তবুও এই দেশে নারী খেলোয়াড়েরা সম্মান পান না! – প্রিয়লেখা

তবুও এই দেশে নারী খেলোয়াড়েরা সম্মান পান না!

Sanjoy Basak Partha
Published: June 10, 2018

সেপ্টেম্বর ২০১৬ এর কথা। মার্জিয়াদের অসাধারণ আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্সের সুবাদে শুরুতে এক গোল খেয়েও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের অনূর্ধ্ব ১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ দল হারিয়ে দিয়েছিল চাইনিজ তাইপেকে। দারুণ এই জয়ের সুবাদে চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগও তৈরি করে নিয়েছিল বাংলাদেশের মেয়েরা।

অর্জনের দিক থেকে এটি ছিল নিঃসন্দেহে বিশাল এক অর্জন। এশিয়ার সেরা মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ এর আগে কেবল একবারই হয়েছিল বাংলাদেশের, সেটিও আবার সেই ১৯৮০ সালে। কুয়েতে বাংলাদেশের সিনিয়র পুরুষ দল সেবার অংশ নিয়েছিল এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে।

কিন্তু এমন ঐতিহাসিক অর্জনের পরেও নারী দলের সাথে যেরকম আচরণ করেছে বাফুফে, তাকে নিন্দনীয় বললেও কম বলা হয়। বাকি দলগুলোকে যেখানে উন্নত মানের হোটেলে রাখা হয়েছিল, সেখানে বাংলাদেশ দলের ঠাঁই হয়েছিল বাফুফের একটি আবাসিক ভবনে! তাও এমন একটি ভবনে যেখানে ফুটবলারদের জন্য ছিল না ন্যূনতম কোন সুযোগ সুবিধা। এরকম সুযোগ সুবিধাহীন একটি ভবনে মেয়েদের ক্যাম্প করতে হয়েছে আড়াই মাস! তা ঠিক কি কারণে মেয়েদের এখানে রাখা হলো? সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য!

ছয় দলের বাছাইপর্ব আয়োজন করার জন্য এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বাফুফেকে দিয়েছিল ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। কিন্তু টুর্নামেন্টটি আয়োজন করতে বাফুফের আরও প্রায় ৫০ লাখ টাকার মতো দরকার ছিল। সেই টাকার অর্ধেকটা, ২২ লাখ জোগাড় করে ফেলা হলো মেয়েদের হোটেলের বদলে অস্বাস্থ্যকর আবাসিক ভবনে রেখে! মেয়েদের জন্য বার্তাটা যেন ছিল পরিষ্কার- তোমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারো, কিন্তু প্রাধান্যের দিক থেকে তোমরা মোটেও শীর্ষে নেই। বাংলাদেশে নারী অ্যাথলেটদের সামগ্রিক অবস্থা বোঝানোর জন্য এই একটা ঘটনাই যেন যথেষ্ট।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের তারকা খেলোয়াড় সাবিনা খাতুন তো সরাসরিই বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, এ দেশে মেয়েদের জন্য ফুটবলে একদমই টাকা নেই। কখনো ছিলও না।’

‘আমাদের কিন্তু প্রতিভার কোন অভাব নেই। এখন জাতীয় দলে ঢুকতে হলেও অনেক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ঢুকতে হয়। সেই মানের না হলে এখন আর জাতীয় দলে খেলতে পারে না কেউ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যেসব মেয়েরা ফুটবলে আসে, তাদের বেশিরভাগই আসে দরিদ্র পরিবার থেকে। তাদের আর্থিক সহায়তার দরকার হয়। তাদের পরিবার তাদেরকে ফুটবলে পাঠায়, কারণ তারা জানে ফুটবল খেলে অন্তত আয় করতে পারবে তাদের মেয়েরা। কিন্তু এখানে আয় করাটা খুব কঠিন। এত সহজে টাকা আসে না।’

জাতীয় দলের ফুটবলারদের বাফুফের পক্ষ থেকে প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু ফুটবলারদের দাবি, নিয়মিত ভিত্তিতে এই টাকা দেয়া হয় না তাদের, বরং পেট চালানোর জন্য অন্য আর্থিক উৎসের উপরেও নির্ভর করতে হয় তাদের।

‘অনূর্ধ্ব ১৬ দলের মেয়েরা যখন চ্যাম্পিয়ন হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ১ লাখ করে টাকা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এতে কি প্রমাণ হলো? ভালো ফলাফল করতে পারলেই কেবল সমর্থন দেয়া হয়, নাহলে না’- বলছিলেন সাবিনা।

‘ফলাফল দেখাতে না পারলে আমাদের আবার সেই শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। তাহলে এত পরিশ্রমের মূল্য থাকলো কোথায়? এই মেয়েগুলো সারা বছর কঠিন পরিশ্রম করে, এটার জন্য বছর জুড়েই তাদের টাকা দেয়া উচিত। প্রাপ্য টাকা না পেলে তো ওরা আগ্রহই হারিয়ে ফেলবে’- আক্ষেপের সুরে বলেন সাবিনা।

এ তো গেলো একটা সমস্যা। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মেয়েরা পর্যাপ্ত ম্যাচই পায় না। ঘরোয়া লীগ হয় না নিয়মিত, বছরজুড়ে নির্দিষ্ট কোন শিডিউলও মেনে চলা হয় না। সেটাই বলছিলেন সাবিনা, ‘গত কয়েক বছর পুরুষ দলের তুলনায় নারী দল বেশি সাফল্য এনে দিয়েছে। সরকার ও বাফুফেকে বুঝতে হবে, মেয়েদের ফুটবলে অনেক প্রতিভা লুকানো আছে। আমাদের তাদের সমর্থন দরকার, ঠিকঠাক একটা অবকাঠামো, বেতন কাঠামো দিতে হবে এই মেয়েদের।’

শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বাংলাদেশের মেয়েদের। খুব বেশিদিন হয়নি ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। তবুও এই অল্প সময়েই সাউথ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দলকে হারিয়েছে তারা। এবার তো ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জিতে ইতিহাসই করে ফেলেছে তারা। কেবল সাকিব আল হাসান নন, নারী দলের সালমা খাতুনও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হওয়ার খেতাব অর্জন করেছেন। এ সবই এসেছে ন্যূনতম সুযোগ সুবিধার মধ্য দিয়ে।

মেয়েদের ম্যাচ ফি’র অঙ্কটা জানা না থাকলে লজ্জায় অপমানে আপনার মাথা নিচু হয়ে আসতে পারে। ছেলেদের ক্রিকেটে যেখানে ম্যাচ ফি ৫০ হাজার টাকার মতো, মেয়েরা সেখানে ম্যাচ ফি পান মাত্র ৬০০ টাকা করে!

নারী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রুমানা আহমেদের যেন এই বিষয়ে কথা বলতেই লজ্জাবোধ হলো, ‘ম্যাচ ফির ব্যাপারে আর কি ই বা বলবো! সত্যি বলছি, অঙ্কটা খুবই লজ্জাজনক। এই বিষয়ে কথা বলতে আমার খুব একটা ভালো লাগে না। একটা ম্যাচ খেলার জন্য আমরা ৬০০ টাকা করে পাই, এই কথাটা কারোর সামনে বলবোই বা কীভাবে আমরা? এটা খুবই লজ্জাজনক।’

তবে মেয়েদের ক্রিকেটে অর্থের এমন সংকটের জন্য বিসিবি দায়ী করছে স্পন্সরের অপর্যাপ্ততাকে। ছেলেদের ক্রিকেটে যেমন চাইলেই স্পন্সর পাওয়া যায়, মেয়েদের ক্রিকেটে নাকি তেমনটা পাওয়া যায় না, জানালেন বিসিবির নারী উইংয়ের পরিচালক শফিউল আলম চৌধুরী, ‘নারী দলের জন্য সহজে স্পন্সর পাওয়া যায় না। সাফল্য মোটামুটি নিশ্চিত, এমন জায়গায়ই কেবল তারা বিনিয়োগ করতে চায়। একবার মেয়েরা পারফর্ম করা শুরু করলেই এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। এছাড়া কেনই বা তারা বিনিয়োগ করবে?’

মেয়েরা এবার নিজেদের সর্বোচ্চটাই পারফর্ম করে দেখিয়েছেন। এবার কি বদলাবে তাদের অবস্থা? নাকি আরও একবার অবহেলিত হয়েই থাকতে হবে দেশকে গর্বিত করা এই সোনার মেয়েদের?

ডেইলি স্টার থেকে অনুবাদকৃত ও সংক্ষেপিত

ইমেজ কার্টেসি: ডেইলি স্টার