৪৫০ বছরের পুরনো একটি বই ও কিছু সামুরাই নীতি - প্রিয়লেখা

৪৫০ বছরের পুরনো একটি বই ও কিছু সামুরাই নীতি

ahnafratul
Published: October 24, 2017

সুকাহারা বকুদেন।

নামটি কি আপনাদের কাছে পরিচিত? হয়ত নয়। তবে ১৪৮৯ সাল থেকে ১৫৭১ সাল পর্যন্ত তিনি জাপানে দোর্দন্ড প্রতাপের সাথেই অবস্থান করতেন। একটু ভেঙেই বলি তাহলে।
সম্প্রতি এরিক শাহান নামক একজন ইংরেজ অনুবাদক জাপানী ভাষায় লেখা একটি বই অনুবাদ করেছেন। বইটির নাম ‘দ্য হান্ড্রেড রুলস অব ওয়ার’, প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো একটি বই। ধারণা করা হয় ১৫৭১ সালের দিকে সুকাহারা এই বইটি লিখেছিলেন। বইটিতে ইতিহাসখ্যাত জাপানী সামুরাইদের সম্পর্কে নানা তথ্য সম্বলিত রয়েছে। সামুরাইদের বাচ্চা হলে তাদের নাম কি রাখা উচিত, যুদ্ধে যাবার সময় সামুরাইদের কি ধরণের খাবার খাওয়ানো উচিত, সামুরাইদের কাছে থাকা বিভিন্ন ধন সম্পদ কি ছিল ইত্যাদি নানা বিষয় সম্পর্কে বইটি লেখা হয়েছিল। মূলত, বইটি অনেকগুলো যুদ্ধসঙ্গীতের সমন্বয়ে লেখা হয়েছে। যেসকল সামুরাই যুদ্ধে যেতে পারতেন না, তারা যেন এই গানগুলো গেয়ে অন্যান্যদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, সেজন্যই এই বইটি লেখা হয়েছিল।

সুকাহারা বকুদেনের মূর্তি

সুকাহারা প্রায় দেড়শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং শত শত সামুরাই শত্রুকে হত্যা করেছিলেন তার তলোয়ারের আঘাতের সাহায্যে। শাহান লাইভ সাইন্সকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, এই বইটি জাপানে সর্বপ্রথম ছাপানো হয়েছিল ১৮৪০ সালে। যদিও বইটির লেখার সাহায্যে ধারণা করা হয় যে সুকাহারাই বইটি লিখেছিলেন, তবে শাহান বলেন নিশ্চিত করার কোন সুযোগ এখনো তাদের কাছে নেই।
বইটির মাঝে সামুরাইদের নানা ধরণের পালনীয় নিয়মের কথা বলা হয়েছে। তবে একটি নিয়মের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর তা হচ্ছে, প্রত্যেক সামুরাইয়ের মৃত্যু কিভাবে ঘটবে, তারওপর তাদেরকে বিশেষভাবে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। এছাড়াও যুদ্ধশিক্ষা, ধনুর্বিদ্যা, তলোয়ারবাজী, বর্শার সাহায্যে কি করে যুদ্ধ করতে হয়, অশ্ব চালাতে কিভাবে পারঙ্গম হওয়া যায় তা সম্পর্কেও নানা কথা লেখা হয়েছে।


বইটিতে আরো বলা হয়েছে, একজন সামুরাইয়ের সবচেয়ে বড় সম্পত্তি হল তার ঘোড়া। যে সামুরাই ঘোড়ায় চড়তে জানত না, তাকে কাপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হত।
“যারা ছোট ঘোড়া চালায়, তাদের মনও ছোট হয়। ভার বহন করার জন্য যারা ছোট আকারের ঘোড়া বেছে নেয়, তাদের বুদ্ধিও হয় কম।”
আচ্ছা, একজন সামুরাইয়ের সন্তানের নাম কি হতে পারে, ধারণা করুন তো? বইটিতে কিন্তু এ সম্পর্কেও লেখা হয়েছে। ধনুর্বিদ্যায় সামুরাইদের বিশেষভাবে পারঙ্গম থাকতে হত। সামুরাই গোত্রে যদি কোন সন্তানের জন্ম হয়, তাহলে তার নাম “ইউমি” (Yumi) রাখাটাই সবচাইতে ভালো বলে মনে করা হয়েছে এই বইতে। ইউমি মানে হচ্ছে ‘ধনুক’।

বইটিতে আরো যেসব সামুরাই নিয়মের কথা বলা হয়েছে, দেখে নিন এক নজরেঃ
১) একজন বাচ্চার নাম ইউমি রাখাটাই সবচেয়ে ভালো। এর মানে হচ্ছে, বাচ্চার সম্মান ও যশ তাকাসাগোর পাইন ট্রি এর মতই উঁচু হবে। তাকাসাগোর পাইন ট্রি বলতে বোঝানো হয়েছে, তাকাসাগো মন্দিরের দুটো সম্মিলিত পাইন গাছ, যারা একই শিকড় থেকে গজিয়ে উঠেছে। এরমানে দাঁড়ায় ‘অনন্ত ও দীর্ঘ জীবনের সূচনা’।
২) সামুরাই যুদ্ধে যাবার সময় তার জন্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার হচ্ছে ভাত ও গরম পানির মিশ্রণ।

 


৩) সামুরাইদের অ্যালকোহলজাতীয় কোন পানীয় পান করা নিষেধ। এরফলে তাদের নানা ধরণের ভুল হতে পারে এবং যুদ্ধে খুব দ্রুত মরণ ঘনিয়ে আসতে পারে।
৪) শুকনো পাম ফল ও ভাজা বীন নিয়ে যুদ্ধে আসা সামুরাইদের জন্য সৌভাগ্যজনক। এগুলো তাদেরকে ততটাই সুরক্ষা দেবে, যতটুকু অস্ত্র ও বর্ম দেয়।
৫) যুদ্ধের শেষে একজন সামুরাই বেঁচে থাকবে নাকি মৃত্যুবরণ করবে, তা নিয়ে কখনোই তাদের মাথা ঘামানো উচিত না।

শাহান আরো বলেন, বইটি পড়লে জানা যাবে সামুরাইদের জীবন কতটা বিচিত্র ছিল। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও একজন সামুরাইকে চিন্তা করতে হত সম্মান রক্ষা করবার কথা, যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মানের সাথে কিভাবে মৃত্যুবরণ করা যায় তার কথা। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও একজন সামুরাই তীক্ষ্ণধার তলোয়ারের খোঁচায় প্রাণনাশ করে ফিরত শত্রুর। দেশে ফিরবার পর বিজয়মাল্য দিয়ে সসম্ভ্রমে বরণ করে নেয়া হত তাকে।

আজ এ পর্যন্তই। প্রিয়লেখার সাথেই থাকুন।
(ফিচারটি তৈরি করতে সাহায্য নেয়া হয়েছে এই সাইটের)