রোহিঙ্গা বনাম রাখাইন সংঘর্ষের উদ্ভব - প্রিয়লেখা

রোহিঙ্গা বনাম রাখাইন সংঘর্ষের উদ্ভব

Naseeb Ur Rahman
Published: September 23, 2017

‘মগের মুল্লুক’- অর্থাৎ অরাজক দেশ বাগধারাটি তো সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা পড়ে এসেছি। কখনো সচেতনে কখনো বা অচেতনে। কিন্তু কেউ কি জানতো তা এমন ভাবে সত্যি হবে? পুরো বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখবে কিভাবে মানবতা হয় ভূলুণ্ঠিত!  কখনো যা কল্পনাই করেনি বর্তমান প্রজন্ম, তাই সত্যি করে দেখালো মিয়ানমার এর সামরিক জান্তা ও তার পুতুল শাসক নোবেল বিজয়ী রাজকুমারী অং সান সু কি। বলছি যখন মগেদের,কথা, খানিকটা পেছন থেকেই শুরু করা যাক। সে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা৷ বাংলাদেশে একসময় মগদের ভীষণ উপদ্রব ছিল৷ আরাকান, অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার থেকে আসা মগ জলদস্যুরা সে সময় বাংলাদেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব বানিয়ে বসে৷ ফরাসি পরিব্রাজক বার্নিয়ের  তার Travels of Barnier নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন মগদের লুণ্ঠন ও অত্যাচারের ভয়াবহ সব বিবরণ , যা যে কারো রক্ত হিম করে দিবে৷ তখনকার জলদস্যু মগদের অধিকাংশই ছিলো রাখাইন বৌদ্ধ, ইতিহাস তার সাক্ষী।

রোহিঙ্গা কারাঃ

ঐতিহাসিক ভাবে আরাকান রাজ্য, ও বর্তমানে রাখাইন স্টেট নামে পরিচিত মিয়ানমারের একটি অঙ্গরাজ্যের মুসলিম অধিবাসীদের বলা হচ্ছে রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা বিদ্বেষী এক বৌদ্ধ ভিক্ষুঃ

চিত্রঃ আসিন ওয়াইরাথু

বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমানদের একটি তৃতীয় দেশে পাঠানোর জন্য রাষ্ট্রপতি থেইন সেইনের বিতর্কিত পরিকল্পনাকে উৎসাহিত করতে সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে মান্দলেতে বৌদ্ধদের সমাবেশে আসিন ওয়াইরাথু নেতৃত্ব দেন। তার এক মাস পর রাখাইন রাজ্যে আরও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।ওয়াইরাথু দাবি করেন,মিয়ানমারের মিকিটিলাতে সোনার দোকানে জনৈক বৌদ্ধ ও মুসলমানের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। যা পরে জাতিগত বিদ্বেষ ও সহিংসতায় রূপ নেয়। ফলাফলে ৪০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে ও তার জন্য সম্পূর্ণ ভাবে রোহিঙ্গাদের দায়ী করেন ওয়ারাইথু। শহরের বাইরে মঠ, দোকান এবং ঘর পুড়িয়ে দেয়া হলে তাৎক্ষনিকভাবে ১৪ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলো। বার্মার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শিন থাউবিতা এবং একজন মুসলিম পুরুষ সহ কমপক্ষে দুইজন মানুষকে ৫ই মার্চের এই অমানবিক  হামলার মুখে নির্যাতিত হতে হয়েছিলো। এই সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০ জুন ২০১৩ তারিখে টাইম ম্যাগাজিনের কভার স্ট্যাটাসে “বৌদ্ধ সন্ত্রাসের মুখ” শিরোনামে ওয়াইরাথুকে নিয়ে ফিচারও করা হয়।

রোহিঙ্গা বনাম রাখাইন সংঘর্ষের উদ্ভব যেভাবে শুরু হলঃ 

  1. প্রথম এবং সবচেয়ে মারাত্মক সাংঘর্ষিক ঘটনাটি ঘটে ২০১২ সালের জুন মাসে। সে সময় রাখাইন বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক দাঙ্গা হয়। দাঙ্গার জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানদের দায়ী করা হয়। সেই দাঙ্গায় প্রায় ২০০ জন মৃতের সন্ধান পাওয়া যায় এবং হাজার হাজার লোককে নিখোঁজ বলা হয়। ধারণা করা হয় নিখোঁজদের সবাইকেই হত্যা করা হয়েছিল। কথিত রয়েছে এই দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে এক বৌদ্ধ তরুনী ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে, যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা।
  2. ২০১৩ সালের আগস্টে কেন্দ্রীয় শহর কানবালায় বৌদ্ধ মহিলা ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত মুসলিম পুরুষকে পুলিশ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর হাতে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরে, বৌদ্ধ অধিবাসীরা  মুসলমানদের মালিকানাধীন ঘরবাড়ি ও দোকান পুড়িয়ে দেয়।
  3. ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে, জাতিসংঘ উত্থাপন করে যে রাখাইন রাজ্যে ৪০ জনের বেশি রোহিঙ্গা, নারী ও শিশুকে সহিংসতায় হত্যা করা হয়েছে যার পিছনে অভিযোগ ছিলো যে রোহিঙ্গারা রাখাইন এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে।
  4. ২০১২ সালের জুন মাসে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে,মিয়ানমারের ম্যান্ডেলায় কোন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নারী এক বা একাধিক মুসলিম পুরুষের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে।
  5. সাম্প্রতিক ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মুসলিম সংখ্যালঘুদের তথা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যে ঘটনা অভিশাপ হয়ে বর্ষিত হয় তা বিশ্ববাসীর সামনে এভাবে এসেছে যে, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা নিরাপত্তা বেষ্টনী এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত ১২ জন রাখাইন নিরাপত্তা রক্ষী কে নির্মমভাবে হত্যা করে।


চিত্রঃ ১৯৭০ সাল হতে বর্তমান পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহনের

পরিসংখ্যান (তথ্যসুত্রঃ alzazeera.com)

অতঃপর শুরু হয়েছে কতিপয় মানুষের অপরাধের প্রতিবাদে প্রতিহিংসার ঘাতক লড়াই, যাকে জাতিসংঘ সহ অনেকেই বলছে  সর্বকালের অভিশপ্ত এক Ethnic Cleansing” বা জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়া।

চিত্রঃ মিয়ানমারে বসবাসরত গোত্র সমুহ স্বীকৃত বনাম অস্বীকৃত (তথ্যসূত্রঃwww.alzazeera.com)

চিত্রঃ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী ক্যাম্প সমুহের অবস্থান (তথ্যসূত্রঃwww.alzazeera.com)

বিশ্ব মানবতা যেন একজোট হয়ে লড়ে যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বিদায় নিচ্ছি। ‘প্রিয়লেখার’ সাথেই থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ

  1.  http://www.bbc.com/news
  2. https://www.theguardian.com/international
  3. http://www.aljazeera.com/topics/regions/asia-pacific.html