ই-কমার্স ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে চাইলে জেনে নিন ৯টি টিপস! - প্রিয়লেখা

ই-কমার্স ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে চাইলে জেনে নিন ৯টি টিপস!

Naseeb Ur Rahman
Published: May 25, 2019

“এখন যুগটাই অনলাইনের”- এ কথা শুনেন নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! যে কোন তথ্য জানতে, সেবা পেতে বা কেনাকাটা করতে চাইলে অনলাইন শপিংয়ের কথাই আজকাল আমরা ভাবি, এমনকি অনলাইনে খোঁজা শুরু করি। বর্তমান বাজার ও ভোক্তা এই দুই পক্ষই অনলাইনকে তাদের ব্যবসায়িক তথা চাহিদা মেটানোর অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন অতি স্বাচ্ছন্দ্যে। তাই এই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই ওয়েবসাইটের বিকল্প নেই, হোক তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ্রুপ বা পেইজ, ওয়েবসাইট থাকাটা অত্যাবশ্যকীয়। সুতরাং, আজ আমরা ই-কমার্স ব্যবসায়ে ব্যবহারের জন্য কিভাবে একটি কার্যকরী ওয়েবসাইট তৈরি করতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করব।

ই-কমার্স ওয়েবসাইট বানানো কিছুটা কঠিন। কেননা শুধু যে আপনার ওয়েবসাইট দেখতে আকর্ষণীয় হতে হবে তাই নয়, বরং ওয়েবসাইট এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যেন তা যে ব্র্যান্ডের জন্য তৈরি করা হয়েছে, সেই ব্র্যান্ডকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে এবং ভিজিটরদের ওয়েবসাইটে বেশিক্ষন ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পরিশেষে, ভিজিটরকে পণ্য ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

চলুন তবে দেখে নেয়া যাক, কিভাবে একটি টপ রেটেড ই-কমার্স সাইট সাজাবেন –

সাধারণ কিন্তু আকর্ষণীয়ঃ

ই-কমার্স সাইট ডিজাইন করার সময় প্রথম যেই বিষয়টা মাথায় রাখা খুবই জরুরি তা হলো, সহজ ও সাবলীল ডিজাইন। ই-কমার্স সাইট ডিজাইন করতে চাইলে অবশ্যই মনে রাখবেন, ডিজাইন যত সাধারন হবে ততই মঙ্গল। কেননা, আপনি যত রঙ, ব্যানার অ্যাড বা পপ আপ এ ভিজিটরকে ব্যস্ত করে তুলবেন, ভিজিটর কিন্তু ততই আপনার আসল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাবে, আর তা হল পণ্য বিক্রি!

এতসব কারুকার্য করতে গিয়ে শেষে আমও যাবে, ছালাও যাবে ! এসব কিছু মূলত ভিজিটরের মনোযোগ নষ্ট করে। তাই ই-কমার্স ওয়েবসাইটের ডিজাইন যতটা সম্ভব পরিস্কার, সাবলীল, স্পষ্ট ও সাধারন ভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন।

ব্র্যান্ডিং যখন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণঃ

ভেবে দেখুন, আপনি কোন অনলাইন শপে কেনাকাটা করতে চাইলে প্রথমেই ব্র্যান্ডের নাম ও বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। নাম না জানা ব্র্যান্ডগুলো থেকে আপনি পারতপক্ষে দূরেই থাকতে চাইবেন। কিন্তু তাই বলে কি নতুন কোন ব্র্যান্ড থেকে কেনাকাটা করবেন না! তা কি হয়, নতুন নতুন ব্র্যান্ড আসবে, অফার আসবে, আপনি এক ব্র্যান্ডের পণ্যের সাথে অন্য ব্র্যান্ডের তুলনা করবেন- অনলাইনে কেনাকাটা করার মজাই তো সেখানে।

অনলাইন শপিং এর এই যুগে কোন একটি ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইটই হল একমাত্র মাধ্যম যেখানে ব্র্যান্ডের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার সুযোগ থাকে, যেখানে ব্র্যান্ডের পরিচিতি, উদ্দেশ্য বলা থাকে। আপনি যদি সত্যি আস্থা ভাজন একটি ব্র্যান্ড সৃষ্টি করতে চান, তবে বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি। একটি ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইট তার কাস্টমারদের সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি করে।

তাই ওয়েবসাইট বানানোর সময় ব্র্যান্ডের অস্তিত্ব ডিজাইনের মধ্যে ছড়িয়ে দিন। যেমন, ব্র্যান্ডটি যদি একজন ব্যাক্তি হত তাহলে কেমন হত, যদি তিনটি শব্দের মধ্যে ব্র্যান্ড সম্পর্কে বলতে বলা হয় কি বলবেন, অন্যান্য ই-কমার্স ওয়েবসাইট থেকে আপনার ওয়েবসাইটে কি কি নতুনত্ব আনা সম্ভব, ঠিক এই ধরনের প্রশ্ন-উত্তরের মিশেলে ওয়েবসাইটের ডিজাইন করুন। তখন দেখবেন ব্র্যান্ড নিজেই কথা বলবে, অর্থাৎ ওয়েবসাইটটি হয়ে উঠবে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।

নিজেকে ওয়েবসাইটের ভিজিটর হিসেবে ভাবুনঃ

ই-কমার্স ওয়েবসাইট ডিজাইনের সময় আপনাকে আপনার অডিয়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে। বস্তুত, একজন সম্ভাব্য ভিজিটর একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইটে যা চায় – ওয়েবসাইটটি যেন সহজে নেভিগেট করা যায়, ওয়েবসাইটের ডিজাইন যেন আকর্ষণীয় হয়, এবং সেখানে যেন পণ্য ক্রয়ের সহজ, ঝামেলা বিহীন ও দ্রুততর প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত থাকে।

ভেবে দেখুন, কি ধরনের লে-আউট ভিজিটরদের জন্য ভাল হবে, কিভাব পণ্যগুলো ওয়েবসাইটে সাজিয়ে রাখবেন এবং বিক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও  সহজতর করবেন। এই বিষয়গুলোই মুলত ডিজাইনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে বেশি। আগে ক্রেতাদের চাহিদা বুঝার চেষ্টা করুন এবং পরবর্তীতে তার উপর ভিত্তি করেই আপনার ওয়েবসাইটটি ডিজাইন করুন।

নজরকাড়া রঙের ব্যবহার করুনঃ  

ওয়েবসাইট ডিজাইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো হোমপেজ ও ওয়েবপেজের রঙ নির্বাচন। রঙ আপনার পছন্দ অনুযায়ী হবে বা ক্লায়েন্টের ইচ্ছা মত হবে এমন নয়। রঙ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। আপনি যদি রঙের মাহাত্য এবং একেকটি রঙের মানবিক মানসিকতার উপর প্রভাব ধরতে পারেন, তবেই পারবেন রঙের সঠিক ব্যবহার করতে।

যেমন, কোন পণ্য ক্রয় করতে যেই বাটনে চাপবেন তার রঙ লাল রাখতে পারেন। লাল রঙ স্বভাবতই নজর কাড়ে, সুতরাং ফাইনাল বাটনে লাল রঙের ব্যবহার করুন।

ছবির ব্যবহার যা কথা বলেঃ

ওয়েব ডিজাইনের আরেকটি শক্তিশালী ও অন্যতম অংশ হল ছবি! ছবি নেই এমন ওয়েবসাইটে কেউ কখনো সময়ক্ষেপণ করার কষ্ট করবে না। যে ওয়েবসাইটের ছবি যত পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে ও বুদ্ধিদীপ্ত সেই ওয়েবসাইটে ভিজিটর বেশি সময় ব্যয় করতে চাইবে, এমনকি অনেক ভিজিটর শুধুমাত্র ছবি দেখতেই ওয়েবসাইটে ঘুরে। তাই ই-কমার্স ওয়েবসাইটের প্রচারের জন্য ঝকঝকে ছবির কোন বিকল্প নেই। 

পণ্যের চেহারা দেখতে হলেও তো ছবি লাগবেই, ক্রেতা পণ্যের ছবি দেখে যাচাই বাছাই করেই তবে পণ্য কিনতে চাইবে, এছাড়াও থাকছে ছবি দেখিয়ে পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট করার ব্যাপার।

এক জরিপে দেখা গেছে যে, ওয়েবসাইটে প্রাসঙ্গিক ছবির কারণেই প্রায় ৪০% পর্যন্ত ভিজিটরের ওয়েবসাইটে কার্যক্রম বেড়ে যায়। তাই ছবি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বোত্তম মানের ছবি বেছে নিতে হবে।

ওয়েবসাইটের কন্টেন্টের উপর জোর দিনঃ

ওয়েবসাইটে কন্টেন্ট বেশি হলে তাঁর ২০% একজন ভিজিটরের নজর কাড়ে, বাকিটা সে স্ক্যান করে, অর্থাৎ একবার চোখ বুলিয়ে চলে যায়। একবার পণ্য সম্পর্কে ধারনা পেয়ে গেলে দ্বিতীয়বার সে আর পড়তে যাবে না। ভিজিটর প্রতিটা তথ্য যতটুকু সম্ভব সংক্ষেপে জানতে আগ্রহী।

তাই এই বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে যেন কন্টেন্ট যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে ব্র্যান্ডের দরকারি তথ্যগুলোর যেন উপস্থাপন থাকে। যেমন, সংক্ষিপ্ত প্যারা লিখুন, বড় লাইন ছোট করে আনুন এবং বুলেট আকারে সুস্পষ্টভাবে তথ্য প্রদান করার চেষ্টা করুন।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখুনঃ 

ই-কমার্স ওয়েবসাইটের উপর ক্রেতাদের নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততা বাড়াতে চাইলে ওয়েবসাইটে ক্লায়েন্ট ফিডব্যাক দেয়ার ব্যবস্থা রাখুন। বিভিন্ন ক্লায়েন্টের ইতিবাচক ফিডব্যাক বা মতামত নতুন ভিজিটরদের মনে আস্থার জায়গা তৈরি হতে সাহায্য করবে। এছাড়াও রেটিং সেকশন রাখতে পারেন। যেখানে ক্লায়েন্টরা পণ্যের রেটিং দিতে পারবে ।

Testimonial সেকশনে কাস্টমারের ছবিসহ ওয়েবসাইটে পণ্য ক্রয়ের অভিজ্ঞতা, কোন ব্যাপারটা বেশি ভাল লেগেছে বা কোন বিষয়টাতে আরও ভাল করার সুযোগ রয়েছে, এই ধরনের মতামত প্রকাশের জায়গা রাখা যায়। যত বেশি ভিজিটর পূর্ববর্তী ক্লায়েন্টদের মতামত ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানবে ততই নতুন ক্রেতারা  ওয়েবসাইট হতে সরাসরি ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

পণ্য থাকুক হাতের নাগালেঃ

আপনি ভেবে দেখুন, যখন অনলাইনে কোন পণ্য ক্রয় করতে যান, প্রথমে ওয়েবসাইট এক পলকে স্ক্রল করেন এবং তারপরই প্রয়োজনীয় পণ্য খোঁজা শুরু করেন। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আপনার কাঙ্খিত পণ্য যদি  খুঁজে না পান- সাথে সাথে যে চিন্তাটি মাথায় আসে তা হলো, কি বাজে ওয়েবসাইট রে বাবা!

মনে রাখবেন, এই প্রবণতা কিন্তু বাউন্স রেট বাড়ায়, অর্থাৎ ওয়েবসাইটে ভিজিটর এসেই বেড়িয়ে যায়। তাই ওয়েবসাইট ডিজাইনের সময় এমন ভাবে ডিজাইন করবেন যেন চাহিদাবহুল পণ্য থাকে হাতের নাগালে, পণ্য ক্যাটাগরি থাকে গোছানো, যেন নাম লিখলেই সাথে সাথে কাঙ্খিত পণ্যের পাশাপাশি সমমানের একাধিক পণ্য স্ক্রিনে ভেসে উঠে। পণ্যের ক্যাটাগরি এবং পেজগুলো যেন সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়, আকার, রঙ ও পণ্যের ধরন দিয়ে ফিল্টার করা যায়, এই বিষয়ের উপর সব চাইতে বেশি নজর দিন। কারন ই-কমার্স সাইটের একমাত্র উদ্দেশ্য পণ্য বেচা, তাই নয় কি!  

চেক আউট প্রক্রিয়া সহজ করুনঃ

পণ্য ক্রয়ের জন্য চেক আউট সহজ হওয়ার জরুরি, কিন্তু এই চেক আউট যদি সময় সাপেক্ষ ও ঝঞ্ঝাটমুক্ত না হয় তাহলে মনে রাখুন কোন ক্রেতা কিন্তু দ্বিতীয়বারের মত পণ্য ক্রয়ের জন্য আপনার ওয়েবসাইটে আসবে না। তাই ওয়েবসাইট ডিজাইনের সময় একজন ওয়েব ডিজাইনারকে বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখতে হবে – সহজ ও ঝামেলাবিহীন চেক আউট পেজ এবং প্রসেস ডিজাইন করা। প্রসেসটি যেন এমন হয় যে, পণ্য নির্বাচন, ডেলিভারির মাধ্যম নির্বাচন, মূল্য প্রদানের মাধ্যম নির্বাচন এবং সর্বশেষ মূল্য পরিশোধ করার সাথে মেসেজ দিয়ে নিশ্চিত করা – এই পুরো প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করে ক্রেতা খুব সহজেই চেক আউট করতে পারেন।   

একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট ডিজাইন করা যেমন খুব সহজ আবার ঠিক কঠিনও বলা যায়। আশা করছি এই টিপসগুলো একটি সফল ই-কমার্স ওয়েবসাইট ডিজাইনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। মনে রাখবেন,ডিজাইনে ক্রিয়েটিভিটি দেখানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করাই বুদ্ধিমান ডিজাইনারের কাজ!

তথ্য ও ছবিসূত্রঃ

99designblogs