুদ্ধ করবার  একাগ্রতা। এমন মানুষের প্রাপ্য কি কেবল পরিশ্রম আর ত্যাগ? দেশ কি তার জন্য কিছুই করতে পারেনা?

 

বাবা মারা গেছে সাত বছর আগে। বয়স তখন ৮ বছর। ছোট দুই ভাইবোন আর মাকে নিয়ে তার সংসার। শত অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে কোনরকম আরো সাতটি বছর পেরিয়ে আজ ১৫ বছরে এসে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাকে।

 

হ্যা, এমনটিই গল্প তুহিনের।

 

রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্হিত দৈনিক যুগান্তরের ক্যান্টিনে ওয়েটার এর কাজ করে তুহিন। বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। বেঁচে থাকতে বাবা কৃষি কাজ করতেন, তবে তিনি সাত বছর আগে চলে গেছেন তাদের ছেড়ে। সংসারের বড় সন্তান তুহিন তখন আট বছরের শিশু। তারও স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করবার। মায়েরও স্বপ্ন ছিল। বাবার রেখে যাওয়া গাছ বিক্রি করেই এতদিন চলেছে তাদের। ষষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত কুমিল্লায় পড়াশুনা করেছে তুহিন। তবে বাস্তবতা এখন আর সহায় নেই। লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার খোঁজে বের হতে হয়েছে তুহিনকে কারণ ছোট দুই ভাইবোনকে সে লেখাপড়া শেখাতে চায়। ১৫ বছর বয়সের কিশোরের চোখে সে প্রত্যয় স্পষ্ট। আর তাই নিজের জীবন উৎসর্গ করছে উপার্জনের মধ্য দিয়ে।

 

ছোট বোন পড়ে পঞ্চম শ্রেনীতে আর ছোট ভাইটি তৃতীয় শ্রেনীতে। তাদের পড়াশুনা চালিয়ে নিয়ে যেয়ে নিজের স্বপ্ন তাদের মাঝে রুপ দিতে চায় তুহিন। এখানে  সে কাজ করছে এক বছর  যাবৎ। মাসিক ছয় হাজার টাকা বেতন এবং থাকা খাওয়ার সুবিধাসহ এখানে কর্মরত সে। মাস শেষে পুরো টাকাই পাঠিয়ে দেয় বাড়িতে। যেন ভাইবোন পড়াশুনা করতে পারে, দু মুঠো খেতে পারে।

জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে-

 

– নিজে কেন পড়াশুনা বাদ দিয়েছো?

 

“আমি পড়াশুনা করতে চাইলে ভাই বোন দুইডা আর আমি কেউই পড়তে পারতাম না।”

 

– তুমি এভাবেই পড়াশুনা না শিখে নিজের জীবনকে নষ্ট করতে চাও?

 

“ভাই বোন পড়াশুনা শিখুক। তাতেই আমি খুশি।”

 

– যদি কাজের ফাঁকে পড়ার সুযোগ পাও কি করবে?

 

“তাহলে অবশ্যই পড়বো।”

 

শেষের প্রশ্নের উত্তরটা খুব জোরালো ছিল। কাজের ফাঁকে পড়ার সুযোগ পেলে সে অবশ্যই পড়তে চায়।

অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি ছেলেটি সর্বদা হাস্যোজ্জল এবং সাবলীল। তবে অগভীর নয়। এমন ইচ্ছাশক্তি, ত্যাগ আর মানবিকতা রয়েছে যার মধ্যে তার জন্য কি সমাজ কাজের ফাঁকে পড়াশুনার সুযোগ তৈরী করে দিতে পারেনা?

 

এমন তুহিন আশেপাশে আরো রয়েছে। এই তুহিনরাই কি সমাজের সম্পদ নয়? না বুঝেই তারা পরিবার থেকে শুরু করে সমাজে বিশাল অবদান রেখে চলেছে।

 

আমাদের নগরগুলোতে যদি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর একটি করে কিশোর শ্রমিকদের জন্য বিদ্যালয় থাকতো আর দুটো করে শিফট এর ব্যবস্হা থাকতো তবে দিনে শ্রম দেওয়া কিশোর কিশোরী সন্ধ্যায় এবং সন্ধ্যায় শ্রম যাদের দিতে হয় তারা দিনে পড়াশুনা করে যোগ্য মানব সম্পদ হতে পারতো।

 

 

ছবিঃ সংগৃহীত