বর্ষায় সেজে ওঠা সিলেট - প্রিয়লেখা

বর্ষায় সেজে ওঠা সিলেট

Milky Reza
Published: June 1, 2019
“আবার এসেছে আষাঢ়,
আকাশ ছেয়ে।
এই পুরাতন হৃদয় আমার,
আজি পুলকে উঠিছে নাচি।”
আষাঢ় বা বর্ষা নিয়ে এমন অনেক গান বা কবিতাই রয়েছে কবিগুরু সহ সকল কবিদের। বর্ষা এমনই এক ঋতু।
গ্রীষ্মের পর আসে বর্ষা। গ্রীষ্মের প্রচন্ত তাপদাহ শেষে শীতল বাতাস আর বৃষ্টির ধারা নিয়ে আসে। ক্লান্ত দেহে তখন প্রানের সঞ্চার হয়। প্রকৃতিও তখন সেজে ওঠে নানান রুপে। এছাড়াও বিংশ শতাব্দীর এই যান্ত্রিক শহুরে জীবন, প্রচন্ড ব্যস্ততায় হাঁসফাঁসিয়ে ওঠে প্রান। প্রকৃতির এমন সৌন্দর্যে প্রকৃতিগতভাবেই আমাদেরও আশা জাগে একটু মানসিক প্রশান্তির।
সব মিলিয়ে বর্ষা নিয়ে আসে ভ্রমনের আহ্বান। সে অবশ্যই প্রকৃতির কাছাকাছি। আর সে দিক দিয়ে সিলেট একটি চমৎকার জায়গা হতে পারে। আর বর্ষায় সিলেটের সৌন্দর্য কয়েক গুন বেড়ে যায়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি এই সিলেট। সবুজ চা বাগান, পাহাড়, নদী – ঝর্ণা, টিলা আর দিগন্তজোড়া সবুজ গাছ, নীল আকাশের নিচে অপরুপ মায়াবি আভা সিলেটকে করেছে রুপের রাণী। এ সৌন্দর্য আর নতুন রঙের আল্পনা যেকোনো ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে সিলেটে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। আর বর্ষাকালে সে আহ্বান থাকে কানায় কানায় ভরপুর। হযরত শাহজালাল (র.)-এর পুণ্যভূমি, মরমী কবি হাছন রাজা, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, আলী আমজাদের ঘড়ি আর কিন ব্রিজের স্মৃতিবিজড়িত সিলেট তো প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দেয়ই।
 সাথে সাথে অনুপম সৌন্দর্যে ভরা কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, কোথাও সবুজ ক্ষেত, নিবিড় অরণ্য আবার কোথাও সুউচ্চ পর্বতমালা, দেখে আনমনা হয়ে গেয়ে উঠতেই পারেন-
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না’কো তুমি,
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্ম ভূমি “
দূর থেকে দেখতে পাবেন পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা অসংখ্য ঝর্ণাধারা হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সবুজে  মোড়ানো এই বর্ষায় পাহাড়ি ঝর্ণা আর ডুব পাথরের জলখেলার দৃশ্যে শোভিত অপরূপ প্রকৃতির অপ্সরা বিছানাকান্দি। সামনে চোখে পড়বে অসংখ্য পাথর, মনে হবে – এটি যেন পাথরের বিছানা। সাবধানতার সঙ্গে পাথরের উপর দিয়ে যাবেন, হাঁটতে হাঁটতে দেখবেন ভারতের সীমানা সামনে। মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার শীতল পানিতে ভিজলে মনে হবে পৃথিবীর সব শান্তি যেন এখানে। অথবা জাফলং, বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা তার সৌন্দর্যে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
ঝরনা দেখার দিন হলো বর্ষা। এ সময় পাহাড়ের সৌন্দর্য আরও বাড়ে, বৃষ্টির পানিতে আরও সবুজ হয় তার গাছপালা। আর পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঝরনাগুলোও মেলে ধরে তাদের পূর্ণ রূপ। কালবৈশাখী কিংবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি, যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের বন-বাঁদাড়ের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ঝিরি ঝরনাগুলো এসময় ফুলে-ফেঁপে থাকে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা কিংবা সৌন্দর্য নিয়ে।
মেঘের গুড়ু গুড়ু শব্দ বারবার জানিয়ে দেয় ঝর্ণা দেখার দিন হলো শুরু।
অন্য সময় এই ঝরনা থাকে শুকনো, পায়ে চলা পথের মতো। কিন্তু বর্ষায় সেখান থেকে কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলে সরু স্রোত। তার সে দৃশ্য অপরুপ! বৃষ্টির সময় পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়াটা সব সময়ই উপভোগ্য।
হ্যাঁ, সাথে শখের ক্যামেরাটা নিতে ভুলবেন না!
অবস্থানঃ
ডুব পাথরে জলের বিছানা, বিছানাকান্দিঃ-
বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের রুস্তুমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বিছানাকান্দি সিলেট জেলার নবীনতম ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে এখন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সাদা কালো মেঘের চাদরে ঘেরা চেরাপুঞ্জি আর মেঘালয়ের সবুজ গালিচা পাতা পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রাণবন্ত ঝর্ণার স্রোতস্বিনী জলধারার নিচে বিস্তৃত পাথুরে বিছানায় সজ্জিত অপরূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম বিছানাকান্দি। অনেকের মতে গুচ্ছ গুচ্ছ পাথর বিছানো বলেই এর নাম হয়েছে বিছানাকান্দি।
বিছানাকান্দি মুলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সাতটি সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গমস্থল যেখানে অনেকগুলো ঝরনাধারার পানি একত্রিত হয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশের পিয়াইন নদীতে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সাথে বড় বড় পাথর এসে জমা হয় বিছানাকান্দিতে। পিয়াইন নদীর একটি শাখা পাহাড়ের নীচ দিয়ে চলে গেছে ভোলাগঞ্জের দিকে আর একটি শাখা গেছে পাংতুমাই হয়ে জাফলং এর দিকে।
জাফলং, গোয়াইনঘাট,সিলেটঃ-
জাফলং বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকায়, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সমৃদ্ধ সম্পূর্ণ পাহাড়ী এলাকা যা সবুজ পাহাড়ের অরণ্যে ঘেরা। । এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।
ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাওকি নদী এই জাফলং দিয়ে পিয়াইন নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্ষাকালে ভারতীয় সীমান্তবর্তী শীলং মালভূমির পাহাড়গুলোতে প্রবল বৃষ্টিপাত হলে ঐসব পাহাড় থেকে ডাওকি নদীর প্রবল স্রোত বয়ে আনে বড় বড় গণ্ডশিলা (boulder)। একারণে সিলেট এলাকার জাফলং-এর নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর পাওয়া যায়। আর এই এলাকার মানুষের এক বৃহৎ অংশের জীবিকা গড়ে উঠেছে এই পাথর উত্তোলন ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে।
খাদিমনগর রেইনফরেস্ট, সিলেটঃ-
সিলেট শহর থেকে জাফলং রাস্তা ধরে ১০ কি:মি: এর মতো এগোলেই শাহপরান মাজার গেট পেরুনোর পর পরই খাদিম চৌমোহনা। খাদিম চৌমোহনা থেকে হাতের ডানদিকে চলে গেছে রাস্তা। রাস্তা ধরে সামনে গেলে খাদিমনগর চা বাগানের শুরু। বাগানের রাস্তা ধরে আরেকটু সামনে গেলে একটা কালভার্ট। কালভার্ট পেরিয়ে বামের রাস্তা না ধরে পথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকলে আরো চা বাগান, চা বাগানের পর প্রাকৃতিক বনের হাতছানি।
মুল সড়ক থেকে উত্তরের দিকে পাকা, কাঁচা ও ইট বিছানো পাঁচ কি:মি: পথ পেরুনোর পর খাদিমনগর রেইনফরেস্টের শুরু। পূর্বে ছড়াগাঙ্গ ও হাবিবনগর, পশ্চিমে বরজান ও কালাগুল, উত্তরে গুলনি, দক্ষিনে খাদিমনগর এই ছয়টি চা বাগানের মাঝখানে ১৬৭৩ একর পাহাড় ও প্রাকৃতিক বনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই রেইনফরেস্টটি জাতীয় উদ্যান বলে সরকারী স্বীকৃতি পেয়েছে এবং ইউএসএইড এর সহায়তায় এর ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে।
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, সিলেটঃ-
জলাভূমিতে বিভিন্ন জাতের ছোট গাছপালা এমনিতেই জন্মে থাকে। কিন্তু এসব গাছের সঙ্গে পানিসহিষ্ণু বড় গাছপালা জন্মে একটা বনের রূপ নিলে তবেই তাকে বলে সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলের জঙ্গল। বিশ্বের বৃহৎ জলাভূমির বনগুলো দেখা যায় কিছু বৃহৎ নদীর পাড়ে যেমন অ্যামাজন, মিসিসিপি এবং কঙ্গোর তীরে কিংবা অন্যান্য রেইন ফরেষ্ট অঞ্চলগুলোতে। সারা পৃথিবীতে ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট বা স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। যার মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আছে দুইটি, একটি শ্রীলংকায় আর আরেকটি আমাদের বাংলাদেশে।
লাউয়াছড়া, কানাইঘাট, সিলেটঃ-
উত্তর-পূর্ব থেকে উত্তর পশ্চিম পর্যন্ত সিলেটকে ঘিরে রাখা মেঘালয় পাহাড়শ্রেনীর পূর্ব অংশে কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল লাউয়াছড়া। লাউয়াছড়া মুলতঃ একটি পাথর কোয়ারী, এ ছাড়া এখানে অনেক পুরনো একটি চা বাগান রয়েছে।
লাউয়াছড়া যেতে হলে পর্যটকদের প্রথমে যেতে হবে কানাইঘাট উপজেলা সদরে। সিলেট নগরী থেকে কানাইঘাট যাওয়ার কয়েকটি পথ আছে। সিলেট জাফলং মহাসড়কের উপর দরবস্ত বাজার থেকে হাতের ডান দিকে রাস্তা চলে গেছে কানাইঘাট পর্যন্ত। মাইক্রোতে ঘন্টা দেড়েক এর মতো সময় লাগবে। এই রাস্তাটি ও সুন্দর। বামদিকে জৈন্তিয়া পাহাড়ের সারি । কানাইঘাট উপজেলা সদর সুরমা নদীর তীরে। নদীরঘাট থেকে নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয় লাউয়াছড়ার দিকে। নৌকা এগুতে থাকে পূর্ব দিকে। একটা পয়েন্টে এসে নৌকা পড়বে তিন নদীর মোহনায়। দক্ষিন থেকে এসেছে বরাক, উত্তর থেকে লোভা। এই দুই নদী মিশে সুরমা হিসেবে চলে গেছে পশ্চিমে। এই মোহনায় এসে নৌকা প্রবেশ করে স্বচ্ছ পানির নদী ‘লোভা’য়।
বর্ষায় সিলেটের এই স্থানগুলো সাজে অপরুপ সাজে। আর ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করে পুনরায় প্রবল গতিতে ছুটবার জন্য আমাদেরও প্রয়োজন একটু মানসিক বিশ্রাম। যা দিতে পারে কেবল প্রকৃতি। তাই বর্ষার ভরা রুপ দেখতে সিলেটে ঘুরে আসতেই পারি।
ছবি সংগ্রহঃ ইন্টারনেট