মার্ভেলের ডিফেন্ডার'সঃ কতটুকু ডিফেন্ড করতে পারলেন নিজেদের? - প্রিয়লেখা

মার্ভেলের ডিফেন্ডার’সঃ কতটুকু ডিফেন্ড করতে পারলেন নিজেদের?

ahnafratul
Published: August 25, 2017

একচ্ছত্র আধিপত্য বলতে যা বোঝায়, , মূলত গেম অব থ্রোনস এখন তাই করছে। এক ধরণের নেশা, যে নেশার মায়া ছাড়ানো খুব কঠিন। তবুও আশেপাশে কি ঘটছে, তার খোঁজ খবরও একটু রাখতে হয় বৈকি।

বলছিলাম মার্ভেলের দ্য ডিফেন্ডারস এর কথা। পুরনো চরিত্রগুলোই আবার ফিরে এসেছে একটু নতুনভাবে। এবার নিউ ইয়র্ক শহরকে রক্ষা করতে হবে আমাদের চারজন সুপারহিরোকে। তবে কেউ আলাদাভাবে এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করতে পারবেন না। তাদের গঠন করতে হবে জোট।  হেল’স কিচেনের ডেভিল, বুলেটপ্রুফ লিউক কেইজ, আয়রন ফিস্ট এবং দুঁদে সুপারহিরো গোয়েন্দা জেসিকা জোনস। আরো রয়েছে কিছু পরিচিত চরিত্র। স্টিক, ক্লেয়ার, ক্যারেন পেইজ, কলিন উইংস, মাদাম গাও, বাকুতো, ইলেকট্রা এমনই আরো পরিচিত নানা মুখ এসেছে প্রথম সিজনে। এবার মূল কাহিনীতে আসা যাক। কিভাবে আবর্তিত হয়েছে ডিফেন্ডারসের প্রথম সিজনের প্লটঃ

আয়রন ফিস্ট তার প্রতিপক্ষ দ্য হ্যান্ডের বিরুদ্ধে এবার নানা দেশে ঘুরছে সঙ্গিনী কলিনের সাথে। তবে শেষ পর্যন্ত বিশেষ এক তথ্যে আয়রন ফিস্ট তথা ড্যানি র‍্যান্ড জানতে পেরেছে সকল কিছুর হোতা নিউ ইয়র্ক শহর। সে ফিরে আসছে কলিনকে নিয়ে।

মূলত, ডিফেন্ডারসের প্রথম সিজন সাজানো হয়েছে ড্যানি র‍্যান্ডকে ঘিরেই। রহস্যময় সংগঠন দ্য হ্যান্ডের প্রাচীন একটি রহস্য উদ্ধার করবার চাবিকাঠি আমাদের এই আয়রন ফিস্ট। ঘুমন্ত কালো শক্তিকে উদ্ধার করতে আলেক্সান্দ্রা জাগিয়ে তুলেছে তার চাইতেও আঁধার  ঘণীভূত চরিত্র ইলেকট্রা নাচিওস। তবে এবার সে ইলেকট্রা হিসেবে ফেরে নি, ফিরেছে দ্য ডার্ক স্কাই হিসেবে, আলেক্সান্দ্রার অন্যতম গোপন এক অস্ত্র এই দ্য ডার্ক স্কাই।

হারলেমে সমস্যা এখনো শেষ হয় নি। সমস্যা সমাধান করবার জন্য লিউক কেজকে আরো একবার কঠোর হতে হবে, যেতে হবে হারলেমে। এর মাঝেই এক পরিবারের সাথে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টে জড়িয়ে পরে লিউক। দ্য হ্যান্ডের এক সদস্য হোয়াইট হ্যাটের পিছু পিছু যেতেই তার সামনে পেয়ে যায় আয়রন ফিস্টকে। কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির ফলস্বরুপ আমরা দর্শকরা দেখতে পাব আয়রন ফিস্ট ও লিউক কেইজের বহুল প্রতীক্ষিত “ফিস্ট ফাইট”। দুজনের মাঝে খুনসুটি ও রহস্যময় শহর কান লান নিয়ে লিউক কেইজের করা রসাত্মক মন্তব্যগুলোও বেশ উপভোগ্য ছিল।

এবার আসা যাক ডেভিল অব হেলস কিচেনের প্রসঙ্গে। ডিফেন্ডারসে তাকে নিয়ে যেসব ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, তা আমার কাছে ভালো লাগে নি। কেন লাগে নি, তার কারণগুলো বলছি। তবে সেগুলো শুধুই ব্যক্তিগত।

প্রথমত, এখানে ম্যাট মারডককে দেখানো হয়েছে একটু লো প্রোফাইল হিসেবে। ডেয়ারডেভিল সিরিজ আমরা যারা দেখেছি, তারা জানি ডেয়ারডেভিল চরিত্রটি কতটা গভীর, কাহিনী বিন্যাসে সন্নিবেশিত আর কতটা ভয়ংকর। এখানে ম্যাট যেন কিছুটা ভীত। সে চাচ্ছে না দ্য হ্যান্ডের সাথে সরাসরি কোন ধরণের সংঘর্ষে যেতে। এমনকি লিউক কেইজ, জেসিকা আর ফিস্টকেও নিবৃত্ত করতে চাচ্ছে এক পর্যায়ে ম্যাট মারডক। তবে শেষ পর্যন্ত সকলকে একত্র করতে অন্যতম ভূমিকা সেই পালন করে।

দ্বিতীয়ত, ডেয়ারডেভিল সিজনের বেশিরভাগ সময়েই নিজেকে একজন ল’ইয়ার হিসেবে দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।

তৃতীয়ত, ডেয়ারডেভিলের হিংস্রতাটাই আমার বেশি পছন্দ। এটি এবারে খুব কম লেগেছে আমার কাছে।

তবে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে নেমে যদি পরিচালকের কৃতিত্বের কথা বলি, তাহলে আমি তাকে দশে আট দেব। কারণ, এই সিজনে পূর্বের কথা যথেষ্ট পরিমিত পর্যায়ে রেখে নতুন একটি কাহিনী আবর্তিত করেছেন ডগলাস পেট্রি ও মার্কো রামিরেজ। চারটি মূল চরিত্রকেই এখানে সমানভাবে দেখানো হয়েছে যদিও মূল কাহিনীর বেশিরভাগই আবর্তিত হয়েছে আয়রন ফিস্টকে ঘিরে। এখানে পরিচালক তার মুনশিয়ানা বেশ ভালোভাবেই দেখাতে সমর্থ হয়েছেন।

আমার পছন্দের জায়গাটি হচ্ছে, মিডল্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্কেলে চার সুপারহিরোর জমায়েত। কাহিনীকে এমনভাবে বিনিসুতার মালায় গাঁথা হয়েছে যে, ৮ পর্বের এই সিজনে একটুও দম ফেলার অবকাশ নেই। প্রত্যেক পর্বেই নতুন নতুন চমক এনেছেন।

সত্য কথা বলতে গেলে, আয়রন ফিস্টকে নিয়ে টেস্ট ট্র্যান্সমিশন চালাবার ফলে দর্শকের যে হতাশাজনক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছিল, তার অনেকটাই কভার আপ করবার চেষ্টা করা হয়েছে ডিফেন্ডারসে। বলতে গেলে পরিচালকের কাহিনীকারদের মূল লক্ষ্যও হয়ত তাই ছিল। কতটুকু করতে পারল ড্যানি র‍্যান্ড, তা আপনি সিরিজটি দেখলেই বুঝতে পারবেন। তবে আমার কাছে এবার ড্যানিকে বেশ পরিণতই মনে হয়েছে।

এবার একটু পেছনের কথা বলি। দ্য ডিফেন্ডারস যখন নির্মিতব্য ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন একটি সত্ত্বা এসেছিল। জিমি ফ্যালনের লেইট নাইট শো, ট্রেভর নোয়াহর ডেইলি শো, স্টিফেন কোলবার্টের লেইট নাইট শো এমন আটটি বিখ্যাত টক শোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে তুলে ধরা হয়। বেড়ে যাওয়া অপরাধের গ্রাফ চার্ট, রেসিজম, সেক্সিজম, কাজের ব্যাপ্তি কমে যাওয়া, জনতা কোন দিকে তাদের আস্থার ভরসা রাখতে পারবে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত হওয়া ইত্যাদি নানা দিক উঠে আসছিল এই সময়ে। এই সময়কে বলা হচ্ছে, ইন্টার্নাল কনফ্লিক্ট ল্যাকিং ইন গ্রে টোনস।

দর্শকের কাছে এক সময় জরিপে জানতে চাওয়া হয়, আলেক্সান্দ্রার অমর হতে চাওয়ার এই মিশনে তারা কতটুকু সমর্থন জানাচ্ছে তাকে। অবাক হবার মত বিষয় হচ্ছে, তাদের অনেকেই এই ব্যাপারটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

ডিফেন্ডারস কেন আপনি দেখবেনঃ

১) কারণ, পছন্দের চরিত্রগুলোর সন্নিবেশ এখানে একসাথে দেখানো হয়েছে। ৮ পর্বের এই সিরিজে পরিচালক তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন প্রতিটি চরিত্রকে সমান গুরুত্ব দেয়ার।

২) ডেয়ারডেভিল বনাম ইলেকট্রা। বেশ কিছু অ্যাকশন দৃশ্য রয়েছে এবং দৃষ্টিনন্দন করবার মতই। একটা সময় আমার নিজেরই মনে হচ্ছিল ম্যাট মারডক নিজেকে বিস্ফোরণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন কি না। (কোন বিস্ফোরণ তা জানতে হলে আপনাকে এবার দেখতেই হবে)

৩) লিউক কেইজ ও আয়রন ফিস্টের খুনসুটি, ফিস্ট ফাইট।

৪) দ্য হ্যান্ড সংঘটির করুণ পরিণতি কিভাবে ঘটল। ইলেকট্রা শেষ পর্যন্ত ডেয়ারডেভিলের প্রিয়তমাই থাকছে নাকি নতুন এক খলনায়িকা পেতে যাচ্ছি আমরা।

৫) আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, নারী চরিত্রগুলোকে এখানে বেশ ভালোই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এলিভেটর ছিঁড়ে পড়ার দৃশ্যে জেসিকার ফিস্ট ও কেইজকে বাঁচানো, কলিনের সাথে বাকুতোর দ্বান্দ্বিক পতন, ক্লেয়ার, অফিসার মিসটি, ক্যারেন- যে যার জায়গায় বেশ ভালো অভিনয় করেছেন এবং কাহিনীপট থেকে বোঝা যাচ্ছে, লড়তে জেসিকা শুধু একাই জানেন না! প্রত্যেকটি নারীকে এখানে এক একজন সুপারহিরো হিসেবে দেখানো হয়েছে। এমনকি হারলেমের ঐ মাকেও, যিনি সদ্য হারিয়েছেন তার সন্তানকে।

আলেক্সান্দ্রা

তবে মজার কথা হচ্ছে, আপনি মার্ভেল ফ্র্যাঞ্চাইজের ফ্যান হয়ে থাকলে এসব কোন কারণই নয়, আপনি দেখবেনই। তবে এবার আসা যাক ডিফেন্ডারসের কিছু দূর্বলতার দিক, যা আমার কাছে মনে হয়েছে-

১) কাহিনী অত্যন্ত সাধারণ মানের। অনেকটা ভিনি ভিডি ভিসির মতই; এলাম দেখলাম আর জয় করলাম। একটি সুপারহিরো প্রোডাকশনে জয় শেষ পর্যন্ত নায়কেরই হবে তবুও এখানে কাহিনীসূত্র ঠিক যেন জমাতে পারেন নি পরিচালক।

২) ৮ পর্বের সিজনে কাহিনী একটু ঠাঁসা বলেই মনে হয়েছে, বিস্তার খুব কম।

৩) মিডল্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্কেল নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত থাকলে ভালো হত তাদের জন্য, যারা নতুনভাবে ডিফেন্ডারস দেখছেন।

৪) দ্য হ্যান্ড সংঘে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আলেক্সান্দ্রাকে দেখানো হয়েছে এবং বাকি চারজনের দিকে তেমনভাবে ফোকাস করা হয় নি। তবুও আলেক্সান্দ্রার পরিণতি নিয়ে বেশ বড় একটা চমক খেতে হয়।

৫) ডেয়ারডেভিলকে একটু ক্লিশে হিসেবেই লেগেছে আমার কাছে।

বাকি কিছু আর বললাম না। গেম অব থ্রোনসের জ্বরে এই সিরিজটি এখনো বেশ তাজাই রয়েছে। আপনারা দেখে নিজেরাই যাচাই করে নিন। লিউক কেইজখ্যাত মাইক কল্টার তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,

 

“দ্য ডিফেন্ডারসে আমার যে জিনিসটি সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তা হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক। বন্ধুর সাথে বন্ধুর সম্পর্ক, সাধারণ কেউ হয়েও অপরকে রক্ষা করতে চাওয়ার সম্পর্ক।”

সম্পর্কের এই মুগ্ধতায় মুগ্ধ হতে চাইলে আপনি দেখতেই পারেন মার্ভেল’স ডিফেন্ডারস। হতাশ হবার উপকরণ থাকলেও মুগ্ধ হবারও নেহাত কম কিছু নেই।