মির্জা গালিবঃ বিস্মৃত এক শায়রী রচয়িতার আখ্যান - প্রিয়লেখা

মির্জা গালিবঃ বিস্মৃত এক শায়রী রচয়িতার আখ্যান

farzana tasnim
Published: September 11, 2017

অ্যায় বারিষ তু ইতনা না বারাস কে ওহ আ না সাকে
যাব ওহ আ যায়ে তো ইতনা বারাস কে ওহ যা না সাকে

মির্জা গালিবের এই শের বা শায়রীটি হয়তো অনেকেই জানেন। বলা হয়, ইংরেজি সাহিত্যে যেমন শেক্সপিয়ার রাজা, তেমনি উর্দু সাহিত্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছেন মির্জা গালিব। উর্দু ও ফারসী কবিতার জগতে শ্রেষ্ঠ কবি মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান গালিব ১৭৭৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর মুঘল ভারতের আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন৷ দক্ষিণ এশিয়ায় তিনি এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী উর্দু ভাষী কবি।

মির্জা গালিবের বাবা আবদুল্লাহ বেগ খান ছিলেন সৈনিক। তার মৃত্যুর সময় গালিবের বয়স চার বছর৷ এরপর তিনি আশ্রয় পান চাচা নসরুল্লাহ বেগ খানের৷ চাচার মৃত্যুর সময়ে গালিবের বয়স নয় বছর৷ এরপর মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন। আগ্রার খ্যাতিমান পণ্ডিত শেখ মোয়াজ্জেমের কাছে গালিবের শিক্ষা জীবন শুরু। মীর আযম আলী পরিচালিত একটি মাদ্রাসায়ও যেতেন৷ সেখানে যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র ও অধিবিদ্যাসহ অন্যান্য বিষয়ে পড়াশুনা করেন৷ কিন্তু তার ঝোঁক ছিল ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি। ওই সময়ে আরবী ও ফারসী ভাষায় দক্ষ আবদুস সামাদ নামে এক জ্ঞানী ব্যক্তি আগ্রা সফর করেন৷ গালিব তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ আবদুস সামাদ গালিবের মামার বাড়িতে দুই বছর ছিলেন৷ গালিব কখনো কাউকে ‘উস্তাদ’ বলে স্বীকার না করলেও পরবর্তীতে আবদুস সামাদের উল্লেখ করেছেন অত্যন্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে৷

নয় বছর বয়সেই গালিব ফারসীতে কবিতা লিখতে শুরু করেন৷ পুরো জীবন ধরে তিনি ফারসীকে তার প্রথম প্রেম বলে বর্ণনা করেছেন৷ যদিও শৈশবে উর্দুতেই কবিতা লিখতেন তিনি। বলা হয়ে থাকে আগ্রার এক অভিজাত ও কবি হোসাইন-উদ-দৌলা একবার কিছু তরুণ কবির কবিতা নিয়ে যান লক্ষ্ণৌর বিখ্যাত কবি মীর তকী মীরের কাছে৷ মীর তকী কবি খ্যাতির পাশাপাশি চড়া মেজাজের জন্যেও পরিচিত ছিলেন, ভাল কবিতা ছাড়া সবই বাতিল করে দিতেন৷ তাকে গালিবের কবিতা দেখালে মন্তব্য করেন, ভাল উস্তাদের তত্ত্বাবধানে ছেলেটি বিরাট কবি হতে পারবে৷

মির্জা গালিব ১৮১০ সালের ৮ আগস্ট নওয়াব ইলাহী বখশ খানের মেয়ে ওমরাও বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই (সম্ভবত ১৮১১ সালে) দিল্লিতে চলে আসেন। পরবর্তী ৫১ বছর তিনি ওখানেই বসবাস করেছেন৷ তার শ্বশুর দিল্লির অভিজাতদের অন্যতম ছিলেন৷ শ্বশুরের প্রভাবের কারণে দিল্লির অভিজাত মহলের সঙ্গে গালিবের পরিচিত হতে বেগ পেতে হয়নি৷ কিন্তু কবি হিসেবে শুরুটা সহজ ছিল না৷ তার প্রথমদিকের কবিতা ফারসী ঘেঁষা ছিল৷ উর্দু সাধারণ মানুষের ভাষায় পরিণত হওয়ায় সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল৷ কিন্তু গালিবের ওপর ফারসী কবি বুখারি, আসীর ও বেদীর প্রভাব ছিল৷ সমালোচকদের মতে গালিবের প্রথম জীবনের কবিতা তার ব্যক্তিগত জীবনের মতোই দুর্বোধ্য ও সামঞ্জস্যহীন ছিল৷ কিন্তু নিজের কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে প্রচণ্ড অহঙ্কার ছিল তার। তিনি মনে করতেন খুব কম লোকই তার কবিতাকে বিচার করতে সক্ষম৷

গালিব নিজেকে অভিজাত গণ্য করে সেভাবে জীবনাচরণে অভ্যস্ত ছিলেন৷ পালকি ছাড়া কোথাও যেতেন না, শুধু সাক্ষাত প্রার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন৷ মদ্যপান করতেন, ধর্মীয় আচারে তার নিষ্ঠা ছিল না৷ সেজন্যেও তাকে তীব্রভাবে সমালোচিত হতে হয়েছে৷ বিখ্যাত কবি আলতাফ হোসেন হালীর মতে গালিব সন্ধ্যার সময় মদ পান করতেন আর লিখতেন। একা বসে একটি সুতা নিয়ে খেলতেন৷ কবিতার একটি লাইন লিখার পর সুতায় একটি গিট দিতেন৷ কবি যখন ঘুমাতে যেতেন তখন সুতায় অনেকগুলো গিট থাকত৷ সকালে তিনি গিটগুলো খুলতেন৷ প্রতিটি লাইন মুখস্থ বলতে পারতেন তিনি৷

গালিবের আরেকটি দুর্বলতা ছিল জুয়া খেলার প্রতি৷ এর জন্য তিনি জেলও খাটেন। তাকে পুরো মেয়াদ কারাবাস করতে হয়নি৷ কোনো শ্রমও দিতে হয়নি৷ বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খেতে দেওয়া হয় এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতও করতে দেওয়া হয়৷ কিন্তু গালিবের ওপর এই শাস্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল৷ অভিজাত, বুদ্ধিজীবী ও স্পর্শকাতর কবি হিসেবে তার যে অহঙ্কার ছিল তা গুঁড়িয়ে যায়৷ ওই বিপদে বন্ধুরাও পরিত্যাগ করেছিল৷ ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমিনুদ্দিন খান গালিবের সাথে তার সম্পর্কের বিষয় মুছে ফেলতে সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন৷ ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু মোস্তফা খান শেফতা। গালিব জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে তার প্রতি ঋণ স্বীকার করে গেছেন৷

মির্জা গালিবের আর্থিক অবস্থা কখনও ভাল ছিল না। বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর ১৮৫০ সালে গালিবকে ‘নাজমুদ দৌলাহ দাবির উল-মুলক নিজাম জং’ খেতাবে ভূষিত করে তৈমুরের বংশের ইতিহাস লেখার দায়িত্ব দেন বার্ষিক ছয়শ’ রুপি ভাতায়৷ কিন্তু ইতিহাস রচনার কাজে যে পড়াশুনা ও ধৈর্য্যের প্রয়োজন গালিবের তা ছিল না এবং দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে তিনি মুঘল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের চাইতে বেশি আর অগ্রসর হতে পারেননি৷ তার আর্থিক অবস্থা ছিল নাজুক এবং মাসিক ভিত্তিতে ভাতা দেয়ার জন্যে বাহাদুর শাহকে চিঠি লেখেন৷ বাহাদুর শাহ এতে অনুমোদন দেন, কিন্তু ১৮৫১ সালের মধ্যে সম্রাট হুমায়ুনের জীবন কাহিনীর চাইতে বেশি আর লিখতে পারেননি৷ অতএব, প্রকল্পটি ভেস্তে যায়৷ তিনি যতটুকু লিখেছিলেন তা ‘মিহির-ই-নিমরোজ’ নামে ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয়৷

১৮৫৪ সালে গালিব বাহাদুর শাহ জাফরের উস্তাদ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন৷ গালিবের কবি খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়৷ এক পর্যায়ে অযোধ্যার নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহ তাকে বার্ষিক ৫০০ রুপি ভাতা মঞ্জুর করেন৷ আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এলেও গালিবের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছিল৷ চোখে কম দেখছিলেন, কানেও কম শুনছিলেন৷ ১৮৫৬ সালে বৃটিশ কর্তৃপক্ষ অযোধ্যাকে বৃটিশ আওতায় নিয়ে আসে এবং একই বছরে পরবর্তী মুঘল সম্রাট বলে নির্ধারিত মির্জা ফখরুদ্দিন ইন্তেকাল করেন৷ এ কারণে গালিবের ভাতা প্রাপ্তি বন্ধ হয়ে যায়৷ ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর মোগল বাদশাহের সময়ে তিনি যে ভাতা লাভ করতেন, তা বৃটিশ কর্তৃপক্ষ বাতিল করেন৷ ফলে মির্জা গালিবকে নতুন করে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়৷ ভাতা পুনর্বহালের জন্যে তিনি বৃটিশ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি৷

১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মির্জা গালিব ইন্তেকাল করেন। তাকে দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়৷ এখন আর তার মৃত্যুর দিনটিকেও কেউ স্মরণ করে না, নিজে শহরে তার নামে একটি সড়কের নামকরণের প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এককালের নামজাদা সভাকবি কী তবে এভাবেই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবেন?