অগ্নিকান্ড; এক ভয়াবহ বিভীষিকার নাম - প্রিয়লেখা

অগ্নিকান্ড; এক ভয়াবহ বিভীষিকার নাম

Milky Reza (Editor)
Published: August 17, 2019
আগুন! সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আতঙ্কের শীর্ষে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে, পঙ্গু হয়ে পড়েছেন কেউ কেউ, জনজীবন ও সাধারণ দিনযাপন ব্যহত হচ্ছে প্রতিনিয়তই । আর মানসিক দিক দিয়ে শঙ্কাগ্রস্হ রয়েছে সাধারণ মানুষ, কখন যে কোন ভবনটি অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় তা কারো জানা নেই। তবে সম্ভাবনা রয়েছে অধিকাংশ নির্মানের ক্ষেত্রেই। কারণ, অধিকাংশ নির্মানই বিল্ডিং কোড বা ইমারত আইন  মেনে করা হয়না।
কিন্তু এই আতঙ্কে আর কয়দিন? সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, জানতে হবে আগুন প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের উপায়সমূহ।
 আগুন প্রতিরোধের জন্য যা করা যেতে পারে-
আমরা জানি যে আগুনের জন্য তিনটি জিনিসের একসঙ্গে থাকার দরকার হয়—জ্বালানি, বাতাস বা অক্সিজেন ও তাপ। কিন্তু এই তিনটি জিনিস একত্র হলেও আগুন জ্বলবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এই মিশ্রণে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি না হয় (ইগনিশন)। সুতরাং-
১ঃ ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধের উপায় হতে পারে তাপ উৎপাদনকারী ও উন্মুক্ত অগ্নিশিখা তৈরি করে এমন যন্ত্রপাতি সাবধানে রাখা।
২ঃ তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, যেন কোনো দাহ্য পদার্থ বা সূক্ষ্ম বস্তুকণা এই তাপের সংস্পর্শে না আসতে পারে, সেদিকে নজর রাখা।
৩ঃ ভবনে যেন কোনোভাবেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তৈরি না হয়, সেটা নিশ্চিত করা।
অবাঞ্ছিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের একটা বড় উৎস হলো ভবনের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটিযুক্ত নকশা, স্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা।
প্রায় ৭৫ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী এই অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ বিতরন ব্যবস্হা।
এক্ষেত্রে অপেশাদারী এবং অদক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্হা স্হাপণ ও রক্ষনাবেক্ষন,দেশের ভবনগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার মূল কারণ।
৪ঃ ইমারত বিধিমালার নির্দেশনার অনুসরণে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের
দ্বারা ভবনের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার নকশা বা পরিকল্পনা, স্থাপন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।
ভবনের অগ্নি-সুরক্ষাব্যবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
সক্রিয় ব্যবস্থা (অ্যাকটিভ সিস্টেম) ও নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা (প্যাসিভ সিস্টেম)।
ব্যাখ্যা-
১ঃ সক্রিয় ব্যবস্থার একটি স্বয়ংক্রিয়, অন্যটি অস্বয়ংক্রিয় (ম্যানুয়াল)। ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম বা অগ্নিশনাক্তকরণ ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় ও ম্যানুয়াল উভয় কৌশল থাকে। পুরো অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থায় তাপ শনাক্তকরণ, ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকতে হয়। এসব যন্ত্রের সাহায্যে অগ্নিকাণ্ডের একদম শুরুতেই তা শনাক্ত করে সতর্কসংকেত (অ্যালার্ম) দেওয়া হয় যেন ভবন ব্যবহারকারীরা অগ্নিকাণ্ডের শুরুতেই ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
২ঃ অসক্রিয় ব্যবস্হা হলো ভবনের এমন কিছু নির্মাণ বৈশিষ্ট্য, যা আগুনের বিস্তার রোধ করবে এবং ধোঁয়ার প্রভাবমুক্ত অবস্থায় বাসিন্দাদের নিরাপদ নির্গমন নিশ্চিত করবে। উল্লেখ্য, সারা পৃথিবীতেই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের ৭০ শতাংশের মৃত্যু ঘটে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে।
একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অগ্নিকাণ্ডের পরেও যাতে ভবনটি কাঠামোগতভাবে অন্ততপক্ষে কয়েক ঘণ্টা টিকে থাকে ইত্যাদি নিশ্চিত করা হয় অসক্রিয় ব্যবস্থার দ্বারা।
আগুন প্রতিকারের উপায়সমূহঃ
যেহেতু অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের সব কারণ শতভাগ দূর করা সম্ভব নয়, সেহেতু আগুন লেগে গেলে তা থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে সবার আগে।
একটু খরচ করে হলেও কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপন করলে তা যেমন আগুন নেভানো সম্ভব তেমন বহু মূল্যবান জানমালের নিরাপত্তা বিধানও সম্ভব। এ ধরনের কিছু যন্ত্রপাতির কথা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১ঃ ফায়ার স্প্রিংকলার- স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটায়ঃ
আগুন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেভানোর জন্য এ যন্ত্রটি সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়। অত্যন্ত কার্যকর এ যন্ত্রটি ব্যবহার করে প্রতি বছর বহু অগ্নিকাণ্ড রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। যদিও প্রাথমিক অবস্থায় বিপণী বিতান ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় এটি স্থাপন করা একটু ব্যয়সাধ্য। তবে একবার স্থাপন হয়ে গেলে তা অত্যন্ত কার্যকরভাবে আগুন নেভাতে পারে।
কোথাও আগুন লেগে গেলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলেও রাস্তায় জ্যামসহ নানা কারণে তাদের আসতে সময় রাগে। এরপর পাইপ স্থাপন করে কাজ শুরু করতেও কিছুটা সময় নষ্ট হয়। আর এ সময়ের মধ্যে প্রায়ই আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কিন্তু স্প্রিংকলার এসব ঝামেলা থেকে দূরে রাখে।
এটি মূলত পানির পাইপের নেটওয়ার্ক ও তার স্থানে স্থানে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় পানি ছেটানোর ব্যবস্থা। স্প্রিংকলারের কাজ পানি ছিটানো। বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনার স্থানে স্থানে স্প্রিংকলার বসানো থাকে। কোথাও আগুন লেগে গেলে এ স্প্রিংকলারগুলোর মুখের সংবেদনশীল অংশটি মুক্ত হয়ে যায়। ফলে তা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটানো শুরু হয়। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই।
বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রায়ই পানির সংকটের কথা জানা যায়। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে খুব বেশি পানি থাকে না। কয়েক মিনিটেই এ পানি শেষ হয়ে যায়। আর তাই প্রয়োজন হয়  অগ্নিকাণ্ডের কাছাকাছি স্থানে পানির ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত হয় ফায়ার হাইড্রেন্ট। এটি মূলত একটি পানির সংরক্ষণাগারের সঙ্গে সংযুক্ত আগুন নেভানোর জন্য পানির ব্যবস্থা। এখানে উচ্চচাপে পানি সংরক্ষিত হয়। ফলে কাছাকাছি কোথাও আগুন লাগলে এ পয়েন্টে পাইপ লাগিয়ে অগ্নি নির্বাপকরা সহজেই আগুন নেভান। বাংলাদেশে এখনো ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন শুরু না হলেও এ ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।
২ঃ ফায়ার এস্কেপ-এর জন্য ভবনের উভয় পার্শ্বে প্রশস্ত সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন, যেন অগ্নি দুর্ঘটনায় দ্রুত বের হওয়া যায়।
৩ঃ পর্যাপ্ত সংখ্যক ফায়ার এক্সটিংগুইসার থাকা প্রয়োজন, যেন প্রাথমিক অবস্থাতেই দ্রুত আগুন নিভিয়ে ফেলা যায়।
৪ঃ ফায়ার হাইড্রেন্ট বা স্প্রিংকলার স্প্রে সিস্টেম থাকা প্রয়োজন, যেন বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডও সহজে নির্বাপণ করা যায়।
৫ঃ ফায়ার পাম্প ও জকি পাম্প থাকা প্রয়োজন যেন ফায়ার হাইড্রেন্ট-এ পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
৬ঃ ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশের জন্য প্রশস্ত রাস্তা থাকা প্রয়োজন, যেন ফায়ার সার্ভিসের লোকজন অগ্নি নির্বাপণে সহায়তা করতে পারেন।
৭ঃ ভবনের ফ্লোরগুলোতে নির্গমন পথ প্রদর্শক চিহ্ন থাকা প্রয়োজন, যেন অন্ধকারেও নির্গমন পথ চেনা যায়।
৮ঃ ভবনের নক্সা প্রবেশ পথে রাখা প্রয়োজন, যেন নবাগতরা আগমন-নির্গমন পথের অবস্থান বুঝতে পারেন।
৯ঃ  ফায়ার লিফট থাকা প্রয়োজন, যেন অগ্নি দুর্ঘটনার সময় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা যায়।
১০ঃ ফায়ার রিফিউজ এরিয়া থাকা প্রয়োজন, যেন অগ্নি দুর্ঘটনার সময় কাছাকাছি অবস্থানে নিরাপদ আশ্রয় নেয়া যায়।
১১ঃ অটো ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম থাকা প্রয়োজন, যেন দুর্ঘটনার বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ণীত হয়।
১২ঃ অটো ফায়ার এলার্মিং সিস্টেম থাকা প্রয়োজন, অগ্নি দুর্ঘটনার বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ণীত হওয়ার পর যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপদ সংকেত বাজতে থাকে।
কিছু সতর্কতা সর্বদা মেনে চলুন:
বাংলাদেশে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, ফ্যাক্টরি সবক্ষেত্রেই আগুন মোকাবেলায় পূর্ব প্রস্তুতি এবং তড়িৎ পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা যায়। তাই অনাকাঙ্খিত দূর্ঘটনা থেকে বাঁচার জন্য কিছু নির্দেশনা মেনে চলুন-
১. অগ্নি প্রতিরোধে সচেতন হোন।
২. রান্নার পর চুলার আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলুন।
৩. বিড়ি-সিগারেটের জলন্ত অংশ নিভিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেলুন।
৪. ছোট ছেলেমেয়েদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে বিরত রাখুন।
৫. খোলা বাতির ব্যবহার কমিয়ে দিন।
৬. ক্রটিযুক্ত বা নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার, ফিটিংস ও সরঞ্জাম ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
৭. বাসায়, অফিসে বৈদুতিক তার ও ওয়ারিং মাঝে মাঝে অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান দ্বারা পরীক্ষা করাতে হবে।
৮. সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড মোকাবেলায় হাতের কাছে সব সময় দু’বালতি পানি বা বালু মজুদ রাখুন।
৯. বাসগৃহ, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি নির্বাপনী যন্ত্রপাতি স্থাপন করুন এবং মাঝে মাঝে সেগুলির কার্যকারিতা পরীক্ষা করুন।
১০. প্রতিটি শিল্পকারখানায়, সরকারি ও বেসরকারি ভবনে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপন আইন ও বিধি অনুযায়ী অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করুন।
১১. কলকারখানায় অগ্নি নির্বাপণের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখুন।
১২. গুদাম বা কারখানায় ধুমপান নিষিদ্ধ করুন ও দৃশ্যমান স্থানে সতর্কীকরণ পোষ্টার প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিন।
১৩. ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হতে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপন বিষয়ক মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহন করুন।
১৪. স্থানীয়ভাবে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপনের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলুন।
১৫. যে সকল কারণে অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হয় সে সব কারণ থেকে সাবধানতা অবলম্বন করুন।
১৬. আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের সেবা চাইতে ৯৯৯ নম্বরে কল করুন। নম্বরটি প্রয়োজনীয় সব স্থানে লিখে রাখুন। শুধু অগ্নিকাণ্ড নয়, ফায়ার সার্ভিস আরো নানা ধরনের সেবা প্রদান করে থাকে। যেমন সড়ক দুর্ঘটনা, নৌ দুর্ঘটনা, আটকে পড়া মানুষ বা পশু-পাখি উদ্ধার।
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস