আহসান মঞ্জিল: দেখে আসুন ঢাকার বুকে এক নবাবী পুরাকীর্তি - প্রিয়লেখা

আহসান মঞ্জিল: দেখে আসুন ঢাকার বুকে এক নবাবী পুরাকীর্তি

Sanjoy Basak Partha
Published: November 8, 2017

ছুটির দিনে ঘরে বসে অলস বিকেল কাটাচ্ছেন? করার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না? পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন, চলে যান পুরান ঢাকার ইসলামপুরে। সাক্ষী হয়ে আসুন রাজধানী ঢাকার বুক জুড়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা এক নবাবী পুরাকীর্তির, নাম যার আহসান মঞ্জিল।

আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস:

বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে পুরান ঢাকার ইসলামপুরে অবস্থিত এই আহসান মঞ্জিল ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও পুরানো স্থাপত্যকীর্তি। এটি ব্রিটিশ ভারতের উপাধিপ্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবারের বাসভবন ও সদর কাচারি ছিল। বর্তমানে যে জায়গার উপর আহসান মঞ্জিল দাঁড়িয়ে আছে সেটি আগে  ইসলামপুরের কুমারটুলি নামে পরিচিত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জমিদার শেখ এনায়েতুল্লাহ তৎকালীন জালালপুর পরগণায় “রংমহল” নামে একটি প্রমোদভবন তৈরি করেন। অতঃপর কিছুদিন পরে শেখ এনায়েতুল্লাহ মারা গেলে তাঁর ছেলে শেখ মতিউল্লাহ বিলাসবহুল প্রমোদভবন “রংমহল”-টি তৎকালীন ফরাসি বণিকদের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর সেখানে ফরাসিরা তাঁদের বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। ফরাসিরা এই এলাকায় (বর্তমান যে অংশে আহসান মঞ্জিল আছে) উত্তর-পশ্চিম কোনায় “ল্যুসজাল্লা” নামে একটি চৌবাচ্চা নির্মাণ করে। চৌবাচ্চাটি ছিল অপেক্ষাকৃত গোলাকার। কিছুদিন পর ১৮৩০ সালে খাজা আলিমুল্লাহ  ফরাসি বণিকদের কাছ থেকে কুঠিটি কিনে নেন এবং বসবাসের উদ্দেশ্যে সংস্কার করেন। খাজা আলিমুল্লাহর ছেলে নওয়াব আব্দুল গনি ১৮৫৯ সালে প্রাসাদটি পুনরায় নির্মাণ করেন আর প্রাসাদটি তাঁর স্বীয় পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর নামেই নামকরণ করে রাখেন “আহসান মঞ্জিল”।

১৮৮৮ সালের ৭ই এপ্রিল প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে আহসান মঞ্জিলের অন্দরমহলের বেশ কিছু অংশ ভেঙ্গে যায়, সব মিলিয়ে প্রলয়ঙ্করী এই ঘূর্ণিঝড়ে আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরবর্তীতে আহসান মঞ্জিল কে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং বর্তমানে যে সুউচ্চ গম্বুজটি দেখা যায় এমনই একটি গম্বুজ যুক্ত করা হয়। তৎকালীন সময়ে আহসান মঞ্জিলের মতো এতো সুউচ্চ ভবন ঢাকায় ছিলোনা। তাই তখন বহুদূর থেকেও আহসান মঞ্জিলের জাঁকালো গম্বুজটি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। বড় গম্বুজসহ যে অংশটি রয়েছে তাকে বলা হয় প্রাসাদ ভবন, যেটা আগে রঙমহল ছিল আর এর পাশেই আরেকটা অন্দর মহল আছে, যা “জানানা” নামেও পরিচিত ছিল। গম্বুজওয়ালা প্রাসাদ ভবনটি দু’টি সুষম ভাগে ভাগ করা। মাঝখানে গোলাকার কক্ষের উপরে সুউচ্চ অষ্ট-কোণ গম্বুজটি উত্তোলিত। এর পূর্বাংশে দোতলায় বৈঠকখানা, প্লেয়িং কার্ড রুম, গ্রন্থাগার ও তিনটি মেহমান কক্ষ এবং পশ্চিমাংশে একটি নাচঘর, হিন্দুস্থানি কক্ষ এবং কয়েকটি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। নিচ তলায় পূর্বাংশে আছে ডাইনিং হল এবং পশ্চিমাংশে দরবার ঘর, বিলিয়ার্ড কক্ষ এবং কোষাগার। বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে এবং অন্যান্য কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ঢাকার নওয়াবগণ স্থানীয় মহাজন এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অব্যবস্থায় পতিত জমিদারী পরিচালনার ভার ১৯০৭ সালে নওয়াব সলিমূল্লাহ কোর্ট অব ওয়ার্ডস এর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।

১৯১৫ সালে নওয়াব সলিমূল্লাহ মারা যাওয়ার পর তাঁর স্বীয় পুত্র হাবিবুল্লাহ তাঁর পিতার স্থলাভিষিক্ত হলে ঋণের দায়ে একের পর এক জমিদারী পরগনাসমূহ হারাতে থাকেন। তাছাড়া অন্যান্য সন্তানেরা যার যার মত সম্পত্তি নিয়ে আলাদা হয়ে যান। নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল এর ফলে ধীরে ধীরে অবহেলায় ভবনটি পরিত্যক্ত হতে থাকে। অতঃপর ১৯৫৮ সালে নওয়াব হাবিবুল্লাহ মারা গেলে তাঁর পুত্র খাজা হাসান আসকারী নামেমাত্র নওয়াব হন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নবাব পরিবারের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা বিদেশে পাড়ি জমান। এ দেশে যাঁরা ছিলেন তাঁরা বিরাট এই প্রাসাদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণে সক্ষম ছিলেন না। ফলে এটি ক্রমাগত ধ্বংসের দিকে যেতে থাকে। ১৯৭৪ সালে নবাব পরিবারের উত্তরসূরীরা আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবনটির  রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে, ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর, প্রাসাদ ভবনটি নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। এরপর সংস্কার করে এখানে জাদুঘর ও পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দেন। ১৯৮৫ সালের ৩ নভেম্বর আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ ও তৎসংলগ্ন চত্বর সরকার অধিগ্রহণ করে সেখানে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু করে। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

কি আছে আহসান মঞ্জিলের ভেতরে:

আহসান মঞ্জিলের ৩১টি কক্ষের মধ্যে ২৩টি কক্ষ বিভিন্ন প্রর্দশনীর জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। নয়টি কক্ষ লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে প্রাপ্ত এবং ফ্রিৎজ কাপ কর্তৃক ১৯০৪ সালে তোলা ছবির সাথে মিলিয়ে সাজানো হয়েছে। আহসান মঞ্জিলের তোষাখানা ও ক্রোকারিজ কক্ষে থাকা তৈজসপত্র এবং নওয়াব এস্টেটের পুরনো অফিস এডওয়ার্ড হাউস থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণ করে প্রদর্শন করা হয়েছে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য আছে নওয়াব আমলের ডাইনিং রুম, নওয়াবদের ব্যবহৃত বড় বড় আয়না, আলমারি, সিন্দুক, কাচ ও চিনামাটির থালাবাসন, নওয়াবদের অতি বিশ্বস্ত হাতির মাথার কঙ্কাল গজদন্তসহ, নওয়াব আমলের বিভিন্ন ধরনের অলংকৃত রুপা ও ক্রিস্টালের তৈরি চেয়ার-টেবিল, বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র, ফুলদানি, আতরদানি, পানদান, নবাবদের ড্রয়িং রুম, নাচঘর, সোনা ও রুপার তারজালিকাজ আহসান মঞ্জিলের মডেল। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা মোট চার হাজার ৭৭টি।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে প্রদর্শনী থেকে জানা যাবে নবাবদের অবদানে ঢাকায় কবে কীভাবে ফিল্টার করা পানীয় জলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর আগে ঢাকায় ফিল্টার পানীয় জলের কোনো সুযোগ ছিল না। জনকল্যাণমনা নবাব আবদুল গনি আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে তখন ঢাকা শহরে ফিল্টার পানির কল স্থাপন করেন। নবাবদের অবদানে ঢাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয় করে ঢাকায় প্রথম বিজলি বাতির ব্যবস্থা করেন। এখান থেকে জানা যায় এ দেশে কখন কীভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার চালু হয়।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর:

 

১০-১০.৩০ এর মধ্যে জাদুঘর খুলে দেয়া হয়। টিকেট কেটে আপনাকে ঢুকতে হবে, সাধারণত সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত খোলা থাকে। শনিবার – বুধবারের জন্যে এই সময়সূচী প্রযোজ্য। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ, আর শুক্রবার বিকেল ৩-৩.৩০ এর পরে খোলে। একজন গাইড লেকচারার দর্শকদের প্রদর্শনী বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বদা নিয়োজিত থাকেন। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের গ্যালারিতে মিষ্টি মধুর সংগীতের সুর বাজতে থাকে সবসময়। প্রাপ্ত বয়স্ক বাংলাদেশি দর্শকের জন্য প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা, বাংলাদেশি শিশু দর্শক পাঁচ টাকা আর বিদেশি দর্শকের জন্য ৭৫ টাকা। প্রতিবন্ধীদের কোনো টিকিট ক্রয় করতে হয় না। আগে থেকে আবেদন করলে ছাত্রছাত্রীদের বিনা মূল্যে জাদুঘর দেখতে দেওয়া হয়। বহিরাঙ্গনে ভাড়ার বিনিময়ে চলচ্চিত্রায়ণ করা যায়। একজন দর্শক এখানে এসে ভ্রমণের মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি ঐতিহাসিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

আহসান মঞ্জিল গ্রীষ্মকালে শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট এবং শীতকালে সকাল ৯টা ৩০মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে, সব ঋতুতে শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার জাদুঘর সাপ্তাহিক ছুটি থাকে। এ ছাড়া সব সরকারি ছুটির দিনেও জাদুঘর বন্ধ থাকে।

এনটিভি অনলাইন ও পিপীলিকা ডট কম অবলম্বনে