সৌমিত্র চ্যাটার্জীর সাথে একবেলা - প্রিয়লেখা

সৌমিত্র চ্যাটার্জীর সাথে একবেলা

Sanjoy Basak Partha
Published: August 1, 2017

বয়স হয়ে গেছে ৮২, এখনো তিনি আগের মতই সুদর্শন, হ্যান্ডসাম, স্মার্ট। সেই ১৯৫৯ সাল থেকে ২০১৭, প্রতি বছরই তাঁর অন্তত একটি ছবি হলেও মুক্তি পেয়েছে। বাংলা সিনেমায় এখনো এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। ফিল্মফেয়ার ডট কমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে কিংবদন্তি এই অভিনেতার জীবনের নানা দিক। প্রিয়লেখার পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হল।

সত্যজিৎ রায়ের অপুর সংসার দিয়ে শুরু। এরপর ১৯৫৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রতি বছরই আপনার ছবি মুক্তি পেয়েছে!

সৌমিত্র: এটা তো আমার কাজ। আমি একজন পেশাদার অভিনয়শিল্পী, সবসময় তাই হতে চেয়েছি। আমি ভাগ্যবান যে কিংবদন্তি বাঙালি থিয়েটার ব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীর সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলাম। এরপর সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে প্রথম সুযোগ পাওয়া। আমার ক্যারিয়ারে তাঁর অবদান আমি সবসময়ই স্মরণ করব।

কিন্তু শিশির কুমার ভাদুড়ী সিনেমার প্রতি এতটাই বিমুখ ছিলেন যে উনি সত্যজিৎ রায়ের মহানগরে অভিনয় করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। আপনি তাহলে সিনেমার প্রতি উৎসুক হলেন কিভাবে?

সৌমিত্র: ছোটবেলা থেকেই আমি সিনেমার জন্য পাগল ছিলাম। স্কুল পালিয়েও সিনেমা দেখতে গিয়েছি। কিন্তু আমার প্রথম প্রেম ছিল থিয়েটার। এখনো সিনেমার ফাঁকে ফাঁকে থিয়েটার করি আমি।

সবকিছু সামলান কিভাবে?

সৌমিত্র: জানিনা আসলে… শারীরিকভাবে কিছুটা ক্লান্ত অনুভব করি আজকাল। কিন্তু আমার আর কোন বিকল্প নেই। এটাই আমার কাজ, এটাই আমার জীবন। অভিনয় করেই আমি আজকের আমি হয়েছি।

আপনি একজন কবি, লেখক, চিত্রশিল্পীও বটে। ম্যাগাজিন এক্ষণ এর সম্পাদকও আপনি। এত কাজ করার অনুপ্রেরণা পান কোত্থেকে?

সৌমিত্র: ছোট থেকে সৃজনশীল কাজের প্রতি আমার নেশা ছিল। বলতে পারেন আমি সব কাজই পারতাম, কিন্তু কোনটাতেই বিশেষ পারদর্শী ছিলাম না। এরপর থিয়েটার ও কবিতা আবৃত্তির দিকে মনোযোগ দিলাম। বাবা মায়ের থেকেও অনেক সাহায্য পেয়েছি আমি।

অপুর সংসারের কথা বলুন। শোনা যায় যে সত্যজিৎ রায় আপনার সাথে স্ক্রীনপ্লে শেয়ার করেছিলেন, যেটা তিনি অন্য কারোর সাথেই করতেন না।

 

সৌমিত্র: অপু ট্রিলোজির দ্বিতীয় যেটি, অপরাজিত (১৯৫৬), সেটির কলেজ ছাত্র অপুর চরিত্রের জন্য তিনি কাউকে খুঁজছিলেন। কিন্তু চরিত্রটির জন্য আমি নাকি বেশি বড় ছিলাম! আমাকে যখন প্রথম উনার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তো অনেক বেশি লম্বা আর বড়!’ ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘গোল্ডেন লায়ন অনারারি অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার পর তিনি ট্রিলোজির তৃতীয় অংশ করার ঘোষণা দিলেন। আমি তখন ভাবতেও পারিনি যে উনি আমাকে পছন্দ করবেন (হাসতে হাসতে বললেন)। বহু বছর পর উনি আমাকে বলেছিলেন, আমাকে দেখার পরেই নাকি উনি তৃতীয় অংশ করবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দিয়ে শুরু.. এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে! এমন আরও অনেকেই আছেন যাদের অভিষেক হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দিয়ে। কিন্তু আমার মত তাঁর সঙ্গ আর কেউই উপভোগ করতে পারেননি। আমরা একসাথে ১৪ টি ফিচার ফিল্ম ও ২ টি ডকুমেন্টারি করেছি। আমার মনে আছে, উনার বাবা সুকুমার রায়কে নিয়ে যেটি তৈরি করেছিলেন, ওইটাতে আমার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করেছিলেন। আমি যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম, কারণ ওই একটি ছাড়া বাকি সবগুলোতে উনি নিজের কণ্ঠই ব্যবহার করেছিলেন।

সিনেমা বোদ্ধারা আপনাকে ‘সত্যজিৎ রায়ের দ্বিতীয় সত্ত্বা’ বলে ডাকতেন। আপনার নিজের কি মত?

সৌমিত্র: তিনি জানতেন আমার কাছ থেকে কতটুকু কি প্রত্যাশা করতে হবে। আবার আমিও জানতাম উনি আমার কাছ থেকে কি প্রত্যাশা করেন। আমাদের আত্মিক সংযোগ ছিল দুর্দান্ত। উনি ছিলেন আমার মেন্টর। তিনি যে শুধু আমার ক্যারিয়ার গড়ে দিয়েছেন তা না, তিনি আমার মানসিকতাই গড়ে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের জিনিয়াস। তাঁর সাথে আমার কোন তুলনাই হওয়া উচিত না। হলে সেটা খুবই বাজে হবে।

আপনি একবার বলেছিলেন, প্রথম সিনেমাতেই সত্যজিৎ রায় আপনাকে অভিনয়ের স্বাধীনতা দিয়ে দিয়েছিলেন…

সৌমিত্র: তিনি কিন্তু কখনোই বলেননি আমি যা খুশি তাই করতে পারি। আমি চলচ্চিত্রে না থাকলেও উনি আমাকে উনার স্ক্রিপ্ট শোনাতেন। এমনও হয়েছে, স্ক্রিপ্ট শুনে উনাকে আমি একটা চরিত্র দেয়ার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি রাজি হননি (হাসতে হাসতে বললেন)। গুপী গাইন বাঘা বাইনে গুপী চরিত্রটা আমি খুব করে করতে চেয়েছিলাম। আমাকে যখন স্ক্রিপ্টটা পড়ে শোনালেন উনি, লাফিয়ে উঠে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু উনি বলেছিলেন, কৃষকের ছেলের মত ফেস নাকি আমার নেই! মজার ব্যাপার হচ্ছে, চরিত্রটা শেষ পর্যন্ত যিনি করেছিলেন, তপেন চ্যাটার্জী, তিনি যেন এই চরিত্রের জন্যই জন্মেছিলেন! তিনি এতটাই অসাধারণ করেছিলেন, আমি মানিকদা’র (সত্যজিৎ রায়) কাছে গিয়ে বলতেও পারছিলাম না যে আমি এর চেয়েও ভালো করতে পারতাম। শেষ পর্যন্ত গুপী গাইন বাঘা বাইন সিরিজের সাথে আমিও অন্তর্ভুক্ত হলাম, হীরক রাজার দেশের উদয়ন পন্ডিত হয়ে। যাই হোক, আগের কথায় ফিরে আসি.. আমাদের শেষ ছবি শাখা প্রশাখা পর্যন্ত উনি আমাকে সেই স্বাধীনতাটা দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, চরিত্রটা খুব ছোট, বেশি হলে ২৫ লাইনের মত ডায়লগ পাওয়া যাবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমি চরিত্রটা করব কিনা। আমি হেসেছিলাম। মানিকদা যদি আমাকে ঘরের এক কোণায় ছাতা হাতেও দাঁড়িয়ে থাকতে বলতেন, আমি সেই চরিত্রটিও করতাম।

শাখা প্রশাখা সত্যজিৎ রায়ের দ্বিতীয় সর্বশেষ ছবি, আর আপনাদের দুজনের একসাথে শেষ ছবি। অন্যগুলোর থেকে এটি কিভাবে আলাদা ছিল?

সৌমিত্র: মানিকদা আমাকে বলেছিলেন, ‘শোনো সৌমিত্র, সব ছবিতেই আমি তোমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে এসেছি। কিন্তু এই ছবিতে আমরা দুজন একসাথে চিন্তা করব’। চরিত্রটা একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির চরিত্র ছিল। তিনি বললেন, ‘এই ধরণের চরিত্র আমি অনেক দেখেছি, তুমিও দেখেছ। তাদের একটা আলাদা চরিত্র আছে। আমি চাই স্ক্রীনপ্লে লেখার সময় তুমি সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমার সাথে শেয়ার করবে’।

এতদিনের যাত্রায় কোন বিশেষ ঘটনা যা আপনার মনে পড়ে?

সৌমিত্র: পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে হাজার দিন হাজার রাত শুটিং করেছি আমি। কিন্তু অপুর সংসারের প্রথম দিনের শুটিংয়ের কথা কখনোই ভুলব না আমি। শটটা ছিল, একটা বোতলের কারখানায় অপু কাজ খুঁজছে। লোকেদের সেখানে রোবটের মত কাজ করতে দেখে সে। এই দৃশ্য দেখে অপু বুঝতে পারে, এই কাজ তার জন্য না।

উত্তম কুমারের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?

সৌমিত্র: আমার বোনের স্বামীর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন উত্তম কুমার। প্রথমবার তাঁর সাথে আমার দেখা হয় উনি আমার বোনের বিয়েতে এলে। আমাদের একসাথে করা প্রথম ছবি ছিল তপন সিনহার ‘ঝিন্দের বন্দী’। আউটডোর শুটিং করতে করতে আমরা একে অপরের প্রেমে পরে  গিয়েছিলাম (হাসি)। এরপর অনেক বাধা বিপত্তি এলেও আমাদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।

আপনার তো বিশাল মেয়ে ভক্তকুল ছিল। সামলাতেন কিভাবে?

সৌমিত্র: নারী ভক্তদের আগ্রহ উপভোগ করতাম না, সেটা বললে মিথ্যা বলা হবে। নারী ভক্তের কাছ থেকে প্রথম যে প্রেমপত্র টা পেয়েছিলাম, আমার স্ত্রী দীপা সেটা বহু বছর সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর বার দুয়েক আমরা বাসা বদল করলাম, তখন সেটা হারিয়ে গেল (হাসি)। চিঠিটার মূলকথা ছিল, ‘আমার দুর্ভাগ্য যে আপনি বিবাহিত’। এরপর আরও অনেক অনেক চিঠি পেয়েছি, কিন্তু প্রথম পাওয়া এই চিঠিটা স্পেশাল ছিল।

লোকে এখনো আপনাকে ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এর তরুণ ফেলু গোয়েন্দা হিসেবে মনে রেখেছে। এমনকি সত্যজিৎ রায় নাকি আপনাকে মাথায় রেখেই ফেলুদাকে আঁকতে শুরু করেছিলেন…

সৌমিত্র: প্রথম স্কেচটা আমার মত ছিল না। আমার মনে আছে আমি মানিকদা কে বলছিলাম যে উনি নিজেকেই ফুটিয়ে তুলছেন কিনা ফেলুদার মধ্যে। একটা গোটা জেনারেশন বেড়ে উঠেছে ফেলুদার সাথে, এবং আমি তাদের সেই ফেলুদা হয়ে ছিলাম। সত্যি বলতে, শুরুর দিকে লোকে যখন আমাকে ফেলুদা বলে ডাকত, আমার অতটা পছন্দ হত না। আমি ভাবতাম, ‘আমি তো কত ভাল ভাল ছবি করেছি। আমার কি শুধুই ফেলুদা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া উচিত? অপুর সংসার বা অশনি সংকেত এর জন্য পাওয়া উচিত না?’ কিন্তু আমি পরে আমার ভুল বুঝতে পেরেছিলাম। যদি একজন লোকও আমাকে ফেলুদা হিসেবে মনে রাখে, আমার তাতে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত, রাগ করা না। তখনকার সময়ে বাচ্চাদের জন্য খুব বেশি ছবি ছিল না। পুরো বাংলার বাচ্চাদের জন্যই ছবিগুলো করেছিলাম।

হৃষীকেশ মুখার্জী, দিলিপ কুমার, রাজ কুমার- অনেকেই আপনাকে হিন্দি ছবিতে কাজের কথা বলেছিলেন, কিন্তু আপনি রাজি হননি। কেন?

সৌমিত্র: আমি আসলে জানিনা কেন। আজকের দিনে হলে আমি হয়তো ফিরিয়ে দিতাম না। তখন আমি কিছুটা বোকা ছিলাম, টাকার গুরুত্বটা ঠিকভাবে বুঝতাম না। সত্যি বলতে, সেখানে কাজ করার ব্যাপারে কখনোই তেমন উত্তেজিত ছিলাম না আমি। সেখানে গেলে কি আমি কবিতা লিখতে পারতাম? থিয়েটার করতে পারতাম? হিন্দি ছবিতে কাজ করে আরও বেশি খ্যাতি হয়তো পেতাম। কিন্তু আমি সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কাজ করেছি, আর সেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রদর্শিত হত। পরবর্তী জীবনে এসে টিভি সিরিয়াল করেছি, তবে সেটা শুধু আমি হিন্দি বলতে পারি তা প্রমাণ করার জন্যই।

নাসিরুদ্দিন শাহ আপনার বড় ভক্ত। দেখা হয়েছে তাঁর সাথে?

সৌমিত্র: ও হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার। আমরা একসাথে বার্লিন গিয়েছিলাম। আমি জানতাম না উনি আমার ভক্ত, একবার দারুণ প্রশংসা করলেন, তখন জানলাম। বার্লিনে আমাদের একটা ফিল্ম শোতে যাওয়ার কথা ছিল। আকিরা কুরুসাওয়ার ছবি ছিল। কিন্তু উনি এলেন না। পরদিন সকালে জিজ্ঞেস করলাম এলেন না কেন। উনি বললেন, ‘দাদা, আমি আসতাম। কিন্তু হঠাৎই জানতে পারলাম, টিভিতে অশনি সংকেত দেখাবে। সত্যজিৎ রায়ের এই একটা ছবিই আমার দেখা হয়নি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, নাসির, ছবিটা ভালো লেগেছে? আমার কাজ পছন্দ হয়েছে? তিনি বললেন, ‘দাদা, অভিনেতা হিসেবে কাউকে যদি এতটা অনুপ্রাণিত করতে পারি, যতটা আপনি আমাকে করেছেন, তাহলে আমি পরিপূর্ণ হব’। সে আমার কাজের অনেক বড় প্রশংসাকারী ছিল। আমিও তাঁর প্রশংসা করি।

তপন সিনহা, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার- সব বড় পরিচালকদের সাথেই কাজ করেছেন, একমাত্র ঋত্বিক ঘটক ছাড়া। আফসোস হয়?

সৌমিত্র: না। আমার মনে হয় আমাদের কেমিস্ট্রি টা খুব বেশি জমত না। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে খুব একটা পছন্দ করতাম না। কিন্তু একজন পরিচালক হিসেবে তাঁকে আমি সম্মান করি।

নতুনদের সাথে কাজ করা উপভোগ করেন?

সৌমিত্র: তারা ভালো কাজ করলে উপভোগ করি। না করলে উপভোগ করি না।

শিবপ্রসাদ মুখার্জী ও নন্দিতা ঘোষের সাথে অলীক সুখ, প্রাক্তন এবং বেলাশেষে তে অভিনয় করেছেন। এখন পোস্ততেও করছেন। পরিচালক হিসেবে কেমন উনারা?

সৌমিত্র: তারা দক্ষ, নিজের কাজটা জানে। তারা মূলত পারিবারিক সিনেমাই বানায়, যা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। মিডল ক্লাস অডিয়েন্সের কাছে কিভাবে পৌঁছাতে হবে, সেটা তারা জানে।

পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে জীবন আপনাকে সবচেয়ে বড় কোন শিক্ষাটা দিয়েছে?

সৌমিত্র: সত্যবাদী হওয়া।