রহস্যময় সিরিয়াল কিলার "জ্যাক দা রিপার" অমীমাংসিত - প্রিয়লেখা

রহস্যময় সিরিয়াল কিলার “জ্যাক দা রিপার” অমীমাংসিত

Afreen Houqe
Published: May 9, 2020

“জ্যাক দা রিপার” (প্রথম পর্ব )

 

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্য সময়ে, ব্রিটেন লন্ডনের ইস্ট এন্ড সহ বড় বড় শহর গুলোতে আইরিশ অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ১৮৮২ সাল থেকেই রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর ইহুদি পালিয়ে আসেন শরণার্থী শিবিরে। আর একারনেই লন্ডনের ইস্ট এন্ডের হোয়াইট চ্যাপলের প্যারিশ ,জনসমাগমে রূপ নিয়েছিলো। আর এর ফলে আবাসন পরিস্থিতি ভয়াবহ খারাপ রূপ নিতে থাকে। কাজের কোনো ব্যবস্থা নেই এদিকে আবাসন পরিস্থিতি খারাপ,  অর্থনৈতিক মন্দা এমন অবস্থায় চলে গিয়েছিলো যে এখানকার পচাশি শতাংশ শিশু পাঁচ বছর হবার আগেই মারা যাচ্ছিলো অন্নাভাব অপুষ্টি এবং নানা কারণে । বাড়ছিলো ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি আর নেশার মাত্রাও এমন হারে বেড়ে গিয়েছিলো বলা হয় অন্যায় অপরাধের জন্য এই অঞ্চলকে অনেকেই এড়িয়ে চলতো সে সময়।

 

কিন্তু জীবনযাপনের জন্য খাওয়া পরার জন্য সে সময় অনেক নারীকেই বেছে নিতে হয় বেশ্যাবৃত্তি,তাদের দৈনন্দিন জীবন চালনার আর কোনো পথও খোলা ছিলোনা।

১৮৮৮ সালে অক্টোবর মাসে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ অনুমান করে জানায় যে হোয়াইট চ্যাপেলে সেসময় ৬২টি পতিতালয়ে কমপক্ষে ১,২০০ জন মহিলা যৌনকর্মী হিসাবে কাজ করতো। জনবসতি হিসাবে ২৩৩ টি ঘরে থাকতো প্রায় ৮,৫০০ মানুষ এটিও যেনো সে সময়ে এক ভিন্ন দৃশ্য নিয়ে আসে চোখের পর্দায়। ভাবতে পারেন এভাবেও থাকা সম্ভব?

একটি মাত্র শোবার ঘর সেখানে কিভাবে থাকতে  হয়েছিলো একেকটি পরিবারকে?

 

হোয়াইট চ্যাপলের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো এমন ভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিচ্ছিলো তাতে করে অন্যায় অপরাধের পরিমান দিন দিন বাড়তেই লাগলো। ১৮৮৬ সাল থেকে ১৮৮৯ মধ্যবর্তী সময়ে এত বেশি পরিমাণ নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছিলো যে স্বয়ং পুলিশ হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলো অবস্থা স্বাভাবিক করতে। এরমাঝে সবচেয়ে নেতিবাচক ঘটনা ঘটে যার নাম দেয়া হয় ব্লাড সানডে(১৮৮৭) পুলিশের হস্তক্ষেপের কারনে সাধারণ জনগণের মধ্যে আরো বহুগুণ অশান্তি বেড়ে গিয়েছিলো। বিদ্বেষবিরোধিতা, অপরাধ নাটিজম, বর্ণবাদ, সামাজিক অবক্ষয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছিলো হোয়াইট চ্যাপেলকে, এতটাই যে অর্থনৈতিক আন্ডারক্লাস এবং কুখ্যাত জায়গা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হতো এই অঞ্চলকে।

 

১৮৮৮ সালের অরাজকতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিলো সার্বিক পরিস্থিতির কারণে “জ্যাক দা রিপারের” অপরাধ হত্যা নৃশংসতা ঢাকা পরে গিয়েছিলো অন্য সব খবরের আড়ালে। কিন্তু সে নিজেই তৈরি করেছিলো দুর্বৃত্ত বর্বর হত্যার নজিরবিহীন এক মিডিয়া কাভারেজ।

 

এই সময়ে এর আশেপাশের অঞ্চল গুলোতে অপরাধ অরাজকতা এত বেশি মাত্রায় ছিলো যে সবাই যেনো এই অবস্থাকে স্বাভাবিক জীবন যাত্রার একটি অংশ হিসেবেই ধরে নিয়েছিলো। তাই হয়তো লুটপাট, ছিনতাই বা ধর্ষণ নিত্য দিনের কাজগুলোকে আর ব্যাহত করতো না সেভাবে। কিন্তু একটি ব্যাপার তখন লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের নজরে আসে আর সেটি হলো নারীদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা অন্যদিকে কয়েকজন একই সময়ে খুন হবার ঘটনা। যদিও তারা শুরুতে এই বিষয়টিকে এতটা প্রাধান্য দেয়নি। কিন্তু এও বলা যায়না তারা একদম উড়িয়ে দিয়েছিলো নারী হত্যার ঘটনাটি। সেই সময়কালীন এগারোটি পৃথক পৃথক হত্যা এবং একই শ্রেণীর পেশার নারীদের মধ্যে বাড়িয়ে তুলেছিলো অনিশ্চয়তা।

যদিও খুনগুলো কি এজকন করেছিলো নাকি ভিন্ন ভিন্ন মানুষ এই হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিলো এটি নিয়েও পুলিশ বিপাকে পরে যায় সে সময়। আর পুলিশ সার্ভিস কমিশন তখন পুলিশ ডকেটে “হোয়াইট চ্যাপেল হত্যাকাণ্ড” রহস্য উৎঘাটন করার জন্য নথিভুক্ত করে কেসটিকে। আর একারনেই ইহুদি পাড়ায় চাপা ভয়ভীতি ছড়িয়ে পরতে লাগলো। কে এই খুনি? কেনই বা ঘটাচ্ছে হত্যা কান্ড? নিমশ্রেণীর যৌনকর্মীদের উপর কেন এত ক্ষোভ তার?

 

অবস্থা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌছেছিলো যে সাধারণ মানুষ চিঠি পাঠানো শুরু করলো পুলিশ ডিপার্টমেন্টে সংবাদ মাধ্যম গুলোতে। চিঠির ভার দিনে দিনে বাড়তে লাগলো ,আর মানুষের উত্তেজনা উদ্বেগ যে মাত্রা আর অন্য দিকে ভয় যে সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছিলো সেটি যেনো এবার আর ঠেকিয়ে রাখাও সম্ভব না । পুলিশের কাছে আসা বা সংবাদ মাধ্যমে আসা বেশিরভাগ চিঠিকেই সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভাবেনি কেউ। বরং পুলিশ প্রশাসন ,সংবাদ কর্মীরা ভাবতো এসবই ঠাট্রা করেই করছে মানুষ। কিন্তু একদিন একটি চিঠি তোলপাড় করে তোলে গুমোট পরিবেশ, তৈরি করে একটি অন্য ইতিহাস যে চিঠি লিখেছিলো স্বয়ং হত্যাকারী “জ্যাক দা রিপার” চিঠিতে স্বাক্ষর ছিলো তার।জ্যাক দা রিপার নিজেই যেনো সগৌরবে জানান দিলো তার অস্তিত্ব…

 

এবার সংবাদ মাধ্যমে শোরগোল সৃষ্টি হলো এই বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হলো হোয়াইট চ্যাপেলে বসবাসকৃত অভিবাসীদের মধ্যেও। কোনো এক অজানা শঙ্কায় তারা ভীতু হয়ে পড়লো। কারন খুনি কে ?কেমন দেখতে? কি তার পরিচয় কেউ জানেনা। তার খুনের নৃশংসতা বর্বরতা যে হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়ার মত ক্ষমতা রাখে। এগারোটি খুন যার সবাই নারী এবং পেশায় নিম্নবিত্ত যৌনকর্মী এটাও কি কোনো এক ইঙ্গিত বয়ে এনছিলো জনমনে।

 

পুলিশি তদন্তে এগারোটি খুনের ধরন কোনো ভাবেই সূত্র মেলাতে পারছিলো না খুনির খুন করবার মোটিভ কি? সেকি কোনো মানসিক রোগী? কিংবা একজনই কি খুনগুলো করে যাচ্ছিলো অকপটে নাকি এটিও ভিন্ন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ? জ্যাক দ্য রিপার কতৃক যে হত্যাকাণ্ডগুলির কথা জানা যায়, সেগুলিতে সাধারণত ইস্ট এন্ড লন্ডনের নিমবিত্ত বস্তি এলাকার অধিবাসী ও সেই এলাকায় কর্মরত নারী যৌনকর্মীরা জড়িত ছিল। এদের গলা কেটে হত্যা করার পর পেট চিরে ফেলা হতো।এমনকি কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা গেলো শুধু হত্যাই নয় শরীরের ভেতর থাকা অর্গান গুলো নিখুঁতভাবে কেটে নেওয়া হয়েছে।

এই থেকে সন্দেহ হতে শুরু করে হত্যাকান্ড যে ঘটাচ্ছে সে শরীর এর হিসাব টা জানে ঠিক ঠাক,হতে পারে সে একজন চিকিৎসক কিংবা হয়তো চিকিৎসা সেবার কোনো কাজে সম্পৃক্তও হতে পারে। নয়তো এতো সুচারু হত্যার পরিকল্পনা এমনকি শরীরের ভেতরে থাকা অর্গান কেটে বের করে নেয়া অসম্ভব প্রায়।

 

১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসেই হত্যার গুজব গুলো ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। এর মাঝে একাধিক গণমাধ্যমে , স্টক ইয়ার্ডে নামে বেনামে পত্রলেখক দাবি করত

১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসেই হত্যার গুজব গুলো ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। এর মাঝে একাধিক গণমাধ্যমে , স্টক ইয়ার্ডে নামে বেনামে পত্রলেখক দাবি করতে থাকেন তারাই হোয়াইট চ্যাপেলে খুনগুলো করছেন।হোয়াইট চ্যাপেল ভিজিল্যান্স কমিটির জর্জ লাস্ক যে চিঠিটি পেয়েছিলেন সেটির উপরে লেখা ছিলো “ফ্রম হেল”

 

পত্রলেখকের দাবি ছিলো সে নারীকে খুন করেছে তার অর্ধেক কিডনি ভেজে খেয়ে নিয়েছে যা কিনা খুবই সুস্বাদু ছিলো।এবং সে নিজেই সেখানে হাস্যরস পূর্ন ইঙ্গিতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় পারলে আমাকে ধরে দেখান। এরকম আরো বেশ কিছু চিঠি আসতে থাকে সে সময় যার সব কটিকে আসলে তেমন আমলেও নেয়া হয়নি।

 

সব নিছকই আর হেসে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছিলো না।আর তখনই আশঙ্কা করা হয় “জ্যাক দা রিপার” নামধারী কেউ একজন এই হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। আর সত্যি বলতে এটি ভাবনাও একদম অমূলক নয়, বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারনও ছিলো যার মূলে ছিলো হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা আর সেটি নিয়ে গণমাধ্যমের প্ৰতিক্রিয়া।

 

সংবাদপত্রের বদৌলতে রিপার যেনো হয়ে উঠে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এক ব্যক্তি। তার এই চরিত্রটি হয়ে উঠে এক কিংবদন্তি রূপ। ১৮৮৮ থেকে ১৮৯১ সাল পর্যন্ত হোয়াইট চ্যাপেলে এগারোটি হত্যাকান্ড নিয়ে তোলপাড় হয় , হয় পুলিশি তদন্ত কিন্তু এই হত্যা কাণ্ডের যোগসূত্র মেলাতে বারবার ব্যর্থ হয় তারা। তখন টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে সামনে আসে পাঁচটি হত্যাকান্ড যা কিনা বর্বরতা নিষ্ঠুরতা নির্মমতার সব গন্ডি পেরিয়ে তৈরি করে এক ভয়াবহ আবহ। “ক্যালনিক্যাল ফাইভ” প্রধান পাঁচ জন নিহতদের হত্যাকান্ড যেনো একটু একটু করে রহস্যের জট খুলতে শুরু করে। এই পাঁচজন নিহতদের মধ্যে হলেন মেরি এন নিকোলাস, আনি চ্যাপম্যান, এলিজাবেধ স্ট্রাইড, ক্যাথরিন এডোয়াস, মেরি জেন কেলি। এরা পাঁচজন খুন হয় ১৮৮৮ সালের ৩১ অগাস্ট থেকে ৯ নভেম্বরের মধ্যে।খুনের সময় এবং ব্যবধান কাছাকাছি হওয়ায় ভাবা হয় এই খুনগুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় আবার নতুন করে নমুনা সংগ্রহে করতে এবার তৎপর হয়ে উঠে প্রশাসন।