ফ্রান্স: সেরা স্কোয়াড, কিন্তু ভুল কোচ? – প্রিয়লেখা

ফ্রান্স: সেরা স্কোয়াড, কিন্তু ভুল কোচ?

Sanjoy Basak Partha
Published: June 2, 2018

এখনো পর্যন্ত যতগুলো স্কোয়াড ঘোষণা করেছে দলগুলো, শক্তিমত্তার দিক থেকে ফ্রান্সের স্কোয়াডকে রাখতে হবে একদম উপরের সারিতেই। আলেজান্দ্রে লাকাজাত্তে, কিংসলে কোমান, আদ্রিয়েন রাবিয়ট ও অ্যান্থনি মার্শালদের মতো বড় নামদের জায়গা হয়নি স্কোয়াডে, এতে করেই ফ্রান্সের স্কোয়াডের শক্তিমত্তা ও গভীরতা সম্পর্কে আঁচ করা যায়।

এছাড়া ইঞ্জুরির কারণে হারাতে হচ্ছে দিমিত্রি পায়েট ও লরাঁ কশিয়েলনির মতো গুরুত্বপূর্ণ দুজন খেলোয়াড়কে, কিন্তু তাঁদের বিকল্প হিসেবে যে দুইজন এসেছেন, সেই নাবিল ফেকির ও আদিল রেমিও সম্ভবত যেকোনো দলের প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু তারপরেও অনেক বিশেষজ্ঞরই মতামত, স্পেন, ব্রাজিল কিংবা জার্মানির মতো বড় দলের সামনে মুখ থুবড়ে পড়বে দিদিয়ের দেশমের দল। শক্তিশালী দল থাকা সত্ত্বেও তাহলে ফ্রান্সের সমস্যা কোথায়? ১০ জুন মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে তাই বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তরই খুঁজতে হবে ’৯৮ এর বিশ্বকাপজয়ীদের।

দেশম কি ফ্রান্সের জন্য উপযুক্ত কোচ?

ফ্রান্সে একটা সাধারণ ধারণা আছে, খেলোয়াড় কিংবা কোচ, দুই ভূমিকাতেই ভাগ্যের যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছেন দিদিয়ের দেশম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভাগ্যটাকে বোধহয় খুব একটা পাশে পাচ্ছেন না দেশম। ইউরো ২০১৬ তে ফ্রান্সের জয় ছাড়া অন্য কোন ফলাফল সম্ভবই মনে হচ্ছিল না। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতানোর পর সেই ঘরের মাঠেই কোচ হিসেবেও জিততে পারতেন বড় একটি শিরোপা।

কিন্তু তারপরেও ফাইনালে পারেননি দেশম, পারেননি মূলত তাঁর অতি রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে। প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ইঞ্জুরির কারণে মাঠ ছেড়ে উঠে গেলেও একটি গোলও বের করতে পারেনি ফেভ্রিট হিসেবে শুরু করা দেশমের দল।

ঠিক কোথায় সমস্যা হচ্ছে তাহলে? এখনই বলাটা হয়তো তাড়াতাড়ি হয়ে যায়, কিন্তু তারপরেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্ত এবং ফর্মেশন দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

২০১৭ এর জুনে সুইডেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। সেরা ফর্মে থাকা এন’গোলো কান্তে, ওসমান ডেম্বেলে ও কিলিয়ান এম্বাপ্পের বদলে প্রথম একাদশে রাখেন ব্লেইস মাতুইদি, মুসা সিসোকো ও দিমিত্রি পায়েটকে।

ফলাফল হিসেবে ম্যাচ হারতে হয় লা ব্লুজরা, ম্যানেজার হিসেবে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতাও হারান দেশম।

এরপর গত সেপ্টেম্বরে টুলুজে আরেকটি বাছাইপর্বের ম্যাচে আবারও দেশমের ভুল সিলেকশনের কারণে লুক্সেমবার্গের কাছে জয়বঞ্চিত হতে হয় ফ্রান্সকে। এ বছরের মার্চে কলম্বিয়ার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ২ গোলে এগিয়ে গিয়েও ৩-২ গোলে ম্যাচ হারাটাও চিন্তার ভাঁজ ফেলে ফ্রান্স সমর্থকদের কপালে।

সমালোচনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে দেশম বলেছিলেন, ‘নিজস্ব বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে সেরা দল বাছাই করি আমি। যেসব খেলোয়াড়দের আমি বাছাই করি, তাঁদের পারফরম্যান্সের সব দায়িত্ব আমার।’

২০২০ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও দেশম নিজেও জানেন, এই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের উপরেই তাঁর চাকরি নির্ভর করছে। সাথে সম্প্রতি রিয়াল মাদ্রিদ থেকে জিনেদিন জিদাও সরে দাঁড়ানোয় দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাচ্ছেন অনেকেই। ১৯৯৮ এর পর আরও একটি সেরা স্কোয়াড পেয়েছে ফ্রান্স, দেশম কি পারবেন আরও একবার দেশকে শিরোপা এনে দিতে?

এই প্রজন্মের নেতা হতে পারবেন পগবা?

ফ্রেঞ্চ ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, প্রত্যেক সফল ফ্রেঞ্চ দলেরই একজন দুর্দান্ত অনফিল্ড নেতা ছিল।

১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে তৃতীয় করার পেছনে নেতার ভূমিকা পালন করেছিলেন রেমন্ড কোপা। এরপর ১৯৮২ ও ১৯৮৬ পরপর দুটি বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সেমিতে তুলেছেন মিশেল প্লাতিনি। প্লাতিনি ইউরো ১৯৮৪ ও জিতিয়েছেন নেতার মতোই।

এরপর ১৯৯৮ থেকে ২০০৬ এ মাঠের পারফরম্যান্সে নেতৃত্ব দিয়েছেন জিনেদিন জিদান। কোপা-প্লাতিনি-জিদানের পর এবার আরও একজন উত্তরসূরির খোঁজে ফ্রান্স। বর্তমান এই ফ্রান্স দলে তেমন খেলোয়াড় একজনই আছেন, পল পগবা।

১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য রবার্ট পিরেস তো সরাসরিই বলে দিয়েছেন, ‘নেতা হওয়ার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় পগবার।’

‘পগবা জানিয়েছে, ও এই দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এটাই ওর জন্য উপযুক্ত সময়। ও নেতা হতে চায়। ও এখন যথেষ্ট পরিণত, বিশ্বকাপের ভার কাঁধে নেয়ার মতো শক্তিশালীও বটে।’

‘বিশ্বকাপ জিততে হলে ফ্রান্সের সেরা ফর্মের পগবাকে চাই। ওরই এই দলকে পরিচালনা করতে হবে, এমবাপ্পে ও ডেম্বেলের মতো তরুণদের দিকনির্দেশনা দিতে হবে।’

‘পগবাই কিন্তু একমাত্র নেতা নয়। হুগো লরিস, রাফায়েল ভারানে, ব্লেস মাতুইদি ও অ্যান্টোইন গ্রিজম্যানের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়েরাও থাকছেন দলে। কিন্তু পগবাকেই হতে হবে দলের কেন্দ্র। গত বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিল ও। এবার আর তরুণ নয়, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়াটাই পগবার লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

আর মোনাকো থেকে পিএসজিতে যাওয়া এমবাপ্পের ব্যাপারে কি বলছেন পিরেস? এখনই এমবাপ্পের উপর প্রত্যাশার পারদ চাপাতে রাজি নন পিরেস, ‘ওর বয়স মাত্র ১৯। ওর সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। ওর উপর খুব বেশি চাপ দেয়াটা উচিত হবে না। এটা ওর প্রথম কোন মেজর টুর্নামেন্ট। আমি বিশ্বাস করি ও মাঠে ভালো পারফর্ম করবে, কিন্তু এটা ওর শেখারও একটা মঞ্চ।’

২০০৬ বিশ্বকাপ শেষে জিদানের অবসরের পর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যায় ভুগছে ফ্রান্স। একজন নেতা থাকলে পারফর্ম করাটা যে অনেকটাই সহজ হয়ে যায়, তার আদর্শ উদাহরণ তো জিদানই। দেশম চাইলে জিদানের শরণাপন্ন হতে পারেন। ফ্রান্সের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের মূল নায়কই যে পারেন এ যুগের পগবা-গ্রিজম্যানদের অনুপ্রাণিত করতে!

বিবিসি অবলম্বনে