হাসিনা পার্কারঃ গডমাদার অব নাগপাড়ার উত্থান আখ্যান - প্রিয়লেখা

হাসিনা পার্কারঃ গডমাদার অব নাগপাড়ার উত্থান আখ্যান

ahnafratul
Published: August 9, 2017

মহারাষ্ট্রের একটি সম্ভ্রান্ত মারাঠা মুসলিম পরিবারে মেয়েটির জন্ম। বাবা ইব্রাহীম কাসকার ছিলেন মুম্বাই পুলিশ ডিপার্টমেন্টের একজন হেড কনস্টেবল এবং মা আমিনা বাই ছিলেন একজন গৃহিণী। মুম্বাইতে বসবাস করা আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতই হয়ত এই পরিবারটিও বসবাস করতে পারত কিন্তু একটি নাম পরিবারটির ভাগ্য আজীবনের জন্য বদলে দেয়।

নামটি দাউদ ইব্রাহীম; যিনি নিজের হাতে লিখতে বসেছিলেন মুম্বাইয়ের ভাগ্য। হতে চেয়েছিলেন মুম্বাইয়ের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। ১৯৮০ এর দশকে অপরাধ জগতের সিন্ডিকেট ডি-কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রন করার মাধ্যমে দাউদ ধীরে ধীরে উঠছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। তবে আজ দাউদকে নিয়ে আমাদের গল্প নয় পাঠক। একদম শুরুতে চলে যান এ গল্পের। কি বলেছিলাম?

দাউদ ইব্রাহীম

১৯৫৯ সালে মহারাষ্ট্রের একটি সম্ভ্রান্ত মারাঠা মুসলিম পরিবারে মেয়েটির জন্ম, নাম হাসিনা। আস্তে আস্তে যিনি হয়ে ওঠেন “হাসিনা আপা”, “লেডি ডন” খেতাবের অধিকারী।

আবার চলে যাচ্ছি ইব্রাহীম কাসকার ও আমিনা বাইয়ের পরিবারে। এই দম্পতির মোট সন্তান হয়েছিল ১২জন। এদের মধ্যে দুটো নাম মুম্বাইয়ে ত্রাস ছড়াতে শুরু করে ৮০ ও ৯০ এর দশক থেকে। বারো জনার মাঝে তৃতীয় জন, দাউদ ইব্রাহীমের পথ অনুসরণ করে হাসিনা ১৯৯১ সালে নিজ হাতে স্বামী খুনের প্রতিশোধ নিতে উঠে আসেন এবং অচিরেই হয়ে ওঠেন “গডমাদার অব নাগপাড়া”। তার আগেই তিনি পেয়ে গিয়েছিলেন “পার্কার” উপাধি, স্বামী ইব্রাহীম পার্কার কর্তৃক।

ইব্রাহীম পার্কার ও হাসিনা পার্কার দম্পতির মোট সন্তান চারজন। আলিশাহ, কুদসিয়া, উমাইদাহ ও ড্যানিশ পার্কার। ১৯৯১ সালে এই পরিবারের ভাগ্যাকাশে নেমে আসে চরম এক বার্তা। স্বামী ইব্রাহীম পার্কার বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন অরুণ গাওলির গ্যাং সদস্যদের হাতে। বোনের স্বামীর হত্যার প্রতিশোধ নিতে মুম্বাইয়ের জে জে হাসপাতালে ভয়াবহ এক বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে পরে দাউদ ইব্রাহীমের দলের সদস্যরা। শৈলেশ হালদাংকার সহ নিহত হয় আরো ২৪ জন। এমনকি দুজন পুলিশ গার্ড, যারা কিনা শৈলেশকে নজরদারির মাঝে রেখেছিল, তারাও নিহত হয় এই বন্দুকযুদ্ধে।

এরপরই আসে নতুন এক আখ্যান। হাসিনা পার্কার…

হাসিনা পার্কার ও সাথে তার ভাই দাউদ ইব্রাহীম

মূলত স্বামী ইব্রাহীমের মৃত্যুর পরপরই হাসিনা আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই জগতের সাথে লিপ্ত হয়ে পরেন। সুখে ঘরকন্না করবার করার কথা যার ছিল, তিনিই কিনা জড়িয়ে পড়লেন কুখ্যাত সব র‍্যাকেটে। নাগপাড়ার বিলাসবহুল গর্ডন হল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে হাসিনা শুরু করেন তার যাত্রা। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি এখানেই এসে ওঠেন।

তার ভাই দাউদ ইব্রাহীমের সবসময় মুম্বাইতে থেকে কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। আর হবেই বা কেন? পিছে পিছে ঘুরছে মৃত্যুর হাতছানি, আর সাথে পুলিশের নজরদারি তো রয়েছেই। তবে হাসিনা ততদিনে সুযোগ্য হয়ে উঠেছেন। পুলিশের কাছে এবং কোর্টে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন ভাই দাউদ ইব্রাহীমের সাথে তার কোন ধরণের সম্পর্ক নেই। তবে সত্যটা হচ্ছে, দাউদের মুম্বাইয়ের যত ব্যবসা রয়েছে, সবকিছুই হাসিনা নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। একটি রিপোর্টে উঠে আসে, তার নামে প্রায় ৫০০০ কোটি রুপির অর্থসম্পদ রয়েছে। শুধু নাগপাড়ায় থেকে এত টাকা কিভাবে করলেন হাসিনা? এখানেও একটি মজার ব্যপার রয়েছে। হাসিনার নামে প্রায় ৮৮টি মামলা হলেও তিনি কোর্টে হাজিরা দিয়েছেন মাত্র একবার। অনেকে মজা করে বলতেন তখন,

“আপার এসব কিছু দেখবার এত সময় নেই।”

নানা ধরণের চাঁদাবাজি ও অর্থসংক্রান্ত র‍্যাকেটিংয়ে জড়িয়ে পড়ছিলেন হাসিনা ধীরে ধীরে। এদের মাঝে হাওলা সংক্রান্ত কেসগুলো সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত কিংবা ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্য, স্থান যেটিই হোক না কেন, টাকার আদান প্রদানের বেলায় হাসিনা সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠতে লাগলেন।

মুম্বাইয়ের নানা পেশার মানুষ আস্তে আস্তে নৈবেদ্য প্রদান শুরু করল হাসিনাকে। ভূমি দখলের জন্য বিল্ডাররা হাসিনার কাছে ধর্না দিতে শুরু করলেন। বস্তিবাসীর নিকট থেকে কেমন করে অনুমোদন আদায় করা যায়, সে সম্পর্কে তাদের বুদ্ধি দিতে লাগলেন হাসিনা। মুম্বাইয়ের স্লাম রি-ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি (এস আর এ) এর মাঝে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন হাসিনা। এমনকি কোন কেবল অপারেটর কোন জায়গায় তাদের ব্যবসা স্থাপন করবে, সেটি পর্যন্ত হাসিনার ইশারা ছাড়া সম্ভব হয়ে উঠছিল না!

হাসিনা এসব কাজের শুধুমাত্র নির্দেশনা দিতেন মাত্র। এজন্য প্রতি সপ্তাহে বা মাসে তাকে “হাফতা” (একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চাঁদা; অনেকে এটিকে “প্রোটেকশন মানি” হিসেবেও বলে থাকেন)  দিয়ে থাকত। হাসিনার নির্দেশে এসব কাজ করত তার খুবই কাছের একজন অনুচর, সালিম পাটেল। জমি সংক্রান্ত মামলা, অর্থপাচার, বিল্ডার সংক্রান্ত মারামারি এসব কিছুতেই হাসিনার নির্দেশে কর্ম সম্পাদন করত সালিম পাটেল ও তার দলের লোকেরা।

আন্ডারওয়ার্ল্ড জগতের মানুষেরা হয়ত বিনোদন খুব পছন্দ করেন, আবার কেউ বা খেলাধূলা খুব পছন্দ করেন। ঘটনা অবশ্য ঠিক এরকম নয়। কারণ, মিডিয়া কিংবা স্পোর্টস- এই দুই জগতে চাইলেই প্রচুর টাকা আয় করা যায় (যদি আপনি সেটা চান অসদুপায়ে)। অর্থলগ্নি করা, বাজি ধরা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে টাকা আয় করার বেশ কিছু পথ খোলা থাকে ডন, মাফিয়াদের জন্য। হাসিনাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। অচিরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ব্যবসা ও যশ ছড়ানোর জন্য তাকে ক্ষেত্র বিস্তার করতে হবে। তাই তিনি এবার নামলেন ছবির জগতে।

না, নায়িকা হিসেবে নয়। তিনি মধ্য রাশিয়া ও উপকূলবর্তী দেশগুলোর সাথে বলিউড ছবির স্বত্ব সম্পর্কিত নানা বিষয়াদি নিয়ে কাজ করেছেন। অনেকে বলেন ছবি তৈরি করা বা প্রোডাকশনের ব্যাপারেও বেশ আগ্রহ ছিল হাসিনার। তবে এ সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় নি।

এর মাঝেই জীবনে ঘটে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। হাসিনার বড় ছেলে, দানিশ ২০০৬ সালে একটি সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। বলা হয়ে থাকে যে, দানিশ দাউদ ইব্রাহীমের সবচেয়ে প্রিয় ভাতিজা ছিলেন। মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত হাসিনাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন তার বাকি তিন ছেলেমেয়ে।

হাসিনার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালের এপ্রিলের ৫ তারিখে (নাম্বারটি হচ্ছে- A2745364)। ২০০৭ সালের ৬এপ্রিল পর্যন্ত এই পাসপোর্টের মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী হাসিনা তার পাসপোর্টটি হারিয়ে ফেলেন। মুম্বাই ক্রাইম ব্র্যাঞ্চে একটি সাক্ষাতের পর পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলার ঘটনায় তিনি একটি নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করেন কিন্তু তাকে নতুন পাসপোর্ট আর দেয়া হয় নি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, অপরাধ জগতের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা এবং দাউদ ইব্রাহীমের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। হাসিনার উকিল শ্যাম কেশওয়ানী এই ব্যপারে আইনি লড়াই করলেও পরবর্তীতে তা সম্পর্কে আর খুব বেশি অগ্রগতি হয় নি। অনেকে ধারণা করেন, তার এই পাসপোর্ট হারিয়ে যাবার পেছনে মুম্বাই পুলিশের হাত ছিল। হাসিনাকে বলা হত দাউদ ইব্রাহীমের পরিবারের সবচেয়ে “চালু সদস্য” যার পেছনে পুলিশের চোখ থাকত সর্বক্ষণ।

হাসিনা পার্কারের নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন শ্রদ্ধা কাপুর

ঘটনাবহুল জীবন ও নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে মুম্বাইয়ের নাগপাড়ার এই লেডি ডন মৃত্যুবরণ করেন ২০১৪ সালে। মাসটি ছিল তখন রমজানের মাস। হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন হাসিনা। সাথে সাথে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাবিব হাসপাতালে। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হাসিনা পার্কারের মৃত্যুর কারণ- এই রায় দেন ডাক্তার।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ডনদের নিয়ে রয়েছে নানা আখ্যান ও পিলে চমকে দেবার মত ঘটনা। তবে নিঃসন্দেহে, হাসিনা পার্কার ওরফে “আপা”, মুম্বাইবাসীদের মনে দাগ কেটে রেখে যাবার মত একটি নাম। স্বামীর মৃত্যুর পর আটপৌরে জীবন কাটানো একজন সাধারণ নারী হয়ে ওঠেন মুম্বাইয়ের ত্রাস, কথাটি শুনলে সিনেমা মনে হলেও এটিই সত্য। মুম্বাই পুলিশকে কাদাজল খাইয়ে ছাড়া এই নারী কোন শ্যুটআউটে কিংবা জেলে কাটানো দিনে নয়, মৃত্যুবরণ করেন একেবারে প্রাকৃতিক নিয়মে, সহজাতভাবে। আর হ্যা, কিছুদিন পরেই হাসিনা পার্কারের নাম ভূমিকায় পর্দা কাঁপাতে আসছেন বলিউড হার্টথ্রব শ্রদ্ধা কাপুর। পোস্টার কিংবা টিজার, দুটি জায়গাতেই বেশ উৎরে গিয়েছেন তিনি। হাসিনা পার্কার তিনি কতটুকু হতে পারলেন, বাকিটা দর্শক বিচার করবে সিনেমা হলেই।

আজ আর নয়। প্রিয়লেখার সাথেই থাকুন।

(তথ্যসুত্রঃ গ্লামটেইনমেন্ট ডট কম, স্টারসআনফোল্ডেড ডট কম, ইন্ডিয়া ডট কম, সোশিওফ্রিক ডট কম)