মোঘল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আকবর 'দ্য গ্রেট' - প্রিয়লেখা

মোঘল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আকবর ‘দ্য গ্রেট’

ahnafratul
Published: January 21, 2018

এই উপমহাদেশে যুগে যুগে কালে কালে এসেছে বহু শাসনামল। ইতিহাসের পাতাটা কখনোই সুগম ছিল না। কখনো হতে হয়েছে রক্তে রঞ্জিত কিংবা কখনো হতে হয়েছে ঘটনাবহুল। তবে একবাক্যে সকলেই স্বীকার করবেন যে মোঘল শাসনামলই এই উপমহাদেশের পুরো খোলচলচে বদলে দিতে যথেষ্ট অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এদের মধ্যে একটি নামই হয়তো আপনাদের মনে এখন ঘোরাফেরা করছে। সম্রাট আকবর, আকবর দ্য গ্রেট। জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবর ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। সম্রাট হুমায়ূনের যোগ্য পুত্র ও সম্রাট বাবরের পৌত্র আকবর কঠোর নীতি ও সুশাসনের মাধ্যমে এই উপমহাদেশের মানচিত্রে নানা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ১৫৫৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করে সম্রাট আকবর মোঘল সালতানাতের ভার নিজের হাতে তুলে নেন। বৈরাম খানের সহযোগিতায় ভারতবর্ষের অধিকাংশ স্থান ও আফগানিস্থানে নিজের শাসন কায়েম করেন। তবে ১৫৬০ সালে আকবর তার শ্রদ্ধাভাজন ও অভিভাবক বৈরাম খানকে সরিয়ে পুরোপুরি শাসনের ভার নিজের হাতে তুলে নেন। সেটি আরেক গল্প। আসুন, আজ প্রিয়লেখার পাতায় মহান এই শাসক সম্পর্কে কিছু জেনে নেয়া যাক।

নিরক্ষর আকবর

সমগ্র ভারতবর্ষের একচ্ছত্র অধিপতি আকবর দ্য গ্রেট ছিলেন নিরক্ষর। লিখতে পড়তে জানতেন না তিনি, তবে অসম্ভব তীক্ষ্ম স্মৃতিশক্তি ছিল তার। একবার যা দেখতেন বা শুনতেন, তাই মনে রাখতে পারতেন। কেউ কেউ বলেন মাত্র ১৩ বছরেই নিজের কাঁধে সমগ্র শাসনের ভার চলে আসবার চাপে কখনো পড়াশোনা করবার সুযোগ হয় নি আকবরের। কেউ কেউ বলেন আকবরের ডাইস্লেক্সিয়া নামক একটি রোগ ছিল। এই কারণে পড়তে গেলে কখনোই তিনি অক্ষরগুলো ঠাহর করতে পারতেন না, যে কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি তার। তবে নিজে পড়াশোনা না করলেও আকবর শিক্ষিত ও জ্ঞানী গুণীদের বেশ সমাদর করতেন। তার সভাকে অলংকৃত করেছিলেন ইতিহাস বিখ্যাত নবরত্ন।

শিকারী আকবর

শিকার করতে সম্রাট আকবর খুব পছন্দ করতেন। তিনি যখন শিকারে যেতেন, সাথে খুবই অল্প লোক রাখতেন। কখনো কখনো একা একাই শিকারে চলে যেতেন। কথিত আছে, ১৯ বছর বয়সে আকবর একটি সিংহীর শিকার করেছিলেন, তাও শুধু একটি তলোয়ারের সাহায্যে। বাঘ, সিংহ, চিতা, বন্য বাইসন, এমনকি হাতিও শিকার করতেন আকবর। এসব শিকার করতে গিয়েই একবার মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। তবে স্রষ্টার অসীম কৃপায় এবং কিছুটা অলৌকিকভাবেই সেরে ওঠেন তিনি। এই কারণে অনেকেই ভেবে থাকেন যে ৬৩ বছর বয়সে আকবরের মৃত্যুবরণ করাটা কিছুটা অদ্ভুত। নিজের শিকার সম্পর্কে লিখে রাখতে বা চিত্রের সাহায্যে অঙ্কন করে রাখতে পছন্দ করতেন আকবর।

নবরত্ন

সম্রাট আকবর বিশ্বাস করতেন কোন রাজসভা অলংকৃত হতে পারে বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার সাহায্যে। এজন্য রাজসভার সোনাদানা, হীরা মাণিক্যের চাইতে আকবর গুণীর কদর করতেন বেশি। নবরত্ন তার সভাকেই অলংকৃত করেছিল। নবরত্নের তালিকায় যারা যারা ছিলেন, তারা হচ্ছেন- বীরবল, তানসেন, টোডরমল, আবুল ফযল, রাজা মান সিংহ প্রমুখ। তবে অনেকেই জানেন না, আবদুল রহিম খান ই খানান ওরফে রহিম তার বিখ্যাত সব শ্লোকের জন্য নবরত্নের এক সদস্য হিসেবে আকবরের রাজসভায় থাকতেন। এই রহিম ছিলেন বৈরাম খানের পুত্র, যাকে আকবর দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

চমৎকার স্থাপত্যশৈলী

আকবরের শাসনামলে গড়ে ওঠা স্থাপত্যগুলো দেখলেই মনে হবে এটি যে স্বয়ং আকবরকেই নির্দেশ করছে। তার রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি ১৯৮৬ সালে পৃথিবীর দর্শনীয় স্থানগুলোর তালিকায় জায়গা পায় এবং রানী যোধা বাই, তানসেন কিংবা বীরবলের জন্য তৈরি বাসভবনগুলোও দেখতে অতুলনীয়। অনেকেই বলেন আকবরের স্থাপত্যের মাঝে কিছুটা নিজ ধর্মের প্রতি বেশিমাত্রায় টান প্রকাশ পায় কিন্তু হিন্দু কিংবা মুসলমান, দুই ধর্মের নিকট হতেই এই স্থাপত্যগুলোর উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়াও বুলন্দ দরওয়াজা এবং জামে মসজিদের নির্মাণশৈলী করেছে ইতিহাসকে মুগ্ধ।

কঠোর অনুশাসন

কেবলমাত্র শৌর্য-বীর্য বা অসীম সাহসই একজন শাসককে মহান করে তোলে না। এরজন্য চাই কঠোর অনুশাসন ও নিয়মকে মান্য করা। আকবর কঠোরভাবেই তা মেনে চলতেন। দিনে ঘুমুতেন মাত্র সারে চাড় ঘণ্টা। রাতে তিন ঘন্টা ও দুপুরে দেড় ঘন্টা ঘুমুনো আকবর মনে করতেন মূল্যবান কিন্তু সংক্ষিপ্ত এই জীবনটিকে কেবলমাত্র ঘুমিয়ে নষ্ট করলে চলবে না। মধ্যবয়সে এসে শাকাহারী হয়ে যান আকবর। মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন। হাঁটতে পছন্দ করতেন তিনি। মথুরার শিকার ভূমি থেকে একবার বিশাল লোকলস্কর নিয়ে পায়ে হেঁটে আগ্রা রওনা দিয়েছিলেন তিনি। যাত্রাপথ ছিল প্রায় ষাট কিলোমিটারের মতো। এতোটাই দ্রুত হেঁটেছিলেন যে শেষপর্যন্ত তার সাথে মাত্র দুজন লোক তাল মিলিয়ে চলতে পেরেছিল!

নিজের খেয়াল বা হারেমের নারী, সবদিকেই আকবরের ছিল সমান ঝোঁক। রাজ্য শাসন করবার সময় তার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত মানুষের উপকারে এসেছে। জিজিয়া কর সরিয়ে দেয়া, হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করা, হজ্বের সময় যাতে মুসলমানদের কষ্ট কম হয়, সেজন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা, দ্বীন ই এলাহী প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি কাজ আকবরকে করেছে জনপ্রিয়। তবে প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, ঠিক তেমনি আকবরের মাঝেও যে কোন দোষ বা কালিমা ছিল না, তা কিন্তু মোটেই বলা যাবে না। তবুও, ইতিহাসের পাতায় তিনি ‘আকবর দ্য গ্রেট’ এক মহান শাসক।

(ফিচারটি লেখা হয়েছে এই সাইটের সাহায্যে)