একজন অদম্য মাইশা সবার অনুপ্রেরনা - প্রিয়লেখা

একজন অদম্য মাইশা সবার অনুপ্রেরনা

Milky Reza (Editor)
Published: July 27, 2019

হারমোনিকা (মাউথ অর্গান) বাজাতে ভীষণ ভালোবাসে মাইশা। রয়েছে বিশেষ পারদর্শীতা। সঙ্গে অন্যান্য বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গবেষণা রয়েছে তার। মাইশা মরিয়ম সৈয়দ, শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমেই আগ্রহ এবং চর্চা তার। একজন ভালো বক্তা, উপস্থিত বক্তৃতায় দেশ সেরা হবার স্বর্ণপদকসহ অনেক স্বীকৃতি রয়েছে তার ঝুলিতে।

 

এছাড়াও সে একজন আবৃত্তিকার, উপস্থাপক, সঙ্গীতশিল্পী, লেখিকা, গীতিকার, হারমোনি বিশেষজ্ঞ এবং ছড়াকার। তার কথায় কথায় ছড়া কাটতে পারার স্বভাব যোগ্যতা সবাইকে মুগ্ধ করে। সহজ কথা যায়না বলা সহজে- হ্যা, ছড়ায় ছড়ায় সহজ করে গভীর অর্থ প্রকাশের প্রবণতা তার মধ্যে রয়েছে যা সচরাচর সবার থাকেনা।

 

অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি মানুষটি তার শারিরীক প্রতিবন্ধকতা কীভাবে জয় করেছে!  মাইশা মরিয়মের কথা মনে পড়লেই মনে পড়ে এক অতিমাত্রায় মেধাবী, প্রগতিশীল এবং মুক্তমনা নারীর কথা। সাদা মনের মানুষের কথা। একজন লেখিকা এবং চিন্তাবিদের কথা। কখনোই মনে পড়েনা তার শারিরীক প্রতিবন্ধকতার কথা।

 

হ্যা, জন্মগত শারিরীক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এই নারীর। তবে তার সব গুণ, যোগ্যতা এবং চর্চা ছাপিয়ে গেছে সবকিছু। ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্রী মাইশা মরিয়ম। মা একজন ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপিকা, বাবা রাজশাহী শহরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী । ছোট ভাই রয়েছে মাইশার, সেও সঙ্গীত চর্চা করে। সবমিলে ছোট, সুখী এবং শৈল্পিক পরিবার তার। রাজশাহীতেই বসবাস। তবে মাইশার চর্চা রাজশাহীর গন্ডী পেরিয়ে সবকূল ছাপিয়ে যায়।

 

বন্ধুদের ভীষণ প্রিয় মাইশা। আড্ডা, শিল্প, বন্ধু এবং যত ইতিবাচক চিন্তায় দিন কাটে তার। জয় করেছে দেশের অনেক গন্যমান্য শিল্পীদের হৃদয়। সে স্বপ্ন দেখে একটি প্রগতিশীল সমাজের। আর তার লেখনি ও চিন্তারা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে দেশের স্বার্থে।

 

মাইশা মরিয়ম সায়েদ একজন অনুপ্রেরণা, একজন শক্তি এবং একজন দৃষ্টান্ত। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দোহাই দিয়ে বিষন্নতা উদযাপন করে না যে, বিষন্নতা ছড়িয়ে দেয় না যে, কেবল ছড়িয়ে দেয় স্বপ্ন। শেখায় কোন বাঁধাই বাঁধা নয়। কোন ব্যথাই বিলাসিতা নয়। বরং শক্তি।

 

মাইশা আজ দেশের কাছে কেবলই মেধাবী মাইশা হিসেবে পরিচিত; আর কিছু নয়। আর এটিই তার অর্জন। মাইশা মরিয়ম একজন শিক্ষা। আর তার পরিবার তো বটেই। তার গুণগুলোকে সম্মানিত করেছে তারা, আর উৎসাহ দিয়ে চলেছে। তাই অনেক কিছুই শেখার রয়েছে এই পরিবারটির কাছ থেকে। ইতিবাচক চিন্তাই পারে সব বাঁধা দূর করতে।

কথা বলেছি মাইশা মরিয়মের সাথে। জেনে নিয়েছি তার কিছু অভিব্যক্তি।

#আপনার অনুপ্রেরণা কে?

 

শুধু একজনকে বেছে নেয়াটা মুশকিল। একেকজনের একেকটা কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হই। ছোটবেলা থেকে মাকে দেখছি একসাথে সংসার, চাকরি, পারিবারিক জীবন, শখ, সব সামাল দিতে। এটা দেখে মনে মনে ভাবতাম আমিও ওরকম হবো। বাবাকে দেখেছি সবসময় নিজের আগে অন্যদের কথা ভাবতে। কেউ কোনো দরকারে বাবার কাছে সাহায্য চাইলে তাকে আজ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়নি, তা সে ঘোর শত্রু হলেও। এটা আমি নিজের জীবনে প্রতিফলন করার চেষ্টা করি খুব। আর যদি উৎসাহদাতার কথা বলি, আমার কিছু অদ্ভূত কিসিমের পাগলাটে বন্ধুবান্ধব আছে, একেকজনের একেক দিকে ঝোঁক, আবার সেসবে ভীষণ দক্ষও ওরা। কেউ ভীষণ ভালো আঁকে, কেউ দুর্দান্ত কেক বানায়, কেউ অসম্ভব ভালো ফটোগ্রাফার, কেউ দারুণ লেখে। ওদের দেখে বিভিন্ন বিচিত্ররকমের কাজ করার আইডিয়া পাই। ওরা সবসময় আমার সবরকমের পাগলামিকে প্রশ্রয় দেয়। যখন হতাশাগ্রস্থ হই, ভেঙে পড়ি, ওরা আমাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়। আমার স্বপ্নগুলোকে সত্যি করতে ওরা আমার চেয়েও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ওদের সাথে কাটানো সময় আমার ক্ষেত্রে ওষুধের মত কাজ করে।

মানুষের অনুপ্রেরণা হয় বড় বড় আদর্শ ব্যক্তিবর্গ। আমার কাছে তাদেরকে অনেক দূরের,  অনেক অধরা মনে হয়। আমার অনুপ্রেরণাগুলোকে আমি হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারি, হাত ধরে হাঁটতে পারি ওদের, চাইলেই জড়িয়ে ধরতে পারি,  যখন তখন ফোন করে বক বক করতে পারি, একসাথে উদ্দেশ্যহীনভাবে বেরিয়ে পড়তে পারি কোথাও। আমার চালিকাশক্তি ওরাই। আমার অক্সিজেন।

 

#কবে থেকে হারমোনিকা শুরু?

 

দিন-তারিখের হিসেব করতে হলে বলবো, ২০০০ সালের ১ অক্টোবর থেকে।  আমার ৫ বছরের জন্মদিনে বাবা একটা খেলনা হার্মোনিকা কিনে দিয়েছিলো। তারপর অনেকদিন পর্যন্ত ওটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলনা ছিলো। তখন গানটান কিচ্ছু শিখিনি, এমনিই ওটায় ফুঁ দিতে দিতে কখন যেন আশেপাশের বিভিন্ন আওয়াজ, কলিংবেলের আওয়াজ, টিভিতে শোনা গানের সুর, ইত্যাদি নকল করতে শুরু করি। এটা যে একটা ইন্সট্রুমেন্ট, আর আমি যে সেটাকে বাজাচ্ছি, তা আমি তখনো বুঝিনি। আমার কাছে ওটা একটা খেলা ছিলো।

 

#হারমোনিকাই কেন?

 

যে বয়সে আমি প্রথম হার্মোনিকা হাতে পাই, ঐ বয়সী একটা বাচ্চাকে যেকোনো ইন্সট্রুমেন্ট এমনকি আঁকার সরঞ্জাম দিলেও তার কাছে ওটা খেলনাই মনে হবে। আমার কাছেও ওটা খেলনাই ছিলো। ঐ সময়ে খেলতে খেলতে জিনিসটার সাথে যে সখ্যতা গড়ে উঠেছে, বড় হয়ে যদি সিরিয়াস ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে হার্মোনিকা শিখতে যেতাম তাহলে বোধহয় ততটা সহজে ব্যাপারটা হত না। এখন আমি আরও কয়েকটা ইন্সট্রুমেন্ট বাজাই, মানে চেষ্টা করি আরকি। বাজাতে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, হার্মোনিকার মেকানিজম আমার শেখা অন্যান্য প্রায় সব ইন্সট্রুমেন্টের চাইতে অপেক্ষাকৃত সহজ। আক্ষরিক অর্থেই একদম শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার মতই সহজ। শুধু দম নিতে হয়, আর ছাড়তে হয়। এই দম টানা আর ছাড়া দিয়ে পরবর্তীতে কী করা যায়, সেটা যে যত ভালো বুঝবে সে ততই ভালো বাজাবে। আর তাছাড়া, আমার প্রথম বন্ধু আমার হার্মোনিকা। হয়তো সেজন্যই। কোনো যন্ত্র বাজাতে চাইলে সবার আগে সেটাকে বন্ধু করে নিতে হবে তো। তাহলেই শেখা সহজ হবে। আমি সবসময় বলি, If you want to play an instrument, learn to play with it first. বাদ্যযন্ত্র সবার আগে একটা খেলনা, একটা বন্ধু। এটা শুধু হার্মোনিকা নয়, সব বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

 

#কখনো কি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন?

 

কোনো কোনো ক্ষেত্রে underestimated হয়েছি। আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা দেখে হয়তো সবাই ভেবেছে আমি এই কাজটা পারবো না, আর আমি সেইটাই তাদের চোখের সামনে করে ফেলে তাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছি। এটা করতে মজা লাগে খুব। স্কুলে থাকতে কখনো কখনো bullying-এর শিকার হতাম, তবে আমার বন্ধুরা জানতে পারলে যে আমার পেছনে লাগতো তার আর রক্ষা ছিলো না। ইদানিং ফ্রিল্যান্সিং করতে গিয়ে মেয়ে হওয়ার কারণে অনেকের নাক সিঁটকানো দেখতে হয়, তারপর যখন তারা দেখে আমি আর দশটা পুরুষ কলিগের মতই প্রফেশনালিজমের সাথে কাজ হ্যান্ডল করছি তখন তারা ঢোঁকটোক গিলে চুপ করে যায়। এটাও এঞ্জয় করি খুব। এখনো সেভাবে বৈষম্য করার সুযোগ পায়নি কেউ আমার সাথে।

 

#লেখালিখির বিষয়বস্তু কেমন থাকে সাধারণত?

 

আমি খুব আয়োজন করে লিখি না। যখন যে ব্যাপারটা আমাকে নাড়া দেয়, বা মনে হয় এটা নিয়ে একটু কথা হওয়া দরকার, তখন সেটা নিয়েই লিখি। সেটা গানবাজনা হতে পারে, বঞ্চিত মানুষের অধিকার হতে পারে, পরিবেশ সংরক্ষণ হতে পারে, নতুন পড়া কোনো বই হতে পারে, বা আর যেকোনোকিছু। এছাড়া ছড়া, কবিতা, লিরিক এগুলো তো প্রায়ই লেখা হয়। খুব যে ভেবে লিখি তাও নয়। লেখাকে লেখার প্রবাহে চলতে দিই। প্রিয় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছিলেন, “Poetry is the spontaneous overflow of powerful feeling.”, আমি মনে করি কথাটা সবধরণের লেখার বেলাতেই খাটে।

 

#এ পর্যন্ত কী কী সম্মাননা পেয়েছেন?

 

এভাবে গুণে গুণে হিসেব করা হয়নি কখনো। সবচেয়ে প্রথম বোধহয় পেয়েছিলাম ক্লাস টু তে। তখন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তাম। কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে YLE (Young Learners’ Examination) নামে স্কুল ভিত্তিক একটা প্রতিযোগিতা হত ইংরেজি ভাষার উপরে দক্ষতা নিয়ে। তিনটা গ্রুপ ছিলো ওটার, Starters, Movers, Flyers। আমি Starters গ্রুপে পরীক্ষাটা দিয়েছিলাম। সারা বাংলাদেশে ফার্স্ট হয়েছিলাম।

এরপর স্কুল কলেজে ছোট-বড় টুকটাক প্রাইজ পেয়েছি, কখনো গানের জন্য, কখনো লেখার জন্য, কখনো উপস্থিত বক্তৃতায় কখনোবা বিতর্কে। ২০১১ তে ক্লাস নাইনে থাকতে রবি এবং ডেইলি স্টার আয়োজিত স্কুলভিত্তিক ন্যাশনাল ইংলিশ ফেস্টে আবার প্রথম হই। ২০১৬ তে প্রথম বর্ষে পড়াকালীন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক পাই। ২০১৮ তে ইন্ডিয়ান মাউথঅর্গান প্লেয়ার্সের আয়োজনে কলকাতায় হার্মোনিকা মিটআপে প্রথম বাংলাদেশী ডেলিগেট হিসেবে পারফর্ম করেছি, বিদেশের মাটিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারা, সেটাও আমার জন্য একটা সম্মাননা। এ বছর মে মাসে ঢাকার প্রাইম অর্কেস্ট্রার আমন্ত্রণে দিনব্যাপি হার্মোনিকার উপরে একটা ওয়ার্কশপ করানোর স্বীকৃতিস্বরূপ একটা সম্মাননা সনদ পেয়েছি।

 

#দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাটা কি?

 

এদেশে জন্মেছি, এখানকার জল-হাওয়ায় বড় হয়েছি, স্বাভাবিকভাবেই আমার পারিপার্শ্বিককে আরও সুন্দর, সবার জন্য আরও বসবাসযোগ্য করে তোলার একটা তাগিদ আমার থাকবেই। এই দেশটা আমাকে খুব সুন্দর একটা শৈশব দিয়েছে। যে শৈশব নতুন গল্পের বইয়ের ঘ্রাণের, রং পেন্সিলের, ভোরবেলা সূর্য ওঠার সাথে সাথে ভৈরবী রাগের বন্দিশের, ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে ছোটরা একসাথে মাঠে হুটোপুটি করে খেলার, সন্ধ্যায় মাগরিবের আজান আর মন্দিরের শাঁখের আওয়াজ মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়ার। বিশেষ করে আমার শহর রাজশাহীর পরিবেশটা এমন ছিলো, যে এখানে বেড়ে উঠেছি বলে নিজেকে এখন ভাগ্যবান মনে হয়। কিন্তু এখন সেই পরিবেশটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এখন ছোটরা আর মাঠে খেলতে যায় না, স্কুলে ক্লাস টু-থ্রি তেও ছেলে আর মেয়ে আলাদা আলাদা বসে, ঈদে আর পূজায় সবাই এক হয়ে আনন্দ করে না। এখনকার বাচ্চারা আর ছবি আঁকে না, গান গায় না, সবাই শুধু পড়াশোনা করে আর নাহলে কম্পিউটার বা ট্যাব নিয়ে বসে থাকে। আমি আমার দেশটাকে আবার আমার শৈশবের সেই সুন্দর, ভেদাভেদহীন, মুক্ত উদার পরিবেশটা ফিরিয়ে দিতে চাই। সেটা হতে পারে সংগীত দিয়ে, হতে পারে লেখালিখি দিয়ে, বা আরও অনেকভাবেই। আমার দেশটাকে আমি আবার নিঃশ্বাস নিতে দেখতে চাই। আমি যাকিছু করি, সব এইজন্যই করি।

#এক নজরে দেশকে কিভাবে দেখতে চান?

 

এককথায়, আমি আমার দেশটাকে আরও accepting হতে দেখতে চাই। আমাদের মাঝে acceptance টা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। সেই জায়গায় এসে ভর করছে উগ্রতা, সংবেদনশীলতা, ঘৃণা। আমি চাই আমার দেশের মানুষগুলো সব ক্ষেত্রেই একে অপরকে যে যেমন, তেমনভাবেই মেনে নিক। কেউ কারোর ক্ষতি না করে যদি কিছুর চর্চা করতে চায়, কাউকে ভালোবাসতে চায়, প্রচলিত কোনোকিছু মানতে চায়, কিংবা না চায়, তাতে যেন কেউ বাধা না দেয়। সহিষ্ণুতা বা সহনশীলতা কথাটার মাঝে ‘সহ্য করা’ ব্যাপারটা আছে। যাতে উপরে উপরে কাজ হলেও, ভেতর থেকে পরিবর্তনটা আসে না। আমি চাই এদেশের মানুষ একে অপরের মতের প্রতি শুধু সহনশীল না, বরং মন থেকে শ্রদ্ধাশীল হোক। আমি চাই কেউ যেন কারোর উপর কিছু চাপিয়ে না দেয়। কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও ফটোগ্রাফার হতে চাইলে সমাজ এবং পরিবার যেন তার স্বপ্নটাকে মেরে না ফেলে, কেউ প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে কাউকে ভালোবাসলে যেন তার ভালোবাসাটাকে পাপ হিসেবে না দেখে। ভালোবাসা কখনো পাপ হতে পারে না। আমি চাই আমার বাংলাদেশে সৌম্য সরকার পুজোর শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে যেন কমেন্টে তাকে গালিগালাজ না করা হয়। যেন শুধু টুপি-দাড়ি থাকার জন্য বা হিজাব পরার জন্য কাউকে জঙ্গী আখ্যা না দেয়া হয়। যেন সকলের বিশ্বাসকে এবং অবিশ্বাসকে সমানভাবে সম্মান করা হয়। লেখকদের যেন প্রাণের ভয়ে কলম বন্ধ করতে না হয়। আমি চাই আমার দেশের মেয়েরা যেন নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় প্রাণখুলে বাঁচতে পারে। যেন পুরুষেরা তাদের ভয়ের নয়, বরং পরম ভরসা আর ভালোবাসার আশ্রয় হয়। আমি চাই আমার বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে অং রাখাইনের ছবি মাই বাইসাইকেল মুক্তি পাক। আমার চাকমা বন্ধুটার ছোট ভাইবোনগুলো স্কুলে ওদের মাতৃভাষাতেই পড়ুক।

এরকমটা যেদিন হবে, সেদিন থেকে আমি utopia কথাটার বদলে সব জায়গায় বাংলাদেশ নামটা ব্যবহার করবো।

 

#আপনি আপনার জায়গা থেকে কীভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন?

 

আমি আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে আগে আমার চারপাশটা বদলানোর চেষ্টা করছি, একটু একটু করে। মানুষজনকে সাংগীতিক শিক্ষা দিয়ে চলেছি তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায়। বেশ কয়েকটা বইপোড়োদের ক্লাবে আছি, তারা কী পড়ছে, কী লিখছে দেখছি, মানুষকে ভালো বই পড়তে, মোটকথা পড়তে উৎসাহ দিচ্ছি। মনের অন্ধকার দূর করার ওটাই সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম।

এছাড়া, রাজশাহীতে বারোভাজা বলে একটা সংগঠনের সাথে আছি। ওখানে সমাজের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে কাজ করছি। তাদের শিক্ষা দিয়ে, কারিগরি দক্ষতায় দক্ষ করে, সব বৈষম্যকে ভেঙে ফেলে সমাজে সম্মানের সাথে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে নেওয়াতে সহযোগিতা করছি। আমার নাগালের মধ্যে যেটুকু পাই, আমি করার চেষ্টা করি।

 

#ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

 

নিজেকে আরও গড়তে হবে। আরও বিষয়ভিত্তিক গবেষণালব্ধ পড়াশোনা দিয়ে, নিজের সংগীতচর্চাটার উপর জোর দিয়ে, লেখালিখিটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে। এখনো অনেক অনেককিছু জানা বাকি, শেখা বাকি, সেসব রপ্ত করতে হবে। তার জন্য যদি সাময়িকভাবে দেশের বাইরেও যেতে হয় যাবো। ফিরবো আরও যোগ্য, আরও অভিজ্ঞ,  আরও দক্ষ হয়ে। যাতে করে আমি যেমন স্বপ্ন দেখি, আমার চারপাশটাকে সেভাবেই বদলে দিতে পারি।

 

#সবার জন্য একটি বার্তা কি থাকবে?

 

কখনো নিজের স্বপ্নগুলোর পিছু ছেড়ো না। সেসব বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে, সময় নাও। স্বপ্নগুলো সত্যি করতে ঠিক যা যা প্রয়োজন, সেসবের জোগাড় করো। নিজেকে নিজের স্বপ্নের কারিগর হিসেবে তৈরি করো। তোমার স্বপ্নটাকেই তোমার বেঁচে থাকার কারণ করে নাও। দেখবে কোনোকিছু তোমাকে থামাতে পারবে না।