ষড়ঋতুর রুপে রবী ঠাকুরের প্রেমের বন্দনা - প্রিয়লেখা

ষড়ঋতুর রুপে রবী ঠাকুরের প্রেমের বন্দনা

Milky Reza (Editor)
Published: May 8, 2019

“হে নূতন-দেখা দিক আরবার,
জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।
তোমার প্রকাশ হোক, কুহেলী কাকরী উদঘাটন সূর্যের মতন।”

আজ বাংলায় ২৫ শে বৈশাখ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের সেই বিশেষ দিন।
তাঁর জন্ম ৭ই মে ১৮৬১- ২৫ শে বৈশাখ,১২৬৮ বঙ্গাব্দ। মৃত্যু ৭ই আগস্ট, ১৯৪১-২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ। তিনি ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলে বিশ্বাস করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়। তাঁর সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

বাংলা সাহিত্যকে পরিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবস্হান সবার উপরে বললে ভুল হবেনা। এমন এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব না হলে বোধহয় সাহিত্যের অনেক রসই অপরিচিত থেকে যেত। তাঁর সাহিত্য কর্ম এতো বিষদ যে প্রতিটি দিক নিয়ে একবারে আলোচনা করা অসম্ভব প্রায়। তাঁর প্রকৃতির রুপে প্রেমের বন্দনা যেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে সম্পর্কিত। প্রকৃতির ষড়ঋতুর প্রতিটির আলাদা আলাদা স্বাদকে সাহিত্যে রুপদান করে তিনি আমাদের কাছে পৌছে দিয়েছেন গান ও কবিতার মাধ্যমে। এমন কোন ক্ষণ বা উপলক্ষ নেই হয়তো, যার জন্য কবিগুরুর একটি গান বা কবিতা খুঁজে পাওয়া যায়না। বরং এমন অসংখ্য সৃষ্টি আমাদের মুগ্ধ করে প্রতিনিয়ত। যদি বলি ষড়ঋতুর প্রত্যেকটির জন্য কবিগুরুর গানের কথা- গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত। প্রতিটি ঋতুর রস আস্বাদন করেছেন তিনি তাঁর গানের স্তবকে। আবার তাঁর বন্দনার ধারায়, প্রকৃতির জায়গায় আমরা যদি নারী মনকে স্হাপন করে ভেবে দেখি তাহলে দেখব, প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের মতো মনেরও ঋতু পরিবর্তন হয়। সেখানেও রয়েছে গ্রীষ্মের তাপদাহ, বর্ষার উচ্ছলতা, শরতের শুভ্রতা, হেমন্তের ভরা যৌবন, শীতের আড়ষ্টতা বা পাতা ঝরার শব্দ, বসন্তের প্রেম।
তাই ষড়ঋতুকে নিয়ে লেখা তাঁর প্রতিটি গানকে একটু গভীরভাবে বিশ্লেষন করলে খুঁজে পাই হৃদয়ের ঋতুপরিবর্তনের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য।

গ্রীষ্মে চারপাশ খা খা করে, জলতেষ্টায় হৃদয় ছটফট করে, প্রকৃতির তেমন ভয়াবহতাকে বোঝাতে তিনি লিখেছেন-

“দারুন অগ্নিবানে রে,
হৃদয় তৃষ্ণায় হানে রে।”

অর্থাৎ প্রকৃতি যেন তখন আগুনের বান ছুড়ে দেয় প্রানীকূল এবং জীবকূলের প্রতি এবং তাই প্রচন্ড শুষ্কতায় হৃদয় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ে।

আবার –
” চক্ষে আমার তৃষ্ণা,
ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে
আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন,
সন্তাপে প্রান যায় যে পুড়ে।”

বৈশাখের এই কঠোর দিনকে যদি আমরা মানবিক বিরহের সাথে তুলনা করি, বৃষ্টিহীনতাকে যদি স্নেহহীনতা বা প্রেমহীনতাকে বুঝি, তাহলে এই গানটি হয়ে উঠতে পারে বিরহ উদযাপনের বা হৃদয়ের ব্যথাকে ব্যক্ত করার মাধ্যম।

গ্রীষ্মের পরে বর্ষা। প্রচন্ড রোদ খরা, শুষ্কতার পরেই প্রান জুড়ানো জলের ধারা। চারিদিকে সবুজ, ভেজা বারিধারা। রুষ্ঠ, শুকিয়ে থাকা প্রকৃতি স্নান করে সেজে ওঠে নতুন রঙে। প্রথম বৃষ্টি পেয়েই ময়ূর পেখম মেলে নাচতে শুরু করে।
ঠিক যেমন বিরহের পর এক চিলতে আশার বানী, প্রথম প্রেমের লক্ষণ। প্রেমহীন দগ্ধ হৃদয়ে প্রানের সঞ্চার।
আর এমন সময়ে মনে পড়ে কবিগুরুর এই গান-

“আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে,
জানিনে, জানিনে,
কিছুতে কেন যে মন লাগেনা।”

অথবা-

“পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে,
পাগল আমার মন জেগে ওঠে।”

সে রুপকে ব্যক্ত করতেই কবিগুরু লিখেছেন-

“এসো শরতের অমল মহিমা,
এসো হে ধীরে।
চিত্ত বিকশিবে চরণ ভীড়ে।”

তারপর আসে হেমন্ত।
প্রকৃতির ভরা যৌবন। প্রকৃতি তখন রুপের মহিমায় প্রানবন্ত।
ভরা পুর্নিমার রুপালী আলোয় স্নান করে নেয়া ধরনী, ঠিক যেমন পূর্ণ যৌবনা নারী।
এমন উপলক্ষকে উদযাপন করতে কবিগুরুর গান –

“হেমন্তে কোন বসন্তেরই বানী,
পূর্ন শশী ঐ ঐ ঐযে দিলো আনি।”

হেমন্তের পরেই শীত। প্রকৃতির আড়ষ্ঠতা আর পাতা ঝরার বেলা। তবে তারও আছে আলাদা রং এবং রস। আলাদা রুপ। শীতের শেষে পাতা ঝরার ছন্দ, সে যেন নারী মনের এক আলাদা মেজাজ-

“শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন লাগল নাচন
আমলকির ঐ ডালে ডালে।
পাতাগুলি শিরশিরিয়ে শিরশিরিয়ে,
ঝরিয়ে দিল তালে তালে।”

সবার শেষে আসে বসন্ত। বসন্ত মানে ঋতুর রাজা। প্রেমের ভরা ঋতু । প্রকৃতি এবং নারীমন দুটোই যদি একই সত্বা হয়, তাহলে সে প্রেমে মত্ত ওঠে এসময়। এ সময় নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে গান গেয়ে ওঠে মন। আর বিলক্ষন তখনও আনমনে ঠোঁটে চলে আসে রবী ঠাকুরের প্রকৃতি প্রেমের গান-

” আহা আজি এ বসন্তে
এতো ফুল ফোটে, এতো বাঁশি বাজে, এতে পাখি গায়।”

অথবা নিতান্তই মানবীয় প্রেমের উচ্চারণ-
” তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা,
তুমি আমার সাধের সাধনা,
মম শূণ্য গগন বিহারী।
আমি আপন মনের মাধূরী মেশায়ে তোমারে করেছি রচনা,
তুমি আমারি, তুমি আমারি।”

তাই ষড়ঋতুতে ঘেরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবন আর প্রেম যেখানে অবিচ্ছেদ্য, সে হোক প্রকৃতি প্রেম অথবা মানবীয়- রবি ঠাকুরের গান ছাড়া যেন হৃদয়ের ভাব একদমই পূর্ণতা পায়না। তাই আজ ২৫ শে বৈশাখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে।

ছবিঃ ইন্টারনেট