রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডঃ প্রেমের জন্য সিংহাসন ছেড়েছিলেন যিনি - প্রিয়লেখা

রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডঃ প্রেমের জন্য সিংহাসন ছেড়েছিলেন যিনি

farzana tasnim
Published: August 8, 2017

লাইলী-মজনু, শিরিন-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট প্রভৃতি কালজয়ী প্রেমের কাহিনী আমাদের শিহরিত করে। কখনো কখনো বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো প্রেমের কাহিনী পড়ে আমাদের চোখ কপালে উঠে যায়। কাহিনীর গভীরতা মনে প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি করে। বারবার শুনতে ইচ্ছে হয় সেই প্রেমের উপাখ্যান। এমনই এক ঐতিহাসিক রাজকীয় প্রেমের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের লেখাটি।

ব্রিটেনের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। কালজয়ী প্রেমকাহিনী দিয়ে অন্য আর দশজন রাজার চেয়ে নিজেকে একদম আলদা প্রমাণ করেছেন তিনি। ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর রাজা এডওয়ার্ড অ্যাবডিকেশন বা সিংহাসনের মায়া ত্যাগের মাধ্যমে প্রেমকে জিতিয়ে প্রমাণ করেন সিংহাসনের চেয়ে প্রেম বড়। ১৯৩৬ সালের ২০ জানুয়ারি এডওয়ার্ডের বাবা রাজা পঞ্চম জর্জ মৃত্যুবরণ করেন। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড নাম ধারণ করে এডওয়ার্ড তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী রাজ্য ব্রিটিশ কমনওয়েলথের সিংহাসনে আরোহণ করেন।

রাজপুত্র এডওয়ার্ড ছিলেন একজন সুদর্শন পুরুষ। সোনালি চুল, নীল চোখ আর সুবোধবালক সুলভ চেহারা দিয়ে যে কাউকে আকৃষ্ট করতে পারতেন তিনি। বলা ভালো, মেয়েরা নিজে থেকেই তার প্রতি আকৃষ্ট হতো। ১৯৩১ সালের ১০ জানুয়ারি ব্রিটেনে এক পার্টিতে মার্কিন কন্যা ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে এডওয়ার্ডের পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে প্রেম। খুব সুন্দরী না হলেও দীপ্তিময় চোখ, আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন, মসৃণ চুল এবং স্টাইল সচেতনতার কারণে ওয়ালিস সিম্পসনকে অন্যদের তুলনায় একটু আলাদাই দেখাত। তার চলাফেরায় ছিল স্বতন্ত্র ধরণ। তবে ততদিনে ওয়ালিস তার দ্বিতীয় স্বামীর ঘর করছেন। অত্যধিক মদ্যপানের কারণে ওয়ালিসের প্রথম স্বামী মার্কিন নৌ-বাহিনীর সদস্য লেফটেন্যান্ট আর্ল উইনফিল্ডকে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে ডিভোর্স দেন ওয়ালিস। তারপর ১৯২৮ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ-আমেরিকান জাহাজ ব্যবসায়ী আর্নেস্ট সিম্পসনকে বিয়ে করেন। স্বামীর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন লন্ডনে।

সেই লন্ডনেই যুবরাজ এডওয়ার্ডে সঙ্গে ওয়ালিসের পরিচয় হয়। পরিচয়ের ৩ বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৩৪ সালের দিকে দু’জনের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। এডওয়ার্ড সিংহাসনে বসার পর ওয়ালিসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি রাজপরিবারের আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। একদিকে যখন চলছিল কানাঘুষা, অন্যদিকে এডওয়ার্ড এরমধ্যেই ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। একজন মার্কিন সাধারণ পরিবারের ডিভোর্সি মেয়েকে বৃটিশ রাজার বিয়ের করার সিদ্ধান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ান ইংল্যান্ডের চার্চ।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড ছিলেন ইংল্যান্ড চার্চের প্রধান। এডওয়ার্ডের বিয়ে সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্তটি চার্চের নীতি বিরোধী ছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইনও এডওয়ার্ডের এই অন্ধ প্রেমের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন। কারণ একজন ডিভোর্সি এবং দ্বিতীয় স্বামীর ঘরণী মেয়েকে রাণী হিসেবে মেনে নেবে না তার প্রশাসন এবং জনসাধারণ। এই ঘটনা তখন পৃথিবীব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পত্রিকাগুলোতে বড় শিরোনাম করে হৈচৈ ফেলে দেয় এবং বিতর্কের ঝড় ওঠায়।  অপরদিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রীরাও এডওয়ার্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড তার সিদ্ধান্তে অটুট থাকেন। বাংলা সিনেমার ডায়লগের মতো চারদিকে তখন প্রশ্ন ওঠে- প্রেম বড় না সিংহাসন বড়? এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইন রাজা এডওয়ার্ডকে তিনটি প্রস্তাব দেন এবং তার মধ্যে যে কোনো একটি গ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানান।

প্রথমত, ওয়ালিসকে বিয়ে করার চিন্তা বাদ দেয়া। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা। তৃতীয়ত, সিংহাসন ত্যাগ করা। রুদ্ধশ্বাসে সবাই যখন রাজার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছেন তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড তৃতীয় প্রস্তাবটি বেছে নেন। ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর অষ্টম এডওয়ার্ড পার্লামেন্টে অ্যাবডিকেশন সাবমিট করেন। পরদিন পার্লামেন্ট অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ অনুমোদন করে।

সিংহাসনের মায়া ত্যাগের প্রাক্কালে এডওয়ার্ড তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমি উপলব্ধি করেছি, যে নারীকে আমি ভালবাসি তার সমর্থন ছাড়া রাজা হিসেবে রাজ্য পরিচালনার এ কঠিন দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে অসম্ভব। এই সিদ্ধান্তের ফলাফল কি তা আমি জানি। সিদ্ধান্তটা আমি একাই নিয়েছি।’

মাত্র ৩২৬ দিনের মাথায় সিংহাসন ত্যাগ করে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের রাজার তালিকায় নিজের নাম লেখান অষ্টম এডওয়ার্ড। প্রেমকে জিতিয়ে সারা পৃথিবীর প্রেমের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করেন তিনি। তার ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জ রাজা হন। সিংহাসন ত্যাগের পর এডওয়ার্ড ফ্রান্সে চলে যান। ১৯৩৭ সালের ৩ জুন এডওয়ার্ড ওয়ালী সিম্পসনকে বিয়ে করেন এবং প্যারিসে বসবাস শুরু করেন। তখন তিনি প্রিন্স এডওয়ার্ড নামটি ব্যবহার করতেন। শেষজীবনে ঠিক গল্পের মতো করেই ‘অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিল’ বলা যায়।

ঐতিহাসিক এই প্রেম কাহিনী নিয়ে ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডে একটি রোমান্টিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। ছবিটির নাম ‘ওয়ালিস এন্ড এডওয়ার্ড’। এটি তৈরি করেন কোম্পানি টিভি প্রোডাকশন। ছবিটির দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট। স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন সারাহ উইলিয়ামস। পরিচালনা করেন ডেভিড মুর। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেন ডেভিট ওয়েসথিড, জুয়িলি রিচার্ডসন, লিসা কেই এবং আরও অনেকে। এই দম্পতি তাদের জীবনের শেষদিনগুলো অতিবাহিত করেন ফ্রান্সে। ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন সিংহাসনের মায়া ছেড়ে বেরিয়ে আসা মুকুটবিহীন রাজা এডওয়ার্ড।