শার্লকঃ পর্দার আড়ালের মজার কিছু গপ্পো - প্রিয়লেখা

শার্লকঃ পর্দার আড়ালের মজার কিছু গপ্পো

ahnafratul
Published: November 10, 2017

শুরুটা হয়েছিল ২০১০ সালের ২৫ জুলাই। সাহিত্যের ইতিহাসের কালোত্তীর্ণ এই মহানায়কের রুপালী পর্দায় প্রয়াণ ঘটে ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারী। সত্যিই কি প্রয়াণ ঘটেছে তার? শার্লক হোমস যতটা না মানুষের মনে স্থান গেড়ে নিয়েছেন, তার চাইতেও বেশি উত্তেজনা বোধহয় বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ সৃষ্টি করতে পেরেছেন তার অসাধারণ অভিনয় শৈলীর মাধ্যমে। মার্ক গ্যাটিস ও স্টিভেন মোফাটের একবিংশ শতাব্দীর শার্লক যতটা হাইপ তৈরি করতে পেরেছে, রহস্য রোমাঞ্চে ভরপুর এরকম কোন ড্রামা সিরিজ বোধহয় এতোটা তৈরি করতে পারে নি।
চতুর্থ সিজনের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে শেষ হয় শার্লকের চতুর্থ কিস্তি। দর্শকের মনে আশা, হয়ত আবারো একাট্টা হবেন পরিচালক ও প্রযোজকেরা। অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতা বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচও হয়ত সময় করে উঠতে পারবেন দর্শকের লালিত এই চরিত্রের আরো এক সিজনের রুপায়নে। তবে আজ চলুন জেনে আসা যাক অনবদ্য এই সিরিজের পেছনের কিছু গল্পঃ
১) ওয়াটসন চরিত্রে ম্যাট স্মিথঃ


ম্যাট স্মিথকে যদিও আমরা এগারতম “ডক্টর হু” চরিত্র রুপায়নের জন্য চিনি, তবে তিনি কিন্তু শার্লকের সঙ্গী ডক্টর ওয়াটসনের চরিত্রটি করবার জন্য অডিশন দিয়েছিলেন। হয়ত ওয়াটসন চরিত্রটি তার করা হল না, তবে ‘ডক্টর’ খেতাবটি ঠিকই বাগিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
মার্টিন ফ্রিম্যানকে পরিচালকরা একদম মনের মত করে পেয়েছিলেন। বেনেডিক্টের সঙ্গী হিসেবে মার্টিনের রসায়ন ছিল অনবদ্য।

২) বিক্ষোভের সময় শার্লকের শ্যুটিংঃ
২০১১ সালে লন্ডনে একটি বিক্ষোভ হয়েছিল, যেটিকে আমরা ‘লন্ডন রায়ট’ হিসেবে এখ অভিহিত করে থাকি। ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের নানা ধরণের সমস্যা হয়েছিল এই বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে। স্নো হোয়াইট এন্ড দ্য হান্টসম্যানসহ আরো বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজের শ্যুটিং হুমকির সম্মুখে পড়েছিল।


যে দৃশ্যটি আপনারা ইমেজে দেখতে পাচ্ছেন, সেটি ‘আ স্ক্যান্ডাল ইন বেলগ্রাভিয়া’ এপিসোডটির সময় নেয়া হয়েছিল। পরিচালক এতই তাড়া দিয়েছিলেন যে, অস্থির ঐ সময়টিতেই শ্যুটিংএর কাজ করা হবে বলে ঠিক করা হয়। শেষমেষ অনেক ঝামেলা ও হুমকির মাঝে সম্পন্ন হয়েছিল কাজটি।

৩) লেসট্রাডের নাম বিভ্রাটঃ
শার্লকের মনে রাখার ক্ষমতা বিশাল। তার মাইন্ড প্যালেসে কোন কিছুই খোয়া যায় না। সবকিছুই একরকম ধ্যানের মাঝে মনে আনতে পারে সে। কিন্তু ইন্সপেক্টর লেসট্রাডের নাম সে কখনওই ঠিকমত মনে রাখতে পারে না। এর কারণ কি?


এরজন্য আমাদের ফিরে যেতে হয় শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েলের কাছে। আপনি অবাক হবেন, বইতেও কখনো লেসট্রাডের পুরো নাম আর্থার কোনান ডয়েল ব্যক্ত করেন নি। সেখানে শুধুমাত্র দেয়া আছে, লেসট্রাডের প্রথম নাম শুরু হয় ‘G’ দিয়ে। সে কারণেই হয়ত পর্দার শার্লককেও সবসময় একটা ধোঁয়াশার মাঝে রাখতে চেয়েছেন সিরিজের লেখকরা।

৪) স্টিভেন মোফাটের কদাচিৎ আগমনঃ

মার্ক গ্যাটিস, মার্টিন ফ্রিম্যান, বেনেডিক্ট ও স্টিভেন মোফাট (বাঁ থেকে)

শার্লক সিরিজের দুই স্রষ্টা, মার্ক গ্যাটিস এবং স্টিভেন মোফাট। স্টিভেন মোফাট একইসাথে আরো একটি জনপ্রিয় সাইফাই সিরিজ ডক্টর হু এর স্রষ্টা। তবে তিনি ডক্টর হুকে যতটা পছন্দ করেন কিংবা এই চরিত্রটির সাথে মিশে আছেন, শার্লকের সাথে বোধহয় ততটা নয়। মোফাট কদাচিৎ শার্লকের সেটে আসতেন। বড় কোন ধরণের সমস্যা দেখা দিলেই সেটে আগমন ঘটত তার। বাকিটা ছেড়ে দিতেন তিনি গ্যাটিসের ওপরেই।
বেচারা গ্যাটিস তো চাইলেও মোফাটের মত ছুটি নিতে পারতেন না। তিনি যে একইসাথে শার্লক হোমসের ভাই মাইক্রফট!

৫) বইয়ের মরিয়ার্টি বনাম অ্যান্ড্রু স্কটঃ
শার্লক হোমস চরিত্রটি রুপায়ন করবার জন্য যা যা করা দরকার, বাধ্য ছেলের মত সব করে গিয়েছেন বেনেডিক্ট। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের লেখা সমস্ত বইয়ের অরিজিনাল কপি বাসায় কিনে এনে সেগুলো আত্মস্থ করেন। শার্লকের ভঙ্গি, আচরণ সবকিছু নিজের মাঝে আনার চেষ্টা করেছেন। পেরেছেন কি না পারেন নি তা দর্শকের হাতেই ছেড়ে দেয়া যাক।


তবে সিরিজের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র ও শার্লকের শত্রু অ্যান্ড্রু স্কট (ডক্টর মরিয়ার্টি) কিন্তু শার্লক হোমসের কোন বই পড়েন নি। তিনি স্ক্রিপ্ট পড়ে বুঝেছিলেন তাকে এমন একটি মরিয়ার্টি দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে হবে, যা তারা আগে কখনো বইতে পায় নি। সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টা ও অভিনয়শৈলির মাধ্যমে মরিয়ার্টি চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি।

৬) পরিবারের সদস্য সবাইঃ
মাঝে মাঝে একটি প্রোডাকশনে কাজ করবার সময় এর বিভিন্ন কলাকুশলীরা বলে থাকেন যে, সমস্তটাই টিমটাই তাদের পরিবারের মত হয়ে গিয়েছে। তবে শার্লক সিরিজের জন্য বোধহয় কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্য। কেমন করে?
জন ওয়াটসনের পত্নী মেরি ওয়াটসনের ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেছেন, অ্যামান্ডা অ্যাবিংটন, তিনি বাস্তব জীবনেও ওয়াটসন ওরফে মার্টিন ফ্রিম্যানের পত্নী।


পর্দায় শার্লকের বাবা মায়ের চরিত্রে আমরা যাদের দেখতে পেয়েছিলাম, তারা বাস্তব জীবনেও বেনেডিক্টের বাবা মা।
স্টিভেন মোফাটের ছেলে কিশোর শার্লকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
এমনকি পর্দায় আমরা শার্লকের যে কুকুরটি দেখতে পাই, সেটিও বাস্তব জীবনে মার্টিন ফ্রিম্যানের পালিত কুকুর।

৭) বড় কোন তারকা চান নি প্রযোজকেরাঃ
মার্টিন ফ্রিম্যান এবং বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ মূলত শার্লক সিরিজটির মাধ্যমেই দর্শকের কাছে পরিচিত হয়েছেন। এর আগে তাদের তেমন কোন নামডাক ছিল না এবং বড় কোন চলচ্চিত্র কিংবা টিভি শোতেও তারা অভিনয় করেন নি। মার্টিনের হাতে ছিল কেবল ‘টিম ইন দ্য অফিস’ ছবিটি এবং বেনেডিক্ট থিয়েটার ও এর বাইরে টুকটাক কাজ করতেন।


মরিয়ার্টি চরিত্রে অ্যান্ড্রু স্কট ও মেরির চরিত্রে অ্যামান্ডাও তেমন প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী নন। স্টিভেন মোফাট ও মার্ক গ্যাটিস চেয়েছিলেন দর্শকদের একদম নতুন ও পরিষ্কার কিছু উপহার দিতে। আলো ঝলমলে কিংবা বিখ্যাত কোন অভিনয়শিল্পীর হাতে শার্লককে ছাড়তে চান নি তারা।

শার্লককে নিয়ে আসলে এত কথা বলার আছে যে সব বলতে চাইলেও ফুরোনো যাবে না। তবুও শার্লকপ্রেমীদের কাছে এটি একটি ভালোবাসার নাম। দিনশেষে এটাই চাইব, শার্লক যেন পঞ্চম সিজন নিয়ে আবারো ফিরে আসে দর্শকদের মাঝে। বাকিটা কেবলই প্রযোজক আর নির্ধারকদের কাছে!