‘সালমান শাহ হত্যাকাণ্ড’ কি শুধুই অমীমাংসিত মামলার তালিকায় আরেকটি সংযোজন? - প্রিয়লেখা

‘সালমান শাহ হত্যাকাণ্ড’ কি শুধুই অমীমাংসিত মামলার তালিকায় আরেকটি সংযোজন?

farzana tasnim
Published: September 7, 2017

২২ বছর হয়ে গেল তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। অবশ্য বলতে গেলে সবার চেনাজানার জগতে তার বিচরণও ছিল মোটে চার বছর। কিন্তু সেই চার বছরেই নিজের যে অবস্থান তিনি তৈরি করে গিয়েছিলেন, কই ২২ বছর পরেও তো তেমন আরেকজনের দেখা পাওয়া যায় না? মার্জিত ব্যবহার, অভিনয়ে দক্ষতা, সুদর্শন চেহারা সব মিলিয়ে ঢালিউডের এই কমপ্লিট প্যাকেজকে কে ভুলতে পারবে? তার মৃত্যুর পরে জন্ম নেয়া অনেক দর্শককে আজও তিনি নিজের মায়াজালে জড়িয়ে চলেছেন ঠিক একইভাবে। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতকে নিয়ে যেতেন ভিন্ন উচ্চতায়। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেয়া হয়নি। ‘রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের’ শিকার সালমান শাহ যে এভাবে ক্ষণজন্মাদের তালিকায় নাম লেখালেন তার কোন সুরাহা কি আজ ২১ বছর পরেও হবে না?

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে তিনি। সালমান পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। একই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী দুই বছর তার সহপাঠী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বিকম পাস করেন।

সালমান শাহ অভিনয় জীবন শুরু করেন নাটক এবং বিজ্ঞাপন চিত্রের মাধ্যমে। পরবর্তীতে সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রজগতে পদার্পন করেন সালমান শাহ। প্রথম ছবিতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হন। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি তাকে। একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে গেছেন।

আশির দশকের শেষ ভাগে হানিফ সংকেতের গ্রন্হনায় ‘কথার কথা’ নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হত। এরই কোন একটি পর্বে হানিফ সংকেতের নিজ কণ্ঠে গাওয়া গানের মিউজিক ভিডিওতে সালমান শাহ মডেল হিসেবে অভিনয় করেন। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ পারিবারিক ঝামেলার কারণে কিভাবে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায় সে গল্প ফুটে উঠেছিল মিউজিক ভিডিওতে। মিউজিক ভিডিওটি জনপ্রিয় হলেও অনিয়মিত হওয়ার কারণে দর্শক ধীরে ধীরে ভুলে যায় মডেলের কথা। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আবার আলোচনায় আসেন তিনি।

সালমান শাহ অভিনীত মোট চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৭টি। সবচেয়ে বেশী ছবিতে জুটি বেঁধেছেন শাবনূরের সাথে। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এর মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে অভিনয়জীবন শুরু এবং ‘বুকের ভেতর আগুন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাপ্তি। সালমান শাহর অভিনীত একক নাটকগুলো হল: আকাশ ছোঁয়া, দোয়েল, সব পাখি ঘরে ফেরে, সৈকতে সারস, নয়ন, স্বপ্নের পৃথিবী এবং ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে রয়েছে পাথর সময় এবং ইতিকথা।

মিল্ক ভিটা, জাগুরার কেডস, গোল্ড স্টার টি, কোকাকোলা, ফানটা প্রভৃতি বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। চলচ্চিত্র জগতে পদার্পনের কিছুদিন পরেই ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট মায়ের বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেছিলেন সালমান। সামিরা হক ছিলেন একজন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের কিছু চলচ্চিত্রে তাঁর পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবেও কাজ করেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান সালমান শাহ। রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনে তাঁর নিজ বাস ভবনে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। ময়না তদন্ত রিপোর্টে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হলেও তাঁর মৃত্যু নিয়ে রহস্য এখনো কাটেনি। অনেকেই সালমান শাহ-এর মৃত্যুর জন্য তাঁর স্ত্রী সামিরার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন, এমনকি পরবর্তীকালে সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী সামিরা ও আরো কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু পরে এই মামলার আর কোন অগ্রগতি হয়নি ফলে সালমানের মৃত্যু নিয়ে রহস্য আর উদঘাটিত হয়নি। অমীমাংসিত এই হত্যাকাণ্ড যেন নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে পাহাড়সম একেকটি বোঝা। অকালে হারানো প্রিয়জনের আত্মার শান্তিটুকুও নিশ্চিত করতে না পারার মতো হতাশার আর কিছু নেই। আগামী বছর যেন আমাদের ‘সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডের ২৩ বছর, আজও মেলেনি বিচার’- ধরনের কোনো লেখা পড়তে না হয় সেটুকুই সকলের কাম্য।