বাংলা ভাষার বিবর্তন ও বিকৃতি - প্রিয়লেখা

বাংলা ভাষার বিবর্তন ও বিকৃতি

Milky Reza (Editor)
Published: May 22, 2019
বিবর্তন ও বিকৃতি দুটি আলাদা শব্দ ও আলাদা অর্থ বহন করে। আমরা জানি সমাজ, ভাষা এমনকি কোন বিষয়ই চিরস্হির নয়। যুগ পরিবর্তনের সাথে সবকিছুই পরিবর্তিত বা বিবর্তিত হয়ে এগিয়ে চলে। আর এটা গ্রহনযোগ্য। যেমন বাংলা ভাষা। সেও কখনো একই জায়গায় স্হির ছিলনা। উৎপত্তির পর নানাভাবে বিবর্তনের মাধ্যমেই একটি পর্যায়ে এসে পৌছেছে যা এখন আমরা শুদ্ধ লেখ্য বা কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহার করি। এর উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস বিষদ এবং ব্যাপক। সাথে সাথে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে কারণ পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল ভীষণ ইতিবাচক এবং গ্রহনযোগ্য। শুরুতে সংক্ষেপে জেনে নেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে –
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠী থেকে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের দুটি শাখা শতম ও কেন্তুম। শতম শাখা হতে আর্য ভাষার উৎপত্তি ঘটে। আর্যদের ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ। বেদের ভাষা বলে এর নাম বৈদিক ভাষা। এটি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের একটি ভাষা। সপ্তম শতকে পানিনি এই ভাষাতে কিছুটা পরিবর্তন আনেন এবং নির্দিষ্ট সূত্র প্রদান করেন। তাঁর সংস্কার করা বৈদিক ভাষার এই পরিমার্জিত রূপকেই বলা হয় সংস্কৃত ভাষা (যার সংস্কার করা হয়েছে)। আর্যরা এই সংস্কৃত ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করলে তা সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা জানি সংস্কৃত ভাষা ভাবগম্ভীর, বিধিবদ্ধ এবং জনসাধারণের জন্য উচ্চারনে অসুবিধা। তাই সংস্কৃত তথা তৎসম শব্দে কিছু পরিবর্তন আনা হয়, এতে সংস্কৃতের আঁটবাঁধা নিয়মে কিছুটা শিথিলতা আসে। ফলে যে রুপ লাভ করে তাকে পালি ভাষা বলে। পালি ভাষা আরো পরিবর্তিত হয়ে জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী হয়। এর সাথে অনার্যদের ভাষার মিশ্রনের ফলে সৃষ্টি হয় প্রাকৃত ভাষা। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে কথ্য ভাষারূপে প্রাকৃত ভাষা বিস্তার লাভ করে। ফলে এর কয়েকটি আঞ্চলিক রূপ তথা উপভাষা পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
১| পূর্ব ভারতে প্রচলিত মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে পূর্বী অপভ্রংশ উদ্ভুত হয়েছিল এবং সেই অপভ্রংশ হতে মগহী, মৈথিলী ও ভোজপুরী এই তিনটি বিহারী ভাষা এবং
২| বাংলা, অসমীয়া ও ওড়িয়া এই তিনটি ভাষাকে বাংলা ভাষায় জমজ ভগিনী বলা হয়। অন্যদিকে,
৩| পশ্চিমের শৌরসেনী অপভ্রংশ থেকে হিন্দি ও অন্যান্য ইন্দো-আর্য ভাষার উদ্ভব হয়।
যদিও উপরে বলা হয়েছে যে গৌড়ীর প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব ঘটেছে, কিন্তু এ বিষয়ে সকল পন্ডিত একমত হতে পারেননি। মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটেছে এ মতবাদ দিয়েছেন স্যার জর্জ গ্রিয়ার্সন। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এ মত সমর্থন করেছেন। কিন্তু ড. শহীদুল্লাহ্ ভিন্ন মত পোষন করেন। তিনি বলেন গৌড়ীর প্রাকৃত হতে বাংলা ভাষার উদ্ভব। পর্যালোচনা করলে আমরা এটা বুঝতে পারি যে, বাংলা ভাষা সৃষ্টির সূচনা ঘটে ৫-৬ হাজার বছর পূর্বে। যখন ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশের বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মনে করেন বাংলা ভাষা বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছিল ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও প্রবোধচন্দ্র বাগচীর মতে বাংলা ভাষা বর্তমান রূপ লাভ করেছে আনুমানিক খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর (৯৫০-১২০০) মধ্যবর্তী সময়ে।
বাংলা ভাষার বর্তমান এ শব্দ ভান্ডার বাংলা ভাষা গোড়াপত্তনের যুগে স্বল্প সংখ্যক শব্দ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। তবে পরবর্তীতে নানা ভাষার সংস্পর্শে এসে এ ভান্ডার বহুল বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে তুর্কি আগমন ও মুসলিম শাসন পত্তনের সুযোগে ক্রমে প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করে বাংলার নিজস্ব সম্পদে পরিনত হয়েছে। এর পরবর্তীতে এলো ইংরেজী। ইংরেজ শাসনামলে তাদের নিজস্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ লাভ করে। বাংলা ভাষা ঐসব ভাষার শব্দগুলোকে আপন করে নিয়েছে। এভাবে বাংলা ভাষায় যে শব্দ সম্ভারের সমাবেশ ঘটেছে তাকে পন্ডিতগন কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-
১. তৎসম। ২.তদ্ভব। ৩. অর্ধ তৎসম। ৪.দেশী শব্দ। ৫. বিদেশী শব্দ।
এই ছিল বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। বর্তমান গ্রহনযোগ্য আধুনিক বাংলা ভাষা এই বিবর্তনেরই ফলাফল। বিবর্তন একটি স্বাভাবিক ধারা। কোন কিছুই যেমন স্হির নয়, ভাষাও তেমনি স্হির নয় বরং বিবর্তিত হয়েই পরিপূর্ণ হয়। কিন্তু তার মানে কখনোই বিকৃতি নয়। আর বিকৃতি কখনোই কাম্য নয়।
এখন আসি বাংলা ভাষা বিকৃতির প্রসঙ্গে-
বাংলা ভাষা বিকৃতির ইতিহাস বর্তমানে তৈরী হচ্ছে। আমরা যেমন এখন পড়াশুনা করে জানতে পারি কিভাবে বাংলা ভাষা বিবর্তিত হলো, হয়তো নতুন প্রজন্ম অদূর ভবিষ্যতে পড়বে বিংশ বা একবিংশ শতাব্দীতে কিভাবে বাংলা ভাষা বিকৃত হলো। আর এটাই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। কারণ, বাংলা ভাষায় প্রয়োজনীয় সকল রস এবং আভিজাত্য রয়েছে। এ ভাষা মধুর, এর ইতিহাস এবং বিকাশ তাৎপর্যপূর্ণ। যতোটুকু গ্রহন করার প্রয়োজন ছিল তা গ্রহীত হয়েছে বা ভবিষ্যতেও বিবর্তনের গ্রহনযোগ্য ধারা অব্যাহত থাকবে তবে বিকৃতি ঠেকানো ভীষন জরুরী। বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষা বিকৃতির ক্ষেত্রে সবার আগে মনে ভাসে কিছু কিছু এফ এম রেডিওর কথা বন্ধুদের উচ্চারণ এবং কথা বলার ধরণের কথা। ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা লক্ষ করি একটি অগ্রহনযোগ্য বাচনভঙ্গি।
 তারা ইংরেজী কথার ভঙ্গিতে বাংলা উচ্চারণ করছে। যেমন ধরুন- ” বন্ধুড়া, তোমড়া সব্বাই কেমন আছো? নিশ্চই Chilll আছো। Josss। চলো আজ coool আড্ডা হব্বে। fun হব্বে, chilll হব্বে। গান হব্বে, তর্ক হব্বে। I was thinking যে আজ আমড়া মজাড় মজাড় Song play কড়বো। যেমন ধড়ো Tagore সঙ্গীত। আমাকে তোমড়া কল কড়তে পাড়ো, I will definitely receive your calls এবং ফেইসবুক লাইভেও কিন্তু you can comment. আমি অবশ্যই read করার চেষ্টা কড়বো।”
এধরনের কথপোকথন কে আমরা কোন পর্যায়ে ফেলব? অবশ্যই বিকৃতির পর্যায়ে। ভিন্ন ভাষা, সে হোক ইংরেজী, হিন্দি, ফার্সি বা যেকোন ভাষার প্রতি বাঙালীদের শ্রদ্ধা রয়েছে। পরিষ্কার করে যেকোন একটি ভাষায় কথা বলা যেতেই পারে। কিন্তু সব একসাথে একই বাক্যের মধ্যে কেন? একটি বাক্য অর্ধেক বাংলা, কিছুটা ইংরেজী, কিছুটা হিন্দি বললে কোন ভাষাকেই সঠিক সম্মান প্রদর্শন করা হলো  না। বরং প্রতিটি ভাষাকেই অপমান করা হলো। এছাড়াও বাংলা ভাষাকে ইংরেজীর মত করে উচ্চারণ করলে বাংলা ভাষার রস এবং স্বাতন্ত্র্য লোপ পায়। তাছাড়াও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ যেমন, Jossss, Chilll এগুলো কখনো কথাবন্ধুদের মুখে মানানসই নয়। একজন কথাবন্ধু তিনিই হবেন যিনি দ্রুত কথা বললেও প্রতিটি শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে সক্ষম হবেন। যখন বাংলা বলবেন তখন শুদ্ধভাবে বলবেন। যখন ইংরেজী বলবেন, তখন একটি গোটা বাক্য অকপটে বলতে সক্ষম হবেন। তাঁর যেমন ভাষার জ্ঞান থাকবে তেমন ভাষা প্রয়োগের সৌন্দর্যও রপ্ত করা থাকবে। তখনই সে আরেকজন সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা হবেন এবং কথাবন্ধু হওয়ার যোগ্যতা রাখবেন। আর অন্তত তাদের মুখে ভাষা বিকৃত হবার লজ্জাজনক আশঙ্কা থাকবেনা কারণ বর্তমান তরুন সমাজ এফ এম রেডিও এবং কথাবন্ধুদের দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত।
এরপর আসি নাটকের ক্ষেত্রে- উনবিংশ শতাব্দীতে বাবা মায়েরা ছেলে মেয়েদের নাটক দেখার জন্য সময় দিতেন। কারণ তখনকার নাটকে সংলাপ, ভাষা, উচ্চারণ, কথা বলার ধরণ এতো চমৎকার ছিল যে অভিভাবকরা চাইতেন  সেখান থেকে শিশুদের ভাষার শিক্ষা হোক। সুন্দর ভাবে কথা বলার অভ্যাস তৈরী হোক। কিন্তু বর্তমানে নাটকের যেসব সংলাপ, পান্ডুলিপি তৈরী হচ্ছে তার অধিকাংশই আভিজাত্যহীন, প্রমিত নয় বরং নিম্নমানের। অনেকটাই বিকৃত যেমন- ” মামমা, ভালোইতো পাট লও। মামমাহ, আমি যে কি প্যারার মইদ্যে আছিরে মামমা।” এগুলো কোন আঞ্চলিক ভাষা নয়, বরং বিকৃত ভাষা। কাহিনীর সাপেক্ষে আঞ্চলিক ভাষা অবশ্যই গ্রহনযোগ্য কিন্তু বিকৃত ভাষা নয়। এই ধরণের শব্দচয়ন সমাজ এবং ভাষার জন্য মারাত্মক হুমকি। কারণ গণমাধ্যম বা নাটক সমাজ সংস্কারেরই একটি মাধ্যম হওয়ার কথা। এই মাধ্যমগুলো মানুষকে ভীষনভাবে প্রভাবিত করে। একেকটি নাটক বা একেকটি অনুষ্ঠান কেবলই বিনোদন নয় বরং সমাজের প্রতি একেকটি বার্তা। সেই বার্তা যদি ভুলভাবে কড়া নাড়ে তবে তা ভয়ংকর হতে পারে যার প্রভাব আমরা বর্তমান সমাজে দেখছি। আগে আমরা আচার ব্যবহারে শিক্ষিত বা অভিজাত পরিবারের ছেলেমেয়েকে আলাদা করতে পারতাম। কিন্তু এখন তরুণ সমাজে অধিকাংশ ছেলেমেয়েই এই বিকৃত আলাপচারিতা রপ্ত করেছে। এর পুরোটাই এই গণমাধ্যমের প্রভাব। গনমাধ্যমের শক্তি আসলে এতোটাই প্রবল। এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললে সম্ভাব্য উত্তর আসতে পারে এমন- “আমরা সমাজের চিত্রটাই নাটকে তুলে ধরি।” কিন্তু বাস্তবতা হওয়া উচিত তার উল্টো, অর্থাৎ নাটকের প্রেক্ষাপট ও সংলাপের মাধ্যমে সমাজ সংস্কার করে চিত্র বদলে দেওয়াটাই নীতি হওয়া উচিত।
এরপরে আসি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথায়, কিছু কিছু নাটক বা কিছু কিছু এফএম রেডিও থেকে যে সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করছে তার সর্বশেষ প্রয়োগ ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে। এখানে তরুন সমাজ ভাষার এক সর্বনিম্ন ব্যবহারে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। আমরা যেটাকে ব্যঙ্গ করে বলি “বাংলিশ”। অর্থাৎ, ইংরেজী হরফে বাংলা লেখার অভ্যাস। যেমন ধরুন- কেউ বলতে চেয়েছে সুন্দর হয়েছে। সেটা বলবে> নাইস হয়েছে >কেউ লিখবে >Nice hoyeche কেউ আবার >Nayes hoasa। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে পুরো ফেইসবুকের টাইমলাইনটা ঘুরে দেখে আসবেন- কতোটা বিকৃত এবং অগ্রহযোগ্য, রুচিহীন লাগছে সবকিছু। ইংরেজী লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে পুরোটা ইংরেজীতে, আর তা নাহলে পুরোটা বাংলায় লিখতে বাঁধা কোথায়? কেন ইংরেজী হরফে বাংলা, তাও আবার বানান ভুল? এভাবে করে বাংলা ভাষার কথ্য এমনকি লেখ্য রুপও আজ কোথায় যেয়ে দাঁড়াচ্ছে? এর পরবর্তী ধাপ কতোটা ভয়াবহ হবে একবার ভেবে দেখুন।
তাই গণমাধ্যম, এফ এম রেডিও, ফেইসবুকের শিক্ষিত অধিবাসী, এছাড়াও অন্য আরো মাধ্যম যাদের প্রভাব রয়েছে সমাজে তাদের সচেতন হওয়া ভীষন জরুরী। নাহলে বাংলা ভাষা বিকৃতির যে লজ্জার ইতিহাস তৈরী হবে তা বাংলা ভাষা উৎপত্তি এবং বিবর্তনের গৌরবের ইতিহাসকে হার মানিয়ে স্বদম্ভে নিজেকে জাহির করবে।
ছবিঃ ইন্টারনেট