শেন বন্ড : পুলিশ হয়েও বল হাতে আগুন ঝরানো গতিদানবের গল্প - প্রিয়লেখা
শেন বন্ড

শেন বন্ড : পুলিশ হয়েও বল হাতে আগুন ঝরানো গতিদানবের গল্প

Sanjoy Basak Partha
Published: February 28, 2018

নিউজিল্যান্ড পুলিশের দুর্ভাগ্য বলবেন, নাকি পুরো ক্রিকেট দুনিয়ার সৌভাগ্য, সেটার ভার আপনার উপরেই ছেড়ে দিলাম। নিউজিল্যান্ড পুলিশের দুর্ভাগ্য এই অর্থে, শেন বন্ড কে নিজেদের বাহিনীর সদস্য হিসেবে পেয়েও ধরে রাখতে পারেনি। আর পুরো ক্রিকেট দুনিয়ার সৌভাগ্য এই অর্থে, পুলিশে থেকে গেলে এই গতিদানবকে আর পাওয়া হত না ক্রিকেট বিশ্বের!

২৪ বছর বয়সে হাল ছেড়ে দিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন পুলিশ বাহিনীতে। কিন্তু শেন বন্ডের কপালে লেখা ছিল তিনি ক্রিকেটার হবেন, কপালের লিখন আর খন্ডায় কে! পুলিশে গিয়ে অবসর সময়ে ক্রিকেট খেলতে খেলতে আবার পুরানো নেশা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এরপরের গল্পটা শুধুই একজন স্পীডস্টারের। শেন বন্ড এর জীবনের গল্প তাঁর নিজের মুখেই বরং শোনা যাক।

ক্যারিয়ারে এতবার ইনজুরিতে পড়েছেন, তারপরেও খেলা চালিয়ে গেছেন। অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কোত্থেকে?

শেন বন্ড : আমার শুরুটাই তো হয়েছিল দেরিতে, ২৬ বছরের দিকে। কৈশোরে আমার পিঠের ইনজুরিতে পড়েছি অনেকবার। এর মূল কারণ ছিল আমি একদমই ফিট ছিলাম না, আর খুব অলস ছিলাম। একবার যখন ক্রিকেট ছেড়ে পুলিশে যোগ দিলাম, কেবল তখনই বুঝতে পারলাম ক্রিকেটকে আমি কতটা মিস করছি। আমার মনে হল আমি নিজের সাথে সুবিচার করিনি। তো এরপরে যখন সুযোগটা পেলাম, সেটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। যতটা সম্ভব উপভোগ করতে চেয়েছি আমি। যখন মনে হয়েছে আর কিছু দেয়ার নেই আমার, তখন অবসর নিয়েছি।

আপনি, ব্রেট লি আর শোয়েব আখতার ছিলেন ওই সময়ের গতিতারকা। খেলা শুরুর সময় কি ভাবতে পেরেছিলেন কখনো এমন গতিতে বল করতে পারবেন?

শেন বন্ড : আমি ছোট থেকেই মোটামুটি জোরে বল করতাম, কিন্তু গতি মাপার জন্য কোন যন্ত্র ছিল না। মিডিয়াম পেস বোলার ছিলাম আরকি। ২৪-২৫ বছরের দিকে আমি জেনুইন গতিতে বল করা শুরু করি। অভিষেক টেস্টে আমি আমার বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছি স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে, কত জোরে বল করলাম তা দেখার জন্য। বেশিরভাগ সময়েই চেষ্টা করতাম পরের ম্যাচেই এটা ছাপিয়ে আরও জোরে বল করতে। যেকোনো জেনুইন পেস বোলারের বেলায়ই কিন্তু এটা ঘটে। তারা স্ক্রীনের দিকে তাকাতে পছন্দ করে, কত জোরে বল করছে তা দেখতে পছন্দ করে।

দেরিতে শুরু করলেও রাতারাতি তারকাখ্যাতি পেয়ে গিয়েছিলেন আপনি। কখনো চাপ হয়ে বসেছিল এই তারকাখ্যাতি? 

শেন বন্ড : তেমন কিছু হয়নি আমার সাথে। আমার কিছু দারুণ বন্ধু ছিল। আমার মনে হয় নম্র ভদ্র হওয়া এটা নিউজিল্যান্ডের সব মানুষের মধ্যেই আছে। আপনি যখন ক্রিকেট টিমের সাথে থাকবেন, বাকি দুনিয়া থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। নামীদামী হোটেলে থাকবেন, মানুষজন আপনার পেছন পেছন ছুটবে। কিন্তু আমি এর আগে আরও একটি পেশায় কাজ করে এসেছি। উপার্জন করতে কেমন কষ্ট তা আমি বুঝে এসেছি। ক্রিকেটে কম বেশি যাই আয় করতাম, আমি পুলিশে থাকাকালীন আয়ের কথা ভাবতাম। আমি জানতাম এক সময় না এক সময় তো খেলা ছাড়তেই হবে, তখন আবার আগের পৃথিবীতেই ফিরে আসতে হবে। টাকা দেখে বিগড়ে যাওয়ার তাই কোন মানেই হয় না।

শেন বন্ড

অস্ত্রোপচারের পর আপনি অ্যাকশনে কিছুটা বদল এনেছিলেন, কিন্তু গতির সাথে কোন আপোষ করেননি…

শেন বন্ড : রিহ্যাবের সময়েই অ্যাকশন বদল নিয়ে কাজ করেছিলাম। ফিরে এসে আমার নিজের ৮০-৯০% দিতেও কষ্ট হত অনেক। দৌড়ে এসে জোরে বল করা- দলে সবসময় আমার ভূমিকা এটাই ছিল। জোরে দৌড়ে এসে জোরে বল ছোঁড়া, এই অনুভূতিটা আমি খুব পছন্দ করতাম। কিন্তু সবসময় এভাবে বল করলে আপনার চোটে পড়ার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়। কেউ কেউ আছে যারা অন্য অনেকের তুলনায় কম ইনজুরিতে পড়ে, দুর্ভাগ্যবশত আমি সেরকম ছিলাম না। এ কারণেই আমার ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় ইনজুরিতে পড়েই নষ্ট হয়েছে।

কার বিপক্ষে বোলিং করতে পছন্দ করতেন?

শেন বন্ড : আমার সতীর্থদের বিপক্ষে বল করতেই বেশি পছন্দ করতাম। গ্রেট খেলোয়াড়দের বিপক্ষে বল করা অবশ্যই আনন্দের, কিন্তু আমি স্কট স্টাইরিস কিংবা জ্যাকব ওরাম কিংবা ড্যারিল টাফির বিপক্ষে বল করতেই ভালবাসতাম (হাসি)।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মিস করেন?

শেন বন্ড : চেঞ্জরুমে বসে দারুণ সব কৌতুক শোনার সময়টা সত্যিই স্মরণীয় ছিল। অন্য দেশেরটা জানিনা, কিন্তু নিউজিল্যান্ড দলের ড্রেসিংরুমের আবহ কখনো বদলায় না, সবসময় একইরকম থাকে। ড্রেসিংরুমে গিয়ে বসলেই হলো, সবাই মিলে জ্বালানো আরম্ভ করে দেবে। সতীর্থদের সাথে এই খুনসুটিগুলোই সবচেয়ে বেশি মিস করি।

শেন বন্ড

খেলোয়াড় থেকে কোচ হয়েছেন, খেলাটার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে কি কোন প্রকার বদল এসেছে?

শেন বন্ড : খেলোয়াড় হিসেবে বোধহয় কিছুটা স্বার্থপর ছিলাম। স্বার্থপর এই অর্থে, আমি নিজে কি করতে চাই সেটা নিয়েই ভাবতাম বেশিরভাগ সময়। এটা যে দলের উপর কোন খারাপ প্রভাব ফেলত তা কিন্তু না, আমি ভাবতাম আমি ভালো করলে তো দলও ভালোই করবে! কিন্তু কোচ হিসেবে দৃষ্টিভঙ্গিটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখানে আপনাকে দলের জন্য ভাবতে হবে, দলের সবার জন্য আলাদা আলাদাভাবে ভাবতে হবে। খেলোয়াড়দের আচরণ সামলানো, তাদের পছন্দ-অপছন্দ সামলানো- সবই করতে হয়। খেলোয়াড়ি জীবনে ভাবতাম ‘আমি’ নিয়ে, আর কোচিং জীবনে ‘আমরা’ নিয়ে, এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

বিভিন্ন ফরম্যাটের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনটি?

শেন বন্ড : শর্টার ফরম্যাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হল চাপের সাথে মানিয়ে নেয়া। ছয় খাওয়ার পর কোন বোলার মানিয়ে নিতে পারে, কোন বোলার পারে না। আর এখানেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চাপের সময়েও যদি আপনি ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারেন, আপনার সফলতার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।

শেন বন্ড

ফিটনেসের ব্যাপারে সঠিক পথে আছে কিনা এ ব্যাপারে একজন ফাস্ট বোলার নিশ্চিত হবে কিভাবে?

শেন বন্ড : রুটিন মেনে চলতে হবে। আর এটা মেনে চলার জন্য নিজেকে অনুপ্রাণিতও করতে হবে। শৃঙ্খলা একটা বড় বিষয়। গাইডলাইন দেয়ার জন্য ভালো ট্রেনার, ফিজিও দরকার। এছাড়া ছোটখাটো বিষয়গুলো, যেমন কখন আপনার বিশ্রাম দরকার, কতটুকু বিশ্রাম দরকার এগুলো আপনাকে নিজে থেকেই ঠিক করে নিতে হবে। একজন বোলিং কোচ হিসেবে আপনি আপনার বোলারদের এ বিষয়ে সাহায্য করতে পারেন। শিডিউল এখন এত ব্যস্ত, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময়ের জন্য ফর্ম ধরে রাখা আসলেই খুব কঠিন।

একজন উঠতি ফাস্ট বোলারের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

শেন বন্ড : সময় নাও। অনেকেই শীর্ষে উঠার জন্য খুব বেশি তাড়াহুড়া করে ফেলে। এটা অনেকটা ওয়ানডে ম্যাচের মত। শুরুতে সময় নাও, তারপর সময় বুঝে চালিয়ে খেল। ১৮-১৯ বছরের পেস বোলারদের জন্য এটাই হবে আমার উপদেশ। কেউ কেউ দুই বছরের মধ্যেই জাতীয় দলে চলে আসবে, আবার কেউ কেউ আমার মত ২৬ এও আসবে। কিন্তু তাও কিন্তু ১০ বছর খুব ভালোভাবে পারফর্ম করা সম্ভব। নিজের মত পরিকল্পনা সাজাও, কিন্তু কখনোই বেশি তাড়াহুড়া করো না। ধাপে ধাপে এসো, নিজেকে আরো শাণিত করতে থাকো প্রতিটি ধাপে।

ক্রিকবাজ অবলম্বনে

 

.

.