মহান বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ইতিকথা - প্রিয়লেখা

মহান বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ইতিকথা

ahnafratul
Published: July 27, 2017

যুগে যুগে এই পৃথিবীতে এসেছেন অসংখ্য বিজ্ঞানীরা। যারা তাদের কাজ, শ্রম, অধ্যবসায় দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন এই পৃথিবীকে। তাদের পথে নানা ধরণের বাঁধা বিপত্তি হয়ত এসেছে, পরিবর্তন হয়ত সমাজ মেনে নিতে চায় নি কিন্তু তারপরও তারা কিন্তু থেমে যান নি। তারা থেমে যান নি। সকল বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে তারা জয় করতে চেয়েছেন এই পৃথিবীকে।
সারা বিশ্বজুড়েই বিজ্ঞানীদের কীর্তিকলাপ আমাদের মুগ্ধ করেছে। তাদের মাঝে যদি আমরা তালিকা করতে যাই, তাহলে কে বড় কাজ করেছেন, কে ছোট কাজ করেছেন- তা খুঁজতে যাওয়া রীতিমত অন্যায় হয়ে যাবে। তবুও এই উপমহাদেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের একটু আলাদা টান থাকবে। আর তিনি যদি বাঙালি হন, তাহলে তো কথাই নেই। আসুন, আজ জেনে নেয়া যাক এমনই একজন মহান বাঙালি বিজ্ঞানীর কথা।

বাঙালি বিজ্ঞানী হিসেবে যারা বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে তুলতে শিখিয়েছেন, তাদের মধ্যে স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায় অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন রসায়নবিদ, শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানী “বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল” এর প্রণেতা তিনিই। আসুন আজ মহান এই বিজ্ঞানী সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু জেনে নেয়া যাকঃ

জন্মঃ
স্যার প্রফুল্ল রায়ের জন্ম ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট।

জন্মস্থানঃ
তার জন্ম এই বাংলাদেশেই। জন্মস্থান হচ্ছে তৎকালীন রারুলি-কাটিপাড়া, খুলনা।

পিতার নামঃ
স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের পিতার নাম হরিশচন্দ্র রায়। রাজা রামমোহন রায় কর্তৃক যে ব্রাহ্ম সমাজের উদ্ভব হয়েছিল, সেখানে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পিতা ছিলেন অন্যতম সংগঠক ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। তিনিও জাতপাতে খুব একটা বিশ্বাস করতেন না এবং তার সমাজের মানুষের মাঝে নানা ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন তিনি নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে প্রফুল্লও পিতার মত ব্রাহ্ম সমাজের সভায় যোগদান করেন ও নিয়মিত তিনি সেখানে যেতেন।

পড়াশোনাঃ
ছেলেবেলা থেকেই প্রফুল্ল ছিলেন মেধাবী। শিক্ষকরা সকলেই তাকে পছন্দ করতেন এবং তার প্রতিভার বিচ্ছরণের ছটা তারা ছোটবেলা থেকেই দেখতে পেতেন। শিক্ষাজীবনের শুরুটি একটি গ্রামের পাঠশালায় হলেও মেধাবী প্রফুল্ল কখনো কোথাও আটকে থাকেন নি। বরং আপন প্রতিভাবলে তিনি হয়েছিলেন উদ্ভাসিত। ১৮৭৯ সালের এন্ট্রান্স পাশ (তৎকালীন মেট্রিক) করবার পর তিনি কলকাতা চলে আসেন এবং বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। সেখানে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের কোন ব্যবহারিক ক্লাস না থাকার কারণের তিনি বহিরাগত ছাত্র হিসেবে প্রেসিডেন্সি কলেজে যান। এখানে তিনি বিশেষ করে অধ্যাপক আলেকজান্ডার পেডলারের অধীনে পড়াশোনা করেন। ১৮৮২ সালে সর্বভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। এরপর তিনি বিখ্যাত এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান। ১৮৮৯ সালে তিনি রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান করেন।

নিজের স্কুলে শিক্ষার্থীদের সাথে আচার্য

বিজ্ঞানের শাখায় উল্লেখযোগ্য কর্মঃ
প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান করবার পর কিছু বিষয় নিয়ে তিনি বেশ দুঃখবোধ করেন। দুঃখবোধের কারণটাও খুব স্বাভাবিক। এই সমস্যাটা এখন আমরা আমাদের দেশেও দেখতে পাই। মেধাবীদের কদর কোন জায়গায় হচ্ছে না। বরং সব জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছে চাটুকারিতা এবং স্বজনপ্রীতি। যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করে আসা প্রফুল্ল চন্দ্র রায় স্বদেশের জন্য কাজ করার কোন সাহায্য পাচ্ছিলেন না। এটি নিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার অভিযোগ করলেও কোন উত্তর আসে নি। কারণ, তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে স্থানীয় সরকার তেমন কিছুই করতে পারত না। আর একজন বাঙালি যোগ্যতাসম্পন্ন বিজ্ঞানীকে ব্রিটিশ সরকার সাহায্য করবে, এটি চিন্তা করাটাও কেমন যেন বাতুলতা ছিল।
১৮৯৬ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র জমা দেন যেখানে একটি নতুন ধরণের স্থায়ী রাসায়নিক পদার্থের উল্লেখ ছিল। এটির নাম ছিল মারকিউরাস নাইট্রেট। তার এই আবিষ্কারের ফলে মার্কারী (পারদ) ও নাইট্রেটের সমন্বয়ে আরো যেসকল রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে যায়। ১৯২০ সালে তিনি ভারতের বিজ্ঞান সভার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালে তিনি রসায়নের ওপর একটি স্কুল চালু করেন।
এছাড়াও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পরে জৈবিক সালফাইড ও স্বর্ণ, প্লাটিনাম, ইরিডিয়াম ইত্যাদি ভারী ভারী ধাতব পদার্থ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এসব কাজে সাহায্য করবার জন্য তিনি দক্ষ সাহায্যকর্মী সমন্বিত একটি দল পান।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায় আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করবার জন্য সমাদৃত।

সাহিত্যকর্মঃ

প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কিছু কর্ম

১৯৩২ সালে তিনি তার লেখা আত্মজীবনী “একজন বাঙালি রসায়নবিদের জীবন ও অভিজ্ঞতা” নামক একটি বই প্রকাশ করেন। এটি তিনি তৎকালীন ভারতীয় যুবকদের প্রতি উৎসর্গ করেন। বইটির দ্বিতীয় ভলিউম বের হয় ১৯৩৫ সালে। সংস্কৃত ভাষায় লেখা তার বহু ম্যানুস্ক্রিপ্ট রয়েছে।
এছাড়াও নানা বই, ম্যাগাজিনে তার মূল্যবান লেখা ছাপা হয়েছিল।

মৃত্যুঃ
১৯৪৪ সালের ১৬ই জুন এই মহান বিজ্ঞানী কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। কাঁদিয়ে চলে যান তার অনেক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।

এমন আরো বিজ্ঞানীদের জীবনী ও মহৎকর্ম জানতে থাকুন প্রিয়লেখার সাথেই।