রহস্যময় সিরিয়াল কিলার "জ্যাক দা রিপার" অমীমাংসিত - প্রিয়লেখা

রহস্যময় সিরিয়াল কিলার “জ্যাক দা রিপার” অমীমাংসিত

Afreen Houqe
Published: May 12, 2020

“জ্যাক দা রিপার”

(দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব)

তদন্তে নেমে দিকবিদিক শূন্য হয়ে পরেন কর্মকর্তারা তার মূলত দুটি কারন ছিলো একটি কারণ খুনগুলো হবার পর খুনি কোনো প্রমাণ ছেড়ে যেতনা আর দ্বিতীয় কারন ছিলো খুনিকে শনাক্ত করবার মত তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট সন্দেহভাজন ব্যক্তিও নেই তাদের চোখের সামনে। হাজার হাজার চিঠির মধ্যে অনেকেই তাদের ভিতীর কথা উল্লেখ করলেও এর মধ্যে অনেকেই নিজেদের জ্যাক রিপার দাবি করেন।

প্রমান সংগ্রহ করতে নেমে কোনো আলামত খুঁজে না পেলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা নিহত নারীদের খুন হবার ধরন গুলো ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছে না অন্যদিকে বেশিরভাগ নমুনা ইঙ্গিত করে একজন চিকিৎসক ছাড়া এরকম নিখুঁত সূক্ষ খুন করা সম্ভব না। চিঠিগুলার সাথে যোগসূত্র খুজে সেই সময় আনুমানিক দুইহাজার সন্দেহভাজন তালিকা তৈরি করা হয়। সেটার যাচাই বাছাই করে পাঁচজনকে তালিকার প্রধান সন্দেহভাজন হিসাবে সনাক্ত করা হয়।এবং তারা হলেন মন্টোগো জন ড্রুইট,কার্ল ফিগেনবাউম, হারুন কোসমিনস্কি, ফ্রান্সিস ক্রেগ, ওয়াল্টার সিকার্ট। তাদের ব্যাপারে জানবো তবে তার আগে জেনে আসি কিভাবে জ্যাক রিপার খুন করতো, তার কর্মের বিভৎসতার নুমনা জানবো আজ।

ভিক্টোরীয়া লন্ডন ইস্টে, ১৮৮৮ সালের ৩১ অগাস্ট শুক্রবার রাত ৩টা ৪০ মিনিটে স্থানীয়রা একটি লাশ আবিষ্কার করে মেয়েটির নাম মেরি অ্যান নিকোলস।ইস্ট লন্ডনে মেরি অ্যান খুন হয়। খুন হওয়াটা খুব বড় কোনো ঘটনা বলা যায় না তখনের হিসেবে। কিন্তু নিহতের লাশ এভাবে বিকৃত করে দেয়া- এটা অবশ্যই নতুন ছিল। একটা ভীতি চলে আসে জনমনে। কিন্তু এটা যে সিরিয়াল কিলিং হতে পারে সে চিন্তা তখনও মাথায় আসে নি।

ছুড়ির আঘাতে তার গলা ভাগ হয়ে গেছে, দুবার আঘাত করা হয়েছে তার গলায় তাই অনুমান করা যায়। আর তলপেটের নিচের অংশ চিরে ফেলা হয় তার আর নিয়ে যাওয়া হয় এর কিছু অংশ, এমন ভাবে তাকে খুন করা হয় শিরদাঁড়া বেয়ে রক্ত হিম হওয়ার অনুভূতি টের পাওয়া যায়। খুনি কি চাইছিলো নিজের একটি ছাপ ছেড়ে যেতে তাহলে? খুনির সাথে মেরির পরিচয় জানা তখন সম্ভব ছিলোনা আর, আমরাও হয়তো জানতে পারবোনা, কিন্তু এই খুনের মাধ্যমেই শুরু হয় একটি সিরিয়াল কিলিং এর এক নতুন ভয়াল অধ্যায়।

এক সপ্তাহ পর, ১৮৮৮সাল ৮ সেপ্টেম্বর শনিবার। সেদিন প্রায় একই এলাকায় অ্যানি চ্যাপম্যানের লাশ পাওয়া যায় ভোর সাড়ে পাঁচটায়। পেশায় মেরির মতো সেও ছিল পতিতা। এবারও দু’বার আঘাত করে গলা কাটা হয়। তলপেটের নিচ থেকে পুরোটা চেরা। ভেতর থেকে জরায়ু কেটে নেয়া হয়েছে। অবশ্য এবার প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানালো, উসকোখুসকো কালো চুলের এক ভদ্রলোককে চ্যাপম্যানের মারা যাবার ঠিক আধা ঘণ্টা আগেও দেখেছে তার সাথে যেতে।

পর পর দুটো এমন খুনের পর ভীতি আরো বেশি করে ছড়িয়ে পড়ে ইস্ট লন্ডনের অধিবাসীদের মাঝে।

৩০ সেপ্টেম্বর রবিবার ভোরবেলা একই দিনে এলিজাবেথ স্ট্রাইড আর ক্যাথারিন এডোজ এর লাশ পাওয়া যায়। দুজনকে যদিও পাওয়া যায় দু’জায়গায়, এবং দুজনই ছিল পতিতা। অর্থাৎ একই রাত্রে জ্যাক দ্য রিপার দু জায়গায় গিয়ে খুন করে আসে। ক্যাথারিনের গলা ছিল কাটা। তলপেটের নিচ থেকেও কাটা, ভেতরে বাম কিডনি আর জরায়ুর সিংহভাগ কেটে নিয়ে গিয়েছে।এখানেও একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলল, এক উসকোখুসকো লোককে খুন হওয়া ক্যাথারিনের সাথে দেখেছিল।

এলিজাবেথের মৃত্যুটা একটু ভিন্ন। খুবই নিখুঁতভাবে তার প্রধান ধমনী কাঁধের বাম পাশ থেকে কেটে দেয়া হয়েছিল। তবে তলপেটের নিচে কোন আঘাত নেই, সম্ভবত সময় না পাওয়ার কারণে তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে যায় খুনী।

এই জোড়া খুনের পর কী পরিমাণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে তা কল্পনার বাহিরে। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও কোনো হদিস পেলো না খুনীর।

নভেম্বরের ৯ তারিখ শুক্রবার সকাল পৌনে এগারোটায় মেরি কেলি-র লাশ পাওয়া যায় নিজের রুমে, নিজের বিছানায়। খুব যত্নের সাথে তার গলা কাটবার পর মেরুদণ্ড পর্যন্ত কাটা হয়েছে। তলপেটের নিচে তো কাটা হয়েছেই, ভেতরে কিছুই ছিল না। এমনকি তার হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত কেটে নিয়ে গেছে জ্যাক দ্য রিপার। রিপ শব্দের অর্থ বুঝিয়ে দেয়ার জন্যই সে হয়তো ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো নিহতের শরীরের অংশগুলো।

লন্ডনের ইস্ট এন্ডে জ্যাক দ্য রিপার কতৃক হত্যাকাণ্ড (হোয়াইট চ্যাপেল মার্ডার্স নামেও পরিচিত) ভিক্টোরিয়ান যুগের পর এটি একটি রহস্যের সৃষ্টি করে গোটা বিশ্বে।

কুখ্যাত লন্ডন সিরিয়াল কিলারের পরিচয়ের আশেপাশের রহস্যগুলি যেনো এই খুনের মতোই জটিল হয়ে এবং আরো রহস্যময় হয়ে উঠলো,এবং লন্ডন পুলিশ এবং সারা বিশ্বের লোকেরা এখনও জ্যাক দ্য রিপারের আসল পরিচয় নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে যায়।

বিশ্বাস করা হয় যে মেরি অ্যান নিকোলস, অ্যানি চ্যাপম্যান, এলিজাবেথ স্ট্রাইড, ক্যাথরিন এডোয়েস এবং মেরি জেন ​​কেলি হত্যার পিছনে “হোয়াইটচ্যাপেল এর জ্যাক দা রিপার” ছিল; তবে কেউ কেউ ভিন্ন মতে বিশ্বাস করেন যে ১৮৮৮ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে লন্ডনে এগারোটি পৃথক খুনের জন্য জ্যাক দ্য রিপার দায়ী হতে পারে।

২,০০০ জনেরও বেশি লোকের সন্দেহভাজন তালিকা নেওয়ার পরে, ৩০০ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে এবং ৮০ জনকে আটক করার পরে লন্ডন পুলিশ এই সমস্ত নৃশংস হত্যার পিছনে আসল খুনির পরিচয় খুঁজতে গিয়ে নানা রকম তথ্য সামনে এসে তাদের হতবাকও করে দেয়। তবে তাদের তদন্ত চলাকালীন পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বেশ কয়েকজনকে প্রধান সন্দেহভাজন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলো।(যদিও কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়নি)

কিন্তু এতকিছুর পরেই কি কারন ছিলো যার জন্য পাঁচজনকেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হলো একসাথে? কোনো একজনকে একা কেনো নয়? পাঁচজনের চারিত্রিক, মানসিক , শিক্ষা, পেশা ভিন্ন ভিন্ন হওয়া সত্বেও কেনো এই হত্যাকাণ্ডের জন্য এদের জ্যাক রিপার হিসাবে সন্দেহ করা হচ্ছিলো? কি কারন ছিলো যার জন্য এদের কাউকেই সন্দেহের তালিকা থেকে ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছিলো না আবার সরাসরি এদের অভিযুক্তও করা যায়না প্রমাণের সল্পতার কারনে। আর শুধুমাত্র এ কারণেই বারবার চেষ্টা করার পরও আসল খুনিকে সনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পরে।

মন্টোগো জন ড্রুইট

যদিও তার বিরুদ্ধে কোনও জোরলো বা পোক্ত সেরকম প্রমাণ ছিলোনা, লন্ডনের ইস্ট এন্ডে জ্যাক দ্য রিপার হত্যার বিষয়টি তোলপাড় হবার পর,ড্র্রুটের আকস্মিক আত্মহত্যার ঘটনায় লন্ডনের একজন গোয়েন্দা (মেলভিলে লেসি ম্যাকনাঘটেন) নিশ্চিত করেছিল যে ড্রুইটই ছিলো প্রকৃত খুনি “জ্যাক দ্য রিপার”।

মন্টগো জন ড্রুইট ছিলেন “মোটামুটি” ভাল পরিবারের একজন অক্সফোর্ড পড়ুয়া শিক্ষিত মানুষ, যদিও কেউ কেউ বলতেন যে তিনি যৌন বিকৃতি মানসিক ব্যাথিতে আক্রান্ত ছিলেন।তার জন্ম ডারসেটের উইম্বর্ন মিনস্টার শহরে এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনি একবার লন্ডনের ব্ল্যাকহেথে সহকারী স্কুল শিক্ষক হিসাবে কাজ করেছিলেন।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুততার যে ব্যাপারটি ছিল তার কারণ তারা নিশ্চিত যে জ্যাক দ্য রিপার হোয়াইট চ্যাপেল এর স্থানীয় (থ্রিমের অপর পাশে হোয়াইট চ্যাপেল থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থান করেছিল), অনেকে এমনও বলেন তাকে ঘটনাকালীন সময়ের আশেপাশে হোয়াইট চ্যাপেল অঞ্চলেও দেখা গিয়েছিলো।

১৮ নভেম্বর, ১৯৮৮ সালে (মেরি জেন ​​কেলি হত্যার সাত সপ্তাহ পরে, যেটিকে বলা হয় “জ্যাক দ্য রিপারের” চূড়ান্ত এবং শেষ হত্যা বলে মনে করা হয়, ড্রুইটের মরদেহ টেমসে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা বিশ্বাস করেছিলেন যে এটি আত্মহত্যা,তার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করা হয় মেরী জেন কেলি হত্যার পরবর্তী সময়ে তিনি অন্তত কয়েক সপ্তাহ ধরে নদীর তীরে অবস্থানরত অবস্থায় ছিলো।

 

কার্ল ফিগেনবাউম

লন্ডনের “জ্যাক দি রিপার” সন্দেহভাজন এর তালিকায় আরো একজন ছিলো ৫৪ বছর বয়সী জার্মান ব্যবসায়ী নাবিক কার্ল ফিগেনবাউম।

ফিগেনবাউম এমন এক সাইকোপ্যাথ হিসাবে পরিচিত ছিলো যে নিজেই তার স্বীকারোক্তিতে মহিলাদের বিভ্রান্ত করার কথা স্বীকার করেছিলো এবং এমনকি তার এই স্বীকারোক্তির কারণেই তার নিজের আইনজীবীও বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলো যে তার ক্লায়েন্ট কার্ল ফিগেনবাউনই ছিলো সেই কুখ্যাত খুনি “জ্যাক দ্য রিপার”!

ফিগেনবাউম তার জীবদ্দশায় বহু মানুষের চর্চায় ছিলো ফিগেনবাউম হোয়াইটচ্যাপেলের কাছে ডক করা জাহাজগুলিতে ব্যবসায়ী হিসাবে কাজ করতো বলে জানা যায়। ১৮৮৮ এর রেকর্ডস প্রমাণ করে যে ফিগেনবাউম লন্ডনের ইস্ট এন্ডে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের সময়ই কোনো না কোনো কারণে হোয়াইট চ্যাপেলে এ ছিলো বা কাজ করছিলো। তার ব্যাপারে আরো জানা যায় সে এবং তার সহকর্মীদের প্রায়শই হোয়াইট চ্যাপলের কাছের পতিতালয়েও আসা যাওয়া করতে দেখা যেত।

ফিগেনবাউম ১৮৯০ সালের দিকে আমেরিকা চলে যায়, এবং পরে জুলিয়ানা হফম্যান নামে একজন মহিলাকে হত্যার জন্য তাকে আটক করা হয় এবং বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে এই অপরাধের জন্য তখনকার নিয়মে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে শাস্তি দেয়ার আদেশ দেয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা নিজেদের মতামত দেবার বেলায় বলেছিলেন যে লন্ডনের “জ্যাক দ্য রিপার” এর খুন করার ধরন এবং নমুনা গুলো হুবুহু মিলে যায় ফিগেনবাউম এর হফম্যানকে হত্যা করার নমুনার সাথে ।

সত্যিকার অর্থে সেই “জ্যাক দা রিপার” কিনা তার কোনো বিশ্বস্ত প্রমান পাওয়া যায়নি। ইতিহাসে কার্ল ফিগেনবাউম শুধুমাত্র একজন সন্দেহভাজন হয়েই রয়ে গেছে।

অ্যারন কোসমিনস্কিই

বেশ কয়েকজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বিশ্বাস করেছিলেন যে লন্ডনের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলো পোলিশ বার্বার (নাপিত) অ্যারন কোসমিনস্কি। তার কারণ হিসেবে অবশ্য তাদের হাতে অনেক বড় প্রমান ও পাওয়া গিয়েছিলো। আর কি ছিলো সেই পোক্ত প্রমান যে পুলিশ কর্মকর্তারা বিস্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে এই হত্যাকান্ডের পেছনে আছে অ্যারন কোসমিনস্কিই আছে?

হ্যা আশ্চর্যজনক ভাবে এই প্রথমবারের মত অন্তত একটি প্রমান পাওয়া গিয়েছিলো যা থেকে খুনিকে সনাক্ত করা যায়। ক্যাথরিন এডোয়েস এর শাল থেকে কোসমিনস্কির মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ পাওয়া যায়। কিন্তু আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই জোরদার প্রমান থাকা সত্বেও এই মামলায় তেমন সহায়তা বয়ে আনতে পারেনি কেউ।

কোসমিনস্কি ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৫ সালে রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমন অনুমান করা হয়।এরপর ১৮৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে লন্ডনে এসে স্থায়ী হয়েছিলো। কোসমিনস্কি ধর্মে ছিলো ইহুদি। “জ্যাক দ্য রিপার” হত্যাকাণ্ড সময়কালীন কোসমিনস্কি হোয়াইট চ্যাপেলের হেয়ারড্রেসার হিসাবে কাজ করতো। সে নারীবিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে চলতো এবং তার ব্যবহার এবং নারীর প্রতি পোষন করা তীব্র ঘৃণা স্পষ্টতই প্রকাশ পেতো। কোসমিনস্কির হিউসিডিডাল প্রবণতা (মানসিক ব্যাধি) ছিলো এমনকি এজন্য তাকে চিকিৎসক এর শরণাপন্ন হতে হতো। ১৮৮৯ শালে তাকে চিকিৎসার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়, যেখানে যাবার কিছুক্ষনের মধ্যেই মারা যায় অ্যারন কোসমিনস্কিই।

“জ্যাক দ্য রিপার” হত্যাকাণ্ডের সময় থেকে পুলিশ তাদের হাতে থাকা সে সময়কার অনেক নথিই প্রকাশ করেছিলো। কর্মকর্তারা “কোসমিনস্কি” নামে একজনকে সন্দেহও করেছিলেন এটিও সত্য, যদিও অ্যারন কোসমিনস্কি বহু বছর পরেও তাদের সন্দেহভাজন হিসাবে শনাক্ত ছিলো না।

ফ্রান্সিস ক্রেগ

সাম্প্রতিক সময়ে, অনেক রিপারোলজিস্ট বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে লন্ডনে জ্যাক দ্য রিপার হত্যাকাণ্ডের পিছনে মেরি জেন ​​কেলির স্বামী ফ্রান্সিস স্পুরজাইম ক্রেইগ ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের সময়ে ক্রেগ ছিলেন একজন সাংবাদিক। সাংবাদিক হিসাবে কাজ করতেন, পুলিশ আদালত এবং হোয়াইট চ্যাপেল হত্যার তদন্তের পাশাপাশি লন্ডনের ইস্ট এন্ডের অন্যান্য অপরাধের বিষয়েও তদন্ত করছিলেন।

ক্রেগ ১৮৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার আরেকটি পরিচয় তিনি “সুপরিচিত ভিক্টোরিয়ান সমাজ সংস্কারক” এর ছেলে,সে সময় কিছু লোক বলেন যে ক্রেগ মানসিক রোগে ভুগছিলেন; আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে তিনি স্কিজো-টাইপাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এর রোগী ছিলেন।

তিনি হোয়াইট চ্যাপেল এর মাইল এন্ড রোডে থাকতেন, যা জ্যাক দ্য রিপারের প্রথম হত্যাকাণ্ডের দুরুত্ব থেকে মাত্র সাত মিনিট দূরে ছিল। ১৮৮৪ সালে তিনি এলিজাবেথ ওয়েস্টন ডেভিসকে বিয়ে করেন, পরবর্তীতে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন তার স্ত্রী মেরি জেন ​​কেলি ছদ্মনাম একজন পতিতা ।

তথ্যগুলো থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় ক্রেগ একবার নিজেই জেনেছিলেন যে তার স্ত্রী পতিতা হিসাবে কাজ করছেন, তিনি ইস্ট এন্ডের অধীনে নিজের পতিতাবৃত্তি করতেন।তিনি তার ছদ্মনামের আড়ালেই থাকতেন। আর এরপরই ক্রেগ তার হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলেন।

ওয়াল্টার সিকার্ট

পোর্ট্রেট অফ এ কিলার: জ্যাক দ্য রিপার – কেস ক্লোজড বইটিতে লেখক প্যাট্রিসিয়া কর্নওয়েল পিনপয়েন্টেড শিল্পী ওয়াল্টার রিচার্ড সিকার্টকে আসল জ্যাক দ্য রিপার হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এবং এমনকি ডিএনএ প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন যা জ্যাক দ্য রিপারের চিঠিগুলির মধ্যে অন্তত একটির সাথে সিকার্টকে যুক্ত করতে বাধ্য করে । তবে তার বইয়ের আগেও সিকার্ট হোয়াইট চ্যাপেল হত্যার পিছনে ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়েছিলো ১৯৭০ এর দশক থেকে।

সিকার্ট ১৮৬০ সালে মিউনিখে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৬৯ সালে সপরিবারে লন্ডনে চলে আসেন। সিকার্ট পতিতাদের চিত্র আঁকার জন্য পরিচিত ছিলেন এবং কারও কারও মতে তিনি তাঁর শিল্পকর্মে জ্যাক দ্য রিপার হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নিখুঁত এবং ইঙ্গিতপূর্ন চিহ্ন রাখতেন । কিছু বিশেষজ্ঞ দাবি করেন যে ক্লুগুলি প্রকৃত অপরাধ দৃশ্যের সাথে এতটাই মিল, যে কেবল “সত্য খুনি” খুনের সাথে জড়িত ব্যক্তিই শুধু তাদের আঁকতে পারতো।

এটাও বিশ্বাস করা হয় বেশ কয়েকবার চিকিৎসা নেয়ার পরেও সিকার্ট নপুংসক ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা সবসময় বলে আসছিলেন যে জ্যাক দ্য রিপারের একধরনের পুরুষত্বহীনতার সমস্যা থাকতে পারে, এজন্যই তিনি পতিতাদের টার্গেট করেছেন। আর এটি ইতিহাসে আমরা আগেও দেখেছি বেশিরভাগ সিরিয়াল কিলাররা নিজের শারীরিক অক্ষমতার কারণেই নৃশংস হয়ে উঠেন এবং নারীদের প্রতি বর্বরতা প্রকাশ করতে বেছে নেন অন্যদের থেকে আলাদা মাধ্যম।

জ্যাক দা রিপার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হাজার হাজার মানুষকে জেরা করে ছেড়ে দেয় পুলিশ,হোয়াইট চ্যাপেলে রাতে কালো হ্যাট পড়া কোনো ব্যক্তিকে দেখলেই সেই অঞ্চলের পাহারাদারেরা সংঘবদ্ধ আক্রমণ শুরু করতো। অবস্হা বেগতিক হয়ে যাওয়ায় চাকরীতে ইস্তফা দিলেন পুলিশ কমিশনার।

মাত্র একমাস শান্ত ছিলো পরিবেশ, তারপরই আবার খুন! মাত্র বিশ বছর পেরুনো এক তরুণীকে টুকরো টুকরো করে পাঁজর সহ আলাদা করে ফেলা হলো। পরবর্তী বছর ১৮৮৮সালে হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় আরো দুইজন পতিতা প্রাণ হারায় নির্মম ভাবে।

এসময় জর্জ বার্নার্ড শ পুলিশ বরাবর একটি চিঠি লেখেন – যেখানে তিনি নিশ্চিত করেই বলেন ‘হত্যাকারী অবশ্যই একজন সমাজ সংস্কারক যে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে নিশ্চিত কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে।’

রিপারের শেষ খুনটা ছিলো ডর্সালিস স্ট্রীটে। মেরী নামক এক যুবতীকে খুন করেছিলো রিপার! সেই খুন হবার রাতে মেরি গুনগুন করে গান গাইছিলো এবং বারবার এক আগন্তুক কে ডাকছিলো। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে লোকটা ছিলো খাটো, মুখে পাকানো গোঁফ, পরণে চমৎকার পোষাক, হাতে পার্সেলের মতো কিছু একটা ঝুলছিলো তার!

মেরিকে আনুমানিক শ খানেক টুকরো করে জ্যাক দ্য রিপার রক্তে ভেজা কাপড় নিয়ে লন্ডনের বুকে হেঁটে চলে গিয়েছিলো – কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই!

পুলিশ বিভাগ অবশ্য দাবী করেছিলো জ্যাক দ্য রিপার ছিলো একজন স্যাডিস্ট মানে মানসিক রোগী। যেই সিরিয়াল কিলারের কাজই ছিলো যৌণ কর্মীদের যন্ত্রণা দিয়ে এবং ব্যাপক রক্তপাত ঘটিয়ে মৃত্যুবরণ করানো।

পুলিশ বিভাগ সন্দেহ করেছিলো পোল্যান্ডের অধিবাসী স্লেভেন ক্লুসোউইস্কি নামক এক ব্যক্তিই ছিলো জ্যাক দ্য রিপার! হত্যাকান্ডগুলো সংগঠিত হবার সময় সে নাপিতের কাজ করতো হোয়াইট চ্যাপেলে!

তবে এ বিষয়েও কোনো তথ্য প্রমাণ নেই।

এসব নৃশংস ঘটনা ছিল ইতিহাসে বিরল এবং এ ঘটনাগুলো পুরো লন্ডন ও ব্রিটেনকে কাঁপিয়ে দেয়। শুরু হয় পুলিশ, প্রশাসনের তৎপরতা। চারিদিকে বিরাজ করছিল উৎকণ্ঠা। রিপারের হত্যা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল। এরপর হত্যার কারণ যেমন সমাধান হয়নি, তেমনি কেউ ধরাও পড়েনি। তবে ঘটনাগুলো জনমনে প্রভাব ফেলে। তাই লন্ডনের অধিকাবাসীগণ এ ঘটনার শতাব্দী পার হলেও এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছেন এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর যা আজ পর্যন্ত অজানা। এসব ঘটনা নিয়ে মানুষের উৎসাহ ও কৌতূহলকে ঘিরে তৈরি হয় বেশ কিছু চলচ্চিত্র, টেলিভিশন সিরিজ, লেখা হয়েছে বই।

এ ব্যাপারে এখনো কেস চলছে, কিন্তু সম্মুখীন হচ্ছে অসংখ্য বাঁধার, যার মধ্যে রয়েছে নিরেট প্রমাণের অভাব, ভুল তথ্যের সমাহার, মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অত্যন্ত শক্ত কিছু নিয়মের মারপ্যাঁচ। ২০০৭ সালে রাসেল এডওয়ার্ডস নামক এক ব্যবসায়ী এডোয়েসের ব্যবহৃত একটি শাল কিনে নেন। তিনি সেটি লিভারপুলের জেনেটিক্স এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. জারি লুথেলেইনেনের কাছে নিয়ে যান। ড. লুথেলেইনেন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর ডিএনএ পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার ফলাফল হিসেবে তিনি “রিপার” হিসেবে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির বোনের উত্তরাধিকারের ডিএনএ-এর সঙ্গে শত ভাগ মিল খুঁজে পান, যা ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকেই রিপার বলে ধরে নিতে বাধ্য করে। তবু একে জ্যাক দ্য রিপার কেসের সমাধান বলে বিভিন্ন কারণে গ্রহণ করা হয়নি।

২০১১ সালে রিপারের কেস নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বেসরকারী গোয়েন্দা ট্রেভর ম্যারিয়টকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড কিছু ফাইল দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্রিটিশ মিডিয়া জুড়ে বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ১৩২ বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্যাক দ্য রিপারকে নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। রিপারের পরে আরো বহু সিরিয়াল কিলার এসেছে, কিন্তু রিপার রয়ে গেছেন লন্ডনের কুয়াশা ঘেরা রাতের মতোই অস্পষ্ট ও রহস্যময়। জ্যাক দ্য রিপার হয়তো বা থেকে যাবে পৃথিবীর অসংখ্য অমিমাংসিত রহস্যের অন্তরালে। তবে এখনো “জ্যাক দা রিপার” বা “লেদার এপ্রোন” কিংবা ” বস” তকমা লাগাতে পারেনি কেউ। সন্দেহভাজন কাউকেই প্রমাণের অভাবে আসল খুনি সনাক্ত করা যায়