নারীর মুক্তিযুদ্ধ - সেকাল একাল - প্রিয়লেখা

নারীর মুক্তিযুদ্ধ – সেকাল একাল

প্রিয়লেখা.কম
Published: April 20, 2019

“মুক্তিযুদ্ধ”, মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ থেকে ১৬ ই ডিসেম্বর অবধি পাকিস্তানি শাসন থেকে বাংলার নৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সর্বোপরি জাতীয় মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ তাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ মানি। বাংলার মুক্তিযুদ্ধের সেই পটভূমিকে আমরা মনে প্রানে শ্রদ্ধা করি এবং মুক্তির সেই বোধকে আমরা হৃদয়ে ধারন করি। তবে “মুক্তি” সেকি কেবল অর্জনেই সীমাবদ্ধ?  নাকি মুক্তি একটি চলমান বোধ বা বিশ্বাস, জীবন ধরণ এবং জীবন ধারন? অবশ্যই মুক্তি কেবলি অর্জনসর্বস্ব ধারনা নয়, বরং চলমান এবং উপভোগ্য। আর এই বিশ্বাসের ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন জাগে নানারকম। যদি নারীর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করা হয় তবে নারীর মুক্তিযুদ্ধ এখনো চলমান।

নারীর মুক্তিযুদ্ধের সেকাল এবং একালের প্রেক্ষাপট এবং ধরন তাহলে কেমন?

পার্থক্য কোথায়?

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েও নারীরা যুদ্ধ করেছে মুক্তির জন্য। আজো নারী যুদ্ধ করে চলেছে মুক্তির জন্য। তবে ক্ষেত্র ভিন্ন। ১৯৭১ সালে বাংলার নারী হাতে রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ করেছে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে, আর আজ যুদ্ধ করে মুক্ত ভুখন্ডে সামাজিক কিছু শত্রুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে। অর্থাৎ যুদ্ধের এই ক্ষেত্র এবং অর্থবহতায় এসেছে সংকীর্ণতা। নারীর অবদানের গুরুত্ব পরিবর্তিত হয়ে দেশ বা জাতীয় জীবন থেকে সরে নিজের দিকেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অবশ্যই কাম্য ছিল না।

আর এমন চললে দেশকে নারী কিছু দিতে সক্ষম হবে কি?

নারী আজ কেন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এতো ব্যস্ত?

তার এ যুদ্ধ দেশের জন্য না হয়ে নিজের জন্যই কেন আজ?

তার এ সংকীর্নতার কারণ কি?

সে নিজে দায়ী নাকি আজকের সমাজ?

১৯৭১ সালে সারাদেশে যখন যুদ্ধের পটভূমি তখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নিজেকে দেশের জন্য নিবেদন করেছে। নারীরাও রাইফেল হাতে ট্রেইনিং নিয়েছে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ করেছে, শহীদ হয়েছে, দেশকে মুক্ত করেছে।

তৎকালীন সময়ে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, ক্যাম্পে, শরণার্থী ক্যাম্পে, ভারতীয় ক্যাম্পে গিয়ে গিয়ে গনজাগরনের গান গেয়েছেন নারী শিল্পীরা, তাদের সাথী হিসেবে তাদেরই ভাই বা বন্ধুরা তাদের নিরাপত্তা দিয়েছে, একে অন্যকে সহযোগিতা করেছে। তাদের সকলেরই একমাত্র মনযোগ ছিল দেশের স্বাধীনতার প্রতি। তাদের ভীতি বা শত্রু ছিল পাকিস্তানী হানাদার, নিজের সঙ্গী সাথীরা নয়। তারা ছিল নারীদের জন্য নিরাপদ। আর তাইতো তাদের কণ্ঠের তেজ আর আবেগ প্রতিফলিত হয় যখন তারা গেয়ে ওঠে- “নোঙর তোলো তোলো, সময় যে হল হল”

অথবা –“জয় বাংলা, বাংলার জয়” এসব গানের মধ্যে।

একেকটি গান ছিল একেকটি অনুপ্রেরনা। এটাই ছিল তাদের যুদ্ধ, সে যুদ্ধের অর্থবহতা ব্যাপক। নারীকে তখন নিজেরই সমাজের থেকে নিজের সম্মান বাঁচাতে চিন্তা করতে হয়নি একচুল। আর তাই দেশের জন্য  যুদ্ধ করতে পেরেছিল তারা।

যদি বলি বীরপ্রতীক তারামন বিবির কথা। তিনি একটি ক্যাম্পে রান্না করতেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। আর সেখানেই সে রান্নার ফাঁকে ফাঁকে অস্ত্রচালনার কৌশল শেখেন এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন ক্যাম্পের অন্যান্যদের সঙ্গে। দেশের স্বার্থে নিজেকে তিনি তৈরী করেছিলেন, তাঁকে ভাবতে হয়নি ক্যাম্পেই স্বজাতিদের কাছে তিনি নিরাপদ কিনা এ বিষয়ে। কারন তৎকালীন পুরুষদের কাছে বন্ধু বা সহকর্মী হিসেবে নারী নিরাপদ ছিল বলেই সে দেশের জন্য সময় দিতে পেরেছে।

আর আজ? আজকের দিনে এই স্বাধীন ভুখন্ডেও নারীর যুদ্ধ চলমান। তবে এ যুদ্ধ খুবই লজ্জাজনক। কারণ আজকের এ যুদ্ধ স্বজাতীদের সাথে স্বাধীন ভূখন্ডে। দেশের জন্য নয় বরং নিজের জন্য। প্রতিনিয়ত বাসে, ট্রামে, রাস্তায় এমনকি কর্মক্ষেত্রে। আর তখনি নারী নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেই সদা সচেতন, দেশের প্রতি নিবেদনের কথা ভাববার সুযোগ তার কই?

এ সমস্যাকে কি আমরা নারী নির্যাতন বলবো? না।

এ সমস্যা একটি সামাজিক, একটি জাতীয় সমস্যা।

এ যুদ্ধ কি কেবল নারীর যুদ্ধ? না।

এ যুদ্ধ আবারো একটি জাতীয় যুদ্ধ। অসুস্থদের সাথে সুস্থদের যুদ্ধ।

আর এখনো নারীরা যুদ্ধ থেকে বের হতে পারেনি, আর সাথে সাথে যুদ্ধ করে চলেছে সমাজের সুস্হ নাগরিকেরা। নারীর মুক্তিযুদ্ধ সেকাল এবং একালের পার্থক্য এভাবেই তৈরী হয়েছে যা জাতীকে ক্ষতিগ্রস্হ করে চলেছে। নারীর অবদানব্যতীত যেমন দেশ স্বাধীন হয়নি তেমন দেশের উন্নতিও সম্ভব নয়। আমরা নারীকে যোদ্ধা হিসেবে ঠিকই দেখতে চাই, তবে দেশ এবং সমাজের স্বার্থে। নিজেকে বাঁচানোর যুদ্ধে যেন তার সব মেধা, যোগ্যতা শেষ হয়ে না যায়। তাই অচিরেই সেকালের সেই নিরাপত্তা আবার নিশ্চিত হোক!