হোটেল সেসিল : লস অ্যাঞ্জেলসের হানাবাড়ির আদ্যোপান্ত - প্রিয়লেখা

হোটেল সেসিল : লস অ্যাঞ্জেলসের হানাবাড়ির আদ্যোপান্ত

farzana tasnim
Published: January 13, 2018

লস অ্যাঞ্জেলস শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অন্যতম ব্যস্ত একটি সড়ক ডাউনটাউন, আর এখানে রয়েছে হরর ইতিহাসের কুখ্যাত একটি হোটেল ‘ সেসিল ‘। ১৯২৭ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকে দুর্ভাগ্য আর রহস্য যেন পিছু ছাড়েনি হোটেলটির। অস্বাভাবিক ১৬টি মৃত্যুর সাথে জড়িয়ে রয়েছে এই হোটেলের নাম। অতিপ্রাকৃত আর ব্যাখ্যাতীত সব ঘটনার কেন্দ্রস্থল সিসেলি জন্ম দিয়েছে কুখ্যাত কিছু ভিলেনেরও। চলুন তবে জেনে আসা যাক সিসেল হোটেলের আদ্যোপান্ত।

১৯২৪ সালে নির্মাণ করা হয় হোটেল সেসিল। উইলিয়াম ব্যাংকস হ্যানারের নাম জড়িয়ে রয়েছে হোটেলের নির্মাণকাজের সাথে। সমাজের অভিজাত গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবসায়ীদের কথা মাথায় রেখে শুরু করা হয় হোটেলের কাজ। শৈল্পিক পরিচয় দেয়া থেকে শুরু করে মার্বেলের মেঝে, কাঁচের তৈরি জানালা, আমদানিকৃত পাম গাছ কোনো কিছুতেই কার্পণ্য করেননি উইলিয়াম।

সে যাই হোক, যাত্রা শুরু করার মাত্র দু বছরের মাথায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয় গ্রেট ডিপ্রেশন বা অর্থনৈতিক মন্দা। সেসিল হোটেল সম্মুখীন হয় অযত্ন আর অবহেলায়, গোটা এলাকার নাম হয়ে যায় স্কিড রো। খুব দ্রুতই চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের আধার সেসিল হোটেল পরিণত হয় অপরাধীদের প্রধান আড্ডাখানায়। বেশ কিছু মৃত্যুকে ঘিরে রহস্যের জাল ছড়িয়ে পড়ায় গুজব রটে যায়, হোটেলটি নাকি অভিশপ্ত। সেই আগুনে ঘি ঢালতেই যেন আমেরিকার ইতিহাসের বেশ কিছু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেসিল। কালের বিবর্তনে এখন হোটেলটি অর্জন করে নিয়েছে ‘ লস অ্যাঞ্জেলসের সবচেয়ে ভৌতিক হানাবাড়ি ‘র উপাধি।

১৯৮৫ সালে রিচার্ড র‍্যামিরেজ, যিনি ‘ নাইট স্টকার ‘ নামেই বেশি পরিচিত, বাস করতেন হোটেলটির সবচেয়ে উপরের তলায়। নির্বিচারে হত্যার যুগে তিনিও অবতীর্ণ হন অজ্ঞাতনামা খুনীর ভূমিকায়। তদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, র‍্যামিরেজ এই হোটেলটি বেছে নিয়েছিলেন এর পুরোদস্তুর গোলমেলে পরিবেশের জন্য। সজ্ঞানে রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বেরিয়ে খুন করে, আয়েশ করে রুমে ফিরে রক্তাক্ত কাপড়চোপড় ধুয়ে দিয়ে, সটান হয়ে ঘুম দিতেন। দিনের পর দিন এভাবে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেলেও তাকে ধরার মতো কেউ ছিল না। একই কাহিনী ঘটে ১৯৯১ সালে অস্টেলিয়ান সিরিয়াল কিলার জ্যাকের ক্ষেত্রেও। র‍্যামিরেজের সাথে দেখা করতে এসে এই হোটেলের সন্ধান পায় জ্যাক আন্টারোয়েজার, এমনটাই জানা গেছে।

হোটেলের আরেক উল্লেখযোগ্য অতিথির নাম এলিজাবেথ শর্ট, ইনি ‘ ব্ল্যাক ডালিয়া ‘ নামে বহুল পরিচিত। তার কুখ্যাত এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে তিনি এখানেই অবস্থান করছিলেন। হোটেলবাসীদের মধ্যে প্রথম রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে ১৯৩১ সালের ১৯ নভেম্বর। গোটা দেশজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা এক অপরাধীকে তন্নতন্ন করে খুঁজছিল পুলিশ। তাকে পরবর্তীতে উদ্ধার করা হয় হোটেল রুম থেকে, বলা ভালো তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এখান থেকে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, লোকটি বিষাক্ত ক্যাপসুল গ্রহণের কারণে মারা গেছে। মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ পরে তার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়।

১৯৪৪ সালে, তের বছর কেটে যায় এবং আরও ৬টি হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় এখানে। এ বছর ১৯ বছর বয়সী এক মেয়ে তার নবজাতক শিশুকে হোটেলের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কারণ? কারণ সে চায়নি গর্ভবতী হতে, সে চায়নি এই শিশুটির মা হতে। এরপর মারা যায় আরও তিনজন। ১৯৬৪ সালে এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, সারা গায়ে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল তার। এই হত্যার দায়ে কখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যজনক অপরাধটি ঘটে ২০১৩ সালে।

কানাডার কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী এলিসা ল্যামের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় হোটেলের পানির ট্যাংকের ভেতরে। এলিসা হারিয়ে যাওয়ার তিন সপ্তাহ পর হোটেলের অতিথিরা অভিযোগ করে, পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আসল কাহিনী কী তা দেখতে গিয়ে হোটেলের কর্মচারীরা এলিসার নগ্ন মৃতদেহ খুঁজে পায় সেখানে। কর্তৃপক্ষ দাবী করে, দুর্ঘটনাবশত এলিসা পানির ট্যাংকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু হোটেলের আগের সব রেকর্ড সে কথা মোটেও সমর্থন করে না।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, মারা যাওয়ার আগে লিফটে দাঁড়িয়ে খুব অদ্ভুত আচরণ করছিল এলিসা। চোখের সামনে নেই এমন কাউকে উদ্দেশ্য করে তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছিল মেয়েটি। অদৃশ্য কোনো শত্রুর  কাছ থেকে পালানোর জন্য মরিয়া হয়ে লুকানোর জায়গা খুঁজছিল। পাগলের মতো লিফটের সুইচ টিপতে টিপতে হাত নাড়িয়ে কাকে যেন শাসাচ্ছিল সে।

ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এতদিনের গুজব যেন বাস্তবে পরিণত হয়। ব্ল্যাক ডালিয়ার খুনের পর থেকে জনমনে যে সন্দেহের বীজ দানা বেঁধেছিল তা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। ব্ল্যাক ডালিয়া আর এলিসা ল্যাম দুজনের বয়সই বিশের ঘরে, একা একা সান ডিয়েগো থেকে লস অ্যাঞ্জেলসে ভ্রমণ করছিল দুজনই, শেষবার তাদের দেখা গেছে সেসিল হোটেলে, আর মৃতদেহ উদ্ধার করার আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিনব্যাপী নিখোঁজ ছিল। তবে অশরীরী কোনো খুনীর কবলে পড়ে প্রাণ হারায় এই দুই তরুণী? উত্তর জানার কোনো উপায় নেই।

যদিও হোটেলে সর্বশেষ মৃতদেহ পাওয়া গেছে ২০১৫ সালে, এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছিলো এখানে এসে, তবুও এই বছর আমেরিকান হরর স্টোরি সিরিজের বেশ কয়েকটি গল্প আবর্তিত হয়েছে এই হোটেলটিকে ঘিরে।