মীর লোকমান- বাংলাদেশের মূকাভিনয়ে এক অনন্ত প্রজ্জ্বলন শিখা - প্রিয়লেখা

মীর লোকমান- বাংলাদেশের মূকাভিনয়ে এক অনন্ত প্রজ্জ্বলন শিখা

ahnafratul
Published: October 7, 2017

না বলেই কথা বলার চেষ্টা করেছেন কখনো? হয়ত ভাবছেন এ আবার কি কথা? না বলে কথা বলা যায় কখনো? আরে যায় যায়। যদি নাই যেত, মীর লোকমানকে আজ আমরা পেতাম না। সারাবিশ্ব জুড়েই মাইম বা পেন্টোমাইম খুবই জনপ্রিয় একটি শিল্প। সোজা বাংলায় যাকে আমরা বলি মূকাভিনয়। মনের যত কথা আছে, সবকিছু খুলে বলা যায় কেবলমাত্র মুখভঙ্গি আর অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। পার্থ প্রতীম মজুমদারের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? বাংলাদেশের কৃতি এই সন্তান মূকাভিনয়ের মাধ্যমেই পেয়েছেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক(সিভিলিয়ান) পদক। আমাদের আছে আরো একজন। মীর লোকমান।
তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশে মাইমকে জনপ্রিয় করে যাবার জন্য। তার স্বপ্ন একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকবে মাইমের একটি করে অঙ্গ। শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে করে যাচ্ছেন তার স্বপ্নের বাস্তবায়নের কাজ।  কিছুদিন আগে আর্মেনিয়াতে করে এসেছেন আন্তর্জাতিক মাইম ফেস্ট। ফিনল্যান্ড থেকে চিঠি পেয়েছেন ক’দিন আগেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাইম অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাতার সাক্ষাৎকার থাকছে আমাদের আজকের প্রিয়লেখার আয়োজনেঃ

প্রিয়লেখাঃ ভাইয়া, কেমন আছেন?
মীর লোকমানঃ জ্বি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?

প্রিয়লেখাঃ জ্বি। তো ভাইয়া, আজ আমাদের গল্পে গল্পে উঠে আসবে আপনার নানা গল্প, অজানা সব কথা। শুরুটা কিভাবে হয়েছিল বলবেন কি?
মীর লোকমানঃ ২০০৩ সালে নরসিংদীতে আমি প্রথম মাইম অনুষ্ঠান দেখি। দেখে আমার খুব ভালো লাগে। সেখান থেকে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করি মাইম সম্পর্কে।

প্রিয়লেখাঃ কোন বিষয়টা নিয়ে আপনি মাইমের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন সেখানে?
মীর লোকমানঃ দেখুন, বাংলাদেশে অনেক সমস্যা। এত ক্ষুদ্র পরিসরে সব সমস্যার কথা তুলে ধরাও খুব সহজ কাজ না। আমি যখন মাইমটা দেখেছিলাম, সাল ছিল ২০০৩। বয়সও খুব ছোট। সেখানে আমি দেখেছিলাম ছোট্ট একটা স্টেজে কি সাবলীলভাবে পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। দেখে খুব ভালো লেগেছিল আমার। সেখান থেকেই শুরু বলা যায়।

মীর লোকমান

প্রিয়লেখাঃ মাইমের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা তখন আপনার ছিল কি?
মীর লোকমানঃ তখন কোন শিক্ষাই আমার ছিল না এ সম্পর্কে। ২০০৭-০৮ সালে একটা অভিনয়ের প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে আমি মাইম করি, যদিও মাইম নিয়ে আমি কারো কাছে, কোন জায়গায় কিছু শিখতাম না। স্রেফ শখের বসেই কাজটা করেছিলাম। তবে এর থেকেই আমার মাঝে একটা উৎসাহ জাগে। খুঁজতে শুরু করলাম কোথায় ভালো মাইম শেখানোর প্রতিষ্ঠান আছে।

প্রিয়লেখাঃ প্রত্যেক সফল ছাত্রের পেছনে থাকেন একজন সফল গুরু। যার উৎসাহে, প্রণোদনায় ছাত্র উঠে আসে সাফল্যের শিখরে। আপনার জীবনের গুরু কে?
মীর লোকমানঃ মাইম শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আমি যুক্ত হই ২০১১ সালে। কাজী মশহুরুল হুদা ছিলেন আমার মেন্টর। তিনি আমেরিকান প্রবাসী। শিল্পকলা একাডেমী থেকে একটি ফর্ম ছাড়া হয়েছিল যেখানে কর্মশালার মাধ্যমে ২০-৩০ জন নেয়া হবে। সেখানে ২৭ জন সিলেক্ট করা হয়েছিল, যার মাঝে আমি ছিলাম। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে আমাদের প্রথম শো হয়েছিল। মেন্টর হিসেবে মশহুরুল স্যার ছিলেন চমৎকার একজন মানুষ, খুবই হেল্পফুল।

প্রিয়লেখাঃ তা, মাইমের এই একনিষ্ঠ ভক্ত কি শুধু মাইমই করেছেন? নাকি তার আরো কিছু গুণের কথা আমরা শুনব?
মীর লোকমানঃ (সামান্য হেসে) ২০১০ সালের অমর একুশে বইমেলায় আমার একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল, শিলা প্রকাশনী থেকে। বইটার নাম ছিল ‘জীবনের প্রতিধ্বনি’। সেখানে ফেলানী ইস্যুতে একটি কবিতা লিখেছিলাম। নাম ‘কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ভালোবাসার কবিতা’। খুব প্রশংসিত হয়েছিল কবিতাটি।

প্রিয়লেখাঃ ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন- শুরুটা কিভাবে হল?
মীর লোকমানঃ সত্যি কথা বলতে গেলে, ঈশ্বর সরাসরি সাহায্য না করলে এত বড় উদ্যোগটা কখনো নিতে পারতাম না। ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের DUMA-র যাত্রা শুরু হয়। শুরু করেছিলাম মাত্র ৫-৬জন নিয়ে। ধীরে ধীরে এখন সেটা মহীরুহের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলা যায় (গর্বের হাসি)

মীর লোকমানের সাথে তার মাইম দলের সদস্যরা

প্রিয়লেখাঃ বাসা থেকে কি ধরণের সাহায্য সহযোগীতা পেয়েছিলেন?
মীর লোকমানঃ আসলে বাড়ি থেকে তেমন কোন সাহায্য সহযোগীতা পেতাম না। তখন তো আমাদের কোন স্পন্সরও ছিল না। দেখে গিয়েছে নিজের গাঁটের টাকা দিয়েই পোস্টার তৈরি করছি, ব্যানার তৈরি করছি, সব যোগাড় করছি। এমনও দিন গিয়েছে বাড়ি থেকে খাবারের টাকা পাঠিয়েছে, খাই নি। নিজে না খেয়ে কাজ করেছি মাইমের জন্য, ভালোবাসা থেকে।

প্রিয়লেখাঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শো কবে হল আপনাদের?
মীর লোকমানঃ ২০১৩ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক স্টেজ শো হয় আমাদের। নাটমন্ডলে করেছিলাম সেটা। আরেফিন স্যারের কাছে (ঢাবির প্রাক্তন ভিসি) কম্পিত হৃদয়ে গেলাম আমাদের অনুষ্ঠানে আসার জন্য। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। অনুষ্ঠানের পর আমাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন তিনি। সেবার অনুষ্ঠান করে ৮হাজারের মত টাকা পেয়েছিলাম টিকিট বিক্রির। আর একজনের কথা না বললেই না। আমার ডিপার্টমেন্টের হেড, ফাদার ডি কস্তা স্যারের কথা। আর্থিক, মানসিক সকল দিক থেকে আমাদের সাহায্য করেছেন তিনি। যখনই বিপদে পরেছি, তাকে পাশে পেয়েছি।

টি এস সির একটি শোতে মীর লোকমান

প্রিয়লেখাঃ এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। মাইমে আমরা দেখি মুখে সাদা আর কালো রং মাখা হয়ে থাকে। এর কারণ কি?
মীর লোকমানঃ এটার উত্তরটা একটু বিস্তারিতভাবে দেয়া প্রয়োজন। আপনার জানা আছে নিশ্চয়ই, প্রাচীনকালে গ্রীসে মাঝখানে আগুন জ্বেলে দুধারে একটু উঁচু স্থানে বেদীর ওপর দাঁড়িয়ে অভিনয় করত অভিনেতারা। তাদের মুখে কথা বলার কোন নিয়ম ছিল না। তাই মুখে রং মেখে কিংবা একটু অন্যধরণের পোষাক পরে তারা নিজেদের বলা যায় ‘রঞ্জিত’ করত। তবে আপনি এটাকে অতিরঞ্জন বলতে পারবেন না।
আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, কালো আর সাদা রং, ভালো আর মন্দের সংমিশ্রণ। আপনি যখন একইসাথে মুখে কালো আর সাদা রং মাখছেন, আপনার মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে এক ধরণের নিরপেক্ষ ভাব। যেহেতু মুখে কিছু বলতে পারছেন না আপনি, তাই এই নিরপেক্ষতা দর্শকের মনে এক ধরণের ভাবান্তর ঘটায়।

প্রিয়লেখাঃ আপনাদের প্রতি মানুষের মনোভাব কেমন? বিশেষ করে মাইম করার সময়?
মীর লোকমানঃ দেখুন, মাইমটা এদেশে এখনো এতটা জনপ্রিয় নয়। আমরা শো করবার জন্য একস্থান থেকে আরেকস্থানে যাই। মানুষ আমাদের দেখে মাঝেমাঝে হাসাহাসি করে, জোকার বলে ক্ষেপায়। অবজ্ঞা করে। আমরা এই জায়গাটিই পরিবর্তন করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি, সফল হচ্ছি, কোথাও ব্যর্থ হচ্ছি। তবে থেমে থাকছি না। নতুন উদ্যমে আবার কাজ শুরু করছি।

প্রিয়লেখাঃ সম্প্রতি আর্মেনিয়ায় ভ্রমণ করে এলেন। অভিজ্ঞতা বলুনঃ
মীর লোকমানঃ অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা! গত ২২ জুলাই আর্মেনিয়ার ‘লিওনিদ ইয়াংগিবারিন আন্তর্জাতিক মূকাভিনয় উৎসব-২০১৭’ তে অংশগ্রহণ করেছিলাম আমরা। সেখানে অনুষ্ঠানের ভিডিও শুরু করা হয় আমার একটি মাইম দিয়ে। বাংলাদেশ, মীর লোকমান নামের এই পারফর্ম্যান্সটি দেখানো হয়েছিল সে ভিডিওটিতে। এছাড়াও সেখানকার একটি পত্রিকা এই আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানটি নিয়ে একটি বিষদ ফিচার করে। সেখানে আমার তিনটি ছবি ছিল।

বাংলাদেশ স্ট্রীটে বাচ্চাদের সাথে মীর লোকমান ও সাইফুল্লাহ সাদেক

প্রিয়লেখাঃ আর্মেনিয়া সম্পর্কে কিছু বলুন এবার।
মীর লোকমানঃ খুবই চমৎকার সুন্দর সাজানো গোছানো একটা দেশ। মানুষগুলো খুবই অতিথিপরায়ণ। আপনি জেনে অবাক হবেন, আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে ‘বাংলাদেশ ডিসট্রিক্ট’ নামে একটি জায়গা রয়েছে। সেখানে আর্মেনিয়ার সবচেয়ে বড় পার্ক, বাজার আছে। এটা নিয়ে আমার একটা ভিডিও আছে ইউটিউবে (লিংক এখানে দেয়া হল)

প্রিয়লেখাঃ কয়টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল ঐ অনুষ্ঠানে?
মীর লোকমানঃ মোট ৮টি দেশ। ইউরোপের বাইরে দুটো দেশ ছিল বাংলাদেশ আর দক্ষিণ আফ্রিকা। ৪০ মিনিট করে ছিল অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী দিনে ৭মিনিটের একটি সিগমেন্ট ছিল আমাদের। আমি সেখানে আমার Overcome সিগমেন্ট পারফর্ম করেছিলাম।

আর্মেনিয়ার পত্রিকায় মীর লোকমান

প্রিয়লেখাঃ একদম শেষ মুহুর্তে চলে এসেছি আমরা। মাইমের প্রতি মেয়েদের অংশগ্রহণ কেমন?
মীর লোকমানঃ শুরুর দিকে মেয়েদের খুব একটা অংশগ্রহণ আমরা পাই নি। হতে পারে, শিল্পটা সম্পর্কে জানা না থাকা কিংবা বাড়ির বিধিনিষেধ। অংশগ্রহণ যে এখনো খুব বেড়েছে, তা বলা যায় না। তবে হ্যা, সংখ্যাটা এখন আস্তে আস্তে বাড়ছে।

প্রিয়লেখাঃ মাইমে আসতে চাইছে, এমন আগ্রহীদের সম্পর্কে যদি দুটো কথা বলতেন-
মীর লোকমানঃ দেখুন, এই বয়সটাই এখন উদ্যমের। মাইম আজকের কোন শিল্প না। বহু প্রাচীন একটা শিল্প। যারা এই শিল্পকে ভালোবেসে আসতে চান, তাদের বলছি- এটাকে পরিশীলিতভাবে চর্চা করতে হবে, ধরে রাখতে হবে। আর মাইমের কদর দিন দিন বাড়ছে। ধীরে ধীরে এটা একদিন সম্মানজনক একটি পেশায় পরিণত হবে, এটা আমার বিশ্বাস।

প্রিয়লেখাঃ প্রিয়লেখাকে সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
মীর লোকমানঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

(প্রিয়লেখা টিমের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আহনাফ তাহমিদ রাতুল)