মে দিবসের পেছনের কিছু ঘটনা - প্রিয়লেখা

মে দিবসের পেছনের কিছু ঘটনা

ahnafratul
Published: April 30, 2018

যুক্ত্ররাষ্ট্রে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই হয়ত আজকাল জানেন না যে মে দিবস কেন পালিত হয়। একটি জরিপে যখন আমেরিকানদের জিজ্ঞাসা করা হয় যে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সম্পর্কে তারা কী জানেন, বেশিরভাগই উত্তর দেন যে এটি একটি ছুটির দিন এবং কিউবা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলোতে উদ্ভব হয়েছিল মে দিবসের। এই দিবসের মূল সূতিকাগার যে নাকের ডগার শহর শিকাগো, সেটি শুনে অনেকেই বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলেছিলেন। বেজবল কিংবা অ্যাপল পাইয়ের মতো যে মে দিবস নয় এবং আধুনিক অনেক কিছুর সূচনা এখানে হলেও শ্রমিকদের প্রাণের বিনিময়ে যে এই মে দিবসের প্রাপ্তি, সেটি সম্পর্কে অনেক আমেরিকানরাই জানেন না। অনেকে মনে করেন পুনর্জন্ম ও উন্নতির একটি সময়কাল হিসেবে মে মাসের প্রথম দিনটিকে বেছে নেয়া হয়েছে।
উনিশ শতকের শেষের দিকে শ্রমিক সমাজকে দিনে পনের ষোল ঘণ্টারও অধিক খাটতে হতো এবং কাজের পরিবেশও খুব ভালো ছিল না। মৃত্যু ও কর্মক্ষেত্রে আহত হওয়া ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার এবং সেজন্য অভিযোগ জানানোরও কেউ ছিল না। আপটন সিনক্লেয়ারের দ্য জাঙ্গল ও জ্যাক লন্ডনের দ্য আয়রন হিল নামক বইগুলো এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিল। ১৮৬০ সালের গোড়ার দিকে শ্রমিকরা সবাই একবাক্যে সিদ্ধান্ত নেন যে এখন থেকে দিনে আট ঘণ্টার বেশি পরিশ্রম নয় এবং এখান থেকে তাদের মজুরী কাটাও যাবেনা। তবে ১৮৮০ সালের শেষদিকে এসে দাবিটি আরও সুসংহত হয় এবং বেগবান হয়। শ্রমিক সমাজের অনেকেই এই আন্দোলনের সাথে নিজেদের একাত্মতা প্রকাশ করতে থাকেন এবং কাজে যারা নিয়োগ দেন, তাদের কাছে নিজেদের আর্জি পেশ করতে থাকেন।


ঠিক এই সময়ে সমাজতন্ত্র নতুন একটি মোড় নিয়ে আসে পৃথিবীতে এবং শ্রমিক সমাজের কাছে একটি নতুন স্বপ্ন দেখাবার দিন শুরু করবার প্রত্যয় নিয়ে শুরু করে। শ্রমিক সমাজই সকল উৎপাদনের মালিক এবং সেগুলো বণ্টন করবার একমাত্র অধিকার কেবলমাত্র যারা উৎপাদন করছে, তাদেরই রয়েছে, এই ধারণাটি পুরো সমাজের মোড় বদলে দেয়। পুঁজিবাদের করালগ্রাসের কারণে কী ঘটতে পারে, সেটি শ্রমিক সমাজ খুব ভালোমতো বুঝতে পেরেছে এবং উৎপাদনের ষোলো আনাই যে মালিকের পকেটে যায় সেটি তাদের উদ্যমকে আরও দমিয়ে দিতে শুরু করে। এমনকি লাভ করার ফলে উৎপাদনের ন্যুনতম অংশটুকুও শ্রমিকরা পেত না। দিন রাত খেটে, কয়লার কালিতে মেখে ভূত হয়েও মালিকপক্ষের মন তারা নরম করতে পারল না। উপরন্তু রয়েছে হাজার হাজার মানুষের কান্নার ধ্বনি, শিশুদের আর্তচিৎকার আর নারীদের নিষ্পেষিত বেদনার্ত মুখ। মৃত্যুই যেখানে কাম্য, সেখানে মানুষের কান্নার ধ্বনি আর খুব বেশি কিছু আনতে পারল না। সমাজতন্ত্র ঠিক এখানেই নতুন একটি বার্তা নিয়ে এল মানুষের জন্য।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে সমাজতন্ত্র তাদের এজেন্ডাগুলো বলতে শুরু করে এবং সরকারী বিভিন্ন অফিসে তারা নিয়োগপ্রাপ্তও হতে শুরু করে। তবে বৃহৎ সমাজ কাঠামো যারা পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে খুব বেশি কিছু করতে পারল না এই দলগুলো। রাজনৈতিক চাকার ঘূর্ণনে দিকে দিকে তারাও দিশেহারা হয়ে পড়তে শুরু করল। দরকার ছিল এমন একটি আন্দোলন, দরকার ছিল এমন কিছু সুসংহত মানুষের দল যারা সমাজ ব্যবস্থাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে যে যেটি হচ্ছে, সেটি সঠিক নয়। পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ল অরাজকতা এবং পুঁজিবাদের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতেই আগ্রাসিত হতে লাগল গোটা সমাজব্যবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলো থেকে ছিটকে পড়তে শুরু করল সমাজতন্ত্রপন্থীরা।
১৮৮৪ সালে শিকাগোতে সংঘটিত হওয়া জাতীয় কনভেনশনে ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন্স এই সিদ্ধান্তে আসে যে, “১৮৮৬ সালের পর থেকে পহেলা মে শ্রমিকদের নীতিসম্মতভাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কর্ম হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে।” এর পরের বছর কিছু শ্রমিক নেতা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে ধর্মঘট ও আন্দোলনের মাধ্যমে এই দাবি আদায়ের একটি পন্থা হিসেবে অবলম্বন করা হবে। হ্যায়মার্কেট ম্যাসাকারের আগে স্যামুয়েল ফীল্ডন একটি পত্রিকায় বলেন, ‘একজন শ্রমিক দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করুক কিংবা দশ ঘণ্টা, তাকে চাকর হিসেবেই গণ্য করা হয়।’
এরপর কিছু আলাপ আলোচনা হয় যেগুলো ছিল পুরোপুরি শ্রমিকদের বিপক্ষে। পুরো শহরের শ্রমিক ফেটে পড়ে বিদ্রোহে। নির্বিচারে তাদের ওপর আঘাত করা হয়, রাস্তাঘাট করা হয় অবরুদ্ধ। পুলিশ এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মীরা শত শত শ্রমিকদের ওপর আঘাত করে। ১৮৮৬ সালের পহেলা মে ১৩,০০০ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় তিনলক্ষেরও অধিক শ্রমিক তাদের কাজ থেকে ইস্তফা দেয়।
তাদের প্রাণের বিনিময়ে ও দাবি আদায়ের সোচ্চার কণ্ঠের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই সে থেকে শুরু হলো মে দিবস পালন।