পতিতাবৃত্তি বন্ধে আপনার আমার করণীয় রয়েছে - প্রিয়লেখা

পতিতাবৃত্তি বন্ধে আপনার আমার করণীয় রয়েছে

Milky Reza (Editor)
Published: August 15, 2019

ঘুম চোখ খুলেই একটা বুকভরা নিঃশ্বাস নিতেই আমরা সবাই পছন্দ করি। একটু স্নিগ্ধতা বা খোলা বাতাস আশা করি। তবে সে নিঃশ্বাস যদি নিতে হয় চোখ খুলেই কোন বড় পঁচা দর্গন্ধযুক্ত ডাস্টবিনের সামনে? দরজা খুলে আড়মোড়া ভাঙে কোন মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাকের পাশে?
আর যদি এমনটি হয় যে সারারাত নিজেকে বিকিয়ে সকালে এমন পরিবেশে নিজেকে আবিষ্কার করা যেখানে নেই কোথাও শান্তির ছোঁয়া। তাহলে ঘুমের মাঝে স্বপ্নের অবাস্তব সাময়িক সুখটাও পাওয়া হলোনা। হ্যাঁ, ঢাকা শহরের তথাকথিক ডাস্টবিন, আবর্জনা বা মানবেতর জীবন-যাপনের কথা বলছিনা।
বলছি তারও ভিতরের কিছু গল্প।
রাস্তার ধারের পতিতাদের গল্প। ঢাকা শহরের ময়লা, আবর্জনা, ডাস্টবিন, মিউনিসিপ্যালিটির সাদা ট্রাক সবকিছুর সাথে এক সূত্রেই গাঁথা এসব রাস্তার ধারের পতিতাদের গল্প।
ডাস্টবিনের ধারে যেসব ঝুপড়ি ঘর থাকে, তাদের কষ্টের গল্প থাকে তার সাথেই মিশে থাকে এসব ঘরের মেয়েদের পতিতাবৃত্তির চর্চা। ঠিক চর্চা নয়, বাস্তবতা।
ঢাকার ফকিরাপুল, কাকরাইল, ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী এলাকায় বসবাস তাদের। পরিবারের সাথে বা পরিবার ছাড়াই। সন্ধ্যাবেলায় তাদের দেখা যায় অবলিলায় দাঁড়িয়ে থাকতে রাস্তার পাশে। হয়তো ২০, ৫০ অথবা সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় তারা বিকিয়ে দেয় নিজেকে। যেমন তারা নিজেরা তেমনই তাদের প্রার্থীসকল। হয়তো তারাও খেঁটে খাওয়া সামান্য রোজগারের মানুষ। দিনশেষে ফিরে আসে পতিতার দ্বারে। আর এসব মেয়েরাও দিনশেষে ছোটে জীবিকার দায়ে। না, ঠিক জীবিকা নয়, জীবনের দায়ে। ইচ্ছাকৃত এই পথে আসে না সবাই। তবে যে পরিবেশ বা সমাজে তাদের বসবাস তাদের মূল্যবোধ বা চিন্তার সীমাবদ্ধতা এ পর্যন্তই। হয়তো নিজেদের সমাজেই একজন পুরুষ আরেকজন নারীকে এই চরিত্রের বাইরে কল্পনা করতে জানেনা। তারা শেখেনি। আর তাই পরিচিত জনের মাধ্যমেই নিজেকে হারানো শুরু করে এসব নারীরা। সম্মান কি বিষয় হয়তো জানাই হয়নি।
আবার অনেকে কাজের খোঁজে বাইরে কারো কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যবহৃত হয় তার দ্বারা, কারণ এই শ্রেনীটার প্রতি ঠিক এমনটিই দৃষ্টিভঙ্গী সবার। ওদের জামা খুললে কি হবে? তারাতো থাকেই ডাস্টবিনের ধারে। কিইবা রয়েছে যে হারাবে?
তখন ধীরে ধীরে এটিই হয়ে ওঠে পেশা। অগত্যা, ধরেই যখন রাখা সম্ভব নয়, বেচেই নাহয় পেট চলুক!
কাকরাইলে কথা বলেছিলাম এমন এক নারীর সঙ্গে। সাবলীল ছিলেন না তিনি নিজের কথা বলতে, অবশেষে রাজি হলেন।
নাম পরিচয় না প্রকাশের শর্তে।

-আপনার থাকার জায়গার পরিবেশ কেমন?

তিনি: ডাস্টবিনের ধারে ছালার ঘর।

-কয়জন থাকেন?

তিনি: আমি, আমার ছোড দুই ভাই বোন। বাপ, মা।

-একই ঘরে?

তিনি: জ্বি।

-এ পথে কেন এসেছেন?

তিনি: অভাবে।

-নিজের ইচ্ছায় শুরু করেছেন?

তিনি: কারোকি নিজের ইচ্ছে থাকে এইসব করার?

-সতীত্ব হারিয়েছেন এভাবেই নাকি নিজের ইচ্ছায় অন্য কারো কাছে?

তিনি: আমাদের পাশেরই এক ছেলে।

-স্বেচ্ছায়?

তিনি: জ্বি। অয় কইছিলো।

-তারপরেই এই পথ বেছে নিয়েছেন?

তিনি: জ্বি।

-আপনার আশেপাশে এমন আরো কেউ আছে?

তিনি: ম্যালা আছে।

-বান্ধবী আছে আপনার?

তিনি: জ্বি আছে।

-তারাও কি  এই কাজ করে?

তিনি: জ্বি।

-গল্প গুজবে ভালো সময় কাটান আপনারা?

তিনি: জ্বি, মাঝে মাঝে।

-এই কাজ কি সন্ধ্যায় করেন?

তিনি: পারলে সারারাত করি।

-কেমন টাকা পেয়ে থাকেন?

তিনি: ম্যালা কম। ১০০ টাকার বেশী না।

-এ টাকা কাউকে দিতে হয়?

তিনি: জ্বি, বাসায় দেওয়া লাগে।

-এ টাকা ছাড়া কি চলবে না?

তিনি: জ্বি না। আমার আব্বা কাজ করতে পারেনা।

-মূলত কাদের সাথে এই যোগাযোগগুলো হয় আপনার?

তিনি: লেবার, বস্তির লোকজন।

-কোথাও যেতে হয়?

তিনি: জ্বি, আশেপাশে ঝুপড়ি ঘরে। নাইলে বস্তিতে।

-পুলিশ এর রেইড বা অন্য কোন সমস্যা হয়না?

তিনি: জ্বি না। খুব কম। নিজেরা যেইহানে থাহে ওইহানে নিয়ে যায়।

-সকালে বা দিনে কি করেন?

তিনি: ফুল দিয়ে মালা বানায় রাস্তায় গাড়িতে বেঁচি।

-তাতে কেমন ইনকাম আসে?

তিনি: মাঝে মাঝে টাকা অয়  মাঝে মাঝে অয়না।

-ঘুমান কখন?

তিনি: দিনে।

-বাবা, মা জানেন এসব?

তিনি: জ্বি।

-তারা কখনো নিষেধ করেছে?

তিনি: না,গালাগালি করে। খানকি কয়। মানা করেনা।

-কতদিন এমন চলছে?

তিনি: দুই বছর।

-কোন ধরণের শারীরিক সমস্যা অনুভব করেন না?

তিনি: মাঝে মাঝে করি।

-কোন এন-জি-ও কর্মী কি আপনাদের পরামর্শ দিতে আসেন?

তিনি: জ্বি না।

-এভাবেই কি সারাজীবন কাটানোর ইচ্ছা?

তিনি: কারো কি ইচ্ছা থাহে? আর কি করবো? কিছু আর করার নাই।

-কোন ইচ্ছা আছে এসব বাদ দিয়ে অন্যকিছু করার?

তিনি: “না”

তার এই “না” এর মাঝে অনেক না বলা কথা শুনতে পেলাম। কোন লাভ বা উন্নতি নয়, জীবন-যাপন ঠিক নয়, কোন হারানো নয় বা কোন পাওয়া নয়, কেবলি বেঁচে থাকা। কেবলি বেঁচে থাকার জন্য এই সংগ্রাম। সংগ্রাম করে কোথাও পৌছানোর বাসনা করবার সাহস ও তাদের নেই। পতিতাবৃত্তি তাদের পেশা নয়, তাদের বাস্তবতা। তারা বাধ্য।
তারা তাদের ব্যথা কারো কাছে বলতে যায়না, কেবলি মুখ বুজে গঞ্জনা শুনে যায়। কারণ তারাও জানে যারা গঞ্জনা দেয় তারাও জানেনা এদের সত্য কত কঠিন।
এসবের জন্য কে দায়ী? তাদের গঞ্জনা দেওয়ার আগে দেশের প্রেক্ষাপট কি কেউ ভেবে দেখেছি?
বাংলাদেশের মতো দেশে বেকারদের কাজের সুযোগ দেবার ক্ষেত্র খুবই কম, এদের কাজ দিতে পারলে নিশ্চই পতিতাবৃত্তি বেছে নিতেন না।
সুতরাং, বাংলাদেশের কানাচে, ডাস্টবিনের পাশে, অন্ধকারে গাছের আড়ালে এমন পতিতাদের কথা উঠে আসুক গুরুত্ব সহকারে। অনেক সমস্যার আড়ালে এসব সমস্যা ঢাকা পড়ে। অথচ এই সমস্যা থেকেই অন্য অনেক সমস্যার জন্ম। উদ্বাস্ত শিশু, অধিক হারে অনাকাঙ্খিত শিশু যাদের ভরণপোষনের কেউ থাকেনা, তাদের জন্ম এসব পতিতাদের গর্ভে। বড় হয়ে তারাও জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতে। তাছাড়া অপরিচ্ছন্ন যৌন মিলনের ফলে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে যৌন ব্যধী যা আবার এসব পতিতাই বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এবং পুনরায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এসব সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে এসব সমস্যা উৎপন্ন হবার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হোক যেটি কিনা রাস্তার ধারে পতিতাবৃত্তি।
আর তাদের কর্মসংস্হানের ব্যবস্হা করে এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হোক।