ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টঃ যে বই আজো কেউ পড়তে পারে নি - প্রিয়লেখা

ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টঃ যে বই আজো কেউ পড়তে পারে নি

ahnafratul
Published: August 5, 2017

আচ্ছা, আমরা বই কেন পড়ি? কেউ পড়ি জানার জন্য, কেউ পড়ি স্রেফ বিনোদনের জন্য। ধরুন, এমন একটি বই লেখা হল, যে বইটি কেউ পড়তেই পারল না? পড়া তো দূরে থাক, বইটি কোন ভাষায় যে লেখা হয়েছে সেটিই কেউ জানতে পারল না? তাহলে কি আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে না? বইটি কি, কাদের জন্য লেখা, বইতে কি আছে- সেটি নিয়েই কথা বলব আজ। মূলত এটি একটি ম্যানুস্ক্রিপ্ট।

উইলফ্রিড ভয়নিখের নামে এটির নামকরণ করা হয়েছে, পোল্যান্ডের একজন বইয়ের ডিলার, যিনি ১৯১২ সালে এই ম্যানুস্ক্রিপ্টটি ক্রয় করেন। ম্যানুস্ক্রিপ্টটির বেশ কয়েক পাতাই নেই তবে বেঁচে থাকা ২৪০ পৃষ্ঠাও নিতান্ত কম রহস্যের সৃষ্টি করে নি। এর বেশিরভাগ পৃষ্ঠাই তৈরি করা হয়েছে ছবি এবং ডায়াগ্রামের সাহায্যে। কিছু কিছু পৃষ্ঠা ভাঁজ করা অবস্থায়ও পাওয়া গিয়েছে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেইনেখ রেয়ার বুক এন্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরীতে থাকা এই ম্যানুস্ক্রিপ্টটি যুগে যুগে অসংখ্য ক্রিপ্টোগ্রাফারদের রাতের ঘুম হারাম করেছে। ড্যান ব্রাউনের রবার্ট ল্যাংডন যদি বাস্তবে থাকতেন তাহলে তিনি এই ম্যানুস্ক্রিপ্টের কোড ব্রেক করতে পারতেন কি না সেটি নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন অনেক আমেরিকান ও ব্রিটিশ কোডব্রেকার ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টের রহস্যভেদ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেন নি।
নানা চিন্তার খোরাক ও বইয়ের পাতাতেই ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট সীমাবদ্ধ রয়েছে তবে এটা নিয়ে উপসংহারে কেউ পৌছতে পারেন নি। লাইব্রেরীর অভ্যন্তরে ক্যাটালগ MS 408 এর অধীনে থাকা ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে আসুন কিছু জেনে নেয়া যাকঃ

ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টের মালিকানার ইতিহাসঃ

এই বই সম্পর্কে খুব বেশি একটা জানা যায় নি তবে এর লেখনী দেখলে আন্দাজ করা যায় যে, প্রাচীন ইউরোপিয়ান ভাষার সাথে এর মিল রয়েছে। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনা এই বইটির রেডিওকার্বন ডেটিং করে সময়কাল নির্ধারণ করার চেষ্টা করে। ফলাফলে তারা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে এই ম্যানুস্ক্রিপ্টটি ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮, এর কোন একটি সময়কালের মধ্যে করা হয়েছে। শিকাগোর ম্যাক্রোন ইউনিভার্সিটি অব রিসার্চ তাদের পরীক্ষায় জানায় যে এই ম্যানুস্ক্রিপ্টটি যে অঙ্কন সামগ্রীর মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, তার ফলে প্রাচীন ইউরোপের অনেক অজানা তথ্য পাওয়া যাবে। তারা তাদের রিপোর্টে জানায় যে এটি যে কালি দ্বারা লেখা হয়েছে, তা পার্চমেন্ট আবিষ্কারের অনেকদিন পর পর্যন্ত লোকচক্ষুর সামনে আসে নি। তবে এই কালির মাধ্যমে কোন ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন কেউ হন নি, তা তারা হলফ করে বলেছেন।

ভয়নিখঃ যার নামে এই ম্যানুস্ক্রিপ্টের নামকরণ

জর্গ বারেশ্চ নামক একজন আলকেমিস্ট সর্বপ্রথম এই বইয়ের মালিক ছিলেন বলে ইতিহাসের তথ্যানুসারে জানা যায়। অনেকদিন তার লাইব্রেরীতে এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট পরে ছিল এবং তার সামান্যতম কোন ধারণা ছিল না যে এই বইটির পাঠোদ্ধার তিনি কেমন করে করবেন। আথানাসিয়াস কির্চার নামক একজন জেসুইট স্কলার এমন সময় তার গোচরে আসে, যিনি কিনা দাবি করেন হায়ারোগ্লিফিকের পাঠোদ্ধার তিনি করে ফেলেছেন। বারেশ্চ তার কাছে ম্যানুস্ক্রিপ্টটির একটি কপি পাঠিয়ে দেন এবং তিনি আগ্রহী হন যে এটির পাঠোদ্ধার কির্চার নিশ্চয়ই করতে পারবেন। ১৬৩৯ সালে পাঠানো বারেশ্চের চিঠি এই ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে যে, তিনি কির্চারের কাছে ম্যানুস্ক্রিপ্টটির পাঠোদ্ধারের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন। কির্চার তার চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন কি না তা সম্পর্কে জানা নেই সঠিকভাবে তবে তিনি বারেশ্চের নিকট হতে ম্যানুস্ক্রিপ্টটি পাওয়ার বাসনা করেন। বারেশ্চ তার এই আবেদন নাকচ করে দেন। বারেশ্চের মৃত্যুর পর তার বন্ধু জান মারেক মারচির নিকট হতে ঘটনাচক্রে ম্যানুস্ক্রিপ্টটি কির্চারের হাতে আসে।
ধারণা করা হয়, বইটি রাজা দ্বিতীয় রুডলফের অধীনে ছিল, যিনি এটি পাবার জন্য ৬০০ স্বর্ণের ডুকাট খরচ করেন। এবার জানা যাক ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টটিতে আসলে কি রয়েছে?

মেসো আমেরিকান এমন কোন অঞ্চলেই লেখা হয়েছিল ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট

১) ম্যানুস্ক্রিপ্টটিতে বর্তমানে পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪০ এবং এর পার্চমেন্টের পাতাগুলো দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ১৫*২৭ সেন্টিমিটার, পুরুত্ব ৫ সেন্টিমিটার। এটি লেখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পাখির পালক এবং কালি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন ধরণের রঙ। এতে নানা ধরণের ছবিও আঁকা হয়েছে।

২) কেউ কেউ ধারণা করেন যে, ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টের পেছনে ভীনগ্রহবাসীর হাত রয়েছে। আতসী কাঁচ দিয়ে যদি এর পৃষ্ঠাগুলো ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যায় যে এতে সামান্যতম আঁচড় বা কোন ধরণের কাটাকুটি করা হয় নি। এটি দাবি করা হয় যে, কোন মানুষের পক্ষে সামান্যতম ভুল ছাড়া এমন একটি বই একবারে লেখা সম্ভব নয়।

CIT
                                                           ভীনগ্রহবাসীর হাত সত্যিই ছিল ম্যানুস্ক্রিপ্টের লেখনীতে?

৩) ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টটে রয়েছে মোট ৩৭,৯১৯টি শব্দ এবং মাত্র ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ দ্বারা এটি তৈরি করা হয়েছে। এর মাঝেই রয়েছে ফার্মাসি, বোটানি, বায়োলজি, কসমোলজি, অ্যাস্ট্রোলজি ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর ছবি। এর ভাষার ব্যবহারের প্যাটার্ন দেখে অনেকে বলছেন যে এটি তৈরি করা হয়েছে সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবার মতই কোন একটি ভাষায়। তবে অজানা কোন কারণে এটি কোন ভাষা, তা মানুষের পক্ষে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ধাঁধাঁ বলে অনেকে ধারণা করেন।

৪) ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে নানা ধরণের কথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন এটি পনের শতকের কোন বিজ্ঞানীর তৈরি কোডেড ধাঁধাঁ, আবার কেউ বলেন এটিও তৈরির পেছনে আন্নুনাকিস গোত্রীয় ভীনগ্রহবাসীর হাত রয়েছে। কেউ কেউ তো আবার জোরেসোরে দানিকেনের বক্তব্যও প্রমাণ করতে লেগে যান ভয়নিখের পাঠোদ্ধারের ব্যাপারে।

৫) একজন ফ্রান্সিস্কান সাধু ও আলকেমিস্ট রজার বেকন (যিনি ডক্টর মিরাবিলিস নামেও পরিচিত) এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট লিখেছেন বলে অনেকে দাবি করেন। রজার আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ নিয়ে চমতকার কিছু কাজ করেছেন। তবে এই যুক্তি খাটে না কারণ, রজার বেকন মৃত্যুবরণ করেন ১২৯৪ সালে আর ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টের কার্বন ডেটের বয়স ১৪২০ থেকে শুরু!

CIT
                                              রজার বেকনঃ ধারণা করা হয় যিনি ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টের লেখক

৭) প্রায় ৩৮,০০০ শব্দ থেকে মাত্র ১০টি শব্দের পাঠোদ্ধার করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত।

৮) ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্ট লেখার সময় কোন কৃত্রিম বা তৈরি কালির ব্যবহার করা হয় নি। নানা ধরণের খনিজ সম্পদ ও চকমকি পাথর থেকে এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়েছে।

পবিত্র পূজা সম্পন্ন করছেন একজন নারী

“অনেকেই”, “কেউ কেউ”, “ধারণা করছেন”, “হয়ত” এই শব্দগুলো ব্যবহার করা একদম যুক্তিযুক্ত ভয়নিখ ম্যানুস্ক্রিপ্টের বর্ণনায়। কারণ, যার সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না, তাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিই বা করা আছে আমাদের? তবে শত শত বছর ধরে রহস্যময় এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট আকৃষ্ট করেছে মানুষকে, কেড়েছে তাদের আগ্রহ। হয়ত একদিন অবশ্যই এই ম্যানুস্ক্রিপ্টের রহস্য মানুষ ভেদ করবে!

আজ এ পর্যন্তই। প্রিয়লেখার সাথেই থাকুন, সকলের প্রিয় হয়ে থাকুন।