"গ্রীষ্মে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিকার" - প্রিয়লেখা

“গ্রীষ্মে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিকার”

Milky Reza
Published: May 11, 2019

“নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা।
খেলো খেলো তব নীরব খেলা।।
যদি ঝরে পড়ে পড়ুক পাতা, ম্লান হয়ে যাক মালাগাঁথা,
থাক জনহীন পথে পথে মরিচীকাজাল ফেলা।।
শুষ্ক ধুলায় খষে-পড়া ফুলদলে,
ঘূর্নী-আঁচল উড়াও আকাশতলে।
প্রান যদি করো মরুসম তবে তাই হোক-

হে নির্মম।”

গ্রীষ্মের ত্বপ্ততা নিয়ে প্রকৃতির সাথে এমনই কথোপথন ছিল কবিগুরু’র। গ্রীষ্মের প্রকৃতিকে তিনি নির্মম বলে সম্বোধন করেছিলেন। আসলে রূপবৈচিত্র্যে ষড়ঋতুর দেশ এই বাংলাদেশ। একেক ঋতুর  একেক বৈশিষ্ট্য। বর্ষা যেমন বৃষ্টি নিয়ে আসে তেমনি শরৎ আনে প্রকৃতির মুগ্ধতা। হেমন্ত আনে ফসলের সম্ভার। আর ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি ফিরে পায় নব যৌবনের স্বাদ। শীত যেমন হাড় কাঁপিয়ে আসে তেমনি গ্রীষ্ম আসে অসহনীয় দাহ নিয়ে। ষড়ঋতুর এই স্বাদের বিভিন্নতার একটি সঠিক বিন্যাস ছিল একসময়। তবে এখন যুগ বিবর্তনের সাথে সাথে নানাভাবে অত্যাচারিত হয়ে প্রকৃতি মাঝে মাঝে টাল মাটাল আচরণ করে। তার প্রভাব আমাদের স্বাস্হ্যকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্হ করে। এই ব্যস্ত জীবনে অসুস্হতা উদযাপন করার সুযোগ কই? আর তাই এধরনের সমস্যার প্রেক্ষিতে সমাধান এবং প্রতিকারের কথা ভাবতে হবে সবার আগে। তাছাড়াও এখন চলছে পবিত্র রমজান মাস। গ্রীষ্মের অসহনীয় তাপদাহেই রোজা পালন করছেন মুসলমানগন। তাই স্বাস্হের সঠিক যত্ন নেয়া খুবই দরকার। ব্যতীক্রম হলে রোজা পালনের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তেই পারে।

আজ কথা বলবো গ্রীষ্মে স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং তার প্রতিকারের উপায়সমূহ নিয়ে।

ঋতুর এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরনের কারনে গ্রীষ্মে আমরা তার নানারকম রুপ দেখতে পাই। দিনে প্রচন্ড গরম। শহরের এক কোনে বসে ঝিমোয় ক্লান্ত কাক,  তাপে নাভিশ্বাস উঠে যায় মানুষ সহ সব পশু-পাখির। আবার শেষ রাতেই ঠান্ডা পরিবেশ। ২৪ ঘন্টার দিন পরিক্রমায় আবহাওয়ার এতো রকম পরিবর্তনে মানুষের শরীর ভারসম্যহীন হয়ে পড়ছে। দানা বাঁধছে নানারকম রোগ ব্যধী। আর এসব সমস্যা প্রতিকার নিয়েই পরামর্শ প্রদান করেন চিকিৎসক ডঃ নুরূল হুদা জনি।

এমবিবিএস, পিজিটি (মেডিসিন), সিসিডি(ডায়াবেটলজি)
রেজিস্টার, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন,
আকিজ মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, খুলনা।

গ্রীষ্মে কি কি ধরনের স্বাস্হ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হতে পারি আমরা?

গ্রীষ্মে ম্যালাইজ নামক সমস্যার সম্মুখীন হয় প্রায় সকল বয়সের মানুষই। ম্যালাইজ অর্থাৎ, ঝিম ঝিম ভাব, দুর্বলতা,  যাকে আমরা মাথা ঘোরা বলি অর্থাৎ শরীরে চলাফেরায় ভারসম্য নষ্ট হয়, ঠিক তীব্র জ্বর নয় তবে জ্বর জ্বর ভাব অনুভূত হয়, ক্ষুধা মন্দা ও মাঝে মাঝে বমি বমি ভাবও হতে পারে।

এছাড়াও গ্যাসট্রোইন্টারাইজ অর্থাৎ পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

এ সমস্যা প্রতিকারের জন্য কি কি করনীয়?

এ সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে এসময় যথা সম্ভব হালকা খাবার খেতে হবে, মসলা জাতীয় খাবার বর্জন করা ভালো, বাইরের খাবার নিষিদ্ধ প্রায়। ডাবের পানি, সব্জি খেতে হবে। খারাপ লাগলে স্যালাইন খেতে হবে। প্রয়োজনীয় ঘুমের ক্ষেত্রে অবহেলা না করাই ভালো। বাইরে রোদে ছাতা বা ছাউনীর আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

পানি পান করার বিষয়ে কি পরামর্শ দেবেন?

আমরা সব ঋতুতেই প্রচুর পানি পান করার পরামর্শ দেই। শরীরের সেলগুলো সতেজ রাখতে পানি পান করার বিকল্প নেই। তবে গ্রীষ্মকালে বেশী সচেতন হতে হবে কারণ এ সময়ে প্রচুর ঘাম হয়, শরীরের পানি শুকিয়ে যায়, বাইরের রোদ এবং গরমের প্রকোপে ত্বক এবং গলা শুকিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি না খেলে ডিহাইড্রেট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং হিটস্ট্রোক ও হতে পারে যা পরবর্তীতে শরীরের উপর খারাপ প্রভাব রেখে যায়।

এছাড়াও এসময় ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন, ইউটিআই এর আক্রমন হতে পারে। তাই আমরা এসময় প্রায় ১০-১২ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দেই।

শিশুদের ক্ষেত্রে কি ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে?

এসময় শিশুদের নিয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে। অল্পেই ওদের পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে যা তাদের ছোট শরীরকে অত্যাচার করতে পারে। এ সময়ে ওদের ভাইরাল এ্যাটাক বেশী হয়। স্বর্দি, কাশি, জ্বর, পেটব্যধা, ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

এ থেকে প্রতিকারের উপায় কি?

যেসব শিশুরা বাসার বাইরে স্কুলে, কোচিং এ,  খেলার মাঠে বিভিন্ন জায়গায় যায় তারা যেন বাইরের খাবার না খায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বাইরে যাওয়ার সময় মাম ফ্লাস্কে করে যেন বাসার বিশুদ্ধ পানি নিয়ে যায় এবং বাইরে কোথাও পানি পান না করে।

দুই বছরের কম বয়সের শিশুকে এসময়ে বাইরের খাবারের তুলনায় বুকের দুধ বেশী খাওয়াতে হবে।

পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন আছে কি?

-অবশ্যই। এসময়ে রোগ জীবানু এবং এ্যালার্জির আক্রমন বেশী হয়। যাদের স্কিন এ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে তাদের খারাপ রকম এ্যাটাক হতে পারে। তাই অবশ্যই বাইরে থেকে ফিরে পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করে নেয়া ভালো, ঘাম যেন শরীরে শোষিত নাহয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শরীরকে সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করতে হবে। আর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে। খাবার আগে শিশু এবং সকলেরই সাবান দিতে হাত ধুয়ে নিতে হবে। বাইরে গেলে অবশ্যই ব্যাগে ছোট্ট হ্যান্ড স্যানিটাইজার বহন করা উচিত যেন খাবারের আগে সাবান বা পানি না পেলেও হাতকে জীবানুমুক্ত করা যায়।

আর সর্বোপরি সবাইকেই প্রচুর ঋতুকালীন ফলমূল খেতে হবে এবং শরবত পান করতে হবে।

উপরোক্ত বিষয়গুলো পালন করলে এধরণের সমস্যা থেকে প্রতিকার সম্ভব।