রিকি পন্টিংঃ সেরা ব্যাটসম্যান নাকি সেরা ক্যাপ্টেন ! – প্রিয়লেখা

রিকি পন্টিংঃ সেরা ব্যাটসম্যান নাকি সেরা ক্যাপ্টেন !

প্রিয়লেখা.কম
Published: May 15, 2018

তিনি কি ছিলেন ? সেরা ব্যাটসম্যান নাকি সেরা ক্যাপ্টেন ? ক্রিকেটের ইতিহাসে এ রকম কয় জন মহারথী এসেছেন যাদের নিয়ে এই প্রশ্নটি উঠতে পারে ? হাতে গোনা মাত্র অল্প কয়েকজন । একটু ধারণা করুন তো কার কথা বলতে চাইছি ? কয়েকটা নাম ঘুরে ফিরে মাথায় আসছে তো ?  ঠিক আছে , একটু সহজ করে দিচ্ছি । একটা তথ্য দিলেই হবে। তিনি তার দল কে ২৩০ টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে জিতিয়েছেন ১৬৫ টিতেই । হ্যাঁ , তিনি আর কেউ নন । পরিসংখ্যানের বিচারে অস্ট্রেলিয়ার তথা ওয়ানডের  ইতিহাসের সফলতম  ক্যাপ্টেন রিকি পন্টিং । রিকি পন্টিং এর সফলতার গল্প নিয়েই আমার আজকের লেখা ।

রিকি পন্টিং এর অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেট দলে অভিষেক হয়েছিল ১৫ ই ফেব্রূয়ারী  ১৯৯৫ সালে সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে । একই বছর ৮ ডিসেম্বর শ্রীলংকার বিরুদ্ধে  টেস্ট অভিষেক হল তার । ১৯৯৬ বিশ্বকাপের রানার আপ অস্ট্রেলিয়া দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন রিকি পন্টিং। কোন ক্রিকেটবোদ্ধাই বোধহয়  এটা ভাবেননি যে অস্ট্রেলিয়ার এই রানার আপ দলেই আছে এমন দুইজন যাদের হাতে উঠতে যাচ্ছে পরের টানা তিন তিনটি বিশ্বকাপ এর শিরোপা । হ্যাঁ , ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ এর শিরোপা হাতে তুলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের আদর্শতম  ক্যাপ্টেন স্টীভ ওয়াহ । আর ২০০৩ এবং ২০০৭ এ এই শিরোপা হাতে তুলেছিলেন সদা হাস্যময় রিকি পন্টিং ।

রিকি পন্টিং জন্মগ্রহণ করেন অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ায় ১৯৭৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ছোটবেলা থেকেই তার ক্রিকেট প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় । ১৯৯২ সালে মাত্র ১৭ বছর ৩৩৭ দিন বয়সে তাসমানিয়ার হয়ে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় । ১৯৯৫ সালে ওয়ানডে এবং টেস্ট দলে অভিষেক হলেও দলে নিজের অবস্থানটি পাকা করে নিতে তার কয়েক বছর লেগে যায়। টেস্টে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কোন বছরেই তিনি ৫০০ এর উপরে রান তুলতে পারেন নি । পরের তিন বছরে তিনি অনেকটাই ধারাবাহিক হয়েছিলেন । ২০০২ সালে প্রথমবারের মত টেস্টে এক বছরে ১০০০ রানের মাইলফলক অতিক্রম করেন । আর ওয়ানডেতে ক্যারিয়ারের ২য় বছরেই ৭৩৩ রান তুলে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। ১৯৯৮  সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে এক বছরে ওয়ানডেতে করেছিলেন ১১৬৬ রান । যার পুরস্কার হিসেবে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ দলে নিজের জায়গাটি করে নেন ।১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে ১০ ম্যাচে ৩৫.৪ গড়ে মোট ৩৫৪ রান করেন । মাত্র ২৫ বছর বয়সেই  ধারাবাহিক ব্যাটিং এ ৩ নম্বর পজিশনটা নিজের করে নিতে থাকেন ।

১৯৯৯ এর বিশ্বকাপ শিরোপা হাতে পন্টিং এবং লেম্যান এর উদযাপন

২০০০ সাল টা রিকি পন্টিং এর জন্য একটু খারাপ গেলেও ২০০১ সালে ওয়ানডে এবং টেস্ট মিলিয়ে দেড় হাজার এর উপর রান তুলে নেন । এর পরের বছরই ২০০২ সালে স্টীভ ওয়াহ সীমিত ওভার এর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে রিকি পন্টিং অস্ট্রেলিয়ার সীমিত ওভার এর ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হন । এর পরপরই যেন সব সাফল্য  রুপকথার গল্পের মত অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে যেতে লাগল ।

রুপকথার শুরু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২০০২-২০০৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজ জয়ের মাধ্যমে । সেবার নিজের দেশে অজিরা ৪-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অ্যাশেজ সিরিজ জয় করে নেয় । ২০০২ এবং ২০০৩ দুটি সালই  রিকি পন্টিং  প্রতিপক্ষের বোলারদের সামনে ব্যাট হাতে রাজত্ব করেছেন । ২০০২ সালে টেস্টে তুলেছেন ১০৬৪ রান , ২০০৩ সালে ১৫০৩ । আর সীমিত ওভারে ২০০২ সালে করেছেন ৮৮২ রান , ২০০৩ সালে ১১৫৪।  এই ১১৫৪ রানের মধ্যে ২০০৩ বিশ্বকাপের প্রথম ১০ ম্যাচে করেছিলেন ২৭.৫ গড়ে ২৭৫ রান । শ্রীলংকার বিরুদ্ধে ১১৪ রানের একটি ইনিংস ছাড়া ফাইনালের আগ পর্যন্ত পন্টিং এর ব্যাট কথা বলেনি। ২০০৩ এর ফাইনালেই পন্টিং এর ব্যাট যেন সব জমানো কথা বলে দিল। ফাইনালে পন্টিং খেলেন ১২১ বলে ১৪০ রানের এক অতিমানবীয় ইনিংস। সেই ইনিংসে ছিল চারটি চার এবং আটটি ছয় । ইনিংসটি এতটাই দুর্দান্ত ছিল যে সেদিন পন্টিংকে সঙ্গ দেয়া সহযোদ্ধা ডেমিয়েন মার্টিন বিশ তম ওভারে নেমেও ৮৪ বলে ৮৮ রানে অপরাজিত থেকেছিলেন, সেঞ্চুরি করা হয়ে উঠেনি তার । তাদের ২৩৪ রানের অপরাজিত জুটিতে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৩৫৯ / ২ । পন্টিং এর নেতৃত্বে  নিজেদের তৃতীয় শিরোপা অপরাজিত ভাবে ঘরে তুলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ানরা।

২০০৪ সালে পন্টিং  ব্যাট হাতে টেস্টে করেন ৬৯৭ , ওয়ানডেতে ৮৪০ । ২০০৪ সালে স্টীভ ওয়াহ টেস্ট এর নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে নেতৃত্বের ব্যাটন চলে যায় রিকি পন্টিং এর হাতে । ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়া অ্যাশেজ সিরিজ হারলেও পন্টিং  ব্যাট হাতে টেস্টে করেন ১৫৪৪ , ওয়ানডেতে ১১৯১। ২০০৬ সালে টেস্টে ১৩৩৩ রান করলেও ওয়ানডেতে ৭৯৮ করেন । ২০০৬ সালে তার নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়া অধরা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় করে। ২০০৬ সালের ১২ ই মার্চ পন্টিং ওয়ানডেতে তার ব্যাক্তিগত সর্বাধিক ১৬৪ রানের ইনিংস খেলেন । স্নায়ুবিনাশী এই ম্যাচটিতে অস্ট্রেলিয়া ৪৩৪ রান করেও হেরে যায় । ২০০৭ সালে টেস্টে পন্টিং  ব্যাট হাতে আশাতীত রকমের খারাপ খেলেন , মাত্র ১৯২ রান করেন। কিন্তু এই ব্যর্থতা ঢেকে যায় ওয়ানডের সাফল্য দিয়ে । ২০০৭ সালে ওয়ানডেতে পন্টিং ১৪২৪ রান করেন যার মধ্যে বিশ্বকাপের  ৯ ইনিংসে ৫৯.৮৯ গড়ে মোট ৫৩৯ রান করেন । অরিন্দম বীরত্ব  দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ানরা টানা দ্বিতীয়বারের মত অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন  হওয়ার গৌরব অর্জন করে ।

২০০৭ এর বিশ্বকাপে দুর্দান্ত সব ইনিংস খেলা পন্টিং ২০০৮ এ এসে নিজেকে যেন ওয়ানডেতে হারিয়ে ফেলেন । ২০০৮ এ তার ওয়ানডে সংগ্রহ ছিল ২৭৮ রান। অবশ্য টেস্টে তিনি অনেক ভাল খেলেন , রান করেন ১১৮২। পরের বছরই পন্টিং ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়ান এবং এক বছরে ১১৯৮ রান করেন । সে বছর তার টেস্ট সংগ্রহ ছিল ৮৫৩ । ২০১০ সালে ব্যাট হাতে টেস্টে ৮১৩ , ওয়ানডেতে ৭৭১ রান করলেও তার নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া টি – ২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায় । ২০১১ সালেও তার নেতৃত্বে ওয়ানডে বিশ্বকাপের  কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে অস্ট্রেলিয়া হেরে যায় । ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর  পেশাদারি মনোভাবের পরিচয় দিয়ে পন্টিং নিজে থেকেই নেতৃত্ব ছেড়ে দেন এবং তার যোগ্য উত্তরসূরি মাইকেল ক্লার্ক কে নিজের মত করে দল গুছিয়ে নিতে সাহায্য করেন । এই মাইকেল ক্লার্ক ই পরে ২০১৫ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ পুনরূদ্ধার করেন।

একনজরে রিকি পন্টিং এর সেরা অর্জনসমূহ

  • অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে টেস্ট , ওয়ানডে , টি – ২০ মিলিয়ে সর্বাধিক ২৭,৪৮৩ আন্তর্জাতিক রান । টেস্টে অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে সর্বাধিক ১৩,৩৭৮ , ও ওয়ানডেতেও অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে সর্বাধিক ১৩,৭০৪ রান তার ।
  • টেস্টে ৪১ , ওয়ানডেতে ৩০ মিলিয়ে ৭১ টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির মালিক ।
  • টেস্টে ৬২ , ওয়ানডেতে ৮১ মিলিয়ে ১৪৩ টি আন্তর্জাতিক ফিফটির মালিক।
  • ৭৭ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে ৪৮ জয় উপহার দিয়েছেন দেশকে যা অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে সর্বাধিক। এর মধ্যে টানা ১৬ টেস্ট জয় ছিল ।
  • ২৩০ ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে জয় এনে দিয়েছেন ১৬৫ টিতেই । অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোন দেশের কেউ দলকে এত ম্যাচ নেতৃত্বই দেননি ।
  • ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ এবং ২০১১ মিলিয়ে বিশ্বকাপের টানা ৩৫ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া  ছিল অপরাজিত । ১৯৯৯ ছাড়া বাকি তিন বিশ্বকাপে পন্টিং নেতৃত্ব দেন এবং তার নেতৃত্বেই অস্ট্রেলিয়া টানা ২ বার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ।

অস্ট্রেলিয়ার সোনালী যুগের সবচেয়ে বড় সাক্ষী যেন পন্টিং । রঙিন পোষাকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ৩৭৫ বার, আর সাদা পোষাকে ১৬৮ বার। দুটিই অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে সর্বোচ্চ , যদিও সাদা পোষাকে তার সাথে এই কৃতিত্বে ভাগ বসিয়ে আছেন পন্টিংদের চিরনেতা স্টীভ ওয়াহ । এটি নিঃসন্দেহে এটাও প্রমাণ করে যে নিজের ফিটনেস এর ব্যাপারে কতটুকু যত্নবান ছিলেন তিনি । আর এই ফিটনেস এর জোরেই কিনা ওয়ানডেতে ধরেছেন ১৬০ ক্যাচ ,যা ওয়ানডেতে ফিল্ডার হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ , আর টেস্টে ধরেছেন ১৯৬ ক্যাচ ,যা টেস্টে ফিল্ডার হিসেবে  চতুর্থ  সর্বোচ্চ ।

এছাড়াও পন্টিং এর যে আরও কত রেকর্ড আছে সবটা বোধহয় পন্টিং এর অনেক ডাই হার্ড ফ্যানও জানেন না । লেখার শুরুতে একটা প্রশ্ন ছিল পন্টিং কি ছিলেন ? সেরা ব্যাটসম্যান নাকি সেরা ক্যাপ্টেন ? দুটি তথ্য দিয়ে লেখাটা শেষ করি । পন্টিংকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ৩ নম্বর ব্যাটসম্যান ধরা হয় আর অস্ট্রেলিয়ার ঘোষিত সর্বকালের সেরা একাদশে রিকি পন্টিং এর নামটি সহ অধিনায়ক হিসেবে জ্বলজ্বল করছে।

আজ এই পর্যন্তই। খুব দ্রতই আবার ফিরবো আপনাদের সামনে নতুন কোন লেখা নিয়ে ততদিন আমাদের সাথেই থাকুন।