হাইপেশিয়াঃ ইতিহাসের বিখ্যাত এক নারী আলকেমিস্ট - প্রিয়লেখা

হাইপেশিয়াঃ ইতিহাসের বিখ্যাত এক নারী আলকেমিস্ট

ahnafratul
Published: January 21, 2018

আলকেমি হচ্ছে এমন একটি বিদ্যা, যার সাহায্যে সীসাকে স্বর্ণে পরিণত করা যায় বলে ভাবা হতো। কথাটি সত্য না মিথ্যে সেটি নিয়ে যাচাই বাছাই করার সুযোগ খুব একটা নেই। তবে প্রথিতযশা অনেক বিজ্ঞানীই ধারনা করতেন যে সীসা থেকে স্বর্ণ তৈরি করা যায়। বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন, গ্যালিলেই গ্যালিলিওসহ নানা বিজ্ঞানীরা আলকেমিতে বিশ্বাস করতেন। তারা সফল হয়েছেন কিনা জানার সুযোগ নেই, তবে আধুনিক রসায়নের মানোন্নয়নে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। মনে আছে হ্যারি পটারের একদম প্রথম দিককার বইতে লেখা নিকোলাস ফ্লামেলের কথা? যিনি পরশপাথরের নিয়ে কাজ করেছিলেন? কোন ফিকশনাল চরিত্র নয়, নিকোলাস ফ্লামেল বলে সত্যিই কেউ একজন ছিলেন এবং তিনি আলকেমিস্টও বটে।

তবে নারীরা তাদের সময়ের চাইতে একটু বেশিই এগিয়ে ছিলেন। সকলেই নামকরা বিজ্ঞানী এবং আলকেমিস্ট ছিলেন। আবিষ্কার ও কর্মের দ্বারা নিজের নামাঙ্কিত করে গিয়েছেন বিশ্ব ইতিহাসের পাতায়। তবে তাদের অসামান্য এই অবদান ইতিহাস মনে রাখে নি, তাদেরকে পরিচয়ও তেমনভাবে করিয়ে দেয় নি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। এদের মাঝেই একজন হলেন হাইপেশিয়া।

যীশুর জন্মের ৩৫০-৩৭০ বছর আগে মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মিশর তখন ছিল প্রসিদ্ধ। তখন আলেক্সান্দ্রিয়া পূবের রোমার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, দর্শন ইত্যাদি বিভিন্ন শাখায় ছিল তার সরব বিচরণ। এসব বিষয়ে শিক্ষাও দিতেন তিনি। পানি পরিশুদ্ধকরণ ও এর উপাদান আলাদা করবার নিয়মাবলীও তিনি জানতেন। এখনকার দিনে এটি খুব সহজ কাজ বলে মনে হলেও তৎকালীন সময়ে এটিকে আলকেমি বিদ্যা বলে ধরে নেয়া হতো। আলকেমিরা মনে করতেন কোন বস্তু থেকে যদি এর উপাদানগুলো আলাদা করা যায়, তাহলে সেটি ঐ বস্তুটিকে আরো পরিশুদ্ধ করে তোলে। পানি ফুটানোকে অন্যতম একটি কাজ মনে করতেন আলকেমিস্টরা। আজকে আমরা জানি যে কথাটি সত্য। পানি ফুটানো হলে এর মাঝে যে ব্যাকটেরিয়াগুলো থাকে, সেগুলর মৃত্যু ঘটে।

হাইপেশিয়া দেখতে সুন্দরী ছিলেন, অভিজাত ছিলেন, কথাবার্তাও ছিল মার্জিত। অরেস্টেসসহ অনেকেই সেসময় তাকে বিয়ে করতে চাইত। তখনকার সময়ে আলেক্সান্দ্রিয়ার গভর্নর ছিলেন অরেস্টেস। হাইপেশিয়া ছিলেন নাস্তিক এবং পেইগান উপাসক আর অরেস্টাস ছিলেন মনে প্রাণে ক্রিশ্চিয়ান। বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হলে হাইপেশিয়া সরাসরি নাকচ করে দেন এবং বলেন বিয়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কোন সম্পর্কে তিনি বিশ্বাস করেন না। অরেস্টাস তার এই মতামতকে শ্রদ্ধা জানান এবং তারা খুব ভালো বন্ধু হয়ে যান। তখনকার সময়ে আলেক্সান্দ্রিয়ায় সিরিল নামক এক ঈর্ষান্বিত ক্রিশ্চিয়ান শাসন করতে আসেন এবং শহর থেকে সকল ইহুদীদের বিতাড়িত করেন। অরেস্টেস হাইপেশিয়াকে সতর্ক করবার অনেক চেষ্টা করেন যাতে সে ক্রিশ্চিয়ান হয়ে সিরিলের রোষানল থেকে বাঁচতে পারে। প্রস্তাব নাকচ করে দেন হাইপেশিয়া।

যীশুর জন্মের ৪১৫ বছর আগে হাইপেশিয়ার সাথে করুণ এক ঘটনা ঘটে। সিরিলের কিছু অনুগামী ও উন্মত্ত জনতা হাইপেশিয়াকে একদিন তার গাড়ি থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে আনে। হতভাগ্য হাইপেশিয়ার কাপড় চিরে ফেলা হয় এবং নগ্ন দেহের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় তারা। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হাইপেশিয়াকে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়। মৃত দেহ থেকে প্রত্যেকটি অঙ্গ আলাদা করে ছিঁড়ে ফেলা হয়। পুড়িয়ে ফেলা হয় ইতিহাসের প্রথম নারী গণিতবিদ ও আলকেমিস্টের শরীর। ক্ষুব্ধ অরেস্টেস সিরিলের দরবারে যান এই ঘটনার বিচার চাইতে। সিরিল কিছুই করেন নি। আপাতদৃষ্টিতে যেন মনে হয় হাইপেশিয়ার মৃত্যুর পেছনে এই শাসকেরই হাত ছিল।

সবচেয়ে হাস্যকর এবং এরচাইতেও মর্মান্তিক ঘটনা হচ্ছে হাইপেশিয়ার মৃত্যুর কিছু বছর পরই চার্চ সিরিলকে ‘সেইন্ট’ (সন্ত) উপাধিতে ভূষিত করে।

যীশুর জন্মের ৪১৫ বছর পূর্বে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মারা যান হতভাগ্য এই আলকেমিস্ট। ইতিহাসে তাকে কেউ কেউ ডাইনি বলেও আখ্যায়িত করেছে।