স্পাইডার সিল্কঃ বিজ্ঞানের অবাক বিস্ময় যা বদলে দিবে আগামীর পৃথিবী - প্রিয়লেখা

স্পাইডার সিল্কঃ বিজ্ঞানের অবাক বিস্ময় যা বদলে দিবে আগামীর পৃথিবী

Naseeb Ur Rahman
Published: August 19, 2017

চিত্রঃ ফ্রিটজ ভলর‍্যাথ যিনি একদল গবেষককে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও পরিচালনা করছেন অক্সফোর্ড সিল্ক প্রোজেক্ট,যারা স্পাইডার সিল্ক এর বায়োলজিক্যাল, কেমিক্যাল ও মেক্যানিকাল প্রোপার্টির অনুসন্ধান করছেন।

বিজ্ঞানের যে অবাক বিস্ময় তার সূত্রপাত ঘটে কিন্তু বৈপব্লিক ধারনার উপর। আমরা তো মজা করেই বলি যদি নিউটনের মাথার উপর আপেল না পড়তো তবে কখনোই দি ল অফ গ্র্যাভিটি আবিষ্কার হতো না। ঠিক তেমনি আর্কিমিডিস যদি গোসলে না ঢুকতেন, যদি রাজা তাকে স্বর্ণের মুকুট হতে খাদ বের করার দায়িত্ব না দিতেন, তিনি যদি ইউরেকা ইউরেকা বলে বেরিয়ে  না আসতেন আমরা পেতাম না পানির প্লবতা সূত্র। বলতে চাইছি, কল্পনা, জ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা ও আবিষ্কারের নেশা এই সব গুনাবলী একজন বিজ্ঞানীর রক্তের কণায় কণায় ছুটে বেড়ায়। আর তা পাল্টায় আগামীর পৃথিবী।

স্পাইডার সিল্ক ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা অনন্য উপাদানঃ

চিত্রঃ রাজা চতুর্দশ লুই

১৭০৯ সালে ফ্রাসোঁয়া জেভিয়ার বোঁ দ্যা সেইন্ট হিলেইয়ার , প্রেসিডেন্ট অফ কোর্ট অফ অ্যাকাউন্টস, এইড, অ্যান্ড ফিন্যান্স, মন্টেপেলিয়ার, ফ্রান্স এর রাজা চতুর্দশ লুইকে একজোড়া রুপালী মোজা উপহার দিয়েছিলেন যা স্পাইডার সিল্ক দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল।যেই সিল্ক সংগ্রহ করা হয়েছিলো ১০০ এর উপর মাকড়সা হতে। পরবর্তী বছর  ফ্রাসোঁয়া জেভিয়ার বোঁ দ্যা সেইন্ট হিলেইয়ার ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটিতে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, স্পাইডার সিল্ক দিয়ে উৎকৃষ্ট মোজা বা পোশাক প্রস্তুত করা কোন সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে অতগুলো  মাকড়সা থেকে সুতো সংগ্রহ করা ও প্রস্তুত করা। তারো ৩০০ বছর পরে আজ সেই স্পাইডার সিল্কের প্রস্তুতকৃত পোশাক আধুনিক জনগনের স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আজ চাইলে যে কেউ স্পাইডার সিল্কের প্রস্তুতকৃত হাতে বোনা টাই সহ পোশাক ক্রয় করতে পারে যা লিমিটেড এডিশন হিসেবে বিক্রি করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রসিদ্ধ বায়ো টেকনোলজি কোম্পানি বোল্ট থ্রেড।

আসলে কি আছে স্পাইডার সিল্কেঃ

স্পাইডার সিল্ক এমন একটি সিন্থেটিক ম্যাটেরিয়াল যা পাল্টাতে পারে আগামীর ভবিষ্যৎ। একে বলা হচ্ছে পোশাক শিল্পের বৈপ্লবিক অগ্রদুত যা হটিয়ে দিবে নাইলনকে।  যা থেকে এমন কি বুলেটপ্রুফ ভেস্ট ও বানানো সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছিলো। গবেষকরা এই ধারণাটি পেয়েছিলেন রেশমের থেকে প্রাপ্ত সিল্কের আনবিক গঠন, সহন শক্তি ও নমনীয়তা সম্পর্কে জানতে পেরে।কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশক গবেষণা করে এটি প্রমাণিত হয়েছিলো যে মাকড়শার জাল থেকে পোশাক বানানো সম্ভব হলেও অন্তত বুলেটপ্রুফ ভেস্ট প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। তবে কম ক্যালিবারের বুলেট যেমন .২২ ক্যালিবার আটকাতে পেরেছিলো স্পাইডার সিল্ক দিয়ে তৈরি করা স্কিন।   

“মাকড়সার জাল থেকে প্রাপ্ত সুতা যথেষ্ট প্রসারিত করা সম্ভব কিন্তু তা যতক্ষনে বুলেটকে বাঁধা দিবে ততক্ষণে তা আপনার শরীরকে স্পর্শ করে আপনাকে আহত করে ফেলবে। এছাড়াও মাকড়সার সুতা সংগ্রহ করতে হবে মাকড়সা হতে যা আর্থিকভাবে লাভজনক নয়।”-ফ্রিটজ ভলর‍্যাথ 

চিত্রঃ ফ্রিটয ভলর‍্যাথ যাকে স্পাইডারসিল্ক গবেষণার অগ্রদূত বলা হয় (ডান থেকে দ্বিতীয়)

তবু কিন্তু স্পাইডারসিল্ক নিয়ে গবেষণা থেমে থাকে নি। বুলেটপ্রুফ ভেস্ট তৈরি করতে না পারায় গবেষণা এবার নতুন দিকে মোড় নেয়। এবার বিজ্ঞানীরা তাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করেন ঠিক স্পাইডারসিল্কের মত বিকল্প ম্যাটেরিয়াল আবিষ্কার করবেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কি আছে স্পাইডার সিল্কে? কেন এটা নিয়েই এতো মাতামাতি। তবে চলুন জেনে নিই স্পাইডার সিল্কের বৈশিষ্ট্য বাস্তব জীবনের স্পাইডারম্যান  ফ্রিটজ ভলর‍্যাথ থেকে। আর তাকে কিন্তু আমরা স্পাইডারম্যান বলছি না, দীর্ঘকালীন তার গবেষণার বিষয়বস্তু দেখে বিশ্বনন্দিত পত্রিকা টেলিগ্রাফ তাকে ‘বাস্তব জীবনের স্পাইডারম্যান’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রফেসর ফ্রিটজ ভলর‍্যাথ এর মতে স্পাইডার সিল্ক এর যুগান্তকারী প্রভাব পড়বে কৃষি,ভ্রমন, স্থাপত্যবিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান এমন কি ঔষধ শিল্পেও । তিনি এমন কি স্পাইডার সিল্ক ব্যবহার করে ‘লিভিং ইমপ্ল্যান্ট’ সৃষ্টি করেন যা মানুষের জয়েন্ট ও নার্ভ কে রিজেনারেট করতে সক্ষম।

স্পাইডারসিল্কের বৈশিষ্ট্যঃ

  •  সিন্থেটিক সিল্ক একধরনের বায়োপলিমার দিয়ে আবিষ্কার করা হয় যাকে বলা হচ্ছে অ্যাকুয়ামেল্ট
  • এই উপাদান রুম টেম্পারেচারের সাথে প্রসারিত হয়
  • এই উপাদান দিয়ে তৈরি পোশাক হাল্কা ও ওয়াটারপ্রুফ
  • স্পাইডার সিল্ক সম্পর্কে এমন ও কথিত রয়েছে যে স্পাইডার সিল্ক স্টিলের চেয়ে ৫ গুন বেশী শক্তিশালী।
  • স্পাইডার সিল্ক বুলেটপ্রুফ ভেস্ট কেভলারের চেয়েও বেশী টিয়ার রেসিস্ট্যান্ট অর্থাৎ সহজে ছেড়া সম্ভব নয়।

স্পাইডার সিল্ক দিয়ে কি আসলেও পোশাক তৈরি করা হয়েছেঃ

চিত্রঃ মাদাগাস্কার গোল্ডেন ওর্ব স্পাইডার

স্পাইডার সিল্কের ইতিহাস অনেক পুরোনো। এটি আফ্রিকার মাদাগাস্কারে চাষ করা হতো। স্পাইডার সিল্কের দারুণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এটি খুবই শক্ত, খুবই স্থিতিস্থাপক। তবে এটি হাতে বুনন করা খুব কঠিন কাজ। এছাড়াও স্পাইডারকে চাষ করা মুশকিল। গোল্ডেন স্পাইডার ওয়ার্ম আফ্রিকার মাদাগাস্কারে পাওয়া যায়। সাধারণত স্ত্রী স্পাইডার থেকে সিল্ক সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ৬০ জনের এক গ্রুপ মিলে ৫ বছর কাজ করে ২০১৩ সালে একটি কাপড় তৈরি করার মতো সিল্ক সংগ্রহ করেন।কাপড় তৈরি করার জন্য প্রথমে স্পাইডার সংগ্রহ করে সেগুলোকে কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়, তারপর সেগুলো থেকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সিল্ক ফিলামেন্ট সংগ্রহ করা হয়। এরপর অনেকগুলো সিল্ক ফিলামেন্ট একত্রিত করে পাক দিয়ে একটি সিল্ক সুতা তৈরি করা হয়। সুতা তৈরি করার পর তাঁতের মাধ্যমে লুমে কাপড় তৈরি করা হয়। উইভিং করার পরে আরো অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের মাধ্যমে ফিনিশিং প্রোডাক্ট পাওয়া যায়।

চিত্রঃ স্পাইডারসিল্ক দিয়ে হাতে বুনে তৈরি করা “  গোল্ডেন কেপ”  যা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে ১.২ মিলিয়ন মাদাগাস্কার গোল্ডেন ওর্ব  স্পাইডার হতে প্রাপ্ত সিল্ক, এটি তৈরিতে সময় লেগেছে ৮ বছর। তৈরি করেছেন সাইমন পিয়ার্স ও নিকোলাস গোল্ডলি

জাপানে আধুনিক পদ্ধতিতে স্পাইডার সিল্ক থেকে কাপড় তৈরি করা হয়। আর এ সিল্কের তৈরি পোশাক জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রদর্শিত হয়েছে। স্পাইবার নামের জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান সিনথেটিক স্পাইডার সিল্কের এ পোশাক তৈরি করেছে। তাদের দাবি মাকড়সার সিল্কের তৈরি এ পোশাক অনেক শক্ত হলেও তা অনেক হাল্কা। এ প্রযুক্তি আবিষ্কারের জন্য ১৬টি পেটেন্টের দাবি করেছে স্পাইবার।

চিত্রঃ ‘স্পাইবার’প্রতিষ্ঠাতা কাজুহিদে সেকিয়ামা

হুবহু মাকড়সার জালের মতো সিল্ক তৈরি বেশ কঠিন। তবে স্পাইবারের বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকরা জিন সংশ্লেষ ও ব্যাকটেরিয়া থেকে বিশেষ প্রোটিনের কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘ফাইব্রোইন’ নামের এ প্রোটিন অনেকটাই মাকড়সার জালের প্রোটিনের মতো। গবেষকরা জানিয়েছেন, পোশাক ছাড়াও কুমোনোস (জাপানি ভাষায় স্পাইডার সিল্ক) ব্যবহার করে ফিল্ম, জেল, স্পঞ্জ, কৃত্রিম রক্তনালি ও ন্যানো ফাইবার তৈরির কাজ করা যাবে। এছাড়া শিল্প ক্ষেত্রে গাড়ির যন্ত্রাংশ ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই সিল্ক কাজে লাগবে।

চিত্রঃ সিনথেটিক স্পাইডার সিল্ক যা প্রস্তুত করছে ‘স্পাইবার’

কেন স্পাইডার সিল্ক কে বলা হচ্ছে আগামীর ভবিষ্যৎঃ

পোশাক খাতেঃ

আমরা বর্তমানে যে সকল পোশাক পরিধান করছি তার বেশির ভাগই প্রস্ত্যুত করা হচ্ছে সিনথেটিক সুতা নাইলন থেকে। নাইলন এর প্রধান উপকরন হচ্ছে অ্যাক্রিলিক বা পলিমার যা আসছে পেট্রোলিয়াম থেকে। আর আমরা সবাই জানি পেট্রোলিয়াম আসে অপরিশোধিত খনিজ তেল থেকে। তাই আমরা কিন্তু নাইলনের পোশাক কে স্বাস্থ্য সম্মত বলতে পারি না। আবার আমরা যদি শুধু সুতি কাপড় পড়তে চাই তাও কিন্তু কঠিন কারন তুলার আঁশ এর মূল্য যথেষ্ট বেশী যে কারনেও কাপড় উপাদনকারীরা খরচ কমাতে সিন্থেটিক সুতা নাইলন বেশী ব্যবহার করছে। বিজ্ঞানীরা এবং উদ্যোক্তারা তাই খোঁজ করছিলেন  স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব সুতার যার সন্ধান দিয়েছে স্পাইডার সিল্ক।

  চিত্রঃ স্পাইডারসিল্ক দিয়ে ‘স্পাইবার’ নর্থফেস গ্রুপের জন্য তৈরি করেছে মুন পারকা

চিকিৎসা খাতেঃ

দীর্ঘ ৫বছর গবেষণার পর যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানীরা প্রস্তুত করেছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রোপার্টি সমৃদ্ধ স্পাইডারসিল্ক যা যে কোন ধরনের কাটা ছেড়া, জখম বা ক্ষতের দ্রুত উপশম ঘটাবে এবং ইনফেকশন প্রতিরোধ করবে। এই নতুন ধরনের স্পাইডার সিল্ক  সংগ্রহে ই-কোলি ব্যাকটেরিয়ার সহায়তা নেওয়া হয় বলে উল্লেখ করেন ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম থেকে পরিচালিত এই গবেষণার মুখপাত্র ‘নিল থমাস’। তিনি আরও বলেন এই গবেষণার ধারনাটি আসে প্রাচীন গ্রীক ও রোমানদের চিকিৎসা বিদ্যা থেকে,  যুদ্ধে আহত সৈনিকদের ব্যান্ডেজ স্পাইডার সিল্ক হতে প্রস্তুত করা হতো, এবং তাতে অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে ব্যবহৃত হতো মধু ও ভিনেগারের মিশ্রণ। স্পাইডার সিল্ক চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অবদান রাখতে পারে কারন এটি বায়োকম্প্যাটিবল, বায়োডিগ্রেডেবল ও প্রোটিনবেসড  যার কোন ধরনের এলারজিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

স্পাইডার সিল্ক ব্যবহৃত হতে পারে কেমিক্যাল ডিটেক্টর হিসেবেওঃ

ÉCOLE POLYTECHNIQUE FÉDÉRALE DE LAUSANNE (EPFL)  সুইজারল্যান্ড এর ফেডারেল ভিত্তিক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এর গবেষক প্রফেসর ল্যুক থেভেনাজ তার গবেষণায় বলেছেন স্পাইডার সিল্ক হতে পারে পারফেক্ট অপ্টিক্যাল ফাইবার ও কেমিক্যাল ডিটেক্টর। কিছু সুনির্দিষ্ট মলিকিউল ব্যবহার করার ফলে স্পাইডার সিল্ক তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। স্পাইডার সিল্ক এর সাথে লেজার ও পোলারাইজড অ্যানালাইজার ব্যবহার করলে তা তাৎক্ষনিক কেমিক্যাল ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার করা যায় যা রিউইসেবল।

স্পাইডার সিল্ক কে প্রথমে মিথ বলে মনে করা হলেও ক্যালিফোর্নিয়ার বোল্ট থ্রেড ও  জাপানের স্পাইবার এর মাঝে চলছে স্পাইডার সিল্কের সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগীতা যদিও দুইজনের লক্ষ্য ও কর্মপন্থা ভিন্ন। বোল্ট থ্রেড বলছে সিনথেটিক স্পাইডার সিল্ক নির্মাণে তারা মডিফাইড ইষ্ট, পানি ও চিনি ব্যবহার করছে আর স্পাইবার ব্যবহার করছে ই-কোলি ব্যাক্টেরিয়া। আসলে কোন কাজে লাগানো যায় না স্পাইডার সিল্ক তাই নিয়ে গবেষণা করা উচিত আর তা ভবিষ্যৎ বলে দিবে কারন স্পাইডার সিল্ক এর সম্ভাবনা অযুত।