সময়ের সেরা জাদুকরেরা - প্রিয়লেখা

সময়ের সেরা জাদুকরেরা

Naseeb Ur Rahman
Published: September 4, 2017

মানুষের মন সবসময় অতিপ্রাকৃত ব্যাপারগুলো নিয়ে খুবই কৌতূহলী। জাদুবিদ্যাই হোক বা জাদুকর মানবসভ্যতার শুরু থেকেই আচ্ছন করে রেখেছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়। সেই জাদুবিদ্যায় আবার রকমফেরও রয়েছে। যেমনঃ মানুষকে বিনোদন দেয়ার জন্য হাতসাফাই ও কৌশলের খেলা যাকে বলা যেতে পারে সিম্পল এন্টারটেইনমেন্ট, আবার সভ্যতার জন্ম লগ্ন থেকে প্রকৃতিকে ও মানুষকে বশ করার চেষ্টা রত কিছু মানুষের গুপ্তবিদ্যা যা কালো জাদু বলে পরিচিত ও যার ভয়ঙ্কর সব ঘটনা, লোককথা  সকলের মনে শিহরন জাগায়। তবে সুপ্রীয় পাঠক এসব বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্নে আমরা যেতে চাই না। তবে জাদু নিয়ে লিখতে গিয়ে যখন রেফারেন্স খুঁজতে গেলাম, তখন তিন ধরনের জাদুর কথাই ঘুরে ফিরে এলোঃ  উপকারে জাদু (White Magic), আত্মরক্ষায় জাদু (Magic protection), ও ক্ষতিকর জাদু( black magic)। তবে জাদুবিদ্যার উৎপত্তি নিয়ে অন্য কোনদিন বসবো। আমাদের আজকের আয়োজন বিশ্বের সেরা ১০ জাদুকরকে নিয়ে যারা নিমেষে আপনাকে করে ফেলতে পারে আচ্ছন্ন। তবে চলুন শুরু করা যাক-

সেরা তালিকায় ১০মঃ সোল মিষ্টিক

আচ্ছা যদি আপনারা পোশাক পরিবর্তন করতে চান কত সময় লাগতে পারে। আমরা যে জাদুকর জুটির কথা বলছি তারা শুধু পোশাকের পরিবর্তন নয়, ড্যান্স পারফরমেন্সেও বিশ্ব রেকর্ডধারী। বলছিলাম ‘সোল মিষ্টিক’  এর কথা। ১৯৯৬ সালে সোল মিষ্টিক’ গড়ে তোলে ল্যাটিন আমেরিকান ড্যান্সপোর্ট চ্যাম্পিয়ন গেভিন স্কিনার এবং লিডা লিম। তাদের প্রথম দেখা যায় জনপ্রিয় টিভি রিয়েলিটি শো ‘অস্ট্রেলিয়া গট ট্যালেন্টস’ এ।  সোল মিষ্টিক’ ২০১২ সালে ৩ টি বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল যা অস্ট্রেলিয়া গট ট্যালেন্ট (সিরিজ ৬) এ প্রচারিত হয়েছিলো, বুট এবং জুতোর সর্বোচ্চ গতির ধারাবাহিক পরিবর্তন,পাশাপাশি বসে মুহূর্তে পোশাক পরিবর্তন  এবং দ্রুততম ২ সেকেন্ডে পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের পোশাক পরিবর্তন এই ছিলো রেকর্ড। অর্জন তো ছিলো অনেক কিন্তু তা বলতে গেলে বাকীদের সময় ফুরিয়ে যাবে। তাদের পারফর্মেন্স দেখতে https://www.youtube.com/watch?v=Zova1XXOR_0

তালিকায় ৯মঃ দান্তে

হ্যারি অগাস্ট জেন্সেন জাদুর জগতে পরিচিত দান্তে দ্যা ম্যাজিসিয়ান নামে। তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে ১৯৫৫ সালে তার মৃত্যুর পর ঐতিহাসিকরা মন্তব্য করেছিলেন জাদুর স্বর্ণালী যুগের অবসান ঘটলো। ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া এই অনবদ্য পারফর্মার  মাত্র ১৬ বছর বয়সে মঞ্চে নিজের জাদুকরী কারিশমা দেখান।পরবর্তী ৫ বছর তিনি বিশ্ব ভ্রমন করেন। তার বিশভ্রমনের যে সহযোগীদল ছিলো তাতে থাকতো ২৫-৪০জন ষ্টেজপারফর্মার। তার জাদু প্রদর্শনের ইন্ট্রোটাও খুব মজার ছিলো, আলী বাবার গুহার দরজা খুলতে বলা হয় ‘খুল যা সিম সিম’ আর দান্তে বলতেন,-” Sim Sala Bim.”

 

তালিকায় ৮মঃ হ্যারি ব্ল্যাকস্টোন সিনিয়র

২০ শতকের সেরা মায়াজাল বিস্তারকারী, গোলোকধাঁধার ওস্তাদ ধরা হয় হ্যারি ব্ল্যাক স্টোন সিনিয়রকে। আজকের যুগে আমরা ম্যাজিকের যে কলাকৌশল দেখতে পাই তা অনেক আগেই প্রবর্তন করেছিলেন এই মেধাবী জাদুকর। সময়কাল ২য় বিশ্বযুদ্ধ, ইউনাইটেড স্টেটস অর্গানাইজেশন ইনকর্পোরেটেড এর হাত ধরে হ্যারি সর্বপ্রথম করাত দিয়ে দেহ দ্বিখণ্ডিত করে জোড়া দেবার জাদুটি প্রদর্শন করেন। তার ছেলেও পরবর্তীতে সেরা জাদুকর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলো।

তালিকায় ৭মঃ জ্যা ইউজিন রবার্ট হুডিনি

১৯ শতকের ফরাসী জ্যা ইউজিন রবার্ট হুডিনি কে বলা হয় জাদুবিদ্যার আধুনিক কলা কৌশলের জনক। আরেক জনপ্রিয় জাদুকর হ্যারি হুডিনি রবার্ট হুডিনিকে নিজের আদর্শ মেনে তার নামের সাথে হুডিনি যুক্ত করেছিলেন। রবার্ট হুডিনির জাদুতে শ্রেষ্ঠ প্রদর্শন ছিলো ‘SeconD SighT’ নামে পরিচিত  কৌশলটি। তিনি দর্শকদের সারিতে হেঁটে যেতেন ও বিভিন্ন বস্তুকে ছুঁতেন। মঞ্চে দাঁড়ানো তার সহকারী চোখে কালো কাপড় বাধা অবস্থায় রবার্ট যে জিনিস ছুঁয়েছেন তার বিস্তারিত বিবরন দিতো। আরেকটি জনপ্রিয় কৌশলের নাম ছিলো ‘এমিল’, সেখানে রবার্ট কোন একটি তরল পানীয়তে চুমুক দিয়ে দর্শকদের জিজ্ঞেস করতেন তিনি আসলে কি পান করেছেন তা মনে মনে ভাবতে। পরে দর্শকরা মনে মনে কি ভেবেছে তা বলে দিয়ে তিনি সবাইকে চমকে দিতেন।

তালিকায় ৬ষ্ঠঃ ডেভিড ব্লেইন

ডেভিড ব্লেইন ৯০ এর দশকের শেষের দিকে বিখ্যাত হয়েছিলেন, “স্ট্রিট ম্যাজিক” শো এর মাধ্যমে। তার শোটি রাস্তায় সাধারন জনগণের মাঝে প্রদর্শিত হতো। যাদু দেখানোর পাশাপাশি তার কৌশলগুলির মধ্যেও ব্লেনের শান্ত সমাহিত ভাব ও ধৈর্য ফুটে উঠতো যা তাকে করে তুলতো আরও আকর্ষণীয়। ব্লেইন জীবিত অবস্থায় এক সপ্তাহের জন্য কবরে সমাহিত ছিলেন (যা তার আদর্শ হুডিনি ১৯২৬ সালে তার মৃত্যুর আগে প্রদর্শনের পরিকল্পনা করেছিলেন) একটি বরফ খন্ডের মধ্যে জমাট অবস্থায় ৬৩ ঘন্টা (সেসময়এর একটি বিশ্ব রেকর্ড) নিজেকে বন্দী রেখেছিলেন, একটি ১০০ ফুট উচ্চ স্তম্ভে উপর দাঁড়িয়ে ৩৫ ঘন্টার কোন অবলম্বন ছাড়া দাঁড়িয়ে ছিলেন, একটি কাঁচের বাক্সে ৪৪ দিন কোন খাদ্য বা পানীয় ছাড়া নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলেন, ১৬ ঘন্টা জন্য একটি গাইরোস্কোপ এর মধ্যে ঘূর্ণায়মান ছিলেন, ৬০ ঘন্টা পা উপরে মাথা নিচে দিয়ে উপরে নিচে ঝুলেছেন এবং সর্বাধিক, ৭২ ঘন্টা অতিবাহীত করেছেন  এক মিলিয়ন বৈদ্যুতিক ভোলটেজ তার দেহের দিকে নিক্ষিপ্ত অবস্থায়। অতিমানবীয় তার কর্মকাণ্ড দেখতে ঘুরে আসুন তার ইউটিউব চ্যানেল https://www.youtube.com/user/davidblaine

তালিকায় ৫মঃ  সিগফ্রিড ও রয়  

জার্মান জাদুকর সিগফ্রিড ফিশব্যাকার ও অনবদ্য অ্যানিম্যাল ট্রেইনার রয় হর্ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নেওয়ার  পাশাপাশি নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের উদ্দেশ্যে  সাদা বাঘ ও সিংহের খেলা নামে এক আকর্ষণীর ষ্টেজ শোর সূচনা ঘটায়। ১৯৯০ সাল হতে ২০০৩ সাল পর্যন্ত লাসভেগাসের মির‍্যাজ নামক ক্লাবে বিশ্বের সবচেয়ে চাহিদা সম্পন্ন শো হিসেবে প্রদর্শিত হতো। কিন্তু ২০০৩ সালে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা সবকিছু পালটে দেয়। প্রদর্শন করা অবস্থায় রয় হর্ন একটি বাঘের হাতে আক্রান্ত হন। বাঘটি তার ঘাড় ও মাথায় এমন ভাবে কামড় দেয় যে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে রয়ের বাঁচা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় ,তার খুলির কিছু অংশ ও চিকিৎসকরা অপসারন করতে বাধ্য হয়। রয় কিন্তু মৃত্যুকে হার মানায়। দীর্ঘ তিন বছর লড়াই করে ২০০৬ সালে রয় চলা ও কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পায়। কিন্তু মির‍্যাজ রয় ও সিগফ্রিড জুটির আর কোন শো প্রদর্শন করতে না চাওয়ায় ২০১০ সালে শো বিজনেস থেকে এই জুটি অবসর গ্রহন করে।

তালিকায় ৪র্থঃ ক্রিস অ্যাঞ্জেল

ক্রিস্টোফার নিকোলাস সারেন্তাকোস !!! (ভাগ্যিস নামটা ছোট করেছেন) ওরফে ক্রিস অ্যাঞ্জেল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তার টিভি শো ‘ক্রিস অ্যাঞ্জেলঃ মাইন্ড ফ্রিক’ থেকে। এটি ২০০৫ সালে সম্প্রচারিত করেছিলো A&E টেলিভিশন নেটওয়ার্ক। পরবর্তীতে  ২০১০ সাল পর্যন্ত এর ৬টি সিজন সম্প্রচারিত হয়। তার প্রদর্শিত সবচেয়ে জনপ্রিয় কৌশল ছিলো লাস ভেগাসের ভিড়ে দুটো ভবন এর মধ্যে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, কাউকে অর্ধেক কেটে ফেলা, পানির উপর দিয়ে হাঁটা ইত্যাদি। ভাসমান হবার নানা কৌশল দেখিয়েও তিনি সুপরিচিত। ২০০৮ সালে তিনি ইলিউশনের উপর একটি অনুষ্ঠান করেন  ‘ক্রিস অ্যাঞ্জেলঃ বিলিভ’ যেখানে তার সঙ্গী ছিলেন সেরকেই সিলিল।

 

তালিকায় ৩য়ঃ পেন ও টেলার

৮০’র দশকের জনপ্রিয় জুটি পেন জিলেট ও রেমন্ড টেলার যারা মঞ্চে ‘পেন ও টেলার’ হিসেবে পরিচিত ছিলো। হাস্যরস ও কৌতুকের মধ্য দিয়ে জটিল সব জাদুকৌশল দেখাতে সিদ্ধহস্ত ছিলো তারা। মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রথমে তারা জাদু করে দেখাতো পরে দর্শকদের সেই কৌশল বলে দিতো পরবর্তীতে আবার একই কৌশল পুনরায় ব্যবহার করে আরও জটিল কোন জাদু দেখাতো আর দর্শকদের মাঝে বিরাজ করতো টান টান উত্তেজনা। তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাজিক ছিলো ‘কাপস ও বলস’। টেলার কখনোই জাদু প্রদর্শনের সময় কথা বলতো না এবং সাধারনত ভায়োলেন্সেরশিকার হয়ে বসতো, যেমনঃ পেরেকের উপর পড়ে যাওয়া, ১৮ চাকার গাড়ীর নিচে চাপা পড়া,পানির ট্যাংকারে ডুবে যাওয়া ইত্যাদি।

তালিকায় ২য়ঃ হ্যারি হুডিনি

হ্যারি হুডিনি ১৮০০ সালে এবং ১৯০০ সালের শেষের দিকে সক্রিয় ছিলেন, তিনি শতাব্দীর সেরা Escape Artist হিসেবে বিখ্যাত। তিনি ইউরোপ ভ্রমণের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেন, বিভিন্ন পুলিশ বাহিনীকে প্রতিটি স্টেশনে নিজেকে বন্দী করতে বা হ্যান্ডকাফ করতে প্রলুদ্ধ করেন। তিনি  স্ট্রেইটজ্যাকেট পরিহিত অবস্থা থেকে নিজে সুউচ্চ ভবনে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নিজেকে রক্ষা করেন, তিনি স্ট্রেইটজ্যাকেট পড়া অবস্থায় পানিতে ডুবে থাকা থেকে নিজেকে রক্ষা করেন, তাকে লোহার শেকলে বেঁধে কবর দিয়ে দেওয়া হয় সেখান থেকেও তিনি কোনমতে বেঁচে ফিরেন। হুডিনির এই মৃত্যুর মুখ থেকে বারে বারে বেঁচে ফেরাকে সাজানো নাটক বলে অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু জীবদ্দশায় প্রতি মুহূর্তে তিনি জাদুকরদের মিথ্যে জাদু কৌশল ধরিয়ে দেওয়ায় তৎপর থাকতেন। ১৯২৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতিও যথেষ্ট নাটকীয় ছিলো যার রহস্য আজও জনসম্মুখে পরিপূর্ণরুপে প্রকাশ পায় নি। জনশ্রুতি রয়েছে এক কলেজ ছাত্র হুডিনিকে জিজ্ঞেস করে, যে তার পেট কতটি মুষ্ট্যাঘাত সহ্য করতে পারে। অতঃপর তাকে অনবরত ঘুষি মারতে থাকে। হুডিনি কয়েকদিন পর পেরিটোনাইটস (অ্যাাপেন্ডিসাইটিস) এ মারা যান বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু একে অনেকেই স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মানেন নি।

তালিকায় ১মঃ ডেভিড কপারফিল্ড

ডেভিড সেথ কটকিন (জন্ম 16 সেপ্টেম্বর, 1956), ডেভিড কপারফিল্ড নামে জনপ্রিয়, একজন আমেরিকান ,যাকে ফোর্বস ইতিহাসের সবচেয়ে সফল জাদুকর হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। ডেভিড কপারফিল্ডের দীর্ঘ, প্রসিদ্ধ কর্মজীবন তাঁকে ইতিহাসে সবচেয়ে সফল একক বিনোদনকারী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯ বছর বয়সে, হাওয়াইয়ের হাওনুলুলুতে একটি বড় হোটেলে একটি শোতে তিনি প্রথম সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে এবিসি নেটওয়ার্ক তার উপর একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করে।  কপারফিল্ড সেই ইলিউশনিস্ট  যিনি ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ কে অদৃশ্য করে দেন, গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের উপর ভাস্কর্যটিকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখেন, এমনকি চীনের গ্রেট ওয়ালের উপর দিয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি হেঁটে চলে যায়!!!  তিনি শুধু একজন ইলিউশনিস্ট নন একজন সেরা গল্প বলিয়ে। দেখুন তার ইলিউশন https://www.youtube.com/watch?v=70U2yybKhKg

আজ এই পর্যন্তই আবার ফিরবো নতুন আঙ্গিকে নতুন লেখায়। আর পাঠক আপনাদের বলছি জানতে বুঝতে মুহূর্তকে খুঁজতে থাকুন প্রিয়লেখায়।