বিখ্যাত সিনেমার পর্দার অন্তরালের মজার ২৫টি গল্প - প্রিয়লেখা

বিখ্যাত সিনেমার পর্দার অন্তরালের মজার ২৫টি গল্প

farzana tasnim
Published: January 16, 2018

রূপালী পর্দায় কত সহজেই আমরা নায়ক-নায়িকার প্রেম, ভিলেনের সাথে হিরোর যুদ্ধ, বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যকার মানসিক টানাপোড়েন এমনি আরও নানা ধরনের দৃশ্য দেখি। সেকেন্ডের মধ্যে বদলে যাওয়া ফ্রেম দেখে আমরা কল্পনাও করতে পারি না এই দৃশ্যগুলো নির্মাণের পেছনে রয়েছে কত বড় একেকটি গল্প। চরিত্রগুলো যেমন গড়গড় করে একের পর এক লাইন বলতে থাকে, তেমনি সহজভাবে যদি সিনেমা বানানো যেত তবে পরিচালকরা প্রতিদিন সকাল-বিকাল-সন্ধ্যায় দু’-তিনটি করে চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলতেন! বেশির ভাগ সময় ক্যামেরার সামনের চেয়ে পেছনেই বেশি গল্প তৈরি হয়। আর ক্যামেরার পেছনের এই গল্পগুলো যে পাল্টে দিতে পারে গোটা সিনেমার ভবিষ্যৎ, তার কিছু নমুনা নিয়েই সাজানো হলো আমাদের আজকের আয়োজন।

১) স্টিফেন কিংয়ের সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘ইট’ অনুযায়ী পেনিওয়াইজ দ্য ক্লাউন প্রতি ২৭ বছর পর পর ঘুম থেকে জেগে ওঠে। উপন্যাস অবলম্বনে প্রথমবারের মতো সিনেমা বানানোর উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৯০ সালে। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হতে হতে চলে যায় আরও ২৭ বছর। অবশেষে ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মুক্তি পায় সুপারন্যাচারাল হরর মুভি ‘ইট’ যেখানে পেনিওয়াইজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিল স্কার্সগার্ড। ২৭ বছর আগে যখন সিনেমাটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, তখন এই অভিনেতা মাত্র ধরণীতে অবতরণ করেছিলেন!

২) পেনিওয়াইজের কথাই আবার বলা যাক। বাস্তব জীবনের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার এবং ধর্ষক জন জোসেফ গ্যাসির চরিত্র অবলম্বনে তৈরি করা হয়েছে এই চরিত্রটি। জোসেফ ক্লাউন বা ভাঁড়ের ছদ্মবেশ নিয়ে বাচ্চাদের পার্টিগুলোতে গিয়ে হাজির হতো। নিজেকে সে ঐ পার্টির বা সোসাইটির সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে অসুস্থ বাচ্চাদের সেবা করতো, দরিদ্র তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতো। তবে তার এই ছদ্মবেশের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা খুনিটিকে খুঁজে বের করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। ‘দ্য কিলার ক্লাউন’ বা ‘পোগো দ্য ক্লাউন’ খ্যাত দুর্ধর্ষ সেই খুনির ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘ইট’ সিনেমার ভয়ংকর চরিত্রটি।

৩) পিক্সার নির্মিত সিনেমা ‘আপ’ এর প্রধান চরিত্র কার্লের বাড়িটি বাতাসে ভাসিয়ে নিতে ২০,৬২২টি বেলুন ব্যবহৃত হয়েছে। বাস্তবে একটি বাড়ি শূন্যে ভাসাতে লাগবে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন বেলুন! আর এই পুরো সিনেমা জুড়ে বিভিন্ন দৃশ্যে প্রায় ১০,২৯৭টি বেলুন ব্যবহার করা হয়েছে।

৪) ডায়নোসরদের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রটি বাচ্চা থেকে বড় প্রায় সবারই পছন্দের সিনেমার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। আপনি জানেন কী, সিনেমাটিতে ভেলোসিরেপ্টোরের কণ্ঠের জন্য সঙ্গমরত কচ্ছপের আওয়াজ ব্যবহার করা হয়েছিল?

৫) ‘দ্য লায়ন কিং’ সিনেমাটি নায়ক চরিত্রে অবতীর্ণ হয় ‘সিম্বা’, আর ভিলেনের বেশে ছিল তিন হায়েনা ‘শেঞ্জি’, ‘বেঞ্জাই’ এবং ‘এড’। তো এই ভিলেনবেশী হায়েনাকে দেখে কোনোমতেই মেনে নিতে পারেনি এক বিশিষ্ট হায়েনা গবেষক। সিনেমায় খলচরিত্রে হায়েনাকে প্রদর্শন করে হায়েনাদের মানহানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি!

৬) আপনি জানেন কী, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, উইল স্মিথ, নিকোলাস কেজ এবং জনি ডেপের মধ্যে দারুণ একটি মিল আছে? তারা সবাই ‘ম্যাট্রিক্স’ সিনেমায় নিও চরিত্রটির জন্য মনোনীত হয়েও সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

৭) ‘টাইটানিক’ দেখেননি এমন সিনেমাপ্রেমী খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। জ্যাক আর রোজের অনবদ্য এই প্রেমকাহিনীর একটি দৃশ্যে রোজের ছবি আঁকছে জ্যাক, এমনটাই দেখা যায়। মজার বিষয় হলো, ঐ হাতটি আসলে ‘অ্যাভাটার’, ‘টাইটানিক’, ‘টার্মিনেটর’খ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরনের। শুধু তাই নয়, জ্যাকের হয়ে এই মুভিতে ব্যবহৃত প্রতিটি স্কেচ এঁকেছেন ক্যামেরন। বাস্তব জীবনে তিনি বাঁহাতি হওয়ায় এই দৃশ্যগুলো পরবর্তীতে আয়নার প্রতিফলনের মতো উল্টে দেয়া হয়েছে।

৮) নব্য-নোয়া (Neo-noir) ঘরানার চলচ্চিত্র ‘দ্য বিগ লেবোস্কি’ মুক্তি পায় ১৯৯৮ সালে। গোটা মুভিটিতে ‘ডিউড’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৬১ বার এবং ফ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দগুলোর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৯২!

৯) শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘হোম অ্যালোন’এর জনপ্রিয়তা শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে বাজ (কেভিনের ভাই) চরিত্রের যে মেয়েবন্ধুকে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়, আদতে তিনি একজন ছেলে! এই চরিত্রটির জন্য সত্যিকারের একটি বাচ্চা মেয়েকে কাস্ট করা কিছুটা নিষ্ঠুর হবে মনে করে পরিচালক সেই অংশটিতে একটি ছেলেকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন।

১০) হ্যারি পটার সিরিজের জনপ্রিয় মুভি ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অফ ফায়ার’। ছবিটির শেষ দৃশ্যে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এক পর্যায়ে দেখানো হয়- ‘No dragons were harmed in the making of this movie’ অর্থাৎ মুভিটি নির্মাণের সময় কোনো ড্রাগন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি! আমরাও আশা করি সেটাই যেন সত্যি হয়।

১১) ‘ওয়ান্ডার উইম্যান’খ্যাত অভিনেত্রী গ্যাল গ্যাডোটকে সিনেমাটির বেশ দৃশ্য পুনরায় শ্যুট করতে হয়। কেননা সে সময় তিনি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি যে সত্যিই একজন ওয়ান্ডার উইম্যান তা প্রমাণ করতেই যেন ঐ অবস্থাতেও বেশ কিছু অ্যাকশন দৃশ্য একাধিকবার শ্যুট করেন গ্যাল।

১২) ২০১৬ সালের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র ‘লা লা ল্যান্ড’ এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার খুব একটা সুযোগ নেই। এই সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে অস্কার পেয়েছেন এমা স্টোন। এমা স্টোন চিত্রায়িত চরিত্রটির জন্য কিন্তু শুরুতে এমা ওয়াটসনের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে তিনি ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সুযোগটি তার হাতছাড়া হয়ে ধরা দেয় এমা স্টোনের কাছে। কে জানে, সিনেমাটি ফিরিয়ে দিতে না হলে আজ হয়তো এমা ওয়াটসনের ঝুলিতেও থাকতো একটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড!

১৩) ক্যামেরন ডায়াজ তার অভিনয় জীবনের শুরু করেন ‘দ্য মাস্ক’ সিনেমায় টিনা চরিত্রটির মাধ্যমে। এই চরিত্রে নির্বাচিত হওয়ার আগে তাকে আরও ১২ বার অডিশনের মুখোমুখি হতে হয়, শেষ পর্যন্ত শ্যুটিং শুরু হওয়ার ঠিক ৭ দিন আগে তাকে নির্বাচিত করা হয়।

১৪) ‘টোয়ালাইট’ সিনেমার একটি দৃশ্যের কথা মনে আছে, যেখানে বেলা আর চার্লি একটি রেস্টুরেন্টে বসে থাকে? তাদের ঠিক পেছনেই ল্যাপটপ হাতে বসে থাকেন বাদামি চুলের এক ভদ্রমহিলা। এই ভদ্রমহিলা আর কেউ নন, স্বয়ং ‘টোয়ালাইট’ বইয়ের লেখিকা স্টিফেনি মেয়ার।

১৫) ১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘টোটাল রিকল’ চলচ্চিত্রটিতে একসাথে অভিনয় করেন আর্নল্ড শোয়ার্জনিগার এবং মাইকেল আইরনসাইড। শোয়ার্জনেগার খেয়াল করছিলেন শ্যুটের ফাঁকে ফাঁকে কারো সাথে যেন সারাক্ষণ ফোনে কথা বলে চলেছেন আইরনসাইড। কথাটি সরাসরি আইরনসাইডকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, তার বোন ক্যান্সারে আক্রান্ত। অসুস্থ বোনের খোঁজখবর নিতেই ফোনে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। সাথে সাথে শ্যুটিং থেকে তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন শোয়ার্জনেগার। আইরনসাইডের বাড়িতে গিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তার বোনকে বললেন কী ধরনের ব্যায়াম করলে, খাবার খেলে কিছুটা সুস্থ বোধ করা সম্ভব। শোয়ার্জনেগারের এই বদান্যতা আইরনসাইড বা তার বোন কখনোই ভুলতে পারেননি।

১৬) হরর সিনেমার জগতে বেশ জনপ্রিয় একটি নাম ‘দ্য এক্সোরসিস্ট’। একে তো ভয়ের মুভি, তার উপর অভিনেতা উইলিয়াম ফ্রিডকিন শ্যুটিং বিরতির মাঝে বারবার ফাঁকা গুলির আওয়াজ ছুঁড়ে সবাইকে চমকে দিতে লাগলেন। দিনের আলোতেই অভিনেতারা এমন ঘাবড়ে গেলেন যে, বাধ্য হয়ে তাকে এক প্রকার জোরপূর্বক থামিয়ে দেয়া হলো। তাদের কাছে ব্যাপারটা মোটেই হাস্যকর ছিল না। হাস্যকর ছিল না পরিচালকে কাছেও। কেননা, উইলিয়ামের মজা করে সবাইকে ভয় দেখানোর পর অভিনেতারা যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলেন, পরবর্তীতে সিনেমায় সেই প্রতিক্রিয়াগুলোই ফ্রেমবন্দী করে দেখানো হয়।

১৭) ‘দ্য প্রিন্সেন ব্রাইড’ সিনেমাটির শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে ম্যান্ডি প্যাটেনকিন্সের বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে তিনি যখন সেটে ফেরেন, তখন ম্যান্ডি ছয় আঙুল বিশিষ্ট লোকটিকে মেরে ফেলবে- এই দৃশ্যটি ধারণ করার কথা। এই দৃশ্যে একটি সংলাপ ছিল এরকম, ‘আমি আমার বাবাকে ফেরত চাই’, এই কথাটি বলার সময় চোখে যেন আগুন জ্বলে ওঠে বাস্তব জীবনে একই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এই অভিনেতার।

১৮) ‘ফাইট ক্লাব’ সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল ধারাবাহিকভাবে। সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় এডওয়ার্ড নর্টন বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন প্রায় অনাহাররূপী এক ডায়েটে, সূর্য থেকে দূরে দূরে থেকে। অন্যদিকে ব্র্যাড পিটের সময় কেটেছে জিমে, রোদে পুড়ে ট্যান হয়ে।

১৯) ব্রুস ক্যাম্পবেলের ডায়েরি মোতাবেক, ‘দ্য ইভিল ডেড’ সিনেমাটি যে কেবিনে শ্যুট করা হয়েছিল, সেখানে সত্যি সত্যি ১৯৩০ সালে এক ব্যক্তি খুন হন।

২০) ‘ওয়েন্স ওয়ার্ল্ড’ সিনেমার পুরো কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল এক মাসেরও কম সময়ে। কেননা, এই সিনেমায় ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিস কারো না কারো কাছ থেকে ধার করে অ্যানা হয়েছিল!

২১) কালজয়ী সিনেমা ‘দ্য শশাঙ্ক রিডাম্পশন’ এর একটি দৃশ্যে দেখা যায়, অভিনেতা মরগান ফ্রিম্যান একটি কাককে শূককীট বা লার্ভা খাওয়াচ্ছেন।  দ্য আমেরিকান হিউম্যান অ্যাসোসিয়েশন তাদেরকে বাধ্য করে প্রাকৃতিক কারণে মারা গেছে এমন একটি লার্ভা ব্যবহার করতে। আর যদি তা না করা হয়, সিনেমার শেষে ‘এই সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় কোনো পশুপাখি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি’- এই ঘোষণাটি লিখতে দিতে রাজি হয়নি তারা। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাদের কথা মতোই কাজ করেন পরিচালক।

২২) ‘গার্ডিয়ান অফ দ্য গ্যালাক্সি’ সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় বেশ কিছু দৃশ্য একাধিকবার ধারণ করতে হয়। কারণ, অভিনেতা ক্রিস প্র্যাট হাতে রেগান নিয়ে গুলি করতে গেলেই মুখ দিয়ে ‘পিউ পিউ’ জাতীয় শব্দ করছিলেন!

২৩) ‘দ্য প্যাশন অফ দ্য ক্রাইস্ট’ সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় যীশুর চরিত্রে অভিনয় করা জিম ক্যাভিজেল, সহকারী পরিচালকসহ তিনজন কলাকুশলী বজ্রাহত হন।

২৪) পাহাড়ে-পর্বতে ঘেরা নিউজিল্যান্ডে ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ সিনেমার বেশ কয়েকটি দৃশ্য ধারণ করা হয়। পাহাড়ের উপরের সেটে কাজ করার সময় অভিনেতা সিন বিন হেলিকপ্টারে চড়ে সেটে যাওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। কারণ তিনি উড়ন্ত কোনো যানবাহনে উঠতে প্রচণ্ড ভয় পান। কাজেই ভারী বর্ম পরে, পুরোপুরি তৈরি হয়ে প্রতিদিন ঐ উঁচু উঁচু পাহাড়ে পায়ে চড়ে সেঁটে পৌঁছাতেন বেচারা!

২৫) ‘লা মিজারেবল’ সিনেমার প্রথম দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য খ্যাতিমান অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান প্রায় ৩৬ ঘণ্টা এক ফোঁটা পানিও পান করেননি!