নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নেমে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন যিনি - প্রিয়লেখা

নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নেমে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন যিনি

Sanjoy Basak Partha
Published: April 19, 2018

ব্যাপারটা চিন্তা করা একটু কষ্টসাধ্যই বটে, তাই না? একজন ব্যাটসম্যানই যেখানে ডাবল সেঞ্চুরি করতে হিমশিম খেয়ে যান, সেখানে নাইটওয়াচম্যান হিসেবে নেমে একজন বোলার ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন, শুরুতে এটা অবিশ্বাস করতে পারেন যে কেউই। কিন্তু এমন ঘটনা একবার দেখেছে টেস্ট ক্রিকেট, সেটিও আবার এই একবিংশ শতাব্দীতেই। আর সেই ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নামও। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে চট্টগ্রাম টেস্টে এই কীর্তি করে রেখে গেছেন অস্ট্রেলিয়ান সাবেক পেস বোলার জেসন গিলেস্পি, যেই কীর্তি টেস্ট ক্রিকেটে নেই আর কারোর। গিলেস্পির সেই অতিমানবীয় কীর্তির এক যুগ পূর্ণ হলো সম্প্রতি। সেই উপলক্ষ্যে গিলেস্পির নিজের লেখা একটি কলাম অনুবাদ করে দেয়া হলো প্রিয়লেখার পাঠকদের জন্য। লেখাটি গিলেস্পির ভাষ্যতেই লেখা হলো।

ফতুল্লায় প্রথম টেস্টে বাংলাদেশকে পরাজিত করার পর দ্বিতীয় টেস্ট খেলার জন্য আমরা চট্টগ্রাম পৌঁছাই। আমার অ্যাডিলেড সতীর্থ ড্যান কালেনের ওই টেস্টে অভিষেক হয়েছিল। ওর জন্য ভীষণ খুশি ছিলাম আমি।

প্রথমে বোলিং করার সুযোগ পাই আমরা। বাংলাদেশকে আটকে ফেলি ১৯৭ রানেই। তিন উইকেট নিয়ে এতে অবদান রাখতে পেরে খুশিই ছিলাম আমি।

আমাদের প্রথম ইনিংসে ওপেন করতে নামলো ম্যাথিউ হেইডেন ও ফিল জ্যাকস। আমি তখন সবেমাত্র বুটজোড়া খুলে শাওয়ার নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। হঠাৎ কাঁধে একটা আলতো টোকা অনুভব করি, ঘুরে দেখি অধিনায়ক রিকি পন্টিং দাঁড়িয়ে। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, প্যাড পরতে অসুবিধা হবে নাকি আমার। আগের টেস্টে বাংলাদেশের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর তাঁর মনে হচ্ছিল, আমাদের একটি উইকেট পড়ে যেতে পারে। আমাকে তাই নাইটওয়াচম্যান হওয়ার জন্য অনুরোধ করলো রিকি।

আমি একবার চিন্তা করলাম। চারপাশে বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে ততক্ষণে, আকাশও বেশ মেঘলা। বাংলাদেশি পেসারেরা তখন বাতাসে মুভমেন্ট আদায় করে নিতে পারে। তার উপর, এটি এমন এক পিচ, যেটিতে প্রথম দিন থেকেই অসমান বাউন্স লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাথে প্রথম দিন থেকেই উইকেটের দুই পাশে স্পিন ধরেছে। এই উইকেটে ব্যাটিং করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না ব্যাটসম্যানদের জন্য।

কিন্তু এতকিছু ভাবলে তো চলতো না। আপনার অধিনায়ক এসে যখন আপনাকে কাজটা করতে বলে তখন তাতে সম্মত হওয়া ছাড়া আর কোন অপশন থাকে না হাতে। আমিও বললাম, ‘কোন সমস্যা নেই। আমি তোমার কাজ করে দিচ্ছি।’

আমি প্যাড পরে তৈরি হয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিকের বলে আউট হয়ে গেল ম্যাথিউ। উইকেটে গেলাম আমি। বোলিংয়ে ওপেন করে, ১১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে এখন আবার ওয়ান ডাউনে ব্যাট করতেও নেমেছি! কিছুটা অবিশ্বাস্যই লাগছিল আমার কাছে।

বাঁহাতি স্পিনারের বিপক্ষে মিডল স্ট্যাম্পে গার্ড নিলাম। কিছুটা ওপেন স্ট্যান্স নিয়ে দাঁড়ালাম, যেন এলবিডব্লিউয়ের সুযোগ কিছুটা হলেও কমে। নিজের স্বাভাবিক রুটিন অনুযায়ীই চললাম আমি। পেছনে ব্যাটটা টোকা দিলাম দুইবার, হাতে নিয়ে ব্যাট ঘুরালাম তিনবার। এই কাজ যে কম করে হলেও ৪০০ বার করতে হবে, তা আমি তখনো ভাবতেই পারিনি।

প্রথম বল খেললাম। চারপাশ থেকে বাংলাদেশি ফিল্ডারদের ‘আহ’, ‘ওহ’ শুনতে পেলাম। প্রথম দিনটা ফিলের সাথে মিলে কাটিয়ে দিলাম। শেষবেলাটা কাটিয়ে দিতে অনেকটা দৃঢ় চরিত্র দেখাতে হয়েছিল আমাকে।

এই দৃঢ় চরিত্র আমাকে আরও অনেকক্ষণ দেখাতে হয়েছিল। বোলারদের জন্য সুবিধাজনক ওই পিচে বাংলাদেশি বোলারের দারুণ বল করেছিল। কিন্তু তারপরেও আমি অবিচল ছিলাম। স্টাম্পের বলগুলোকে যথাসম্ভব সোজা খেলার চেষ্টা করছিলাম, আর অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বলগুলোকে কাভার ড্রাইভ করে গ্যাপে পাঠাচ্ছিলাম।

প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টার অখণ্ড মনোযোগ ধরে রাখা ইনিংসটিও একেবারে নিখুঁত ছিল না। ভুল বোঝাবুঝিতে অধিনায়ক রিকিকে রান আউট করে ফেলেছিলাম।

আমি একটা বল ফরোয়ার্ড ডিফেন্স করেছিলাম ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে। মাথা উঠিয়ে তাকিয়ে দেখি, রিকি প্রায় অর্ধেকটা চলে এসেছে। আমার তখন ক্রিজ থেকে বের হওয়ার কোন উপায়ই ছিল না, অগত্যা রিকিকেই আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরতে হলো। যেভাবে রাগে গজরাতে গজরাতে মাঠ ছাড়ছিল রিকি, আমি তখনই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, ওই ড্রেসিংরুমে আমি এত তাড়াতাড়ি ফিরতে চাই না!

তারপর শুরু হলো সেই দীর্ঘ যাত্রা! প্রথম মাইলফলক হিসেবে পার করলাম পঞ্চাশ। পরবর্তী টার্গেট তখন গ্লেন ম্যাকগ্রার সর্বোচ্চ স্কোর ৬১! ওটা পার করে যাওয়ার পর আমি ব্যাটও উঁচিয়েছিলাম!

এরপর আস্তে আস্তে নার্ভাস নাইন্টিজে ঢুকলাম। জীবনের কোন পর্যায়ের ক্রিকেটেই এর আগে এই পরিস্থিতিতে পড়িনি। আমি তাই আমার বেসিক অনুযায়ীই ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমি তাড়াতাড়ি সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে উদগ্রীব হয়ে ছিলাম, আবার এটাও জানতাম ধৈর্য হারালে চলবে না। আমি শুধু চাইছিলাম, ওয়ার্নের সর্বোচ্চ টেস্ট স্কোর ৯৯* কে পেরিয়ে যেতে!

অবশেষে শতক পেরিয়ে গেলাম। কম সংখ্যক যে দর্শক ছিল তাদের দিকে ব্যাট তুললাম, ড্রেসিংরুমের দিকেও ব্যাট দেখালাম। এরপর মাইক হাসিকে সঙ্গ দিতে লাগলাম। ও একটু দ্রুতগতিতে রান তুলছিল, আর আমি ইনিংসটাকে ধরে রাখছিলাম। আমি ওকে শান্ত করে রাখছিলাম যেন কোন ভুলভাল শট না খেলে ফেলে। শেষ পর্যন্ত যখন আউট হয়ে গেলো, তখন ওর স্কোর ১৮০। ডাবল সেঞ্চুরিটা পাওয়া উচিত ছিল ওর।

আর আমি একের পর এক লিজেন্ডদের সর্বোচ্চ স্কোর পার করে যাচ্ছিলাম। মার্ক ওয়াহর ১৫৮, ড্যারেন লেম্যানের ১৭৮, মাইকেল ভনের ১৯৭ ও স্টিভ ওয়াহর ২০০। বাংলাদেশিদের কাছে আমার ব্যাটিংয়ের জবাব দেয়ার মতো কোন অস্ত্র ছিল না। না পেস, না সুইং, না সীম, না স্পিন- কোন কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না।

অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, রফিককে চার মেরে ১৯৭ থেকে পৌঁছে গেলাম ২০১* এ! এরপর রিকি ইনিংস ঘোষণা করে দিল। দুইশ করার সময় অপর প্রান্তে ছিল মাইকেল ক্লার্ক, আমার জন্য খুব খুশি হয়েছিল ও। ড্রেসিংরুমে যখন ফিরছিলাম, রিকি আমার কানের কাছে এসে বলেছিল, ‘এভাবেই ডাবল সেঞ্চুরি করতে হয়!’