শাইখ সিরাজ: হৃদয়ে যার মাটি ও মানুষ - প্রিয়লেখা

শাইখ সিরাজ: হৃদয়ে যার মাটি ও মানুষ

Sanjoy Basak Partha
Published: September 15, 2017

আপনি একটি শিশুকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও’, নানা ধরণের উত্তর শুনতে পাবেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ক্রিকেটার, পাইলট, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী, অভিনেতা-অভিনেত্রী নানা পেশার কথা মুখে আসবে তাদের। কিন্তু একপ্রকার গ্যারান্টি দিয়ে বলে দেয়া যায়, কৃষক কিংবা কৃষিকাজের সাথে জড়িত থাকতে চায়, এমন একটি শিশুকেও হয়তো আপনি খুঁজে পাবেন না।

আসলে আমাদের দেশের বাস্তবতাটাই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দেশে বাকি সবকিছুর দাম আছে, দাম নেই কেবল কৃষক ও কৃষিকাজের। যেই কৃষির উপর আমাদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে, যে কৃষির উপর অন্তত ৮০% লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল, সেই কৃষি নিয়ে আলোচনা যেন এখনকার সমাজে ‘ক্ষ্যাত’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কৃষি আমাদের সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রাণ, সেই কৃষি নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই, বরং আমরা যেন মোহগ্রস্ত হয়ে পরেছি চাকচিক্যময় দুনিয়ার ঝকমকে জিনিসপত্রের প্রতি। তবে আমাদের সৌভাগ্য, আমাদের একজন শাইখ সিরাজ আছেন, বিরুদ্ধ স্রোতে গিয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের কৃষির মুখ, কৃষকের মুখ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানে পড়েও যিনি গায়ে মেখেছেন মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ!

                                                                               শাইখ সিরাজ-মাটিই যার প্রাণ

বেশ কয়েক বছর ধরে ঈদের সময় ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অনুষ্ঠানটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ঈদের মত আনন্দঘন সময়েও দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা মানুষগুলোকে ভুলে যাননি শাইখ সিরাজ, কৃষক ও তাদের পরিবারের মুখে ঈদের আনন্দের হাসি ফোটাতে গ্রামের কৃষকদের নিয়ে চালু করেছেন এই গেইম শো, যে অনুষ্ঠানটি কিনা ঈদের সময়ে প্রচুর দর্শকের ‘উইশলিস্ট’ এ থাকে।

১৯৫৪ সালে চাঁদপুরে জন্ম নেয়া এই মানুষটির মনে প্রাণে মিশে আছে কৃষি ও কৃষক। নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখান থেকে ভূগোলে করেছেন স্নাতকোত্তর। ছাত্র থাকাকালেই যুক্ত হয়েছিলেন গণমাধ্যমের সাথে। টেলিভিশনের জগতে আসা সত্তরের দশকের শেষ ভাগে। তবে দেশের মানুষ একযোগে শাইখ সিরাজ নামটি জেনেছিল যে অনুষ্ঠানটির কল্যাণে, সেটি ‘মাটি ও মানুষ’। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) তে ১৯৮২ থেকে টানা ১৪ বছর প্রচারিত হয়েছিল অত্যন্ত দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া এই অনুষ্ঠানটি। দেশের কৃষি, কৃষির সম্ভাবনা, কৃষকের অবস্থা- সবকিছু এত নিখুঁতভাবে তুলে ধরতেন, গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো শাইখ সিরাজকে নিজেদেরই একজন বলে ভাবতে শুরু করেছিলেন।

১৯৯৬ তে অন্যতম অংশীদার হিসেবে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করলে বিটিভির মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানটির সাথে ছেদ পরে তাঁর। তবে নিজের মূল কাজ থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল আই’ তে এসে তিনি তাঁর পুরনো কাজ আবার নতুন করে শুরু করেন। ২০০৪ সাল থেকে চ্যানেল আই’তে চালু হল নতুন আরেকটি অনুষ্ঠান, ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’। নাম বদলেছে, তবে শাইখ সিরাজের লক্ষ্য বদলায়নি একটুও। ঠিক আগের মতই দেশের কৃষির সাফল্য থেকে শুরু করে বঞ্চিত কৃষকের কথা, একে একে সবই ফুটিয়ে তুলেছেন ক্যামেরার লেন্সে। কেবল যে দেশের কৃষির কথাই তুলে ধরেছেন তা না, বাইরের দেশের কৃষির সাফল্যের সংবাদ দিয়ে এদেশের কৃষিব্যবস্থাকে আরও অনুপ্রাণিত করার কাজও করেছেন তিনি।

                                               মাটি ও মাটির মানুষদের সাথে এভাবেই মিশে যান শাইখ সিরাজ

প্রাণঘাতী কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করে প্রাকৃতিক উপায়ে কিভাবে ফসলকে কীটের হাত থেকে রক্ষা করা যায় সে বিষয়ে কাজ করেছেন শাইখ সিরাজ। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে কিভাবে উপকূল অঞ্চলের কৃষকেরা ভাসমান সবজি চাষের মত উদ্ভাবনী চিন্তার বাস্তবায়ন করেছেন, সেটিও দেখিয়েছেন তিনি।

‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ ছাড়াও প্রতি বছর বাজেটের আগে ‘কৃষকের বাজেট ভাবনা’ নামে একটি অনুষ্ঠান করেন তিনি। সেখানে কৃষকদের চাওয়া পাওয়া, ক্ষোভ, অভিমান সবকিছু তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।

                                                             বাচ্চাদেরও মাটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিনি

শাইখ সিরাজ আরেকটি উদ্ভাবনী কাজ করে দেখিয়েছেন। তার ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহরের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গেছেন মাঠে, কৃষি কাজ করিয়েছেন তাদের দিয়ে। কৃষকেরা কতটা কষ্ট করে আমাদের মুখের খাবার যোগাচ্ছেন, বিনিময়ে তারা কি পাচ্ছেন, কতটুকু পাচ্ছেন, সেসবের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়ার জন্যই তাঁর এই উদ্যোগ। সারাদিন পরিশ্রম করে যে টাকা উপার্জন করতে পারবে শিক্ষার্থীরা, সেই টাকা দিয়েই তাদের নিজেদের খাবার কিনে খেতে হবে, এমন পরীক্ষার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ফেলেছেন তিনি! এছাড়া ছোট বাচ্চাদেরও তিনি কৃষিক্ষেতে নিয়ে গিয়েছেন, ছোট থেকেই তাদের প্রিয় দেশের মাটির সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে।

                                                     ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও কৃষিকাজ করিয়েছেন শাইখ সিরাজ!

শুধু টেলিভিশন সাংবাদিকতায় না, মুদ্রণ সাংবাদিকতায়ও ছাপ রেখেছেন শাইখ সিরাজ। ২০০৭ সাল থেকে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে কৃষি বিষয়ক পাতার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। সেই নব্বইয়ের দশক থেকে কৃষি বিষয়ক নিবন্ধ লিখে চলেছেন তিনি।

অর্জনের খাতাটা বেশ ভারী শাইখ সিরাজের। ১৯৯৫ সালে ৩৯ বছর বয়সে উন্নয়ন সাংবাদিকতায় পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার ‘একুশে পদক’। এখনো পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন শাইখ সিরাজ। ২০০৯ সালে পেয়েছেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এ এইচ বুর্মা পুরষ্কার। খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্য বিমোচন সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে ভূষিত হয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পুরষ্কার ‘গুসি শান্তি পুরষ্কার’ এ। ব্রিটেনের বিসিএ গোল্ডেন জুবিলি অনার অ্যাওয়ার্ডস পেয়েছেন তিনি, পেয়েছেন ব্রিটিশ বাঙালি সংগঠনের গ্রিন অ্যাওয়ার্ডও। ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সের বিশেষ সম্মাননাও আছে শাইখ সিরাজের ঝুলিতে। এছাড়া শাইখ সিরাজ যুক্তরাষ্ট্রের অশোকা ফাউন্ডেশনের একজন ফেলো।

                                                                                                 কৃষকের পরম বন্ধু!

এছাড়া কৃষিতে অবদানের জন্য রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছেন ১৯৯৫ সালে, বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক পেয়েছেন ২০০৫ সালে। ডক্টর ইব্রাহিম মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল পেয়েছেন ২০০৬ সালে, একই বছর পেয়েছেন ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’। এছাড়া কৃষি বিষয়ে বেশ কয়েকটি লেখা ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে শাইখ সিরাজের।

এসব পুরষ্কার তো কেবলই তাঁর কাজের স্বীকৃতি, শাইখ সিরাজের আসল পুরষ্কার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কাছে এক ভরসার নাম শাইখ সিরাজ। বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রের এই কিংবদন্তির জন্মদিন ছিল কিছুদিন আগেই। জন্মদিনে শাইখ সিরাজের প্রতি প্রিয়লেখার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা ও শুভকামনা!