ব্র্যান্ড, ব্র্যান্ডিং এবং ব্র্যান্ড আইডেন্টিটিঃ এক নাকি ভিন্ন? - প্রিয়লেখা

ব্র্যান্ড, ব্র্যান্ডিং এবং ব্র্যান্ড আইডেন্টিটিঃ এক নাকি ভিন্ন?

Raisa Jabin
Published: May 29, 2019

জীবনের নানা বাঁকে, কাজের প্রয়োজনে বা কোন না কোন ভাবে আমাদের উদ্যোক্তার চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। আপনি যদি একজন ডিজাইনার হন তবে আপনি একজন উদ্যোক্তা, আপনি প্রতি মুহূর্তে ব্র্যান্ডের অলিগলিতে বিচরণ করছেন। কখনও আপনার শিল্পী সত্ত্বাকে তুলে ধরার জন্য, কখনও আপনার ক্লায়েন্টের কাজের প্রয়োজনে।

সাধারণত, লোগো, ওয়েবসাইট, বিলবোর্ড বা ফ্লায়ার এগুলো কোন ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ডিং করার জন্যই তৈরি করা হয়। একজন সফল ডিজাইনার হতে চাইলে আপনার এই বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা থাকা জরুরি। তাহলে, আপনি যখনই কোন ব্র্যান্ডের উপকরন নিয়ে কাজ করবেন, আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন ঠিক কোন জায়গায় আপনাকে কোন বিষয়, রঙ বা উপাদানের উপর জোর দিতে হবে।    

এছাড়াও, ক্লায়েন্টের আপনার যোগ্যতার প্রতি আস্থাশীল হতেও ব্র্যান্ড সংক্রান্ত বিষয় গুলোর উপর স্বচ্ছ ধারনা থাকা প্রয়োজন যা আপনার ঝুলিতে বাড়তি সুবিধা যোগ করবে।  

কেন যেন ব্র্যান্ডের নাম মাথায় আসার সাথে সাথেই সকলের মনে অজান্তেই ভেসে উঠে লোগোর ছবি। লোগো একটি ব্র্যান্ডের মূল উপাদান, একটি কোম্পানির প্রাথমিক পরিচিতি। কিন্তু শুধু লোগো দিয়েই ব্র্যান্ডকে আখ্যায়িত করা যায় না, ব্র্যান্ড আরও অনেক উপাদানের সমষ্টির নাম।

আপনি যদি ডিজাইনের মাধ্যমে কোন ব্র্যান্ডের পুরো পরিচিতি ধরতে চান, তবে যে বিষয়গুলো আপনাকে জানতে হবে –

> ব্র্যান্ডঃ সাধারন মানুষ আপনার কোম্পানির নাম শোনার পরেই সর্ব প্রথম মাথায় যা আসবে।

> ব্র্যান্ডিংঃ  যে কার্যক্রম গুলো কোন কোম্পানির পরিচিতি তুলে ধরতে এবং তা বজায় রাখতে পরিচালিত করা হয়।

>  ব্র্যান্ড আইডেন্টিটিঃ কোন ব্র্যান্ডের সকল উপকরনের সমষ্টি যা একটি ব্র্যান্ডকে সমৃদ্ধ করে।

এতো গেল প্রাথমিক ধারনা, কিন্তু স্বচ্ছ ধারনা পেতে আরও বিস্তারিত জানা জরুরি। তাই নয় কি? 

চলুন তবে জানা যাক-

ব্র্যান্ড কি?

ব্র্যান্ড হল একক সত্ত্বা, ধারণা এবং মনোভাব যা একজন সাধারন মানুষ কোন কোম্পানি সম্পর্কে মনে মনে পোষণ করে, যে ধারণা টি অন্যান্য কোম্পানি থেকে তার আলাদা হওয়ার উপলব্ধি ও প্রমান। স্কট কুক নামক এক উদ্যোক্তা যিনি “Intuit” নামক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বলেন – “ একটি ব্র্যান্ড এখন আর তা নয় যা আমরা ভোক্তাদের বলতে চাই, একটি ব্র্যান্ড হল সেই মতামত যা একজন ভোক্তা আরেকজন ভোক্তার কাছে প্রকাশ করেন”। মনে পড়ে বাংলাদেশের অটবি ফার্নিচার যখন প্রথম তাদের পণ্য বাজারে ছাড়ে তখন আমরা সুলভ মুল্যের ফার্নিচার হিসেবে অটবিকে বেছে নিয়ে ছিলাম। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ ফার্নিচার বানানোর ঝামেলা ছেড়ে অটবি থেকে নিশ্চিন্তে রেডিমেড ফার্নিচার কেনা আরম্ভ করেন। অথচ তাদের কাঠের মান এমন আহামরি কিছুই ছিল না। কারন তাদের ব্র্যান্ডের মূল ভিত্তি ছিল সুলভে ছিমছাম ফার্নিচার বিক্রয়। যা তাদের লোগো থেকে শুরু করে সব কিছুতেই প্রকাশ্য।  ছিমছাম ও সাধারণ মানেই যেন অটবি।  

ব্র্যান্ডিং কি?

যদিও ভোক্তাশ্রেণী আপনার ব্র্যান্ডের পরিচিতি নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়, কিন্তু চালকের আসনে আপনাকেই বসতে হবে। অর্থাৎ, সময়ে সময়ে আপনাকে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ভোক্তা ও ক্রেতাদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে আপনার ব্র্যান্ড কি বলতে চায় এবং তার উদ্দেশ্য কি। মুলত, এটাই  ব্র্যান্ডিং।

আপনার কোম্পানি বা ব্র্যান্ডের উপর ভোক্তাদের গচ্ছিত ধারনাকে সময়ে সময়ে বিভিন্ন মাত্রা দেয়াই হল ব্র্যান্ডিং। ব্র্যান্ড সম্পর্কে সচেতন করা, বিভিন্ন ইভেন্টের মাধ্যমে নতুন করে ব্র্যান্ডের সাথে পরিচিত করা, কারো কোন ভুল ধারনা থাকলে তা বুঝিয়ে দেওয়া, কোম্পানির সুনাম অক্ষুন্ন রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নেয়া সবকিছুই ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। ব্র্যান্ডিং এর প্রচেষ্টা কিন্তু এই জন্য করা হয় না- যেন তা ভোক্তাদের মনে পুরোপুরি জায়গা করে নেয়। বরং ব্র্যান্ডিং এর উদ্দেশ্য হল ভোক্তাদের আপনার পণ্য বা সেবা সম্পর্কে ভুলতে না দেয়া, ব্র্যান্ড সম্পর্কে সচেতন রাখা, যা একটি কোম্পানির সফলতার হারকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই কোন ব্র্যান্ডিং এর কাজ শুরুর আগে ঠিক করে নিন, আপনি ঠিক কোন মেসেজটি আপনার ভোক্তাদের দিতে চাইছেন? আপনার লক্ষ্য কি? একজন ডিজাইনার হিসেবে কোন ব্র্যান্ডের উপকরনের ডিজাইন করতে চাইলে এই তথ্যগুলো আপনাকে তখনই সাহায্য করবে যখন আপনি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে পারবেন।

ব্র্যান্ড আইডেনটিটি কি?

দৃষ্টিগ্রাহ্য ও স্পর্শনীয় সকল উপাদান যা কোন ব্র্যান্ড বা ব্যবসায়িক অস্তিত্বকে বুঝায় তাই ব্র্যান্ড আইডেনটিটি। বেশ কঠিন মনে হচ্ছে! মুলত কোন ব্র্যান্ডের লোগো, রঙ, টাইপোগ্রাফি এই সবই ব্র্যান্ড আইডেনটিটি এর মধ্যে পড়ে।

আরও সহজ করে বলতে গেলে ব্র্যান্ডের অস্তিত্বের প্রচারের জন্য এই উপকরনগুলোর ব্যবহার সর্বস্তরে করা হয়। যুগে যুগে ও কালের বিবর্তনে অনেক নামি দামি ব্র্যান্ড তাদের লোগোর ডিজাইন ও রঙ শুধু মাত্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং ভোক্তাদের মাঝে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে  পরিবর্তন করেছে।

সেই ১৮৮৬ থেকে কোকাকোলা কোম্পানি তাদের লোগোতে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন এনেছে।  ১৯৪০ সাল পর্যন্ত রঙের পরিবর্তন না করা হলেও, ১৯৫০ সালের দিকে লাল রঙের ব্যবহার এই ব্র্যান্ডের বিক্রিতে নতুন মাত্রা আনে। এরপর যুগে যুগে শুধু লোগো ও রং এর পরিবর্তন ছাড়াও বোতলের সাইজেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

আবার ধরুন অ্যাপল এর লোগোর কথা, প্রথম দিকে স্যার আইজ্যাক নিউটনের ছবি সহ লোগো বানালেও সময়ের সাথে এই ব্র্যান্ড যখন তার নিজের জায়গা শক্ত পর্যায়ে নিয়ে গেল তখনি ব্র্যান্ডটি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজ পণ্যে নতুনত্ব এনেছে  এবং  লোগোতেও সেই নতুনত্বের প্রভাব এর দেখা মিলেছে সমান ভাবেই। অ্যাপল এর লোগোতে পরিবর্তনের কারন হিসেবে জানা গেছে  অ্যাপল এর পণ্যগুলো যেমন হালকা ও স্টাইলিশ এবং যুগের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে বানানো, তেমনি এর লোগোকে এমন পর্যায়ে নেয়া হয়েছে যেন তা দেখে গ্রাহকের মনেও একই রকম ট্রেন্ডি অনুভূতির সঞ্চার হয়।

আসলে একটি ব্র্যান্ড একটি জীবন্ত সত্ত্বা। এর ছোট বড় সব ধরনের পরিবর্তনই ব্র্যান্ডের পরিচিতিতে প্রভাব ফেলে। সুতরাং, যখনি একজন ডিজাইনার ব্র্যান্ড আইডেনটিটি ডিজাইন করবেন অবশ্যই ব্র্যান্ডের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাগোড়া জেনে নিবেন।