মানব বিবর্তন এবং সাম্প্রতিক গবেষণা - প্রিয়লেখা

মানব বিবর্তন এবং সাম্প্রতিক গবেষণা

Milky Reza
Published: May 19, 2019

একবার কল্পনা করুন তো মানুষ গাছে চড়ে বেড়াচ্ছে বা কোন আধুনিক সুবিধা ছাড়াই সাগর পাড়ি দিচ্ছে! মানুষের হাত পা বাঁকা হলে কেমন হতো মানুষের রুপ? হ্যাঁ, মানুষের উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এমন কিছু অজানা তথ্য পেয়ে যেতে পারেন। নানা ধরনের বিবর্তনের মাধ্যমে আজ পৃথিবীব্যাপী মানুষ অর্থাৎ হোমোসেপিয়েন্স প্রজাতীর একটি সাধারণ আকারআকৃতি এবং রুপ দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের শুরু থেকে বিশ্লেষণ করলে এবং বর্তমানে যে গবেষনা চলছে সেগুলো সম্পর্কে ধারনা রাখলে আমরা জানতে পারবো নানা অবাক করা তথ্য। তাই চলুন এক নজরে দেখে আসা যাক মানব বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক গবেষনা সম্পর্কে।

মানুষ” বা “হিউম্যান” শব্দটি দ্বারা  প্রকৃতপক্ষে কেবল হোমো গণের অন্তর্ভুক্ত প্রাণীদেরকে বোঝানো হয়। যদিও মানব বিবর্তন গবেষণায় অস্ট্রালোপিথেকাস গণের অনেক প্রজাতির  আলোচনাও চলে আসে।  আনুমানিক ২৩ লক্ষ থেকে ২৪ লক্ষ বছর পূর্বে আফ্রিকাতে হোমো গণটি অস্ট্রালোপিথেকাস গণ থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল। হোমো গণে অনেক প্রজাতিরই উদ্ভব ঘটে থাকলেও একমাত্র মানুষ ছাড়া তাদের সবাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ধরণের বিলুপ্ত মানব প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে হোমো ইরেক্টাস যারা এশিয়ায় বাস করতো এবং হোমো নিয়ানডার্টালেনসিস যারা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। আর্কায়িক হোমো স্যাপিয়েন্সদের উদ্ভব ঘটেছিল আনুমানিক ৪০০,০০০ থেকে ২৫০,০০০ বছর পূর্বের সময়কালের মধ্যে। আর্কায়িক বলতে হোমো স্যাপিয়েন্সদের প্রাচীনতম সদস্যদের বোঝানো হয় যারা প্রজাতিগত দিক দিয়ে এক হলেও আধুনিক মানুষের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে পৃথক ছিল।

দেহের অভ্যন্তরীন গড়নের দিক থেকে সম্পূর্ণ আধুনিক মানুষের উদ্ভব নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অনুকল্প হচ্ছে “আউট অফ আফ্রিকা” বা “আফ্রিকা থেকে বহির্গমন” অনুকল্প যার সারকথা হচ্ছে আমরা আফ্রিকাতে উদ্ভূত হওয়ার পর আনুমানিক ৫০,০০০-১০০,০০০ বছর পূর্বে বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছি। আমাদের বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতির সময়টাতেই এশিয়া থেকে হোমো ইরেক্টাস এবং ইউরোপ থেকে নিয়ানডার্টালরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আরেকটি ভিন্ন অনুকল্প হচ্ছে, আনুমানিক ২৫ লক্ষ বছর পূর্বে ইরেক্ট বা এরগ্যাস্টরা আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল, এদের উত্তরপুরুষ হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথক ভাবেই আমাদের উৎপত্তি ঘটেছে, তবে ভৌগলিকভাবে পৃথক সেসব হোমো-দের মধ্যে অন্তঃপ্রজনন সম্ভব ছিল।

তবে সম্প্রতি মানুষের নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে।

ফিলিপাইনে আদিম মানুষের একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ফিলিপাইনের লুজোন শহরে খননের সময় ওই প্রজাতির সন্ধান পান তাঁরা।

বিজ্ঞানীরা ২০০৭ সালে ওই খননকাজ শুরু করেছিলেন। এখনো পর্যন্ত ওই প্রজাতির দাঁত ও হাত-পায়ের হাড় উদ্ধার করা গেছে। তাঁদের ধারণা, ওই নমুনার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে কয়েকজন কিশোরের হাড় রয়েছে। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচারের বরাত দিয়ে বিবিসি এ খবর জানায়।

লুজোনের কালাও গুহায় আবিষ্কৃত ওই প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে হোমো লুজোনেন্সিস। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, প্রজাতিটি আনুমানিক ৫০ হাজার থেকে ৬৭ হাজার বছর আগে ফিলিপাইন এসেছিল।

হোমো লুজোনেন্সিসের দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আদিম ও আধুনিক উভয় প্রজাতির মানুষের মিল রয়েছে। প্রজাতিটির হাত ও পায়ের আঙুলের হাড় বাঁকা থাকায় বিজ্ঞানীদের ধারণা, গাছে চড়া ওই প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব নমুনা বিজ্ঞানীদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে এ অঞ্চলে মানুষের বিবর্তন হয়েছিল অত্যন্ত জটিল ধাপে।

হোমো লুজোনেন্সিস প্রজাতির আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। জন্ম দিয়েছে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের। আগে ধারণা করা হতো, আধুনিক মানুষের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হোমো ইরেকটিসই ১৯ লাখ বছর আগে প্রথম আফ্রিকা ত্যাগ করে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অন্য কোনো প্রজাতি সে সময় আফ্রিকা ত্যাগ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসতে পারে, হোমো লুজোনেন্সিস পাওয়ার আগে তেমন ধারণা করেননি বিজ্ঞানীরা। আবার সে সময় লুজোনে ঢোকার জন্য অবশ্যই সমুদ্র পাড়ি দেওয়া লাগত। কিন্তু কীভাবে এত আগে ওই প্রজাতি সমুদ্র পাড়ি দিল, সে সমস্যার সমাধান করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

অন্যদিকে, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপে পাওয়া যায় হোমো ফ্লোরোসিয়েন্সিস নামের একটি আদিম প্রজাতি। বামন আকৃতির ওই প্রজাতির ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল হবিট। এই হবিটদের সঙ্গেও হোমো লুজোনেন্সিসের বেশ মিল রয়েছে।

লন্ডন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক ক্রিস স্টিংগার বলেন, ‘২০০৪ সালে ক্ষুদ্র হোমো লুজোনেন্সিসের অসাধারণ আবিষ্কারগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর আমি বলেছিলাম, মানববিবর্তনের ওই ধারা এই অঞ্চলের অন্য দ্বীপগুলোয় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ছবিঃ ইন্টারনেট